রান্নাঘরে চায়ের জলটা সবে চাপিয়েছিল রেখা, পড়িমরি করে ছুটে আসে...
--"কি হল সোনা? অমন করে ডাকছিস কেন?"
--"কি করছো তুমি? একটু আমার কাছে বসো না "...
--" দাঁড়া, আসছি.. চায়ের জলটা গ্যাসে চাপানো আছে, বন্ধ করে আসি "..
--" ঠিক আছ, এক কাজ করো.. দু'জনের জন্য চা নিয়েই এসো"..
--"আসছি"....
রেখা চলে গেলে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায় শ্রীপর্ণা। ছবিটার গলায় রজণীগন্ধার মালাটা হঠাৎ দুলে উঠে যেন বলতে চাইল, "এই তো আমি আছি "....
কত তাড়াতাড়িই যেন সব শেষ হয়ে গেল। এই তো, মনেহচ্ছে ক'দিন ধরে মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না, তাই বলে দুম করে যে একেবারে চলে যাবে শ্রীপর্ণা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। গতকাল তো নিয়মভঙ্গও হয়ে গেল। নিজের বলতে ওই তো এক পিসি আর এক মামা.. যেহেতু মামার বাড়ি কাছাকাছি, তাই মামা -মামী যাওয়া-আসা করছিল।পিসিই ছিল এ ক'দিন.. সেও আজ সকালে চলে গেল নিজের বাড়ি। এখন এই বাড়িতে শুধুই সে আর রেখামা....।
বাবাকে তার মনে পড়ে না। কারণ ,তার দু'বছর বয়সে হঠাৎ করেই একটা দুর্ঘটনায় মারা যায় বছর বত্রিশের সুরঞ্জন বসু। শ্রীপর্ণার মা সুজাতা তখন মাত্রই পঁচিশ। সেই অবস্থায় ওই ছোট্ট মেয়েকে বুকে নিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়িকে আগলে স্বামীর চাকরিতে যোগ দেয় সুজাতা বসু। তারপর শুরু হয় তার জীবনসংগাম....।
একে একে প্রথমে শ্বশুর এবং তার বছর পাঁচেক পর শাশুড়ি গত হলে শ্রীপর্ণাকে আঁকড়েই জীবনের লড়াই চালিয়ে যান সুজাতাদেবী। শ্রীপর্ণার পড়াশোনা, গান, চাকরি সবেতেই সবসময় মা'কে পাশে পেয়েছে সে.. কখনও কখনও সে নিজে ক্লান্ত হয়েছে, আশাহত হয়েছে, কিন্তু মা'কে কখনও ক্লান্ত হতে দেখেনি। একমাত্র বছর দুই আগে একটা চিঠি আসার পর খুব ভেঙে পড়েছিলেন কয়েকদিন.. কিন্তু শ্রীপর্ণা বারবার করে জিজ্ঞাসা করলেও কোন সদুত্তর পায়নি।
--" এই নে চা.. আর কিছু খাবি?" রেখা চা নিয়ে আসে।
--"না না.. তুমি বসো "..
--" বসবো কি? রাতের খাবার করতে হবে না...
তারপর ঘরদোরও কেমন হয়ে আছে.. দিদিটা ছিল তবু ভালো লাগছিল.. এখন যেন ঘরটা একদম খাঁ খাঁ করছে "...বলতে বলতে চোখ মোছে রেখা।
--" কি করবে বলো? এটাই জীবন রেখামা... এবার শুধু তুমি আর আমি "...
চা খাওয়া শেষ হলে কাপ দুটো নিয়ে রান্নাঘরে যায় রেখা।
এই একটা মানুষ, সুজাতা বসুর জীবনসংগ্রামে সবসময় তার পাশে থেকেছে। কবে পনের বছর বয়সে এ বাড়িতে এসেছিল.. তারপর থেকে এখানেই রয়ে গেছ। নিজের বলতেও আর কেউ নেই, যারা আছে তারা খোঁজখবর নেয় না..
শ্রীপর্ণা যখন ছোট, সুজাতা শিখিয়ে ছিলেন রেখামাসি ডাকতে.. ছোট শ্রীপর্ণার ডাকে সেটা হয়ে যায় রেখামা.. রেখাও ওর মুখে মা ডাক শুনে খুব খুশি হতো... সেই থেকে রেখা ওর 'রেখামা'..।
সন্ধ্যেবেলায় মায়ের আলমারিটা খুলে পুরানো ফাইলগুলো দেখছিল শ্রীপর্ণা। একটা ফাইলের ভিতর হঠাৎ করেই দেখে একগোছা চিঠি। খুব অবাক হয়ে চিঠির গোছাটা হাতে নিয়ে খাটে বসে চিঠিগুলো খুলে পড়তে থাকে... একটা.. তারপর আর একটা... তারপর আর একটা....। বিস্ময়ে, আবেগে হতবাক হয়ে যায় সে।
চিঠির কোনওটায় লেখা," প্রিয় সুজাতা, কেমন আছো? জানি তুমি ভালো নেই.. তবু্ও কিসের জেদে সবকিছু আঁকড়ে আছো?.., অন্য একটায় লেখা, "প্রিয় সুজাতা, কিছু ভাবলে আমাদের কথা? আমি মা'কে রাজি করিয়েছি.. কিছু তো বলো"...., আর একটায় লেখা, " সারাজীবন শুধু অন্যের কথাই ভাবলে? আমি কেউ নই তোমার? আমার কথা একটুও ভাববে না?"...এইরকম মোট সতেরটা চিঠি রয়েছে। প্রত্যেকটাতে প্রেরকের জায়গায় লেখা, "ইতি - তোমারই জয়"..।
চিঠিগুলো উল্টেপাল্টে দেখে ঠিকানা, শ্রীরামপুর, সুভাষপল্লী। প্রেরকের পুরোনাম শ্রী সঞ্জয় মুখার্জি।
সব চিঠিগুলো পড়ে শ্রীপর্ণা বুঝতে পারে যে, কোনও এক সঞ্জয় মুখার্জির সাথে বিয়ের আগে থেকেই মায়ের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু সম্ভবত দুই বাড়িই এই সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় শ্রী সুরঞ্জন বসুর সাথে মায়ের বিয়ে হয়ে যায়.. কিন্তু বিবাহিত জীবনের মাত্র চারটে বছর স্বামীর সাথে কাটিয়ে কেবলমাত্র বৃদ্ধ,অসহায় শ্বশুর-শাশুড়ি আর শ্রীপর্ণাকে বুকে আগলে শ্রী সঞ্জয় মুখার্জির আহ্বানে সাড়া দিতে পারেনি শ্রীমতী সুজাতা বসু।
চিঠিগুলো যথাস্থানে রাখতে গিয়ে আর একটা চিঠি চোখে পড়ে শ্রীপর্ণার। এটার লেখক কোনও এক সৌরভ মুখার্জি। চিঠিতে লেখা, " জ্যাঠামশাই গত দুইদিন হল পরলোকগমন করেছেন। ওনার কথামতোই আপনাকে খবরটা জানালাম। যদি সম্ভব হয় শ্রাদ্ধের সময় উপস্থিত থেকে বাধিত করবেন"।শ্রীপর্ণা দেখে চিঠিটা বছর দুই আগের লেখা। সে বুঝতে পারে, তাহলে এই সেই চিঠি যেটা দেখে মা ভেঙে পড়েছিল।
চিঠিগুলো রেখে আলমারিটা বন্ধ করে জানলার ধারে এসে দাঁড়ায় শ্রীপর্ণা, বাইরে শ্রাবণের ধারা অঝোরে ঝরে চলেছে....
রাত্রে খাওয়ার পর শ্রীপর্ণা রেখাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবে ঠিক করে। কারণ, প্রথম থেকেই তার মায়ের সাথে রেখার একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হয়ত সে এ ব্যাপারে সব জানে।
--"রেখামা, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলার আছে। একবার এসো না এখানে "...
--" এই যে আসছি.. রান্নাঘরের লাইটটা অফ করে আসছি "...
ঘরের বড় লাইটটা অফ করে ছোট লাইটটা জ্বালিয়ে চেয়ারে বসে শ্রীপর্ণা।
--" বল, কি বলবি?" রেখা রান্নাঘরের কাজ শেষ করে এসে বসে।
--"আচ্ছা রেখামা, তুমি তো মা'কে অনেকদিন থেকে চেনো.. তাই না?"...
--"হ্যাঁ রে, তা তো চিনিই... আমার মা তোর খামারবাড়িতে রান্নার কাজ করতো..কিন্তু আমার মা'কে তোর দাদু-দিদিমা কোনওদিন রান্নার লোক বলে ভাবেনি,নিজেদের পরিবারের একজন বলেই ভাবতো। তাইতো দিদির যখন বিয়ের ঠিক হল তখন থেকেই আমাকে বলেছিল, "তুই আমার সঙ্গে থাকবি। " তবে প্রথম থেকে ছিলাম না, তুই যখন হলি তখন আমার পনের-ষোল হবে.. সেই যে এলাম, আজও রয়ে গেলাম... দিদিই চলে গেল আমাকে ছেড়ে "...ফুঁপিয়ে ওঠে রেখা।
--" আচ্ছা রেখামা, তুমি সঞ্জয় মুখার্জি বলে কাউকে চিনতে বা এমন কারোর কথা শুনেছো? "... শ্রীপর্ণা সরাসরি জিজ্ঞাসা করে রেখাকে।
রেখা হঠাৎ যেন চমকে ওঠে প্রশ্নটা শুনে..
--" হঠাৎ একথা জিজ্ঞাসা করছিস?"..
--" জিজ্ঞাসা করছি কারণ আছে বলে.. বলো না চিনতে তুমি তাকে?"..শ্রীপর্ণা চিঠিগুলোর কথা বলে রেখাকে।
--"হ্যা, চিনতাম.. আসলে তোর মা আমাকে সব কথা বলতো.. দিদি যখন কলেজে ভর্তি হল তখন সঞ্জয়দা শেষ বছরে। দু'জন দু'জনকে খুব ভালোবাসতো...কিন্তু জানাজানি হবার পর দু'বাড়ির কেউই এ সম্পর্কটা মেনে নেয়নি। তোর দাদু দিদির কলেজের শেষ পরীক্ষার পরেই তোর বাবার সাথে বিয়েটা ঠিক করে ফেলে। বিয়ের পর দিদির ফাইনালের রেজাল্ট বেরিয়েছিল। রাশভারী বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তোর মায়ের ছিল না। তাই তোর বাবার সাথে বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে চলে আসে। তারপর তুই হলি.. আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়েই আসছিল... হঠাৎ করে তোর বাবা চলে গেল "...
--" তারপর? আর সেই সঞ্জয় মুখার্জির কি হল?"..
--"জামাইবাবু মারা যাওয়ার পর তোর মা যখন অফিস যাওয়া শুরু করল তখনই কোনও একদিন যাওয়া-আসার পথে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যায় দু'জনের। সব শুনে অনেকবার করে বলেছিল তোর মা'কে বিয়ের জন্য, কিন্তু দিদি রাজি হয়নি। আসলে তার একটা কারণ আছে"।
--"কি কারণ, রেখামা? বলো না প্লিজ "....
--" সঞ্জয়দার মা রাজি হয়েছিল একটা শর্তে, যে তোকে এখানে রেখে যেতে হবে। তোর মায়ের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি.. তাই "....
--" আর সঞ্জয় মুখার্জি?".....
--" সঞ্জয়দা আর সারাজীবন বিয়ে করলো না... ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়েই কাটিয়ে দিল... বছর দুয়েক আগে তো সেও চলে গেছে".....চুপ করে থাকে রেখা।
--" আচ্ছা যাও.. শুয়ে পড়ো... রাত হয়ে গেছে.. কাল থেকে আমারও অফিস আছে "...
রেখা চলে গেলে জানলার কাছে এসে দাঁড়ায় শ্রীপর্ণা। বৃষ্টিটা অনেকটা কমে এসেছে।
হঠাৎ মিহিরের কথা মনে পড়ে যায়। ইউনিভার্সিটিতে আলাপ ওর সাথে। শ্রীপর্ণা বাংলা আর মিহির ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু দু'জনের কমন ভালোলাগা ছিল গান। একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়েই চাকরি পেয়ে যায় মিহির। বিয়ের কথাও বলেছিল, কিন্তু শ্রীপর্ণা চাকরি না পেলে বিয়ে করবে না জেদ করেছিল... আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়তে থাকে.. তারপর.......
রাত্রে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ মায়ের কথা চিন্তা করতে থাকে শ্রীপর্ণা। আজ মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আরও যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে তার। একটু পরে চোখ বন্ধ করে মনে মনে মা'কে একটা চিঠি লেখে সে, " মা, তুমি কেমন আছো? সারাজীবন মনের মধ্যে এত কষ্ট লুকিয়ে রেখেছিলে শুধুমাত্র আমার জন্যে? আজ আর আমি তোমাদের মাঝে বাধা হবো না মা । তোমার সাথে সঞ্জয়কাকুর দেখা হয়েছে তো? অনেকদিন অপেক্ষা করেছে তোমার জন্য... আর ওনাকে কষ্ট দিও না.... একটু সময় দিও। খুব ভালো থেকো... শ্রী "......
মিহিরকেও একটা চিঠি লেখে সে, " মিহির, তুমি কোথায়? একবার আমার সাথে দেখা করবে? আমার যে তোমাকে খুব প্রয়োজন....তোমার পর্ণা "....
চিঠিদুটো হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে দেখে সব ফাঁকা.... একটাও ডাকবাক্স কোথাও চোখে পড়ে না তার... চিঠিগুলো ফেলবে কোথায়? দিশাহারার মত চলতে থাকে সে.. চিঠিগুলো দু'হাতে ধরেই থাকে....একটা ডাকবাক্স তাকে খুঁজে বের করতেই হবে....একটু দাঁড়িয়ে একটা ডাকবাক্সের খোঁজে আবার হাঁটতে থাকে শ্রীপর্ণা...
গল্পকার শুক্লা মুখার্জি
সুভাষপল্লী, পূর্ব বর্ধমান