শৌভিক চ্যাটার্জী'র অণুগল্প



অংক স্যার 

পত্রিকার সম্পাদক আবদার করেছেন,শিক্ষক দিবস নিয়ে কিছু লিখে দিতেই হবে।ছোটগল্প,মুক্তগদ্য যা হোক কিছু একটা বা নিদেনপক্ষে একটা অনুগল্প।কিন্তু মাথায় যে কিস্যু প্লটই আসছে না।ইতিউতি এলোমেলোমি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।কিছুতেই জমাটি একটা গল্প দাঁড়াচ্ছেই না।আজকাল ফোনেই লিখি।লিখছি আর মুছছি। বাইরের বারান্দায় এসে বসলাম।কিছু আদ্র হাওয়া সোঁদালি গন্ধ মাখিয়ে দিয়ে গেল চোখেমুখে। শিক্ষক দিবসের সময়টা ভরা বর্ষাই থাকে।খানিক আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে।স্নান করা মাধবিলতার সুবাস এ ঘর বারান্দা ম ম করছে।আবারও আসল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসছি,অজান্তে।দুতিনটে বাচ্চা সাইকেল চালিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে হল্লা করে চলে গেল।পিঠে ব্যাগ।চোখ ওদের পিছু নিয়ে মোড়ের মাথার বাঁকে আটকিয়ে গেল।
         মে মাস থেকে ছেলেটার বাবার জুটমিল বন্ধ।আয় নেই কিছুই।সংসার কী ভাবে বারো তেরো বছরের ছেলেটার জানার কথা নয়।সে সবেমাত্র মাস দুই হল,নতুন ক্লাসে উঠেছে।রেজাল্ট তার বরাবরই ভাল।মাষ্টারমশাইরা যে বেশ স্নেহ করেন,এ তাদের আচরণেই পরিষ্কার বুঝতে পারে সে।তবে তার পারিবারিক অবস্থার কথা বিশেষ কেউ জানেন না।কোনও কোনও স্যার মাঝে মধ্যে বলেই বসেন একঘর ছাত্র ছাত্রীর সামনে,'তোমার ফিস্ টা বাকি রয়েছে,পরেরদিন নিয়ে এস!'।অনেক অসাধ্য সাধনে টিউশনের টাকা জোগান ছেলেটির বাবা।তবে কৃষ্ণেন্দু স্যার একটু বেশিই পেশাদার।এবছরই প্রথম পড়তে ঢুকেছে,সে।অংক করান দারুণ। ছবির মত বুঝিয়ে দেন।এক কথায় হজম করিয়ে দেন বলাই ভাল।কৃষ্ণেন্দু স্যার স্থানীয় কোনও স্কুলে পড়ান না,বাইরের কোনও স্কুলের স্যার।শহরে নতুন এসেছেন।পড়াশুনোর বাইরে কোন অপ্রয়োজনীয় কথা একটাও বলেন না।বন্ধুদের সঙ্গে যখন ভর্তি হতে গিয়েছিল,স্যার স্পষ্টত বলেছিলেন,'দ্যাখো,আমি তিনমাসের ফিস্ অ্যাডভান্স্ নিয়ে পড়াই।'অনেক কষ্ট করে,সে অর্থ জোগান দিয়েছিল ছেলেটির বাবা।একেবারে রেজিস্টারে সই সাবুদ করে,ভর্তি হওয়া।'মাষ্টারমশাই,টাকার কথা বললে কেমন যেন লাগে!'মনে হত ছেলেটির।
        
দেখতে দেখতে সেপ্টেম্বর এল।স্যারেদের ব্যাচে ব্যাচে,শিক্ষক দিবসের প্রস্তুতিপর্ব চলছে।প্রত্যেককে চাঁদা দিতে হয়।ছেলেটি চাঁদার প্রশ্নে বড় কুন্ঠিত থাকে।স্বাভাবিক নিয়মেই কৃষ্ণেন্দু স্যারের ব্যাচেও আলোচনা চলতে থাকল।কীভাবে চারচৌকো বড় বারান্দাটিকে সাজান হবে। এই বারান্দাটিই স্যারের ক্লাসঘর।স্থির হল,পঞ্চাশটাকা করে মাথা পিছু চাঁদা।তবে শান্তির কথা কৃষ্ণেন্দু স্যার কোন ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে উপহার নেন না কোনভাবেই।তাই চাঁদা খানিকটা কমই।তবুও পঞ্চাশটাকা জোগাড় করা খুবই চাপের ছেলেটির পক্ষে।কীভাবে ফুল দিয়ে,বেলুন দিয়ে,রঙিন কাগজ ও নানা আধুনিক সরঞ্জামে সেজে উঠবে ক্লাসঘর,এই নিয়ে আলোচনা যতই দীর্ঘতর হচ্ছিল,ছেলেটি ততই লজ্জায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল,সবার অলক্ষ্যে।
অতঃপর সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠল।সেও সবার পিছন পিছন বেরিয়ে আসছে বারান্দা থেকে।' তুমি একটু দাঁড়িয়ে যাও তো।কথা আছে।'স্যারের ডাকে সম্বিৎ ফিরল।'কিন্তু,কী ব্যাপার,স্যার দাঁড়াতে বলছেন কেন,ফিস্ তো মেটান,পুরো তিনমাসের।তবে কি পড়াশুনোয় খুশি নন,স্যার!...'
'স্যার বলুন!'
'বস!'স্যার ভিতরের ঘরে গেলেন।
অনতিবিলম্বেই ফিরে এলেন,হাতে সাদা খাম।
'এটা ধর!'
'স্যার এটা কী!'
'তোমার দেওয়া তিনমাসের পুরো ফিস্ টা আছে,সঙ্গে টিচার্স ডে র তোমাদের ব্যাচের পঞ্চাশটাকা চাঁদাটাও দেওয়া আছে!তুমি প্রতি তিনমাসে এই খামটিই দেবে,সবার সামনে,রেজিস্টারে সইও করবে।আমি একই ভাবে সময় বুঝে তোমায় ফেরত দিয়ে দেব!'
'কিন্তু স্যার...'
'আমি তোমার বাড়ির অবস্থা শুনেছি কদিন হল।তোমায় এসব টাকা পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না আর;আসলে কী জান,আমি একটা বেসরকারি  মিশনে পড়াই।ওখানে অনেক আবাসিক ছাত্র থাকে,আমার টিউশনির সবটুকু টাকাই ওদের জন্য খরচা হয়,তাই আমাকেও একটু ফিস্ এর জন্য কড়াকড়ি করতে হয়।যাক,তুমি এসব মাথায় নিও না!আর হ্যাঁ,এখন থেকে তোমার পড়াশুনোর জন্য কী দরকার আমায় বল,পার্সোনালি।আমি দেখব!'
চোখে জল এল ছেলেটির।মানুষ কি এঁদেরই বলে নাকি এঁদের মত মানুষকেই শিক্ষক বলে নাকি সত্যিকার শিক্ষককেই ঈশ্বর বলে! সব গোলমাল হয়ে আসছে মাথায়।
'এমনও হয় তবে...'
স্যারকে প্রণাম করে ছেলেটি।
'মানুষ হও।মঙ্গল হোক!'
  
দুটো বাচ্চা ছেলেকে যেতে দেখে কখন যেন মন পনেরো বছর আগে চলে গিয়েছিল,বুঝতেই পারি নি।'নাঃগল্প আসছে না।সম্পাদক মশাইকে বলব,এবারে আমায় অব্যহতি দিন!'
কৃষ্ণেন্দু স্যারের ফোন নাম্বারটা পাওয়া জরুরি।স্যারের সেই মিশনটায় একবার যদি যাওয়া!সেদিন কৃষ্ণেন্দু স্যার,আমার পড়াশুনোর দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন স্বেচ্ছায়।আজ আমি অধ্যাপক।আমি কেন এ ধর্মে,স্যারের মন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারব না।এতদিন মাথায় আসেইনি।ভাগ্যিস সম্পাদক মশাই লিখতে বললেন,তাই তো এসব চিন্তা এল...
আপাতত স্যারের সাথে দেখা করা জরুরি।

শৌভিক চ্যাটার্জী 
কালনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ


















0 Comments