নারী ও আধুনিক সমাজ ~ স্বাতী সরকারের প্রবন্ধ


স্বাতী সরকারের প্রবন্ধ 
নারী ও আধুনিক সমাজ 

"সমগ্র সৃষ্টিকে সুখে রাখার জন্য ব্রহ্মা সৃষ্টি করেছিলেন নারী"। আবার কখনো অপ্রতিরোধ্য, শক্তিশালী অসুর বধের জন্যও জন্ম নিয়েছিল নারী। নারীর গঠনমূলক উপাদানের মধ্যেই আছে নমনীয়তা আর শক্তির মেলবন্ধন। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার ধাপগুলিতে যে অনুভূতিগুলো প্রাধান্য পায়, স্নায়ুপদ্মের সেই পাপড়িরই উন্মোচন হয়।
           সাধারণত নারীদের নমনীয়তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, লজ্জা,ভয়কে সামনে রাখা হয় তাই তারই প্রকাশ হয়। আবার যখন তাকে শক্তি-পরীক্ষা দিতে হয় তখন মীরাবাঈ, মেরীকম,গীতা-ববিতাকে পাই।
   নারী শরীরের জৈব রাসায়নিক পদার্থগুলি পুরুষকে আকৃষ্ট করে আসছে চিরকাল,শুধু সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারোর হাত নেই এতে। নিয়ন্ত্রণ আছে শুধু পুরুষের চিন্তায়। আদিমকাল থেকে বর্তমানের অন্তর্জালের আধুনিকতা; সবসময়ই শিকার হয়ে আসছে মেয়েরা, যারা সৌন্দর্য,লজ্জা,ভয়কে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। আর যারা শক্তিকে মর্যাদা দেয় তাদের দিকে পাশবিক হাত সহজে এগোয় না। আধুনিক সমাজ মেয়েদের শক্তির সম্মান দেয়।
       রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিকতার প্রাণপুরুষ। স্বামীর অন্তর্জলি যাত্রার সহযাত্রী হওয়া থেকে মুক্তি পেয়ে আজকের অন্তর্জালের যুগ। একদিনে হয়নি এই পরিবর্তন, একদিনে হয়নি এই সমাজ আধুনিক। দিনে দিনে নারী তার অন্তর্নিহিত শক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছে। এখন পাতাল থেকে মহাকাশ,সর্বত্র তার বিচরণ।
        তবে আধুনিক সমাজকে বাহন করে নারীকে তার অশ্বমেধের ঘোড়া নিয়ে এগোতে হলে শক্ত হাতে লাগাম ধরতে হবে। কারণ যে অপ্রতিরোধ্য গতি নারীর জীবনকে সাফল্যের সাথে এগিয়ে দিচ্ছে সেই গতিই তাকে বিপদে ফেলতে পারে,দুর্বার গতিতে বিপথে নিয়ে যেতে পারে,সেখান থেকে ফিরে আসাটা সহজ নাও হতে পারে। আধুনিক পোশাক ও আধুনিক চিন্তা এই দুই পরিধানের ক্ষেত্রেই শালীনতা রাখা উচিত,এতে নারীর সৌন্দর্য,মর্যাদা বা গরিমা কিছুই ক্ষুণ্ণ হয় না, না তার শক্তি কমে।
           এমন নয় যে তাকে ঘেরাটোপের মধ্যে থাকতে হবে অথবা সম্পূর্ণ আবৃত করে নিতে হবে নিজেদের অথবা তার স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে; এমনও নয়, যে সব পুরুষ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে না সেই দায় বর্তাবে নারীর খোলা মনের পোশাকের উপর।তবে এটাও মনে রাখতে হবে,স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচার নয়।
       নারী তার নিজস্বতায় বলীয়ান হোক,স্বাধীন হোক চিন্তায়,আধুনিক হোক মননে। তার উন্নত চিন্তার স্ফুলিঙ্গে ঝলসে উঠুক পুরুষ মন,তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে এফোর ওফোর হয়ে যাক আদিমকাল থেকে বয়ে আনা আদিম রীপু। নারী শুধু বাহ্যিক,শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য পুরুষের আকর্ষণের কেন্দ্র নয়,নরম মন কিন্তু ইস্পাতের মত স্নায়ু ও পেশীর অধিকারিণী হয়ে নিজেদের রক্ষা করতে শিখুক।
   পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা নয়,তার সমকক্ষতার জন্য লড়াই নয়, নারীর নিজস্বতা,নারীত্বকে উপলব্ধি করাই আসল কাজ। নারীর সমকক্ষ একমাত্র নারী নিজেই। নিজের ক্ষমতা,দক্ষতাকে নিরন্তর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উদযাপন হোক নারীশক্তির। সমগ্র বিশ্বের একক হল আমাদের প্রত্যেকের 'ঘর', যেখানে আমাদের জন্মদাত্রীই তো নারী। নারী ছাড়া সৃষ্টিই সম্ভব না। এত বড় সত্য যেখানে প্রতিষ্ঠিত,সেখানে পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার লড়াই তো অপ্রাসঙ্গিক; আর ধ্বংস করার অধিকার একমাত্র সৃষ্টিকর্তারই থাকে। তাহলে সৃষ্টি আর ধ্বংস দুই ই যদি নারীর অধিকার হয়,তবে একমাত্র নারী ই বিশ্বেশ্বরী,সর্বশক্তির অধিকারী, মহামহিম। এই বোধ প্রতিটি নারীকে তার মধ্যে ধারণ করতে হবে।পৃথিবীর সুখের চাবিকাঠি যদি নারীর গুন হয়; তবে তার দুঃখের কারণ কারোর হওয়ার কথা নয়। নিজের অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে অবহিত না হাওয়াই তার দুঃখের কারণ। পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়,প্রয়োজন নিজের শক্তি,নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
            তাই আধুনিক নারী; উন্মুক্ত করো নিজের বুদ্ধি,জ্ঞান...উন্মোচন করো ভয়ের পর্দা, মেলে ধরো নিজেকে। জন্ম দেওয়ার সাথে সাথে আশ্রয় হয়ে ওঠো পুরুষের।ফুলের মত নমনীয়তা দিয়ে সুখ দিতে কার্পণ্য কোরো না, আবার প্রয়োজনে বজ্রের মত ঝলসে উঠে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতেও দ্বিধা কোরো না।।

প্রবন্ধকার স্বাতী সরকার 
 ড. পঞ্চানন মিত্র লেন, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 

















0 Comments