সেই সব বর্তমান ~ বিকাশরঞ্জন হালদারের মুক্তগদ্য


বিকাশরঞ্জন হালদারের মুক্তগদ্য 
সেই সব বর্তমান 

সৌদামিনীর বয়েস নব্বই। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। সুতো বাঁধা ডাঁটি ভাঙা ময়লা পড়া চশমাটাও কখন কোথায় যে রাখে, খুঁজে পাওয়া দায়। ফলে দায় কাটিয়ে একরকম থাউ-থাউ করে চলাফেরা। একটাও দাঁত নেই। গায়ে জোর নেই। গায়ের চামড়া আলগা। শুধু শরীরটা বেঁটেখাট বলে - আর পাঁচটা এই বয়সী মানুষের মতো কোমর ভেঙে পড়েনি এই যা।  সৌদামিনী  তাই অতি সন্তর্পণে হলেও এখনও নিজে নিজে খোঁটা মারা - কাঠের ঘাটে নামাওঠা করে। বাড়ির ভেতরের পুকুর থেকে স্নান করে আসে। গায়ের জল মোছে। নিজে নিজে বাথরুমে যায়! এসব তাও ঠিক আছে কিন্তু সৌদামিনীর বড় কষ্ট। সে আজ গৃহবন্দী। ছোটবেলার ফেলে আসা চঞ্চল স্বভাবটা নির্ভুল ভাবে স্মৃতিতে ধরা দেয়। ভুলতে না পারা হারিয়ে ফেলা দুরন্ত দিনগুলো, এখনকার দিনগুলোকে, অতিবাহিত করাগুলোকে, কেমন বিঃস্বাদ করে তোলে! সৌদামিনীর  মনকেমন করে। আর ঐ কেমন করা মন, পালাতে চায়। পালিয়ে যেতে চায়। এই যার মনের অবস্থা, তার অবস্থা তাহলে কেমন! চৌহদ্দির মাঝখানে একটা প্রাণ কাঁদে। সৌদামিনী কাঁদে!  তার কান্নার সেরকম কোনো দাম নেই। এ-কান্না পসরা সাজায় না। আড়ালে থেকে যায়। সভ্য মানুষের আধুনিক দৃষ্টি এবং দৃষ্টিভঙ্গি অন্য দিকে হেঁটে যায়। সৌদামিনীর কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। সেই কোন কিশোরী বয়েস থেকে - অদৃষ্টের পরিহাসে -সম্পর্ক ভাঙাগড়া আর জীবনের ইতিহাস গড়ে তোলা ছাড়া, গর্ভে আর সন্তান ধারণ করা হয়ে ওঠেনি। একেবারে শেষে এসে, কোন এক সম্পর্কের রশি ধরে টেনে এখন, এ-বাড়িতে এক নাতিই তার সম্বল! সৌদামিনী একে'ই সন্তান বলে জানে। গর্ভের সন্তান অথবা তার থেকে অনেক আরও  বেশি। এখন বিধবা, বেওয়া, সন্তানহীনা, এরকম কত সামাজিক শব্দ এসে চেপে বসেছে,সৌদামিনীর গায়ে। মানবিকতার আলো কিন্তু বড়ই  নিবু-নিবু। সৌদামিনী বোঝে। বেশিকরে বোঝে। সে অন্তরে বাইরে দেখতে পায় একমাত্র  নাতি ছাড়া তার আপন জন বলতে বোধহয় আর কেউ নেই! নাতিকে করেছে বুকের ধন। নয়নের মণি। সৌদামিনীর  ইদানিং মস্তিষ্কে বিকৃতি দ্যাখা দিয়েছে। সব সময় কতকিছু যেনো চিন্তা করে। প্রবল হাসে আর হাততালি দেয়! তবে বুঝি স্মৃতির  দিগন্ত থেকে -খুশির দিনগুলো ঝরে পড়ে? রঙিন স্বপ্নাভ কৈশোর-যৌবন, মায়া-মধুর, মোহ-মনোহর সত্যিগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মত সুরে-ছন্দে? না কেবলই নীলাভ যন্ত্রণা? এ-শুধু যন্ত্রণা?  সৌদামিনী এখন করে পালায়! পালাতে চায়!  সে তার বর্তমানকে ধুলোমাখা পায়ে মাড়িয়ে অতিতের দিকে দৌড় দেয়। এক সময়ের সেই অনিন্দ সুন্দর বর্তমানগুলো আজ অতীত। শুধুই অতীত। আজ ভরা ভাদ্রের মেঘলা দুপুর। আকাশ মেঘে-গম্ভীর হয়ে যেনো নেমে এসেছে মাটিতে। সারা বাড়িতে তন্দ্রা-ঘোর।  সৌদামিনী প্রত্যেকের দৃষ্টি এড়িয়ে উন্মত্তের মত দৌড় দিলো। বিলাপ করতে করতে! - " তোরা দাঁড়া - আমি যাবো...আমাকে নিয়ে যা...আমাকে নিয়ে যা....এখান থেকে নিয়ে যা..."! বাড়ির সদরে বাঁশের খোপ কাটা- দড়ি বাঁধা গেটটা টেনে খুলে, পা বাড়ালো বাইরের রাস্তায়! বারান্দায় খেলা করছিলো নাতির ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটা। সে দৌড়ে গিয়ে খপ করে ধরে ফেলল হাতটা। নরম-পরম স্নিগ্ধ দু'টো হাত!বলল - " কোথায় যাচ্ছ? এসো দু'জনে খেলা করবো। "সৌদামিনীর মনটা কেমন যেনো স্থির হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্তের হলে ও বা। সে কলকল করে হাসতে থাকলো! সে ঝরঝর করে কাঁদতে থাকলো!  লজ্জা পেয়ে একটু যেনো সরে গেলো, ভাদ্রের দিনান্ত-মেঘ! আর সৌদামিনীর দৃষ্টিপথে ফিরে আসতে থাকলো সেই সব শৈশব - কৈশোর - যৌবনেরা! একটার পর একটা...

গদ্যকার বিকাশরঞ্জন হালদার 
রঘুনাথপুর, বিরেশ্বরপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা















0 Comments