আধুনিকা ~ অভিষেক ঘোষের গল্প


অভিষেক ঘোষের গল্প 
আধুনিকা 

দেখো সূচি মা, তোমার সাথে কদিন ধরেই একটা কথা বলবো বলবো ভাবছি, কিন্তু তুমি এত ব্যস্ত থাকো, কথা হয় না। আসলে আমার এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কিন্তু তোমার বাবা আমাকে বললেন, যেনো তোমাকে বলি, তাই আমি বলছি।

কোনোমতে ব্রেকফাস্টের স্যান্ডুইচটা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে, সূচির হাসি মুখের সম্মতি দেখে বিমলা সাহস করে বলেই ফেলেন, আসলে আমাদের তো একটা বংশমর্যাদা আছে, তাই তোমার বাবা বলেছিলেন, তুমি যদি একটু পোশাক আশাকের ব্যাপারে সচেতন হও, তাহলে খুব ভালো হয়।

খাওয়াটা নিজে থেকেই থমকে যায়, সূচির। মানে, ঠিক বুঝতে পারে না, বিমলা কি বলতে চাইছেন?

আমাদের দিনে বাড়ির মেয়েমানুষরা বাড়িতে একগলা ঘোমটা দিয়ে থাকতো, শ্বশুর ভাসুরের সামনে তো আর কথাই নেই। সেখানে এখন তোমরা অনেক আধুনিকা, আমরা তোমাকে ঘোমটা দিয়ে বাড়িতে বসে থাকতে বলছি না, কিন্তু একটু ভদ্র সমাজে বেরোবার মত.... মানে তুমি যদি এই জিন্সের প্যান্ট.... সেদিন ওনার বন্ধু মিহিরবাবুও ওনাকে দু চার কথা শুনিয়ে দিলেন, তোমার এই জামা কাপড় নিয়ে। আমাদের তো ভদ্র সমাজে বাস করতে হয়....তাই আর কি।

মা, আসলে আমি জানি, কিন্তু শাড়ি পরে এতটা রাস্তা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করা খুব প্রবলেম হয় গো। ট্রেনে এত ভিড়....

সে তুমি যাই বলো মা, ইচ্ছা থাকলে উপায় ঠিক হতে পারে, কেনো, আর কেউ শাড়ি পরে কলকাতা যাতায়াত করছে না? দেখো বাপু, আমার বলা কাজ বললাম, এবার আমাদের সম্মান অসম্মান সব তোমার হাতে, দু বেলা খেতে দিচ্ছ, এর বেশি কিছু তো বলতে পারি না। খোকা বেঁচে থাকলে না হয়...

মা, এভাবে বলছো কেনো, আমি কি সে কথা কখনো বলেছি। তোমরা যেমন ঈশানের মা বাবা, আমিও তো তেমনই তোমাদের নিজের বাবা মার চোখেই দেখি, বলো?

হ্যাঁ, সে মুখে তো বল, কিন্তু কাজে কতটা করো, কে জানে বাপু, যত যাই হোক, শ্বশুর শ্বাশুড়ি কি আর কখনো নিজের হয়?

সূচির মনটা একটা ভয়ঙ্কর দুঃখে ভরে যায়, ঈশান মারা যাওয়ার পরও ও এই বাড়ী ছেড়ে যায় নি, শুধুমাত্র এই দুটো মানুষের জন্য। ওর বাবা ওকে অনেক করে ফিরে যেতে বলেছিলেন। বিভান ও তাই চেয়েছিল। কিন্তু ও যায়নি। ও চলে গেলে, এঁদের কে দেখবে, ঈশান তো এনাদের একমাত্র সন্তান ছিল।

ঈশানের সাথে সূচির পরিচয় ওদের অফিসেই। ঈশানের তত্ত্বাবধানেই ও প্রথম ইন্টার্নশিপ করতে এসেছিল, মাস্টার্স শেষ করার পরে পরেই। সিনিয়র গাইডের টেকনিক্যাল জ্ঞান এর থেকেও ঈশানের যে বিষয়টা সূচির মন কাড়ে, সেটা হলো মানুষ হিসাবেও বড়ো ভালো ছিল ঈশান। খেতে আর খাওয়াতে ভীষণ ভালো বাসতো। কখন যে এই হাসি খুশি স্বভাবের ঈশান মনের মানুষ হয়ে উঠেছে বুঝতেই পারেনি, সূচি। তারপর ক্রমে সেই সম্পর্ক পরিণতি পায় ওদের চার হাত এক করেই। 

কিন্তু সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, সূচির। বিয়ের পর মাত্র দুমাস যেতে না যেতেই একদিন রাত্রে শরীরটা হটাৎ খারাপ করে ঈশানের। সবার অলক্ষ্যে কখন যে ওর হৃদপিণ্ডের কপাটিকাগুলো বুজে আসছিল, ওরা টেরই পায়নি। জন্মদিনের জন্য সকাল থেকেই খাওয়া দাওয়াটা একটু বেশি মাত্রায় জটিল হয়েছিল, সেদিন। শুতে যাওয়ার আগে বুকে একটা চাপ অনুভব করছিল, বলেও ছিল সূচিকে। তারপর ভোরের দিকে অসম্ভব শ্বাসকষ্ট আর বুকে যন্ত্রণা শুরু হয়, ওর। তারপর হটাৎ করেই মিনিট চল্লিশের লড়াই স্তব্ধ হয়ে যায়। ঈশান চলে যায় সূচিকে ছেড়ে। ডাক্তার সান্যাল এসে বলেছিলেন, একটু যদি CPR দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো বা ঈশান আর কিছুক্ষণ লড়াইটা করতে পারতো, কিন্তু সেটা দেওয়া যায়নি। তাই ঈশান চলে যায় চিরনিদ্রায় আর সূচি রয়ে যায়, ওর যাবতীয় স্মৃতি বুকে নিয়ে, ওর অসমাপ্ত কাজ এর দায়িত্ব মাথায় নিয়ে। দেখতে দেখতে প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, বৃদ্ধ শ্বশুর মশাই আর শ্বাশুড়ি মায়ের দেখভাল করতে করতে এই জীবনটাকেই আপন করে নিয়েছে সূচি। ও নিজের বাপের বাড়িতে ফিরে যায়নি, আবার ওর কলেজের বন্ধু বিভানের প্রস্তাব মত ওর হাত ধরে নতুন করে জীবন শুরুও করেনি। সময়ের সাথে ও শুধু বয়ে চলেছে, ঈশানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে।

এই সব ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটা চন্দননগর পৌঁছে যায়। সকালে শ্বাশুড়ি মায়ের কথা মত শাড়ি পরেই বেরিয়েছিল সূচি, পথঘাটে অসুবিধা হয়েছে, কিন্তু সেটাও ওনার মুখ চেয়ে মেনেই নিয়েছে, সূচি। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে টোটো ধরে বাড়ী ফেরে ও। শ্বাশুড়ি মা দরজা খুলে দিলেও বিশেষ কিছু বলেন না, সূচি বোঝে এখনও রাগ পরেনি ওর ওপর। আর কটা দিন দেখে তবে, বিশ্বাস হবে। ও আর কিছু বলে না, ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারটা নিয়ে ওর ঘরে চলে যায়। মানে ওর আর ঈশানের ঘরে, এখন সেখানে ও একাই থাকে।

অফিসের কাজ মেটাতে মেটাতেই বিভানের ফোন আসে। সামান্য কিছু কথা বলে শুয়ে পরে সূচি। হালকা ভলিউমে তখন শুধুই কিশোর কুমার, তারপর কখন কে জানে, ঘুমিয়ে পরেছে।
 
ধম ধম ধম, মাঝরাতে চারদিক এমনিতেই চুপচাপ। তারওপর এত রাতে দরজায় ধাক্কা শুনে চমকে ওঠে সূচি। কয়েক মুহূর্ত পরে আবার, সাথে শ্বাশুড়ি মায়ের গলার আওয়াজ, বিদ্যুতের গতিতে উঠে পরে ও, দরজাটা খুলে কয়েকটা কথা থেকেই বুঝতে পারে, শ্বশুরমশাই এর শরীর খারাপ, তাই বিমলা এত আকুতি নিয়ে ওকে ডাকতে এসেছেন। একরকম ছুটেই ও ঘরে ঢোকে সূচি। বাবার সিভিয়ার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। ভয়ঙ্কর রকম শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। যেকোনো সময় যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় অ্যাটাক হয়, তাহলে খুব বিপদ হয়ে যাবে। সূচি তক্ষুনি ডঃ সান্যালকে ফোন করে চলে আসার জন্য জানায়।

এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, সূচি ওর শ্বশুরমশাইয়ের বুকে আর্টিফিসিয়াল পাম্পিং শুরু করে। বিমলা এই পরিস্থিতিতে কি করা উচিৎ কিছুই জানে না, কিন্তু সূচির জন্য ওনার যেনো কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে ভেবে, ভীষণ চিন্তন্বিতা হয়ে পরেন, এই মেয়েটা এসব কি করছে?

একটু স্বাভাবিক হলেও শ্বাস কষ্টটা রয়েই যায় বিনোদ বিহারী বাবুর। সূচির কথা শুনতে পায়, মা, বাবাকে CPR দিতে হবে, কিচ্ছু করার নেই। কোনোদিক না দেখে সূচি নিচু হয়ে ঝুঁকে পরে বিনোদবিহারী বাবুর মুখের ওপর। হৃদপিণ্ডের যখন অত্যধিক অক্সিজেনের দরকার হয়ে পরে, তখন এটা ছাড়া যে আর উপায় নেই। ও ভুলেই যায় সম্পর্কে ইনি ওর শ্বশুরমশাই, এই মুহূর্তে উনি শুধুমাত্র একজন রুগী, আর তাঁর প্রাণ বাঁচাবার জন্য যা যা দরকার, সেটা সূচিকে করতে হবে। নিজে একবার করে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিয়ে সরাসরি মুখ থেকে মুখে সেই বাতাসে পূর্ণ করতে থাকে ওর শ্বশুরমশাই এর ফুসফুসে। ওনার হৃদপিন্ড যে কাজটা করতে পারছে না, সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে থাকে সূচি।

প্রায় পনেরো মিনিট পর একটু স্বাভাবিক হন বিনোদ বিহারী বাবু। হালকা করে হাতের আঙ্গুল গুলো নাড়তে পারছেন, চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করছেন। ডঃ সান্যাল ততক্ষণে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, যাক মনে হচ্ছে এ যাত্রাটা বিনোদ বিহারী বাবু উতরে গেলেন। তাও, অ্যাম্বুলেন্স কে খবর দেওয়া হয়েছে, ওনাকে আগামী তিনটে দিন ডঃ সান্যালের নার্সিংহোমে ভর্তি থাকতে হবে, সব কিছু চেক আপের জন্য।

আচ্ছা মা, তুমি তো ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্টুডেন্ট বলেই শুনেছি, বিনোদ বিহারী বাবুর কাছে, কিন্তু তুমি এই সব ফার্স্ট এড ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে কি করে জানলে? ডঃ সান্যাল এবার প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন সূচির দিকে। 

আপনি ঠিক ই বলেছেন ডাক্তার কাকু, কিন্তু আমি তিন বছর আগের সেই রাতটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না, যখন শ্বাস নিতে না পেরে ঈশান ছটফট করছিল, কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি নি। মনে আছে আপনার, আপনি বলেছিলেন, ঈশানকে যদি একটু CPR দেওয়া যেত তাহলে ও হয়তো ওদিন রাত্রে আরো কিছুক্ষণ লড়াইটা করতে পারতো তাই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, আমাকে এটা জানতেই হবে, শিখতেই হবে। সেই তাগিদ থেকেই কলকাতায় একটা নার্সিংহোমথেকে ফার্স্ট এড ট্রেনিং নিয়েছিলাম, দেখুন আজ কেমন কাজে এসে গেলো।

মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন ডঃ সান্যাল, সত্যি, তোমরা এখনকার মেয়েরা আধুনিকা, যেমন দায়িত্ব নিয়ে তুমি সংসার সামলাচ্ছ তেমনই আজ মা দুর্গা হয়ে, শ্বশুর মশাইয়ের প্রাণ বাঁচালে। সূচি দেখে বিমলাদেবী খাটের একপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, সূচি বুঝতে পারে, বিমলা দেবীর চোখের জল কিন্তু শুধু ওনার স্বামীর প্রাণে বেঁচে যাওয়ার আনন্দেরই নয়, বরং অনেক অব্যক্ত অপরাধবোধ ওনার চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। সজল চোখেই বৌমা কে কাছে টেনে নেন বিমলা।

লেখক অভিষেক ঘোষ 
ভদ্রেশ্বর, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ 



0 Comments