𒄶 আবির্ভাব ভট্টাচার্য🔸পূর্ব বর্ধমান🔸
এমনও বিকেল হয়-
বারান্দা থেকে বারান্দায় উড়ে যায় প্রজাপতি !
কোথায় পরাগ তার কোথায় মিলন-
জানা নেই
তবু, বিকেল আর সন্ধের সন্ধিক্ষণ
নিরুদ্দিষ্ট বারবেলা,উচ্ছন্নে যাওয়া সংক্রান্তি-
এ'বাড়ি ও'বাড়ি উড়ে যায়
বিষণ্ণ পাতার রঙের-
একটি প্রজাপতি !
সেইসব বাড়ির বারান্দাকে
হয়তো অবেলায় ছুঁয়ে গেছে কর্কট,
সেইসব বাড়িতে প্রতিদিনই কর্কট-সংক্রান্তি ।
অনিচ্ছায় আহার,
দুশ্চিন্তার সঙ্গে ঘর,
একটা দীর্ঘ দিন কেটে গেল-এইটুকু শান্তি !
সেইসব ঘরের বারান্দায় বারান্দায়
অকারণে উড়ে যায়-
কীসের পরাগ আর কীসের মিলন আশায়
পাতার রঙের বিষণ্ন প্রজাপতি !
📚 মোনালিসা নায়েক🔸আরামবাগ🔸
꩜ আজ সাত দিন হয়ে গেল দাদা তুই চিরশান্তির দেশে, যেখানে আর পৌঁছাতে পারবে না কোনো যুদ্ধাস্ত্র। পার্বত্য অঞ্চলের খাড়া অংশে প্রবল শীতে ছয়ঘন্টা ব্যাপী যুদ্ধে দেশের জন্য তোর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কতো কষ্ট পেয়েছিস বলতো দাদা! আমার চোখে এঁকে দিয়েছিস রঙিন স্বপ্ন,পাকা বাড়িতে বাবা,মা কতো স্বস্তিতে গ্রামের সকলকে তাদের সৌভাগ্যের কথা বলতো।যারা একদিন ভেবেছিল তোর পড়াশোনা বাবা আর চালাতে পারবেনা,আমাদের দৈন্যদশার মুক্তি হবে না কোনদিনই। নিত্য অভাবের সংসারে তুই আধপেটা খাবার খেয়ে রাতের পর রাত জেগে উপলব্ধি করেছিলিস--আধাঁরের পর আলোর ঠিকানা,বাবার দৈন্যতা মুছে দেওয়ার শপথ।তাইতো প্রতিদিন ভোর উঠে মাঠে অনুশীলন করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে শত বিদ্রুপের জবাব দিয়েছিস সকলকে।
কিছু স্বপ্ন দাদা অধরাই থেকে যায় জানিস,অজ পাড়াগাঁ বেলঘড়িয়া লড়াকু শক্তি আর সাহসের বীরত্ব আজ সংবাদ শিরোনামে।এখন সবাই বলে আমাদের ঘরের ছেলে– রাজেশ, আমাদের গর্ব।
তুই সময় ও পরিস্থিতির চাপে মোবাইলে টাকা ভরে দিতে পারতিস না সময়মতো, কত কথা শোনাতাম তোকে, আসলে তোর খবর নেওয়ার জন্যই মা-বাবা উদগ্রীব থাকতো তাই হয়তো!বুঝিনি দাদা, সময় তোদের কাছে কতটা মূল্যবান।সেই যন্ত্রনা আজ কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে।এখন মোবাইলে শুধু তোর যত ছবি দেখি রে,তোর ছবি বুকে রেখে মা-বাবা আজ কতরাত বিনিদ্র আছে,জানিস এখন আর রিচার্জের কোনো দরকার হয়না দাদা।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর থেকে তোর হাতে রাখি বাঁধিনি একবারও,এবারে কত আশা করেছিলাম তুই ওই আসবি,আমিও তখন এ বাড়িতে অতিথি হয়ে এসে অনেক বছর পর রাখি বাঁধবো তোর হাতে। তুই এবারে এসে আমায় অলংকার দিবি পণ করেছিলিস, তুই কথা রেখেছিস দাদা।বাবা-মা তো বড় অলংকার সারাজীবন এই অলংকারের বৈভবে আমি যেন সুখী হতে পারি দাদা,তোর স্বপ্ন পূরণ করতে পারি,তুই আশীর্বাদ কর।
জানিস দাদা ,খুব মনে পড়ে আমাদের আগের মাটির বাড়িতে উঠোনে বসে যৎসামান্য খাবার আনন্দ করে চারজনে ভাগ করে খেয়ে সবাই বলতাম একই কথা, আর খাবার লাগবে না ,পেট ভরে গেছে।খুব ভালো ছিল রে দাদা মাটির বাড়ির মায়া,ইঁটের তৈরি পাকা বাড়ির সুখ খুব বেদনাদায়ক রে দাদা,পুরো ঘর জুড়ে তোর- ই সব স্মৃতি জড়িয়ে আছে ,শুধু তুই আর আগের মতো মুঠোয় করে আমার পছন্দের চুলে বাঁধা ক্লিপ,টিপ চেপে ধরে বলিসনা-- বোন এদিকে আয়, দেখ তো এটা তোর কেমন লাগছে?মা, অনেক দিন তোমার হাতে দেশী মুরগির ডিমের ঝোল খাইনি,আজ তুমি কিন্তু এটা রান্না করবে,বাবা,তোমার বয়স হয়েছে,অনেক পরিশ্রম করছো ছোট বয়স থেকে,আর কাজে বেরোবে না তুমি ,আমি আছি তোমার কোনো চিন্তা নেই।তুমি বাড়িতেই থাকবে।
এই বাড়িতে কত নেতা-মন্ত্রী ,এলাকার নামী -দামী মানুষ এসেছিল।সবার প্রশস্তিবাক্য ভোলাতে পারেনি আমাদের শোক।ভাবি বৌদির স্বপ্ন ছিল বরের বেশে তোর গলায় মালা দেবে, জানিস দাদা সে এসেছিল মালা নিয়েই,কফিনবন্দি অবস্থায় বীরের গলায় মালা পড়িয়ে সে বাকরুদ্ধ। তোর কফিন থেকে তাকে তুলতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল প্রতিবেশীদের।
ভাবিসনা দাদা,এখন গোটা বিশ্বের শত্রু দেশের হয়ে তুই যে শক্তি আর সাহস নিয়ে লড়েছিস তা আমাদের কাছে গর্বের। কুড়িজন সন্তানহারা,পিতৃহারা ,স্বজনহারা শহীদদের রক্তের যোগ্য জবাব ঠিক দেবে দেশবাসী।দাদা তুই তো ভীষণরকম জেদি ছিলিস, আবার আসিস এই মায়ের কোলে স্বপ্নপূরণের সাফল্য নিয়ে । ভালোথাকিস রে দাদা।
ইতি-তোর অভাগিনী বোন।
তনয় ভট্টাচার্য🔸পূর্ব বর্ধমান🔸
কৃষ্ণচূড়ার রাঙা কেশের
ললিত-মোহন সাজ
তাহার রূপে রাধাচূড়ার
বেজায় খুশির লাজ ।
খোঁপায় খ্যালে হলুদ-বাহার
মন ভোলানো বরণ
লাজুকলতা মেয়ের মতো
কোমল রাধার ধরণ ।
ঝড় ঝাপটে শাখায় শাখায়
ছোঁয়াছুঁয়ি ঘটে
বুড়ো অশথ হেসে ভাবে
ছেলেমানুষ বটে ।
মাঝে মাঝে ছোঁয়াছুঁয়ি
হলেও ডালে ডালে
একে অন্যের পরশ তাদের
পেলব চিরকালের ।
তাহার রূপে রাধাচূড়ার
বেজায় খুশির লাজ ।
খোঁপায় খ্যালে হলুদ-বাহার
মন ভোলানো বরণ
লাজুকলতা মেয়ের মতো
কোমল রাধার ধরণ ।
ঝড় ঝাপটে শাখায় শাখায়
ছোঁয়াছুঁয়ি ঘটে
বুড়ো অশথ হেসে ভাবে
ছেলেমানুষ বটে ।
মাঝে মাঝে ছোঁয়াছুঁয়ি
হলেও ডালে ডালে
একে অন্যের পরশ তাদের
পেলব চিরকালের ।
𒄶 সুমিতা মুখোপাধ্যায়🔸কলকাতা🔸
꩜ হৃদয় যেদিকে চায়,বেদনায়,বৃষ্টিতে
দেখি তাকে হারাবার,ফিরে পাবার কথা লেখা থাকে
পায়ে দাহ্যলতার হাহাকারটুকু বাঁধা
আমি আগুনের চেয়েও নিরুপায়, জ্বলি;
অনন্তর, কোথায় আর, ফিরে চলি পৃথিবীতে
পথের পাশে কাদাজল, দাঁড়াই, যে হাওয়া
তার ক্ষীণশ্বাস নিয়ে গেল,সে শ্মশানভূমির।
নীরবতায় ভাসমান,ফিরতে চাই না আর কখনও
মেঘমুক্ত তার ভাষা,যেই পাঠ করতে যাই
পৃষ্ঠা থেকে পদধুলি ঝরে পড়ে,অতলে
পেয়ারাতলা পেরিয়ে তার চলে যাওয়া,
যেখানে এতকাল বিঁধেছিল।
✍নিত্যানন্দ দত্ত🔸পূর্ব বর্ধমান🔸
𒄶 সে যদি আবার জল ভেঙে উঠে আসে
আগুন নিভিয়ে ফিরে আসে যদি ফের
ফিরিয়ে নেবেনা তাকে !
জলের চোখের নিচে কতরাত বিনিদ্র কেটেছে তার
আগুনের খিদের পাশে অভুক্ত কেটেছে কত দিন
সে যদি আবার করতল পেতে বসে
প্রিয় ঘুমটির কাছে আবার ফিরতে চায়
দুমুঠো সোহাগ সাজিয়ে দেবেনা,বলো !
কি করে বোঝাবে তাকে আজ
প্রতি অশ্রুপাতে অগম্য হয়েছে তার ফেরবার পথ...
𒄶 সুজিত রেজ🔸চুঁচুড়া ,হুগলি🔸
ক্রমশ কি উপসংহারের দিকে !
রংপেন্সিলের বীর্য এখনও শুকিয়ে যায়নি ,
ট্যুইটার-ইন্সটাগ্রাম-ফেসবুকে দুধ উথলে পড়েনি ,
কবিতা-কলস উপচে পড়া মকরন্দ পান করা হয়নি ।
তাই ,তল্পিতল্পা গোছাচ্ছি না।
পাত পেড়ে ভাত খাচ্ছি আর গন্ধ শুঁকছি
পিসিমার পাতা ঘিয়ের ;
চলনবিলের নৈর্ঋত কোণে বসে ,
চিনেবাদামের খোলা গেঁথে-গেঁথে ভেলা ভাসাচ্ছি ।
উপসংহার রচনা কবির কাজ নয় ।
জেনো ,তা সূচনারই পুরোভাগ ,
সূচনা-গলা সুতোয় খি দিতে-দিতে
কবির কবর রচিত হয় ।
📚 তীর্থঙ্কর সুমিত🔸মানকুন্ডু, হুগলি🔸
꩜ কত কথা এইভাবেই বৃষ্টি নামায়
সারাদিনের ব্যার্থতা
আর রাতের নীরবতা
আমায় টেনে নিয়ে যায় অন্য পৃথিবীর দিকে
যে পৃথিবীতে একপশলা জল
আর ভালোবাসার পাহাড়
টেনে নিয়ে যায়
মনমুগ্ধকর পরিবেশের কাছে
যে পরিবেশে লুকিয়ে থাকে
এক একটা কথার পাহাড়
হয়তো এইভাবেই দিন কেটে যায়
রাত্রিকালীন কথায়।
📚 দেবনাথ সুকান্ত🔹দুর্গাপুর🔹
১
একটি ক্ষণকাল
একটি চৈতন্যের সাঁকো
একটি আজীবন বন্দিশালা
আর একটি আত্মহত্যার অধিকার
তলানি থেকে গভীরতা পর্যন্ত এভাবেই লিখে
আমি এগিয়ে যাচ্ছি
আর যার কোনো সীমারেখা নেই
সে আমার সাইকেলের চাকায় পরিণত হয়েছে
প্রাগৈতিহাসিক সত্যের কাছে মুখ বেঁধে দাঁড়িয়েছে
খানিকটা স্বগতোক্তি
এই তবে শেষ দ্যাখা হল নাকি
ঘূর্ণায়মান সিঁড়ির একদিকে যখন তুমি উঠে যাচ্ছ
আর অন্য দিকে আমি নামছি
বড় কঠিন ছিল আমার মায়ের জীবন
সেই সতেরো থেকে শেষ পর্যন্ত আমি তাকে...
আমি কি আমরা কেউই তাকে শান্তি দিতে পারিনি বলে একদিন
ডট ডট ডট
.
.
.
.
.
.
.
.
.
২
গন্তব্যহীনতায় মরে যেতে যেতে একদিন
এক একমুখী আলো
আমার কাছে জল চেয়েছিল
আমি তার প্রতিফলনের কাছে একটি নীল জ্যোৎস্নার ছবি রেখে বলেছি
ঈশ্বরহীনতায় যখন সঙ্গম থেকে ঝরে যাবে প্রেম
সমাধি ফলকের গায়ে যে শব্দ লিখবে তুমি
দেখো তার আত্মা অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপছে
প্রেমিক হারিয়ে ফেলেছে তার ঘরের চাবি
মদ একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে আগুণের দিকে
না কিছুতেই ত্যাজ্য বলে স্বীকার করিনা দেহ
সুখ আর দুঃখের মাঝে যখন একটি মাত্র রেখা এসে দাঁড়িয়েছে
ভাবছি অন্তত মুখোমুখি যৌনতাটুকু থাকবে তো
꩜ সুজিত কুমার মালিক🔸আরামবাগ🔸
𒄶 তোমার ফুসফুস জ্বলছে !
গ্লাসে গ্লাস ঠেকানো উল্লাসে
বিজয় উৎসবে মেতে
ঢেকে ফেলছি নীল আকাশ।
ভুলে গেছি-
তুমিই ছিলে প্রথম আশ্রয়।
তোমার ঐক্যবদ্ধ সেনাদল
অনেক যুদ্ধের সাক্ষী।
রুখে দিয়েছিলে ঝড়,
উষ্ণায়নের আঁচ ।
আমাজন পুড়ছে,
সাহারা বাড়াচ্ছে হাত...
এন্টার্কটিকা,হিমালয়রা অসুস্থ
প্রশান্ত মহাসাগরেরা কালিমালিপ্ত।
মাউন্ট এটনায় তাই ক্ষোভের উদ্গীরণ,
বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ে সুনামি হয়ে।
হীন চেতনায় বিদ্ধ আজ
বিপন্ন অসহায় প্রাণীকুল
লড়াই থামলে চলবে না
এসো নব নব অবতারে।
তোমার বাঁচার শর্তে
আমার জীবনের আশ্বাস।
📚 লক্ষ্মণ দাস ঠাকুরা🔹পূর্ব বর্ধমান🔹

১
বিড়ালের পাতা ফাঁদ কেটে দিয়েছে ইঁদুর।
আমার উঠোনে পায়রাগুলো
দানা খুঁটে উড়ে যায় আকাশে
শান্তি দূতের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে
আমার চিৎকরা সংসারে।
২
চুঁ কিৎ কিৎ খেলে খোলামকুচি
কিশোরীর হাতে হল বন্দি।
পুকুর জলে ব্যাঙ তুর্ -তুর্ লাফে
ডুবে গেল শেষে।
গড়িয়ে গেল কলসী
তোমার পায়ের কাছে।
৩
ঝরা পাতা ঘুর্ণিঝড়ে
প্রশ্ন করে আমি কে?
মাটিতে দাঁড়িয়ে গাছ বলে
উত্তরটা লুকানো আছে
শেকড়ের গভীরে।
৪
কথা থেমে গেছে,আজ স্মৃতিমন্থন চুপ।
মনকাড়া বাঁশির শব্দ সদর দরজা আঁটে।
ফুলের সাজি ভরে নিদ্রাঘোর অলীক সংলাপে।
তবু তুমি কনুই ডুবিয়ে সময় সাগর জলে
খুঁজে চলো নিজেকে কালের দেবতা বলে ।
🔰খায়রুল ইসলাম🔸পূর্ব বর্ধমান🔸
꩜ পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দে থাকা মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছি আজ সকালে
একটি পা ভ্যান ভর্তি গুলের বস্তা চাপিয়ে হেঁটে চলেছে...
মুখে গান 'হামে তুমসে পেয়ার কিতনা এ হাম নেহি জানতে...'
একটি পা ভ্যান ভর্তি গুলের বস্তা চাপিয়ে হেঁটে চলেছে...
মুখে গান 'হামে তুমসে পেয়ার কিতনা এ হাম নেহি জানতে...'
লোকটি হেঁটে চলেছে সিটি হয়ে গোলাপ বাগ,সরাইটিকর মোড় পিছনে ফেলে
কেশবগঞ্জ চটি পেরিয়ে চলে যাবে নবাবহাট।
ওকে কোন ভোটার কার্ড আপডেট করতে হয়না, আধার বা রেশন কার্ডের জন্য দাঁড়াতে হয়না লাইনে, অথবা আত্মহত্যা...
ওরা খালি গান গায়।
আবার মার খায়।
তবু গান গায়।
ওরা ঘাম নিয়ে ছোটে
ওরা বৃষ্টি মাথায় হাঁটে
লোকটি জানে ভারতবর্ষ মানে বর্ধমান।
লোকটি জানে পৃথিবী মানে বর্ধমান।
লোকটি জানে এতকিছু সংশোধনের মানেও তো সেই প্রতিদিন সকালে উঠে ভ্যান নিয়ে পথে নামা।
কেশবগঞ্জ চটি পেরিয়ে চলে যাবে নবাবহাট।
ওকে কোন ভোটার কার্ড আপডেট করতে হয়না, আধার বা রেশন কার্ডের জন্য দাঁড়াতে হয়না লাইনে, অথবা আত্মহত্যা...
ওরা খালি গান গায়।
আবার মার খায়।
তবু গান গায়।
ওরা ঘাম নিয়ে ছোটে
ওরা বৃষ্টি মাথায় হাঁটে
লোকটি জানে ভারতবর্ষ মানে বর্ধমান।
লোকটি জানে পৃথিবী মানে বর্ধমান।
লোকটি জানে এতকিছু সংশোধনের মানেও তো সেই প্রতিদিন সকালে উঠে ভ্যান নিয়ে পথে নামা।
তাই গান গাই...
হামে তুমসে পেয়ার কিতনা..
হামে তুমসে পেয়ার কিতনা..
📚সূর্য মণ্ডল🔹পূর্ব বর্ধমান🔹
꩜ আমাদের ছোটকাকামণির স্কুলে ভর্তির সময় গুরুমশায় জন্মদিনের কথা বলেছিলেন। দাদু মাথা চুলকে হিসাব করেছিলেন মন্বন্তরের।তারপর একই ভাবে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেছিলেন যা ভাল বোঝেন একটা লিখে নিন গুরুমশায়,চাষার ছেলের আবার ওসবের কি দরকার। মাঝে আর খুব বেশি নাড়াঘাঁটা হয়নি এসব নিয়ে। শুধু অবসরের দিনক্ষণ ঠিক করার সময় একবার চাউর হয়েছিল কথাটা। আর এ বছর ছোটকাকামণি চলে যাবে জেনে তাঁর ছেলেরা খুব ধুমধাম করে পালন করল উৎসব । পায়েস হলো, মাছ হলো। ছোটকাকামণি অল্প একটু জিভ বের করে স্বাদ নিল জন্মদিনের।
📚 চয়ন কুমার রায়🔹পূর্ব বর্ধমান🔹
꩜ জানি বিষ প্রাণঘাতী
তবুও বিষের পেয়ালায়
চুমুক দিতে দিতে বলি,
তুমি আছো,তাই বেঁচে আছি।
মিথ্যার নিখুঁত অভিনয়
সংলাপের তরঙ্গায়িত মাধুরী
শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে ভাবি,
তুমি আছো,তাই বেঁচে আছি।
তোমার করুণার উচ্ছিষ্ট
মহানন্দে ভিক্ষাপাত্র হাতে
বিগলিত স্তুতিবাক্যে বলি,
তোমার অনুগ্রহেই বেঁচে আছি।
🔰ঋভু চট্টোপাধ্যায়🔸দুর্গাপুর🔸

১
বোঝা না গেলেও সব বিছানা রূপকথা নয়,
আতরের গন্ধের নিচে চাপা পড়া কান্না
টুকরো অথবা সব বিম্বিসার মন এক এক
করে উড়ে এলেও শুয়ে পড়ে চা বাগান,
একদিন শত শত মানুষ চা ছোঁয়নি
শুধু সেই তরলে ঘামের গন্ধ ছিল বলে,
তারপরেও তো টাকা ওড়ে, ভাড়া করা
বাঁশের মাথায় উড়ে বসে কাক থেকে কোকিল,
ইঁদুর থেকে বিড়াল।কারোর কাছে স্পষ্ট না হলেও
রাজ্য মানে শুধু ভাতা নয়, ধর্মের কোশেও
ভাতের জ্বালানি লাগে।
২
তারপরেই তো উল্টে দিলাম,যেভাবে রাস্তার
ওপর গাড়ি অথবা পাতার নিচে গাছ থাকে।
বোঝা না গেলেও লেখা যায় জীবন কোন
বাংলা চ্যানালের ট্যাগ লাইন নয়,
বিজ্ঞাপণ মেঘদিনেও রোদ ভাবতে বলে,
তারপর এক এক করে নিচের দিকে সব
গ্লাস উল্টে পেগ হয়, সব পেগ হাঁটতে থাকে
পায়ে লাগানো আরেকটা নাগরদোলার পৃথিবী।
৩
এরপরেও যদি কেউ ভেবে বসে রঁদেভু( রাঁদেভু)
আর গলগথা এক ক্যানভাস,আর বিক্রিত কাক ও কলম অথবা অশ্লীল দাঁড়িয়ে থাকা,ঘুম আর অতিরিক্ত যত্নশীলতা,সব কয়েনের এঘর ওঘর
তাহলেও আর উত্তর পাওয়া যাবে না।
সব তুলি একে একে ছবি শেষ হবার পরেই লেপ খুঁজবে
কলম একটা পাঠকের কোল।তারপর মিছিল বা মঞ্চ
রাস্তা বা ঠিকানা আতিরিক্তআত্মবিশ্বাসেও শুধু
এক গ্লাস জলের জন্য হাঁটতে
গেলেও ঘাম নামবে।জল মানে শুধু নোনতা নয়।
৪
রামায়ণে দ্রৌপদী আনি।
মহাভারতে জ্যান্ত লক্ষণ, তারপর রামশীলাতে জতুগৃহ,
অজ্ঞাতবাসে বিভীষণ বধ।তারমানে এক লিটার চাল
কেনা, অথবা এক কিলো সূর্যের আলো,
তারপর আগুনে স্নান করে একটা বসে থাকা,
এক সাথে পাশা খেলায়,আমি আর বাকি পাঁচটা আঙুল।
তারমানে সব উন্মাদকে বাদ দিয়ে রাজা রানী বা
মন্ত্রীদের সেলফি তুললেই ব্যাস।
সব চিন্তা এক মুহূ্র্তে শেষ হয়ে গেলেও মাটি
ভেদ করে উঠে আসে আরো কঙ্কাল,
হাতে পিঠে আসমানি ছাপ, মাথা নিচু,
ঘাড় অবধি অবুঝ উপত্যকা।
থালা বাসনের দাম্পত্য জীবনে মাঝের একটা
উঁকি দেওয়া প্রশ্ন চিহ্ন রাস্তার পাথর বেয়ে উঠে আসে।
ঐ তো আমার নিজের মিছিল,
ঐ যে আমার ভিতরের নিভে যাওয়া আগুন ছ্যাঁকা ।
꩜পরেশ নাথ কোনার🔸দুর্গাপুর🔸
🔰আমার ছোট্ট খুকুমণি
বাড়িয়ে দিয়ে হাত দু খানি
জড়িয়ে ধরে গলা,
বললো গালে চুমু খেয়ে
নিয়ে চলো রথের মেলা।
মেলা থেকে কিনবো না আমি
কানের দুল,রঙিন কাচের চুড়ি,
কিনবো আমি দাদার মতো
বন্দুক আর গাড়ি।
খুকির কথা শুনে
বললো আমার ঠাম্মা,
এখন থেকে শাসন করো
আলগা দিয়ো না।
মেয়ে মানুষ কিনবে হাঁড়ি
থালা বাসন বটি খুন্তি কড়াই,
বন্দুক দিয়ে হবেটা কী
করবে সে কী লড়াই ?
ছেলে মানুষ ঘরের কাজ
এইতো মেয়েরা করে,
দিনে দিনে হলোটা কী,
লজ্জা শরম গেছে একেবারে হেরে ।
সেদিন আর নেই যে ঠাম্মা
গেছে সেকাল বয়ে ,
ভালবাসায় নেই কোন ভেদ
ছেলে কিম্বা মেয়ে ।
বিভেদ ভুলে যদি করো
ছেলের মতো যতন,
দেখবে সেদিন চক্ষু মেলে
এই খুকিই হবে তোমার কন্যা রতন।
🔰 সঞ্জয় কুমার মুখোপাধ্যায়🔸কলকাতা🔸
꩜ পাশাপাশি চলতে গেলে শুনছি ছেলেখেলা,
এ যেন বিশ্বময় চলছে বাঘবন্দি খেলা ?
নিত্য নতুন খবরে গা ভাসালে,
দেখবে কক্ষপথ চ্যুত হয়ে
অবশেষে একটা ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেলে !
নিয়মাফিক কান খুলে শুনতে গেলে,
আশেপাশে শুনবে রোজ ভুকম্পনের খবর।
যেন জীবন থেকে উঠে গেছে বিশ্বাসের প্রহর,
তবু আমরা চিরকাল মাটিতেই করেছি ভর ।
এক একটা বড় সীমান্ত পেরোলেই,
সত্যি খবর নিয়ে জেগে ওঠে অভিযোগ !
কেন কিছু হারাবার ভয় ?
না আর হারাবে না কিছুই,
এবার দুরে থাকলেও সেই সীমান্ত পেরোবোই।
🔰গোবিন্দ মোদক🔸নদিয়া🔸
চলে যাবো অজানায় পথ চিনে চিনে,
একখানি মেঘ হয়ে আসবোই ফিরে
চিনবে না তখন তো মেঘেদের ভিড়ে।
ভেজা ভেজা বৃষ্টিতে কোনও বরষায়
চলে যাবো বহু দূরে মন যা চায়,
ফিরে আসবো একদিন নেই কোনও ভুল
হয়তো বা হবো আমি কোনও কাশফুল।
মেঘমুক্ত শরতের কোনও এক রাতে
মন যদি চায় খুব কোথাও হারাতে,
চলে যাবো বাঁশি নিয়ে দূর বহুদূর
কান পেতে থাকো যদি শুনবে সে সুর।
হিম ঝরা কোনও এক পৌষালি ভোরে
ভেসে যাবো বহুদূরে ভাবনায় চড়ে,
পাতা ঝরা বনতলে লিখে রেখো নাম
পাঠাবো তোমায় আমি রঙিন সে খাম।
তারপর ফুল ফোটা কোনও ফাগুনেতে,
ঠিকানা বিহীন হবো পথে যেতে যেতে,
ফিরে ঠিক আসবোই কোনও এক দিন
তোমার কাছে যে আছে জন্মের ঋণ !!
🔰 সিদ্ধার্থ সিংহ🔹কলকাতা🔹
꩜ বাজ পড়ার বিকট শব্দে কেঁপে উঠলেন রাধাকান্ত। জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আশি বছরে পা দিয়েও এতটুকুও খাটো হয়নি কান। শুনতে পেলেন বাতাসের উথালিপাথালি। বুঝতে পারলেন ঝড় উঠল বলে।
আর শুয়ে থাকতে পারলেন না। খাটে হাঁটু মুড়ে জবুথবু হয়ে বসলেন। জানালার দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হল সন্ধে হয়ে গেছে। মনে করার চেষ্টা করলেন, তবে কি তন্দ্রা এসেছিল চোখে! না-এলে ফাঁকি দিয়ে বিকেলটা গড়িয়ে গেল কী ভাবে! এমনিতে তো ঘুমই আসে না।
আগে অবশ্য বিছানায় শরীর মেললেই দু’চোখ বুজে আসত। ‘হ্যাঁ গো’, ‘কী হল’, ‘ঘুমোলে নাকি?’, ‘শুনবে তো...’ গোছের ডাকাডাকিতেও বিরক্ত হতেন। অন্য দিকে পাশ ফিরে শুতেন। খুব বেশি হলে ‘উঁ’ ‘অ্যাঁ’ করে উঠতেন। ব্যস, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
অথচ একদিন ছিল যখন এই রাধাকান্তই রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়ে দিতেন। পাশাপাশি শুয়ে এই জানালা দিয়ে আকাশের তারা দেখতে দেখতে কখন যে সকাল হয়ে যেত টেরও পেতেন না।
এখন তিনি নেই। কত দিন হয়ে গেল! যাবার সময় যাদের বলে গিয়েছিলেন ‘তোরা তোদের বাপকে দেখিস’, তারা রাধাকান্তকে দেখছে। দেখছে মানে, দেখাশোনার জন্য একটা কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। সে সকালে আসে, সন্ধে নাগাদ যায়। রাতের খাবার খাইয়ে-দাইয়ে।
আকাশে মেঘ করায় সে বুঝি আজ তাড়াতাড়ি চলে গেছে। এখন তো বর্ষার সময়। এলোপাথাড়ি বৃষ্টিতে জানালা দিয়ে জলের ছাঁট আসে। তাই যাওয়ার আগে সে ভাল করে জানালাগুলো লাগিয়ে দিয়ে যায়, ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিতে বলে। আজ আকাশের অবস্থা দেখে তাড়াহুড়োয় সে হয়তো এ সব বলতে বেমালুম ভুলে গেছে। কিংবা বলেছে, তিনি শুনতে পাননি।
মাঝে মাঝেই জানালা দিয়ে দমকা বাতাস আসছে। আসছে ইতিউতি বজ্রপাতের পৃথিবী কাঁপানো শব্দ। বিদ্যুতের ঝলকানি। রাধাকান্ত ভাবলেন, জানালার ঝাঁপটা ফেলে দেবেন, কিন্তু ওঁর উঠতে ইচ্ছে করল না। কেমন শীত শীত করছে। গায়ে জড়ানো বিছানার চাদরটায় মাথা মুড়ি দিয়ে নিলেন তিনি। জানালাটা দিয়ে দেব! দিয়েই বা কী হবে? ওখান দিয়ে আসা জলের ছাঁটটা যদি ঘর ভাসিয়েও নিয়ে যায়, তা হলেই বা ক্ষতি কী? কার কথা ভেবে আগলাবো এ সব? ওরা কি আর কখনও এ-মুখো হবে!
যখন ওরা ছিল তখন তো জীবন দিয়ে আগলেছেন এ সব। হঠাৎই মনে পড়ে গেল সে বারের কথা। তখনও তাঁর ছোট ছেলেটা হয়নি। চার ছেলেকে শুইয়ে খাটের একদম ধারে গুটিসুটি মেরে পড়ে ছিলেন ওদের মা, তরুলতা। নীচে মাদুর বিছিয়ে উনি। আচমকা মাঝরাতে সে কী পাগল-করা বৃষ্টি। ঝড়-জল। তখন তো অভাবের সংসার। ভাইদের সঙ্গে বনিবনা না-হওয়ায় সবে এক জামাকাপড়ে বেরিয়ে এসেছেন বাপ-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে। কোনও রকমে বারাসতের এই বাঙাল কলোনিতে তিন কাঠা জমি কিনে একটা মাটির ঘর তুলেছেন। হোগলাপাতা দিয়ে ঘিরে করেছেন একচিলতে বাথরুম। চালের বস্তা পরদার মতো টাঙিয়ে চালাচ্ছেন দরজার কাজ। তখন চোর-টোর কোথায়! খা খা জমি। চাষবাস হয়। মাঝে মধ্যে একটা-দুটো বাড়ি। সবার অবস্থা একই রকম। আর চোর-টোর থাকলেও তাঁদের ঘরে নেবার মতো কিছু ছিল না। যদি চুরি করতে ঢুকত, তা হলে হয়তো চোরই লজ্জায় উল্টে কিছু রেখে যেত। ছিল না কল-টলের বালাইও। জল বলতে ক’হাত দূরের ওই পুকুর। শাকসব্জি যতটা না কিনে পারা যায় রাধাকান্ত টুকটুক করে ঘরের আশপাশে লাগিয়েছেন ধনেপাতা, গাজর, লঙ্কা। কঞ্চি দিয়ে টালির চালে তুলে দিয়েছেন লাউ গাছ, উচ্ছে গাছ, শিম গাছ। সে সব পাড়তে চার ছেলের যাকে যখন সামনে পেতেন তুলে দিতেন উপরে। ছেলেরা অতশত বুঝত না, রাধাকান্ত ওদের টালির জোড়ায় জোড়ায় পা দিতে বললেও, ওরা প্রায়ই প্রতিবারই এক-আধটা করে টালি ভাঙত।
বৃষ্টির সময় সেই ভাঙা টালি বেয়ে জল চুইয়ে আসত। আঙুল দিয়ে সেই জলের রেখা টেনে রাধাকান্ত পাঠিয়ে দিতেন তার নীচের সারির টালির উপরের খাঁজে। সে বার টানা তিন-চার দিন ধরে এমন প্রবল বৃষ্টি হল যে ঘরের প্রায় সব জায়গা দিয়েই জল পড়তে লাগল। বাটি, মগ, হাঁড়ি বসিয়েও কুলনো গেল না। শেষে তুলতে হল বিছানা জুড়ে পাতা পলিথিন সিট। বড়টা হওয়ার পর রাধাকান্ত ভেবেছিলেন একটা ওয়েলক্লথ আনবেন। পর পর দু’মাসেও পেরে ওঠেননি। পরে ডাকবাংলোর মোড় থেকে কিনে এনেছিলেন এই পলিথিন সিট। তখন ডাকবাংলোর মোড় এত জমজমাট ছিল না। বিকেলের দিকে ছোট-ছোট চালার নীচে দোকানিরা নানান পশরা সাজিয়ে বসত। হ্যারিকেন-লম্ফর টিমটিমে আলোয় বেচাকেনা হত। সেই পলিথিন সিটটা একটু বড়ই ছিল। বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল চাদরের নীচে। বাকিটা গোঁজা থাকত চার দিক দিয়ে। মাঝে মাধ্যে বিছানাপত্র রোদে দেওয়ার সময় সেটা বেরিয়ে পড়ত। সেটায় শুধু বড়ই নয়, কাটিয়ে দিয়েছিল তার পরের তিন ভাইও।
এক টানে সেটা বের করে টন সুতো দিয়ে খাটের মাথা বরাবর চার দিক বেঁধে দিয়েছিলেন টালির নীচের চেলা-বাঁশগুলোতে। যাতে বউ-বাচ্চাগুলো আর না ভেজে। কিন্তু কখন যে একটু একটু করে ওটায় জল জমে জমে ভারী হয়ে গিয়েছিল উনি বোঝেননি। হঠাৎ একটা কোণের সুতো ছিঁড়ে ঝপাৎ করে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। লাফ দিয়ে উঠলেন ওদের মা, তরুলতা। দেখলেন, একটুর জন্য ওরা ভেজেনি। তবে বিছানার একটা দিক ভিজে একেবারে একশা।
অগত্যা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ওদের মা কোনও রকমে খাটের নীচে গিয়ে মাথা গুঁজলেন। আর রাধাকান্ত ওই ঝড়-জলের মধ্যেই গামছা পরে নেমে পড়লেন উঠোনে। একটা একটা করে কুড়িয়ে এনে তুলে রাখলেন জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া বীজ-দানাগুলো। সদ্য মাথা তোলা চারাগুলোর ওপর চাপা দিয়ে দিলেন কাঁনা-উঁচু থালা। একটু বড়, যেগুলো জলের ঝাপটায় হেলে পড়েছিল, সেগুলোর পাশে কঞ্চি পুঁতে, কাঠি পুঁতে সোজা করে দিলেন। যাতে জোরে হাওয়া দিলেও টাল সামলাতে পারে। সীমানা জুড়ে পোঁতা দু‘-চার হাত লম্বা লম্বা আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেল, সুপারি গাছগুলোর গোড়াতেও দলা দলা মাটি তুলে দিলেন যাতে পড়ে না যায়। এক সময় বৃষ্টি থেমে গেল। চারা-টারা সব ক’টাই টান টান হয়ে দাঁড়াল। বীজ-দানাগুলো বোনা হল আবার। কিন্তু রাধাকান্ত পড়লেন ধুম জ্বরে। জ্বরে ক’দিন তিনি মাথাই তুলতে পারলেন না।
তখন পারতেন। মনে জোর ছিল। ভাবতেন, ছেলেরা আছে। আর তো মাত্র ক’টা দিন। এর পরেই ওরা হাল ধরবে। যাতে ওরা শক্ত হাতে হাল ধরকে পারে, যাতে টালির চাল ফেলে দিয়ে ঢালাই ছাদ দিতে পারে, যে ক’টা পোস্ট বসাতে হয় হোক, যাতে সেই মোড় থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারে বিজলি-বাতি, যাতে মাটির তুলসী মঞ্চের জায়গায় তুলতে পারে টাইলস্ বসানো ছোট্ট মনোরম মন্দির; সে জন্য কী-ই না উনি করেছেন।
ছোট কোম্পানির অল্প মাইনের চাকরি। তাতে বাচ্চাদের মুখে কোনও রকমে দু’বেলা দু’মুঠো তুলে দেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার বাইরে আর কিছু করা যায় না। তাই একে তাকে ধরে ডাকবাংলোর মোড়ের দোকানিদের পাশে একটু জায়গা বের করলেন। অফিস থেকে ফিরে সেখানে উনি বাচ্চাদের খেলনাপাতি নিয়ে বসতেন। হাতা, খুনতি, দা, ছোটখাটো বাসনপত্রও রাখতেন। তার মধ্যেই জমি-বাড়ির দালালি করতেন। ছুটিছাটার দিনেও কিছু না কিছু করতেন। কখনও চুপচাপ বসে থাকেননি তিনি।
নিজেকে নিংড়ে যে দুটো পয়সা পেয়েছেন, সবটুকুই ঢেলে দিয়েছেন ছেলেদের পিছনে। কলকাতায় হস্টেলে রেখে তাদের পড়ালেখা করিয়েছেন। কখনও বুঝতে দেননি দশটা পয়সা বাস ভাড়া বাঁচানোর জন্য শিয়ালদহ থেকে ক’মাইল হেঁটে উনি তাদের কাছে যান। কখনও জানতে দেননি, তাঁরা দুটিতে শুধু মুড়ি চিবিয়ে কী ভাবে কাটিয়ে দেন রাতের পর রাত। রাধাকান্ত চোখে এখন মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে সেই সব দিনের ছবি।
যে দিন মাইনে পেতেন, তার পরের রবিবারই বাড়িতে মাংস হত। না, বাড়িতে মুরগির মাংস ঢুকত না, খাসির মাংস। তাও সব মাসে নয়। যে মাসে বিয়ে, অন্নপ্রাশন বা ওই জাতীয় কোনও নিমন্ত্রণ থাকত, সে মাসে আর মাংস হত না। মাংসের টাকা দিয়ে উপহার কিনে সেখানে যেতেন। যে যতটা পারেন, মাংস খেতেন।
মাস যত এগোত, তত বড় মাছ থেকে কমদামি মাছে নেমে আসত বাজার। দু'সপ্তাহ পরেই আর মাছ নয়, বাড়িতে আসত ডিম। প্রথম কুড়ি দিন পেরোলে আর গোটা ডিম নয়, ডিম সিদ্ধ করে সুতো দিয়ে মাঝখান থেকে কেটে ছেলেমেয়েদের পাতে দিতেন অর্ধেক করে ডিম। মাসের ছাব্বিশ-সাতাশ দিন হয়ে গেলে বাচ্চাদের পাতে সেটাও দিতে পারতেন না। তখন শুধু রাধাকান্ত পাতে পড়ত ডিম, আর বাকিরা পেত ডিমের ঝোল আর চার ফালি করে কাটা দু'টুকরো করে আলু। রাধাকান্ত খেতে না চাইলে তরুলতা বলতেন, তুমি এত খাটাখাটনি করো, এটুকু না খেলে যে বিছানায় পড়ে যাবে!
স্পষ্ট মনে আছে, সে দিন তাঁকে ভাত বেড়ে দিয়ে তরুলতা মুড়ির বাটি নিয়ে বসেছেন। সঙ্গে গোটা চারেক লঙ্কা। বাটির দিকে তাকিয়ে উনি বউকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভাত কোথায়?
--- আছে আছে, ভাত আছে। আসলে ক'দিন ধরে শরীরটা ঠিক ভাল যাচ্ছে না। থেকে থেকেই জ্বর আসছে। তাই... তরুলতা বলছিলেন।
কিন্তু রাধাকান্ত তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই তরুলতার কথা মাঝপথে আটকে গেল। শুধু বললেন, অ।
খেয়ে-দেয়ে উঠে তরুলতার গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বর নেই। পর দিনও তাই। তার পরের দিনও তাই।
রাধাকান্ত বললেন, এটা তো ঠিক ভাল ঠেকছে না। প্রত্যেক মাসেই শেষের দিকে দেখি তোমার এমন হয়। তুমি একবার তা হলে শিবু ডাক্তারকে...
--- তোমার না... হয়েছে একটু জ্বর, তা নিয়ে আবার ডাক্তার-কবিরাজ! এমন জ্বর সবারই হয়। তরুলতা বললেন।
--- না না, অনেক দিন তো হল, রোগ নিয়ে ছেলেখেলা কোরো না। এর পর বিছানায় পড়লে... গজগজ করলেন রাধাকান্ত।
--- মেয়েদের প্রাণ, কই মাছের জান, বুঝলে? সহজে যায় না। দুটো দিন ভাত না খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এর জন্য আবার শুধু শুধু দু’-তিন টাকার ধাক্কা।
তখন শিবু ডাক্তারের ফি, ওষুধপত্র নিয়ে ওই দু‘-তিন টাকাই ছিল। তাও দেখাতে চাইতেন না তরুলতা। কেন দেখাতে চান না ডাক্তার? অনেক পরে সেটা একদিন আবিষ্কার করেছিলেন রাধাকান্ত। আসলে জ্বর-টর কিছু নয়। মাসের শেষের ক’টা দিন চালে একটু টান পড়ে, তখন তো আর দুম করে বলা যায় না চাল বাড়ন্ত, তা ছাড়া রাধাকান্ত ভাতের পোকা। পারলে দু’বেলাই ভাত খান। তাই সব দিক সামলাতে লতার এই বাহানা। বুঝতে পেরে বউকে একটু ধমকেই ছিলেন রাধাকান্ত--- চাল বাড়ন্ত হলে আমাকে বলবে, তা বলে না খেয়ে কাটাবে?
জোরে কথা বললে থতমত খেয়ে যেতেন তরুলতা। ছলছল চোখে মুখ নামিয়ে বলেছিলেন, সেই কোন সাতসকালে একটু ভাত খেয়ে বেরোও, বাইরে খিদে পেলে তুমি কী খাও, আমি বুঝি জানি না, না? তুমি ওদের জন্য এত করতে পারো, আর আমি একটু করলেই... কথা শেষ হওয়ার আগেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন তরুলতা। রাধাকান্ত কাছে গিয়ে তরুলতার মাথাটা বুকে টেনে নিয়েছিলেন।
ছেলেদের জন্য ওঁরা এ ভাবেই করেছেন। ছেলেরাও একে একে পাস-টাস করে যে যার মতো দাঁড়িয়ে গেছে। বিয়ে-থা করেছে।
এক-একটা ছেলে বিয়ে করেছে। বউ নিয়ে এসেছে। আর বুড়ো-বুড়ি নড়েচড়ে উঠেছেন। এ বার বুঝি বাড়ির হাল ফিরল। ছোট-ছোট কচিকাঁচায় ভরে উঠল ঘর। উঠোন। দামালপনায় তাঁদের মাতিয়ে রাখল সারাক্ষণ।
শাশুড়িরা বুঝি এমনটাই চান। তিনিও একদিন নতুন বউ হয়ে এসেছিলেন। সেই ঘটনাটা মনে পড়লে হাসি পেত বহু দিন পর্যন্ত। বিয়ে হয়েছে তখনও ছ’মাস হয়নি। কী একটা কাজে ক’দিনের জন্য রাধাকান্ত গেছেন কোথায় যেন। রাতে বউয়ের শোয়ার জায়গা হয়েছে শাশুড়ির কাছে। শুয়ে শুয়ে নানান কথা হয় শাশুড়ি-বউয়ে। তত দিনে অনেকটা সহজ হয়ে গেছেন তরুলতা। কিন্তু সেই কথাটা শুনে তাঁর সে কী লজ্জা। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যান আর কী।
কর্তা ফিরতেই গদগদ হয়ে বলেছিলেন, তোমার মা কী বলেছেন জানো? ডালপালা ছড়াতে। বলেই, ঠোঁট কামড়ে হাসতে শুরু করেছিলেন। হাসতে হাসতে ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠেছিল।
শাশুড়ির সেই কথা তিনি রেখেছিলেন। পাঁচ-পাঁচটা ডাল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ পাশে ও পাশে। তাই নিজে শাশুড়ি হওয়ার পর নিজের মেয়ের মতো করে বউদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে চেয়েছিলেন। শাশুড়ির কাছ থেকে উনি যা যা পেয়েছেন, তা-ই উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, সেই কথাটিও। তখন কি আর বুঝেছিলেন, সেই দিনকাল আর নেই। মানুষও বদলে গেছে অনেক। ছোট বউ তো মুখের ওপরে বলেই দিয়েছিল, সেই যুগ আর নেই মা। এখন হাম দো হামারা দো। একটাকেই মানুষ করতে লোকে হিমশিম খাচ্ছে, আর আপনি বলছেন... মার্কেট প্রাইস জানেন?
মার্কেট প্রাইস সত্যিই জানতেন না তরুলতা। তাই তো যখনই এক-একটা ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়ি উঠেছে, তখনই নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন। আর প্রতিবারই তা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে।
ভেঙে গেছে দেহ। ভেঙে গেছে মন। ভেঙে গেছে স্বপ্ন।
ছেলেরা যাতে ঠিক মতো শিক্ষা পায়, নিজের বুদ্ধি দিয়ে চটজলদি বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে, সত্যিকারের মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে, সে সবের দিকে নজর দিতে গিয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকানোরই ফুরসত হয়নি রাধাকান্তর।কী করে যে ওই ফুটফুটে শিশুগুলো হঠাৎ এত বড় হয়ে গেল, টের পাননি। তাই সাধ হয়েছিল, নাতি-নাতনিদের কাছে রেখে, ওরা একটু একটু করে কী ভাবে বেড়ে ওঠে, তা দু’চোখ ভরে পরখ করার। কিন্তু তা আর হল কোথায়!
বড় ছেলে কাজ করে মেকনে। সাহেবি ফার্ম। সকাল ন’টায় অ্যাটেনডেন্স। কলকাতায় না থাকলে হয়! মেজ ছেলে ওর বউয়ের ওপরে কিছু বলতে পারে না। বউমা নাকি বিয়ের আগেই ছেলেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, আমি বাবা ওই পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকতে পারব না। একটু বৃষ্টি হলেই যা প্যাঁচপেচে কাদা। সেজ ছেলে আবার খুব হিসেবি। সে হিসেব কষে দেখেছে, এখানে থাকলে তার যাতায়াতে যে সময় লাগবে, সেই সময় সে যদি কোনও কোম্পানির হিসেব-নিকেশ দেখে দেয়, তা হলে যা পাবে, তাতে বালিগঞ্জ, নিউ আলিপুর না-হলেও গড়িয়া বা গার্ডেনরিচে দু‘-তিন কামরার ফ্ল্যাট অনায়াসেই ভাড়া নেওয়া যায়। সুতরাং কে আর শুধু শুধু রাতে শোয়ার জন্য এই ধকল সহ্য করে। সেজ ছেলের এই হিসেব রাধাকান্তর মাথায় ঢোকে না। গড়িয়া বা গার্ডেনরিচ থেকে যদি যাতায়াত করা যায়। বারাসত থেকে করা যায় না? এখন তো শুনি আরও সুবিধে হয়েছে। ধর্মতলা থেকে নাকি দু’মিনিট পর পরই লাক্সারি বাস।একটু দাঁড়ালে সিটও পাওয়া যায়। হু হু করে ছোটে। ডাকবাংলোর মোড়ে আসতে কতক্ষণই বা লাগে! নাকি এখানে না থাকার অন্য কোনও কারণ আছে! তখন শুধু আর টাকা দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। প্রতিদিন বোঝা বইতে হবে। তিনি তো এখন একটা বোঝাই! নাকি অন্য ভাইরা না ভাবলেও তাদের বউরা ভাবতে পারে, বাড়ির লোভে আছে, সেই ভয়ে! নাকি সে তার বউ-বাচ্চা নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। রাধাকান্ত এখন বসে বসে এই রকম এক-একটা কারণ হাতড়ে হাতড়ে বের করেন। অথচ কোনওটাকেই বিশ্বাস করতে মন চায় না। তাঁর ছেলেরা কখনওই এমন হতে পারে না। সেজর পরের জনের তো আবার নাগালই পাওয়া যায় না। আজ দিল্লি, কাল মুম্বই, পরশু চেন্নাই করে বেড়াচ্ছে। অফিস থেকেই ফ্ল্যাট পেয়েছে। বাইশশো স্কোয়ার ফিটের। একদম ঝাঁ-চকচকে। ওর মাকে এক বার নিয়ে গিয়েছিল। পর দিনই ফিরে এসে ওর মা বলেছিলেন, কী কষ্টে আছে গো ওরা, একটুও উঠোন নেই। জামাকাপড় শুকোতে দেবে কোথায়?
আর ছোট ছেলে? সে তো নাক সিঁটকোয়। এটা একটা জায়গা? একটা ভাল স্কুল নেই। মেশার মতো লোকজন নেই। দশটা বাজতে না-বাজতেই শুয়ে পড়া। এটা কোনও লাইফ? এখানে বাচ্চাকাচ্চা রাখলে সে সে রকমই হবে। যত দিন মা-বাবা আছে...
মা-বাবা আছে দেখেই তারা আসে। ছোট আসে। ন' আসে। সেজ আসে। মেজ আসে। বড় আসে। আগে ঘনঘন আসত। যত দিন যাচ্ছে ওদের আসাটাও তত কমছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে থাকার সময়ও। রাধাকান্ত বুঝতে পারেন, যে ছেলে যেখানে আছে সেখানেই তাদের শিকড়-বাকড় ঢুকে গেছে এত গভীরে যে, হুটহাট করে তারা আর আগের মতো আসতে পারে না।
তবু যে ছেলেই আসে রাধাকান্ত জিজ্ঞেস করেন, একা কেন রে? বউমা এল না? কেউ বলে, দেখো না বেরোতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ বউ-বাচ্চা নিয়ে ছোট শালা এসে হাজির। কী করি? একাই আসতে হল। তোমার বউমা তো কবে থেকেই এখানে আসার জন্য... যে দিনই রেডি হই, একটা না-একটা...
কেউ বলে, তোমার দাদু ভাইয়ের সামনে পরীক্ষা তো, এখন ওদের যা চাপ...
আবার কেউ বলে, সপ্তাহে এই একটা দিনই তো ও ছুটি পায়। সংসারে হাজার রকম কাজ থাকে। একসঙ্গে দু’জনে বেরোলে...
রাধাকান্ত চুপচাপ শোনেন। শোনেন নাতি-নাতনিদের কথা। তারা কে সাঁতার শিখছে। কে কোন বসে আঁকা প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে প্রাইজ পেয়েছে। কে এ বারও ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে। কার নাচের প্রোগ্রাম হয়ে গেল কলামন্দিরে।
শুধু শোনেনই। শুনে শুনেই আন্দাজ করেন, তাঁর সেই ছোট্ট ছোট্ট দাদুভাই-দিদিভাইরা এত দিনে কত বড় হল। কেবল ন’য়ের মেয়েটা বাদে। তাকে উনি চোখেই দেখেননি। মুখেভাতের সময় খুব করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল ওরা। উনি যেতে পারেননি। অসুস্থ ছিলেন। ডাক্তার বারণ করেছিলেন। ন’য়েরও আর সময় হয়নি ওকে নিয়ে আসার।
মাঝে মাঝে রাধাকান্ত মনে হয়, ওদের আসা-টাসার মধ্যে হৃদয়ের সেই টান আর নেই। আছে শুধু কর্তব্য। লোকে কী বলবে! কিংবা না এলে নয়, তাই এই আসা-যাওয়া।
ওদের এই আসা-যাওয়া আরও কমে গেছে, ওদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে। বড় ছেলে অবশ্য ওঁকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। উনিই রাজি হননি।
যে ছাউনির তলায় যাঁর সঙ্গে উনি এত কাল কাটিয়েছেন, তিনি চলে য়েতেই সেই ছাউনি ছেড়ে কি তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব? এখানকার প্রতিটি ধূলিকণার মধ্যে যে তিনি রয়েছেন। রয়েছে কত কথা, কত ভালবাসাবাসি, কত স্মৃতি। যেতে গেলে এগুলো কি লতাগুল্ম হয়ে পায়ে পায়ে জড়াবে না?
এগুলো নিয়েই উনি এখন বেঁচে থাকতে চান। আর সেই থাকতে চাওয়ার ইচ্ছেটা একটু-একটু করে বাড়িয়ে দিয়ে যায় মাসে মাসে এক-একটা ছেলে আর কখনও সখনও বউ নাতি-নাতনিরা এসে। যাওয়ার সময় হাতে গুঁজে দিয়ে যায় কিছু টাকা। যে টাকা ওরা পাঁচ ভাই মিলে দেয়। পালা করে নিয়ে আসে একেক মাসে এক-একজন। আর যে আসে, সে-ই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়ে যায় মরুভূমির বুকে মরীচিকার মতো টলটলে জলের পুষ্করিণী। বলে, আমরা তো আছি। যখনই তোমার কোনও দরকার হবে, শুধু একটু খবর দিয়ো, ব্যস। খবর দেওয়ার জন্য সব ক’টা ছেলেরই ফোন নম্বর রয়েছে তাঁর কাছে। মোবাইলের তো বটেই। ল্যান্ড নম্বরও রয়েছে। ওরাও সেই নাম্বারগুলো সেভ করে দিয়ে গেছে ফোনে
কিন্তু কে খবর দেবে! তাঁকে তাঁর বড় ছেলে যে মোবাইলটা কিনে দিয়ে গেছে, সেটার বোতাম টিপতে গিয়ে কোনটার জায়গায় কোনটা টিপে ফেলেন, অন্য লোকের কাছে ফোন চলে যায়। ছেলেরা করলেও কানে চেপে ধরেও সব কথা ঠিক মতো শুনতে পান না। যেটুকু শুনতে পান, তার অনেকটাই বোঝেন না। বাইরে বেরিয়ে যে কাউকে দিয়ে ফোন করাবেন, তারও কি উপায় আছে! এমনিতেই শরীর চলে না। রাধাকান্তর আফসোস হয় ছেলেদের কথা ভেবে, ওরা ভাবে টাকা-পয়সাই সব। আর, দরকার ছাড়া কেউ বুঝি কারও কথা ভাবে না... চোখের সামনে কেমন বদলে গেল পৃথিবীটা!
বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠল ওঁর। এই যে একটু আগে তাঁর জানালা বন্ধ করতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু বিছানার চাদরের মুড়ি থেকে তাঁর যে বেরোতেই ইচ্ছে করল না, ফলে দরমার ঝাঁপটা খোলাই পড়ে রইল। যদি ওই পাঁচটার একটাও থাকত, তা হলে কি জানালাটা এখনও এই ভাবে হাঁ করে খোলা থাকত? একটা হাঁক দিয়ে বললেই কি, কেউ এসে ঝাঁপটা ফেলে দিয়ে যেত না?
অথচ তাঁর ছেলেরা যখন একে-একে চাকরি পাচ্ছে, তখন তাঁর সহকর্মীরাই বলতেন, তোর আর চিন্তা কী? এ বার তো তুই পায়ের ওপর পা তুলে খাবি। যেমন এত দিন কষ্ট করেছিস, এখন ভোগ করবি। ছেলে তো নয়, পাঁচটা রত্ন।
আত্মীয়স্বজনও সে কথা বলত। সামনে এ কথা বললেও, তারা যে আসলে তাঁদের পিছনে এর ঠিক বিপরীত কথাই বলত, সে কথা তিনি তিনি জানতে পারতেন, যখন সেই কথাগুলোই তাঁর কাছে আসত নানা কান ঘুরে। তাঁর ছেলেরা নাকি টাকা দিয়ে ডিগ্রি কিনছে। ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢুকছে। কেউ নাকি শ্বশুরের পয়সায় ছড়ি ঘোড়াচ্ছে। আরও কত কী! প্রথম প্রথম উনি রেগে যেতেন। প্রতিবাদ করতেন। বোঝানোর চেষ্টা করতেন, ব্যাপারটা তা নয়। তার পর আস্তে আস্তে ওঁর মনে হয়েছে, যারা ওগুলো বলে, তারা ঈর্ষা থেকে বলে। তিনি তাঁর ছেলেদের চেনেন। জানেন। বোঝেন।
তাঁকে যখন ছেলেরা বলেছে, আমরা আছি। উনি জানেন, ওরা আছে। সত্যিই আছে। যে কোনও দিন, যে কোনও সময় একটা খবর পাঠালেই ওরা ছুটে আসবে। যে কোনও বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বুক দিয়ে আটকাবে সমস্ত বাধা। সমস্ত বিপত্তি।
কিন্তু ওদের খবর দিল কে? না হলে, ঝড় তো অনেকক্ষণ শুরু হয়েছে। যেমন তাণ্ডব নৃত্যের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে, তাতে তো অনেক আগেই এই টালির চাল-টাল উড়ে যাওয়ার কথা! সামনের ওই এক চিলতে বারান্দাটা তছনছ হয়ে যাওয়ার কথা! অথচ জানালা দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে তো মনে হচ্ছে সব ঠিকই আছে। তবে কি ওরা পাঁচ ভাইই একসঙ্গে এসে ঝড়ের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে? আগলাচ্ছে তাদের পৈতৃক ভিটে?
ইচ্ছে করল ওদের ডাকতে। কিন্তু যত জোরেই ডাকুন না কেন, ঝড়-জলের শব্দ ছাপিয়ে তাঁর গলার স্বর যে উঠোনে, তাঁর ছেলেদের কাছে গিয়ে পৌঁছবে না, এটা উনি এই বয়সেও অনুমান করতে পারলেন।
শীত-শীত লাগছিল দেখে বিছানার চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে নিয়েছিলেন গায়ে। সেটা খুলে খাটের ওপর রেখে, নীচে রাখা জলচৌকিটায় পা দিয়ে রাধাকান্ত নেমে পড়লেন মেঝেয়। ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে দেয়াল ধরে ধরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। চারিদিকে তখন তুমুল ঝড়-জল। অথচ দামাল বাতাস একবারও আছড়ে পড়ল না তাঁর ওপরে। তাঁর বাড়ির ওপরে।
একসঙ্গে পাঁচ ছেলেকে তিনি বহু দিন দেখেননি। দেখার জন্য মনটা ভারী ব্যাকুল হয়ে উঠল। আলো-আঁধারি উঠোনের দিকে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলেন তিনি। যে দিকেই চোখ গেল, দেখলেন, মাথা তুলে ওরা দাঁড়িয়ে।
রাধাকান্ত চমকে উঠলেন, ওরা তো মাত্র পাঁচ জন! এত হল কী করে! কাউকেই যে চেনা যাচ্ছে না। কাকে ডাকবেন প্রথমে? ভাল করে চেনার চেষ্টা করলেন। আর তখনই বিদ্যুৎ চমকালো আকাশে। তারই এক ঝলক আলোয় উনি দেখলেন, কী বিশাল বিশাল তাদের দেহ। ইয়া ঝাঁকরা-ঝাঁকরা মাথা। সীমানা জুড়ে প্রাণপণে তারা আগলাচ্ছে এই ভিটে। ঝড়ের দাপটে উথালিপাথালি খাচ্ছে।
শীতল বাতাসে শরীরটা শিরশির করে উঠল তাঁর। তবু রাধাকান্তর ঘরে যেতে ইচ্ছে করল না। কেবল অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন, চারাগুলো কেমন গাছ হয়ে গেছে।
----------------------------------------------
সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি:
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। ১৯৬৪ সালে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় 'দেশ' পত্রিকায়। প্রথম ছড়া 'শুকতারা'য়। প্রথম গদ্য 'আনন্দবাজার'-এ। প্রথম গল্প 'সানন্দা'য়। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল তোলপাড় হয়। মামলা হয় পাঁচ কোটি টাকার। ছোটদের জন্য যেমন মৌচাক, শিশুমেলা, সন্দেশ, শুকতারা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, চিরসবুজ লেখা, ঝালাপালা, রঙবেরং, শিশুমহল ছাড়াও বর্তমান, গণশক্তি, রবিবাসরীয় আনন্দমেলা-সহ সমস্ত দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় লেখেন, তেমনি বড়দের জন্য লেখেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং মুক্তগদ্য। 'রতিছন্দ' নামে এক নতুন ছন্দের প্রবর্তন করেছেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুশো পঁতাল্লিশটি। তার বেশির ভাগই অনুদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। বেস্ট সেলারেও উঠেছে সে সব। এ ছাড়া যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন লীলা মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মহাশ্বেতা দেবী, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবনীতা দেবসেন, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে। তাঁর লেখা নাটক বেতারে তো হয়ই, মঞ্চস্থও হয় নিয়মিত। তাঁর কাহিনি নিয়ে ছায়াছবিও হয়েছে বেশ কয়েকটি। গান তো লেখেনই। মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে। তাঁর ইংরেজি এবং বাংলা কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কয়েকটি সিনেমায়। বানিয়েছেন দুটি তথ্যচিত্র। তাঁর লেখা পাঠ্য হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ থেকে একত্রিশ তারিখের মধ্যে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, মুক্তগদ্য, প্রচ্ছদকাহিনি মিলিয়ে মোট তিনশো এগারোটি লেখা প্রকাশিত হওয়ায় 'এক মাসে সর্বাধিক লেখা প্রকাশের বিশ্বরেকর্ড' তিনি অর্জন করেছেন। ইতিমধ্যে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, সন্তোষকুমার ঘোষ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার, ড্রিম লাইট অ্যাওয়ার্ড, কমলকুমার মজুমদার জন্মশতবর্ষ স্মারক সম্মান, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চোখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ।
ব্লগ সংরক্ষাণাগার
🔴বিজ্ঞপ্তি:
এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:
বিষয়সমূহ
- Poetry speaks 2
- অণু কথারা 21
- আবার গল্পের দেশে 8
- উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
- একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
- এবং নিবন্ধ 3
- কবিতা যাপন 170
- কবিতার দখিনা দুয়ার 35
- কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
- খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
- গল্পের দেশে 17
- ছড়ার ভুবন 7
- জমকালো রবিবার ২ 29
- জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
- জমকালো রবিবার ৩ 49
- জমকালো রবিবার ৪ 56
- জমকালো রবিবার ৫ 28
- জমকালো রবিবার ৬ 38
- দৈনিক কবিতা যাপন 19
- দৈনিক গল্পের দেশে 2
- দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
- ধারাবাহিক উপন্যাস 3
- ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
- পোয়েট্রি স্পিকস 5
- প্রতিদিনের সংখ্যা 218
- প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
- প্রবন্ধমালা 8
- বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
- বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
- বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
- ভ্রমণ ডায়েরি 1
- মুক্তগদ্যের কথামালা 5
- রম্যরচনা 2
- শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60
যোগাযোগ ফর্ম
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
মোট পাঠক সংখ্যা
লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:
১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত।
২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন।
৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না।
৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন।
৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।
৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে।
৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন।
আমাদের মেইল-
hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook



















