ড: দেবদ্যুতি করণের ভ্রমণ কাহিনি


অগোচরে ইতিহাস

সেই কবে ভূগোলে পড়েছি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার কলোরাডো নদীর অ্যান্টেলোপ, আফ্রিকার ব্লাইড নদীর ক্যানিয়ন কিংবা স্বদেশের গান্ডিকোটা। ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে বারবার ভেবেছি; একবার না দেখলেই নয়। কিন্তু সংগতি সায় দেয়নি; গুমরে ছিলাম ভেতরে। চোখ চালাতেই পেলাম। পশ্চিম মেদিনীপুরের শিলাবতী নদীর গনগনি। অ্যান্টেলোপের মিনিয়েচার ভার্সন!

সেবার রাত থাকতে বেরিয়েছিলাম, গড়বেতা পৌঁছলাম ভোরে। প্রথমে গেলাম সর্বমঙ্গলা মন্দির। এই বয়সে ঠাকুর নাম করার যদিও ইচ্ছে হয়নি, কিন্তু তাহলে কি হবে; মা আমার ভক্তিমতি! মায়ের কথায় যেতেই হল। এই উত্তরমুখী মন্দির নাকি রাজা বিক্রমাদিত্যের আমলে কোনও যোগীর যোগসাধন দ্বারা এক রাতের মধ্যে তৈরি হয়েছে। তখনও মন্দির উত্তরমুখী ছিল না। কথিত আছে এরপর রাজা বিক্রমাদিত্য এই জঙ্গলে সাধনা করে মায়ের কাছ থেকে তাল বেতাল শক্তির বর পান। সেই দৈব ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য মন্দিরকে উত্তরমুখী করে দিতে বলেন। সেই থেকে মন্দিরের দ্বার উত্তরমুখী! মায়ের রক্তবদন আর রক্তাম্বরে স্বর্ণ মুকুট ও অলংকার শোভা পাচ্ছে। মনে মনে বার বার প্রণাম করলাম। এসব শুনে প্রণাম না করে আর থাকা যায়!
শৈশব হাতড়ে ফিরে আসি স্কুল বাসের অপরদিকে। আমার মা বাবা যেখানে বসেছে, তার কিছু দূরে স্কুলের সহশিক্ষকরা। আরও কিছু দূরে বৃদ্ধ হেড মাষ্টারমশাই। তাঁর বার্ধক্য আঁকড়ে ধরেছে আর এক স্থানীয় বৃদ্ধকে। তিনি রিটেয়ার পোস্টমাস্টার, এখন চা-মুড়ির দোকান দিয়েছেন। তিনি শোনান গড়বেতার লুকোনো ইতিহাস: "জানেন বাবু, আপনের মতন মোর এক বন্ধু ছেল; ইস্কুল মাস্টার। গত শীতে হার্টের রোগে মরল। আপনেরা মহাভারত পড়েন কিনা, সেও পড়ত। আরও কত কী যে পড়ত, কী বলব! সে আমারে কইত মহাভারতের গল্প। এইঠি আছে একাড়িয়া গাঁ, তায় ছেল পঞ্চপাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস। বকাসুর হিড়িম্বা রাক্ষসী এককালে এইঠে ছেল । ভীম হিড়িম্বকে মারিয়া বিয়া করেন তাকে। সত্যমিথ্যা বলতে তো পারিনা। আপনেরা পণ্ডিত, আপনেরা বলবেন। অখন কিস্যু নাই..."
কথায় কথায় অনেক সময় কেটে যায়। এদিকে ভাতের পাত পড়েছে। মাষ্টারমশাই উঠে যায়। আমরাও ফিরে আসি আমাদের গাড়ির দিকে। হয়তো ফেরতা বাসে ভাতঘুমে ঢুলতে ঢুলতে ভাবেন; শেষ বয়সে এখানে না এলে তাঁর এতদিনের মহাভারত পড়া-ই অপূর্ন থেকে যেত।
এরপর এলাম শিলাবতীর তীরে। গনগনি যেন নদীর অবাধ্য সর্পিল গতিকে রেখেছে ভালোবাসার রাঙারঙে বেঁধে। কোমর স্পর্শ করে দিয়েছে চান্দ্রবাঁক। সেই রূপে মুগ্ধ আবাল-বৃদ্ধ । শীতের নরম রোদে সেই মুগ্ধতা নিয়ে চা খায় কোনও বৃদ্ধ; হয়তো স্কুলের হেডমাস্টার। দূরে ভাত-মাংস ফুটছে বড় কড়াইয়ে। এডুকেশনাল পিকনিক। ছাত্ররা গেছে ল্যাটেরাইট কিংবা নদীর টানে। কেউ পা ভেজায় নদীর জলে। কেউ খেলে পানি-ঝুপ্পা, কিংবা কোনও বিচ্ছু দিয়ে আসে ডুব-সাঁতার। দিদিমণি হাঁক ছেড়ে বলেন "কত বার বলেছি নদীতে নামবে না কেউ...।" কোনও ক্ষুদে ছাত্রদলের নেতা ল্যাটেরাইটের চাঁইয়ে উঠে শোনায় কবিতা। তাই শুনে মুগ্ধ অনুগামীরা।
পোস্টমাস্টারের ঘষাকাঁচের আড়ালে তেল চিটচিটে মুখে একরকম মোহ আছে। হেড মাষ্টারমশাই হারিয়ে যান মহাভারতের কালে। এতদিনের তাঁর পড়া পুরাণ গাঁথার ঘটনস্থল এখানে জেনে খুব তাজ্জব বনে গেলেন। এমন জায়গা যে তাঁরই দেশে এই অল্প শিক্ষিত লোকটি জানেন অথচ তিনি জানতেন না। তারপর ভাবলেন সব জেনে গেলে নতুন করে জানবার আনন্দটা আর থাকেনা। ওঁর বাড়ির এই জেলার অন্যদিকে, এই অঞ্চলে নয়। ভাবেন কিছু না জানতে পারলে নতুন জায়গায় পিকনিক করতে আসার দরকার কি! পোস্ট বাবুটির কাছে শুনলেন আরও অনেক কথা, এ দেশের কথা। এই বয়সে এই সব শুনতে দারুন লাগে।

লেখক ডা: করণ দেবদ্যুতি
কালিকাখালি, মঠ চন্ডীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর



0 Comments