
মাস্টারমশাই
হাট্টাগাট্টা বলিষ্ট চেহারার লোকটা
মাস্টার মশাইয়ের বাড়িতে প্রায় সারা বছর যাবৎ কাজ করে যাচ্ছে।লোকে ওকে ভজা বলে ডাকে, আসল নাম ভজন।লোকে খুব একটা বেশি ভজাকে কাজে নেয় না কারন ওর খোরাক বেশি মানে আধসের চাল ভাত নাকি গোগ্রাসে গিলে ফেলে।তাই সংসারে অনটন লেগেই থাকে।নিজে দুবার পেটপুরে খায় -মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে মালতি সরাদিন কী খেয়েছে সে জানে না।সাত বছর হলো বিয়ে হয়েছে মালতির সাথে কিন্তু বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। ঠাকুরের দয়ায় মালতি এবার মা হতে চলেছে। দুজনের ভাব ভালোবাসার কোনো খামতি নেই।মালতিকে নাকি ওর বাড়ি থেকে রাতের বেলায় তুলে নিয়ে পালিয়ে ছিলো।ভজন মুর্খ হতে পারে কিন্তু মাস্টারমশায়ের বাড়িতে কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখে গেছে।চন্দ্রায়ন-২,পি.ভি.সিন্ধু,পে- কমিশন, জয়েন্ট পরীক্ষা, অ্যামাজনের আগুন,রাজনীতির হালহকিকৎ, ৩৭০ধারা, এন.আর.সি,করোনা ভাইরাস...সব কিছুর খবর রাখে ভজন।তাই ভজনের স্ত্রী'র ভজনকে নিয়ে গর্বের সীমা নেই।একদিন মালতির প্রচন্ড জ্বর তবু ভজন কাজে এলো।কারণ টাকার ভীষণ প্রয়োজন, হাতে যে টাকা ছিলো বউকে ডাক্তার দেখিয়ে শেষ। মাস্টার বাবুকে যাবার সময় বলে গেলো-- "মাস্টারবাবু সন্ধ্যার সময় বাজারে হাজিরার ৩০০ টাকা দিবেন ঘরে চাল ডাল কিছুই নাই, কিনতে হবে"। সন্ধ্যার সময় বাজারে দেখা হলো দুজনের। মাস্টারমশাই বললো...
--শোন ভজন, মানিব্যাগ আনতে ভুলে গেছি ;তুই ধার বাকি করে চালিয়ে নে।কালকে দিয়ে দিবো।।
--না আমার টাকা লাগবেই মাস্টার।
-- আরে চালিয়ে নে,তোকে তো আমি সবসময়ই দিই।
-- না আমার লাগবেই বাড়িতে চাল, ডাল কিছুই নাই।
--বলছি তো কালকে দিয়ে দিবো,আজকে ধারবাকি করে চালিয়ে নে।
দু'এক কথা বলতে বলতে তর্কাতর্কি। লোকজন জড়ো হয়ে গেল।
তারই মাঝে,বাজারের ব্যাগ মাস্টারের মুখে ছুঁড়ে মারলো ভজন!সবাই অবাক হয়ে গেল!নিজেও বুঝতে পারলো না।মাস্টারের মুখ লজ্জায় পাংশুটে হয়ে গেল।কেউ কিছু বলার আগে-মাস্টার পাশের দোকান থেকে ৩০০ টাকা ধার নিয়ে, ভজনকে দিলো।তারপর এক অদ্ভুত কান্ড ঘটালো মাস্টারমশাই..." গায়ের শার্ট খুলে ধুলো ঝেড়ে বিদায় নিলো।"
ভজন বাড়িতে এসেছে বাজার করে,তারও মন খারাপ। বাড়িতে এসে দেখে মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী, যাকে ভজন দিদিমনি বলেই ডাকে।উনিও একজন হাইস্কুল শিক্ষিকা।উনি জানতেন ভজনের বৌ-মা হতে চলেছে।তাই তিনি কতদিন ভেবেছেন ভজনের বৌকে দেখতে যাবেন এবং কিছু কথা বলে আসবেন।তাই উনি মালতিকে দেখতে এসেছেন। ভজন ঘরে আসার সাথে সাথে মালতি বলছে- দেখো গো? দেখো? দিদি মনি কত কী নিয়ে এসেছে? -ব্যাগ ভর্তি ফলমূল,জামাকাপড়, নতুন শাড়ি, আরো তিন হাজার টাকা দিলো ডাক্তার দেখানোর জন্য ও ঔষধ খাওয়ার জন্য।একথা শুনে ভজন হাও মাও করে কাঁদতে লাগলো।আমি কী সব্বনাশ করলাম গো আমি কী সব্বনাশ করলাম? আমি অমানুষ, আমি অমানুষ। মালতি ও দিদিমনি দু'জনেই অবাক হয়ে গেলো।মালতি জিজ্ঞাসা করছে কী? হয়েছে কী? বলবে তো?তার পার ভজন- বাজারে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বলে।মালতি ও কাঁদতে লাগলো.. দিদিমনি বললো? কাঁদিস না তোরা। ভজন বললো.. "না দিদিমনি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে"? একথা বলে ভজন সোজা দৌড়ে মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি।একেবারে মাস্টারমাশাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে.. " আমাকে ক্ষমা করুন মাস্টারমশাই,আমাকে ক্ষমা করুন,বড় ভুল করেছি।" মাস্টারমশাই বললো.."পা ছাড়,আমি তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি।আরে বোকা ;যে নিজের ভুল নিজে বুঝতে পেরে ক্ষমা চায়,সেইতো আসল শিক্ষক।"
গল্পকার পার্থ প্রতিম পাল
শিলিগুড়ি, শিবমন্দির, রবীন্দ্রসরণি



0 Comments