হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


   🔰 হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়🔹মালঞ্চ, দুর্গাপুর🔹

🔴বাংলা কবিতার ভুবনে কবি আলোক সরকার এমন এক মহাজাগতিক নক্ষত্র যার আপাত সরল  লেখাগুলির মাঝে লুকিয়ে থাকে নির্মাণ ও বিনির্মাণের সুষমা। একবার পড়ার পর এক মোহ তৈরী হয়,পরে দিনে দিনে শব্দ গুলি সম্পর্ক অন্বেষা সৃষ্টি করে।নৈর্ব্যক্তিক এক অন্বয়সাধন নির্লিপ্ততা অথচ চিরজ্বলমান। মানুষের যেমন অতীত ভবিষ্যত দুদিকে ছড়িয়ে থাকে ঠিক তেমনি তার কবিতায় ক্রমান্বয়ে নিস্পৃহ বিস্তৃতি রহস্যময়তায় ভরে ওঠে।
আচ্ছা দেখা যাক কেমন সে নির্লিপ্তি :

....একদিন আর কোনো দুঃখই পাবো না।সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে এসে/ দামী ইজিচেয়ারের ভিতরে নিজেকে সপে দিয়ে / বেয়ারার হাতে ঠান্ডা জল খাব। একদিন অত্যন্ত কৌতুক বলে মনে হবে / এইসব কবিতা ,বিনিদ্র রাত্রি, শিল্পের গভীর গভীরতম মানে/যেমন এখন কুড়ি বছরের প্রেম বহুদিন পর ফিরে এসে/চুলের ভিতরে হাত রাখলেও শুধুমাত্র মমতা ঘনায়, /কোনো উত্তেজনা নয়, শিহরণ নয়, সেইরকম সহজ আঙুলে / একদিন প্রিয় কবিতার বই খুলে পড়ব /একদিন আর কোনো দু:খই পাবো না অন্ধকারে একটি সবুজ পাতা ঝরে গিয়েছিল বলে।

               
                      
                  ᯾একদিন # স্তব্ধলোক᯾


এইসব কবিতার বীজ পাঠকে শুধুমাত্র আলোড়িত করে না, আরোগ্য দেয়। অবশ্য একথা ঠিক নিশ্চিত যে, এইসব কবিতা পংক্তি জীবন এবং জীবন বিষয়েই বলা তবু স্বনির্মিত স্বাতন্ত্র্যতা যা বিশ্বাস নম্র আভরণ জাগ্রত চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।আলোক সরকারের কাছে কবিতা কি এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন:
..ধরা যাক,একটি বাড়ি রয়েছে,তার দরজা
আছে। আমার কাজ বেরিয়ে যাওয়া।বেরিয়ে যাওয়াটাই আমার কাছে সত্য।একটা লক্ষ্য নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।বেরিয়ে যাওয়াটাই শুধু আছে।সে যেখানে যেতে চায় তার একটা আগ্রহ আছে, প্রাপ্তি আছে, আনন্দ আছে।দরজা আছে কি নেই, তার লক্ষ্য নয়।অপরিকল্পনার দিকে যাওয়াটাই শিল্প।আর এসব নিয়েই ঘোর ,ঠিক ঘোর নয়,নিবিষ্টতা,এই নিবিষ্টতাই আমার কবিতা।

আসলে শব্দের গঠনবিন‍্যাস এবং ম‍্যাজিকায়ন আলোক সরকার এর কবিতার ইউ এস পি ।

...যতদিন সে না ফেরে/ আমাদের সব খেলা বন্ধ।/উৎসব বন্ধ /হাওয়াকে বলব তোমাকে আর পাতা/ কাপাতে হবে না। / তুমি সেই দেশে যাও /যেখানে সে আছে।/ ফুলকে বলব/ তোমার আর এ দেশে ফুটতে হবে না / তুমি সেই দেশে ফোটো/ যেখানে সে আছে /আমরা কারো ডাকে ঘরছাড়া হব না/ আমরা কোনো গান শুনব না/ কেবল দুপুর যখন চুপচাপ হবে/আমরা এমন একটা সুর বাজাব / যা ঘর ছেড়ে ওপরে ,আরো ওপরে / মলিন করুণ সুরে সারা আকাশ/ ভরে দেবে ,বাতাস ভরে দেবে / সেই দেশ ভরে দেবে/ যেখানে সে আছে ।...যতদিন সে না ফেরে/ পবিত্র মানুষদের জন্য।

এই কবির কাব্যচর্চা যারা দীর্ঘকাল অনুসরণ করেছেন তারা জানেন কবিতাকে বিষয় থেকে
বিষয়হীন করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার।উতল নির্জন,আলোকিত সমন্বয়,অন্ধকার উৎসব, বিশুদ্ধ অরণ্য,অমূলসম্ভব রাত্রি এই সব কাব্যে তার গভীর সাধনার নিবিড়তা সর্বক্ষেত্রে অভিব‍্যক্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সূক্ষ্মভাবে ব‍্যক্তিকেন্দ্রিক ইগো সেন্ট্রিসিটির প‍্যারাডাইম শিফট ঘটেছে।সংস্কারের বাধনগুলি শিথিল হয়েছে। শৈলী ও প্রথার প্রাচুর্য ক্রিয়াশীল এবং চিরজাগরুক তার লেখায়। এক উজ্জ্বল এবং স্থিতধী সচেতনতা তার হৃদয় সঞ্জাত।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক অশোক মিত্র
আলোক সরকারের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন:
থেমে থেমে, থেকে থেকে, কবিকে উপলব্ধি করতে হয় মনন বোধ ও মজ্জায়।তার কবিতায় পাওয়া যায় বেদ উপনিষদের শান্ত ব‍্যাপ্ত গভীর প্রজ্ঞা । হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে এমনভাবে জারিত করে, যার মধ্যে উপলব্ধি করি এক স্বর্গীয় সুষমা।
তারপর তার নীল আলো সমস্ত অন্তর জগৎকে করে তোলে আবিষ্ট ও আপ্লুত।আলোক সরকারের সৃষ্ট কবিতাগুলি মরমী প্রজ্ঞার আশ্চর্য এক বিস্ময়কর অনুরণন ,যা কিন্তু ব‍্যাখ‍্যাতীত।

...চিরদিন আজ্ঞাবহ থেকে যাবো ।বৈশাখ দুপুরে একা/ তোমার গোপন চিঠি হাতে নিয়ে খররৌদ্রে যাব/ তোমার প্রেমিক তার বাড়ি।বলব বিকেলে হবে দেখা/ বড় রাস্তার পাশে তুমি তার অপেক্ষায়। সমস্ত দুপুরবেলা / পথে পথে ওড়াবে নিস্পৃহ ধুলো, ক্লান্ত কাক ঘূর্ণিফল গাছে ।

                 
                       
                      ᯾ অংশ: বিশুদ্ধ অরণ্য᯾


বিশুদ্ধ অরণ‍্যে আর একটি কবিতা যা উল্লেখ না
করলে লেখাটি সম্পূর্ণ হবে না।
... তোমরা সব এসে দেখে যাও ,আমার ছাদের/ গোপন টবেতে আজ গোলাপ ফুটেছে/ সম্পূর্ণ
আকাশ,মেঘ ভেসে যায়,ফাল্গুন মাসের / হাওয়া তোমরা এসে দেখে যাও। /দশটি পাপড়ি গাঢ় নির্নিমেষ একাগ্র জেগেছে...

                   ᯾রাজকন্যা: বিশুদ্ধ অরণ্য᯾


কেন্দ্রিভূত অবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।অন্ত‍্যমিল  সাধারণত দেখা যায় না তার কবিতায়, টানা গদ্যে কবিতা লেখা নতুন কিছু নয় কিন্তু আলোক সরকারের গদ্য কবিতা গুলি সবসময়
অনন্য মাত্রা প্রদর্শন করে পাঠকের হৃদয়ে।যাকে বলা যায় অভিব‍্যক্তময়তার তৎপরতা।স্বচ্ছ তরল নির্ভার
উৎসর্জনে মূর্ত আরেকটি কবিতা এরকম:

...হারিয়ে যাওয়া লাটিম আমি তোমার কথা ভাবি/ ঠিক তোমার কথা নয় তোমার হারিয়ে যাওয়ার কথা/ ছিলে একদিন সারাবেলা উদ্বেগব‍্যাকুল নিশীথিনী/ ঠিক কখন হারিয়ে গেলে লাল রঙের লাটিম?
কতো নি:শব্দে হারিয়ে গেলে!
কুয়াশা জড়ানো অপরাহ্ন মিলিয়ে যাচ্ছে আলো          কার্ণিশের নিচের আলো কার্ণিশের ওপরের আলো
সব কিছুই সরে যাচ্ছে এখন আমার মনে হয়
পেছিয়ে যাচ্ছে খোলা নীল রঙের আকাশ
মিলিয়ে আসছে কোলাহল।
সব কিছুই সরে যাচ্ছে ।লাল রঙের লাটিম....
ঠিক কখন হারিয়ে গেলে? আমার কেবল ভাবনা শূন‍্যময় অন্ধকার ফেনিয়ে উঠছে অভিমান
আমার কেবল ভাবনা ঠিক কখন হারিয়ে গেলে
লাল রঙের লাটিম।


এই কবিতায় প্রচুর প্রশ্ন আসছে ।কিন্তু আদপে পাঠকের মনে হয় প্রশ্নের বাইরে অন্য কিছু নয় তো।
বাংলা ভাষায় জীবনানন্দ দাশের পর কবি আলোক সরকারকে নির্জনতার কবি বলে অভিহিত করেছেন অনেকেই।কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০১২ তে কবিতা ক‍্যাম্পাস পত্রিকার পাতায় কবি
আলোক সরকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন:
আলোক সরকারের কবিতায় এক শান্ত নীরবতা সব সময় চোখে পড়ে।যেন বহুলোকের জনতার মধ্যে একটি পৃথক লোক হেঁটে চলেছে।

পঞ্চাশের একজন ব‍্যতিক্রমী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও আলোক সরকার কিন্তু
চল্লিশ দশকের শেষ দিক থেকেই একজন বিশিষ্ট কবির শিরোপা লাভ করেছেন।কেননা তার 'উতল নির্জন' এর কবিতা গুলি সব ই চল্লিশ দশকের শেষ পাদে লেখা(১৯৪৬--১৯৪৯)এবং যার প্রকাশ ১৯৫০ সালের মে মাসে ।এরপর আলোকিত সমন্বয় যদিও মাঝে সূর্যাবর্ত নামে একটি কাব্য পুস্তিকা রচিত হয়েছিল।
সরল ভাবনাগুলি থেকে উত্তীর্ণ অনুভবের এক স্থিতপ্রজ্ঞ রূপ প্রথম থেকেই ধরা পড়েছিল।
বাড়িতে পরিবেশ ছিল কবিতার।অগ্রজ অরুণকুমার সরকার ছিলেন সে সময়ের এক সম্ভ্রম জাগানো কবি।

একথা অনস্বীকার্য যে, শিক্ষিত এবং দীক্ষিত পাঠকের কাছে বুদ্ধদেব বসু,সুধীন্দ্রনাথ,প্রেমেন মিত্র, জ‍্যোতিরিন্দ্রের পরই ছিলেন আলোক সরকার, অলোকরঞ্জন,শঙ্খ ঘোষ,শক্তি, সুনীল এবং  উৎপলকুমার। বিষ্ণু দে র সাহিত্যপত্রে এই কবির কবিতা নিয়মিত ছাপা হত। তারপর মাত্র ২২ বছর বয়সে বুদ্ধদেবের কবিতা পত্রিকায়
আলোক সরকারের কবিতা ছাপা হল ।
এমনকি সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের পূর্বাশা পত্রিকায় তার নিয়মিত কবিতা বেরোত । আর ছিল বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনাবিল প্রশ্রয়।

কবিতার পাশাপাশি আলোক সরকারের পাঁচটি উপন্যাস ও বেশ কিছু গল্প আছে যাতে ধরা আছে মানুষের বাস্তব, বাস্তব জীবনের ঘটনা ।
প্রথম উপন্যাস অতিথিনিবাস পূর্বাশা পত্রিকায় বেরিয়েছিল।এমনকি অশত্থ গাছের মতো কাব্যনাটক।কাব‍্যনাটক সম্পর্কে কবির মতামত হল কাব্যনাটক সবসময় আধুনিক মনের ব‍্যাপার।শুধুমাত্র স্বগতোক্তির সময় কবিতা থাকতে পারে এছাড়া কবিতা যত না থাকে ততই ভালো।
তার একটি বিখ্যাত কবিতা ,নৌকো।
সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে
স্মৃতির এই সংকলনে যোগ  করতে চাই।

...সন্ধ্যা হলে কোনোদিন ঘরে থাকব না, বিকেল
হবার আগে/ দুইজনে দুইদিকে চলে যাবো।
আমাদের বাড়ির নির্জন/শীতের শাখার মতো মৃত্যুর বিষাদে শান্ত পরিণত।/সহসা অশোক স্পষ্ট কৃষ্ণচূড়া প্রস্তুত সংরাগে/পলাশের নিমগ্ন প্রদীপ।
ভোরবেলা নীলিমা জাগ্রত।/ভালোবাসা আমাদের দুজনের আঁকা ছবি / সাহজিক বাড়িতে ফিরেই দেখবো বিশ্রুত আলোয় উচ্চারণ।
             

             ᯾ নৌকো: আলোক সরকার᯾


‌কবিতা যে সূক্ষ্মতম শিল্প কর্ম নির্মাণ বিনির্মাণে একথা বুঝেছিলেন আলোক সরকার।আর বুঝেছিলেন বলেই তিনি লিখতে পেরেছিলেন-
মাঠের অনেকটা ভিতরে নেমে বেশ চেঁচিয়ে বলি---শুনতে পাচ্ছ আমি একেবারে ভালো নেই।
আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি।
চমকে উঠে চারিদিকে তাকাই
কেউ শুনতে পেয়েছে?

কার শুনতে পাওয়া নিয়ে ভাবনা তাও ভাবি।

বিকেল নিবে আসছে ক্রমশঃ---
একটু আগে যে গাছটা আধার হচ্ছিল
তা আরো আধার হয়েছে

সারা গায়ে আধার নিয়ে অনবহিত  চলি।
পাতারা তাদের ভেসে যাওয়া শব্দ করে বোঝাচ্ছে-

শব্দ সারা মাঠ ভরে পুরো একটা জীবনকাহিনী।
আরো কিছুটা মাঠের মধ্যে নামি
নিচু গলায় থেমে থেমে বলি
শুনতে পাচ্ছো
আমি একেবারে ভালো নেই।
আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি।
মাথার উপর পুরো আকাশ
দশদিশা দিগন্তে নিস্তব্ধ হয়েছে।


                ᯾ নিস্তব্ধ: আলোক সরকার᯾


২০০৭ সালে অপাপভূমি প্রকাশ পায়।বিশেষতঃ
লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায়। ঠিক তার এক বছর পর ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় আট ফর্মার বৃহদাকার এক কাব্য গ্রন্থ
আশ্রয়ের বহির্গৃহ,যাতে এক অন্য ভাষায় কথা
বলেছেন তিনি।
উপরোক্ত নিস্তব্ধ, কবিতাটি ঐ আশ্রয়ের বহির্গৃহ
থেকেই নেওয়া।
আশ্রয়ের বহির্গৃহ এর প্রথম কবিতা আস্তিক‍্য‍
শুরু হয় এইভাবে:
সায়াহ্নে প্রথম উক্তি
সে প্রাত:কাল নয়
সে সূর্যোদয় নয়
তার কর্তব্য বস্তুর চিহ্নিতকরণ নয়..

এই কাব্যের আরো কিছু প্রণিধানযোগ্য লাইন
উল্লেখ করা যেতে পারে:

ক. যা আসে তাই
     অসামান্য হয়ে আসে
     অসামান্য না হলে চিনব কী করে
     অসামান্য....

খ.কবিতা যখন লিখি
    কান্নাগুলোর উচ্চারণ বিষয়ে
    সতর্ক হই।
    কান্নাগুলোকে ব‍্যক্তিগত করি।

 গ.বেলা যত পড়ে আসছে
     মন্দির প্রাঙ্গণ আরো বেশি
     মন্দির প্রাঙ্গণ...

ঘ.ভাবি রোদ্দুর হয়েছে
    ভাবি বৃষ্টির প্রহর নাকি?
    যা কিছু দূরের তাই রঙ বদলায় ....

ঙ. সে একদিন ছিল
     সে আর কোনদিন আসবে না
     কেবল তার কাছে
     এই বার্তা বার্তাগুলি.......




কবিতা ছাড়াও তার দুটি কাব্য নাটক মনে পড়ছে , কীভাবে যে জনপ্রিয় হয়ে উঠল আমার মতো অনেকের কাছেই তা এখনও বিস্ময়ের কারণ।
১৯৬৪ সালে জুলাই মাসে কলকাতা থিয়েটারে
অশত্থ গাছ প্রথম অভিনীত হয়।
অভিনয় করেছেন কবিতা সিংহ, সমরেন্দ্র
সেনগুপ্ত, রত্নেশ্বর হাজরা, ছন্দা দাশগুপ্ত, ছন্দা দে এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল রায়চৌধুরীর
তত্ত্বাবধানে নাটক মঞ্চস্থ হয়।
আরেকটি হল মায়াকাননের ফুল,১৯৬৫ তে
কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরে প্রথম মঞ্চস্থ হয়।
এক্ষেত্রেও যারা অভিনয় করেছেন তারা সব
বিখ্যাত কবি কালীকৃষ্ণ গুহ,রত্নেশ্বর হাজরা, মৃণাল বসুচৌধুরী,অশোক দত্ত চৌধুরী, সুপ্রিয় গুহ প্রমুখ।
আরো একটা ব‍্যাপার উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে
তা হল,কবিতাতে যৌনতার ব‍্যবহার সম্পর্কে তার
মতামতটি কেমন ছিল?

কবিতাতে যৌনতার সঙ্গে বিশুদ্ধতার কোনো সম্পর্ক নেই, একথা স্বয়ং আলোক সরকার বলছেন।তিনি আরো বলছেন, আমার কবিতায় যৌনতার বড়ো উচ্চারণ নেই।কেননা তা প্রাকৃতিক।তার উপরে আমার কোনো কন্ট্রোল নেই।তা আছে থাকুক কিন্তু শিল্পের মধ্যে তা আসতে পারে না।যা আমার নিজের নয়, তা আমি নেবো বা কেন ?
প্রত‍্যেক মানুষই চায়,সে নিজে পুরো আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ অর্থহীনতার দিকে
শূন্যতার দিকে নিজের উচ্চারণ করতে।
সুরঞ্জনা ,ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে...
এর মানে কী ?
সুরঞ্জনা ,তুমি ওই যুবকের কাছে যাচ্ছো কেন ?
তুমি তো আরও বড়ো, অনেক বড়ো, আকাশের উপরে আকাশ, সেখানে তুমি, তোমার অবস্থান।
একথা আজ অনস্বীকার্য যে, কবিতা রচনার রহস্য যদি এক অপার গণিত হয় তবে আলোক সরকার তার মাস্টারমশাই।

প্রথাগত ব‍্যাকরণেের  সীমা পেরিয়ে
আলোক সরকারের কবিতা আজ তৈরী করেছে
ভাসমান কমিউনিকেশন।
                ----------------------------------------------

















            📚 পরেশ নাথ কোনার🔺 দুর্গাপুর🔺


🔴এখনও সম্পূর্ণ বধির হইনি
চারিদিকে এত ঢাকের আওয়াজ তবু ও ! 
দূর থেকে ভেসে আসে বোবা কান্না
কান পেতে শুনি ।
সেই জলপাইগুড়ি চা বাগান থেকে
শালবনি,দীর্ঘ এ পথ।
ওরা তো তাই করতো,এক একটি কাঠ সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠে,কান ফাটা সেই ঢাকের আওয়াজ। 
ক্লান্তিকর পথচলা রাধানগর থেকে ব্রিস্টল। 
হুগলি নদী ধুতে পারে নি কোন কিছু,
আজ ও চিতা জ্বলে পেটে।
দীর্ঘ দিনের ফেলে আসা রাস্তার অবহেলায়
উঠে গেছে ছালচামড়া।
মরচে ধরা গাড়ি পথ মধ্যে পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। এলোমেলো পথ।
পথের দুধারে শালুকের থোড় আর লম্বা লম্বা শাল গাছ।
শাল গাছের নিচে উই ঢিপি।
উই ঢিপির নিচে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার ক্ষুধার বারুদ।
এত সবুজের সমারোহ তবু কী অন্ধকার !
আমার হাতের তালুতে পূর্ণিমার চাঁদ
ঠিকরে পড়ে আলো আমার আরাম বিছানায় । 


                    ⸙ মিঠুন রায়🔹ত্রিপুরা🔹



🔰নদীর  জলেও এখন  খুঁজে পাইনা জীবনের অস্তিত্ব
নদী ক্রমশ: দূরে সরে যাচ্ছে ফেনিল বেগে ।
স্বপ্নের মেদুরগুলি আটকে আছে জমাট বাধা বালিতে।
বুক ভরা কান্না রাশির স্তূপ তৈরি হচ্ছে চরের বুকে
নদীগর্ভের ভাঙনের ইতিবৃত্তের সন্ধান করেনা কেউ !
জোৎস্না ভরা বর্ণিল বেগে একদিন হয়তো শঙ্খচিলরা আশ্রয় খুঁজে নেবে নদীর বুকেই ।
            



    𑜄 Sanjoy Chakraborty🔹Saltlake, Kolkata🔹


🔵 An extra-ordinary
you are being through the motion.
though it is true,
tears flow continuously with an ambition.

There's a thinking non-sense about a huge galaxy,
for the conditional born,where
it's a human,nothing but animal,wished to be an enormous than the whole Nature.

Will you stop such a life ?
Now the feelings are occupied with sweet and sour
the core of a selfish heart,from the very beginning hour.

A heavenly sacrifice gradually
was grown in the soul.
and it died certainly,
lying down by streaching a few broken mole.
and it will be unchanged till an ultimate coming of fire !

Oh dude !
someone may hire,
but what a beautiful scenario !
can be left its mark in the Universe nude ?



            🔰 ডঃ রমলা মুখার্জী🔹বৈঁচী,হুগলি🔹



🔴 বেশ কয়েক মাস হল ছোট ছেলে দীপ্তদীপ সরকারি চাকরি পেয়ে সুন্দরবনের গোসাবাতে পোস্টিং।ওর মুখে খুব সুন্দরবনের গল্প শুনি।খুব যাবার ইচ্ছে।ছেলে বলল,শীতের সময় লঞ্চে সুন্দরবন ভ্রমণের টিকিট কেটে রাখব মা, তোমাকে নিয়ে ঘুরবো; গরমে লঞ্চ ছাড়ে না।তাছাড়া গরমে গোসাবাতে জলেরও বেশ কষ্ট।পানীয় জল কিনে খেতে হয়।ভূগর্ভস্থ জল মোটেই ভালো নয়,বেশির ভাগই নোনতা।অবশেষে এল সেই দিন,হল আমার প্রতীক্ষার অবসান।ছেলের ফোনে বলল,"মা তুমি আমার রুম-মেট সুদীপের সাথে চলে এসো গোসাবায় আমার বাসায় এক সপ্তাহের জন্য"।
ডিসেম্বরের ছয় তারিখ ভোর পাঁচটায় আমি মোবাইলে নেটে বৈঁচী থেকে ক্যানিং ভায়া হাওড়া পঁচিশ টাকার একটা টিকিট কেটে চেপে বসলাম হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইন লোকালে।হাওড়াতে নেমে সুদীপের সাথে চাপলাম শিয়ালদাগামী বাসে।শিয়ালদা কোর্ট স্টপেজে নেমে আমরা শিয়ালদা স্টেশনে এসে ক্যানিং লোকালে উঠলাম।সুদীপের মায়ের তৈরি লুচি,আলুর দম,আর শীতের বিখ্যাত খেজুর গুড়ের রসগোল্লা দিয়ে টিফিন সারলাম।জানলার ধারের সিটে বসে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে একটু তন্দ্রা এসেছে,কারণ ভোর সাড়ে তিনটেতে উঠতে হয়েছে।এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট পর সুদীপের ডাকে ঘুম ভাঙল,দেখি ক্যানিংএ পোঁছে গেছি।ক্যানিংএ নেমে গদখালির বাসে চেপে সব ঘুম ছুটে গেল,রাস্তা বহুত খারাপ।ঘন্টা খানেক পরে পৌঁছালাম গদখালি। পথে মাতলা,বাসন্তি,হোগল নদী দেখে সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেল। গদখালি থেকে বিদ্যেধরী নদীর ওপর নৌকা-বিহার করতে করতে আমরা গোসাবায় পৌঁছে গেলাম।নদীর দুই তীরের শোভা অতুলনীয়।গোসাবায় ছেলের বাসায় পৌঁছে স্নান-খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বেরুলাম গোসাবার বিখ্যাত হ্যামিলটন সাহেবের বাংলো দেখতে।বাসার খুব কাছেই বাংলোটি।আমি খুবই ভাগ্যবতী,কারণ ঐদিনই ছিল হ্যামিলটন সাহেবের জন্মদিন।সারা দিন নাচ, গান, আবৃত্তি,কুইজ প্রতিযোগিতা চলছিল,বাসা থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম।বাংলোটি আলো দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।বাংলোর ভেতরে ঢুকলাম। ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের ছবি,বসার,শোয়ার,স্নানের ঘরগুলি ঘুরে ঘুরে দেখলাম।গোসাবার উন্নতিতে ঐ সাহেবের অবদান নিয়ে গীতি-আলেখ্য শুনে গোসাবা বাজারটায় গেলাম।বেশ বড় বাজার,হীরে থেকে জিরে সব কিছুই পাওয়া যায়।বাসায় ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে স্নান সেরে পোঁছালাম গোসাবার ইউনিয়ান ঘাটে।সেখান থেকে লঞ্চে করে রওনা দিলাম সুন্দরবনের নানা দর্শণীয় স্থান ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।সেখানে প্রথমেই প্রাতরাশ সেরে নিলাম। তারপর কফি খেতে খেতেই গোসাবার বিডিও ঘাটে লঞ্চ এসে থামল।আমরা গেলাম বেকন বাংলোতে।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বেকন বাংলোতে ১৯৩২ সালে ৩০থেকে ৩১শে ডিসেম্বর অবস্থান করেছিলেন।রবীন্দ্রনাথ বই পাঠরত এইখানের মূর্তিটি খুব সুন্দর ও একদম অন্যরকম।তবে বাংলোটি ছোট,জীর্ণ-দশা।ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ খুবই  দরকার,বিশ্বকবির অমূল্য স্মৃতিটি বাঁচিয়ে রাখা অতি আবশ্যক।বাংলোটির অনতিদূরে একটি অনুকুল ঠাকুরের সুন্দর আশ্রম ও বিদ্যালয় দেখলাম।আবার লঞ্চে এসে একটু ঠাণ্ডা কোল্ডড্রিংকস  খেতে খেতে ইরিগেশন ঘাট,পুলিশ ঘাট,টাইগার ঘাট ইত্যাদি দেখতে দেখতে বিদ্যাধরী নদীর ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার যে কি আনন্দ তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।চারিপাশে ম্যানগ্রোভ গাছের সারি,লঞ্চ চলেছে ধীর গতিতে পাখিরালয়ের দিকে।কিন্তু পাখিরালয়ে গিয়ে হতাশ হতে হল। আগের মত পাখি আর এখানে নেই। হোটেল,দোকান,শব্দদূষণের করালগ্রাসে পাখিরা ক্রমবিলীন। আমাদের সহযাত্রীরা ভীষণ সাংস্কৃতিক মনভাবাপন্ন থাকায় সারাটা পথ হাসি,আনন্দ,গানে ভরে উঠেছিল।আমার ছেলে আর আমিও ওদের অনুরোধ সংগীত পরিবেশন করলাম।লঞ্চ ঢুকল পাখির জঙ্গলে,এখানে সারস, পানকৌড়ি, মাছরাঙা পাখির দেখা মিলল, তবে পরিযায়ী পাখিরা আরও শীত পড়লে তবেই আসে।বিশ্বউষ্ণায়নের কারণে ডিসেম্বরেও তেমন শীতের দেখা নেই।
 
গোসাবার জটিরামপুর ঘাটের কাছাকাছি এই পাখির জঙ্গলে গোসাপ, নানারকম বড় আকারের গিরগিটি জাতীয় প্রাণী দেখলাম।বাজ, চিল আকাশে উড়ছিল, মাছরাঙা মাছ শিকার করেই উড়ে গাছের ডালে গিয়ে বসছিল।পানকৌড়ির জলে ডুবে ডুবে জলজ প্রাণী শিকার করা দেখতে দেখতে আর সোনারপুর,বারাসত থেকে আসা সহযাত্রীদের সঙ্গে ছোটিসি মুলাকাৎ করতে করতে চলেছি। দুপুরের খাওয়া সেরে লঞ্চের নিচের তলায় নেমে সুন্দর করে পাতা বিছানায় একটু গড়াগড়ি দিয়ে নিলাম।বিকেলে পাখিরালয়ের বেশ সুসজ্জিত হোটেল 'আরামে' আমরা সবাই উঠলাম।ঐ হোটেলের নিজস্ব ঘাটে  লঞ্চটি সারা রাত আমাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে রইল।

সন্ধ্যায় 'আরামে' আমাদের বিনোদনের জন্য আদিবাসী সম্প্রদায়েরা ঝুমুর নৃত্য পরিবোশন করল,ঐ অপরূপ নৃত্যের তালে তালে আমরাও পা মেলালাম।ঐ অনুষ্ঠানের পর আবৃত্তি,নাচ ইত্যাদি নানান শিল্পকলা প্রদর্শন করলেন লঞ্চের  সব পর্যটকরা মিলে।আমার ছেলের সুমধুর সংগীতে আমরা সবাই যেন কোন স্বপ্ন-লোকে পৌঁছে গেলাম। গাছ-গাছালিতে ঘেরা বেশ নিরিবিলি পরিবেশে মনেও যেন সবুজের ছোঁয়া লাগছিল।
পরদিন খুব তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে সবাই লঞ্চে চেপে গেলাম সজনেখালি। সজনেখালির বনাঞ্চলকে ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছিল। সজনেখালিতে আমরা প্রথমেই গেলাম পর্যটন অফিসে।সেখানে পারমিশন করিয়ে আমরা গেলাম ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারে।এটি একটি মিউজিয়াম।ম্যানগ্রোভ সম্বন্ধে বেশ সমৃদ্ধ  হয়ে এখান থেকে আমরা গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে।কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছও বাঘের দেখা না পেলেও বন-বিড়াল,হরিণ,গোসাপ ইত্যাদি দেখলাম।তারপর কুমীর-পুকুর,কচ্ছপ পুকুর,বনবিবির মন্দির দেখে অনেক মুগ্ধতা নিয়ে লঞ্চে উঠলাম।ম্যানগ্রোভ গাছের তলায় গোঁজের মত শ্বাসমূলগুলি আমাকে খুবই আকৃষ্ট করছিল।

সুন্দরবনের আর একটু ভেতরে সুধন্যখালিতে লঞ্চ এসে পৌঁছালো। ম্যানগ্রোভ গাছের বড় উদ্যানে প্রতিটি গাছের নাম লেখা থাকায় আমরা এতক্ষণ ধরে যে সমস্ত গাছ দেখতে দেখতে আসছিলাম, প্রায় প্রত্যেকটির নাম জানতে পারলাম।কত রকমের লবনাক্ত মাটির গাছ, যেমন-বাণী, কাঁকড়া, গড়ান, হেতাল, কেওড়া, সুন্দরী, গেঁওয়া, হোগলা,ধুন্দুল আরও কত গাছ বলে শেষ করা যাবে না।স্রোতের টানে উৎপাটিত না হওয়ার জন্য এদের বেশিরভাগেরই ঠেশমুল থাকে।এখানকার লবনাক্ত  মাটিতে অক্সিজেন কম থাকায় মূলগুলি মাটির ওপরে উঠে এসেছে।এদের শ্বাসমূল বলে।এগুলোর গায়ে ছোট ছোট শ্বাসছিদ্র থাকে বায়ু থেকে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য।ম্যনগ্রুভ  পার্কটি দেখার পর সুধন্যখালি ওয়াচটাওয়ারে গেলাম। মিষ্টি জলের পুকুর দেখলাম,সেখানে বাঘেরা জল খেতে আসে।হরিণ,লালমুখো বানর অনেক দেখলাম।বানরগুলো দেখে বাচ্চারা খুব মজা পাচ্ছিল।আমরা লঞ্চে ফিরে লাঞ্চ সারতে সারতেই দোবাকিতে এসে পৌঁছালাম।এখানকার পাঁচমুখি নদীতে মাতলা, বিদ্যেধরী,সরস্বতী, রায়মঙ্গল ও আর এক নাম না জানা নদী এসে মিশেছে।পুরুষের সাথে মহিলারাও জীবন বাজি রেখে হাঙ্গর,কামোট,কুমীর উপেক্ষা করে চিংড়িমাছের মীন থেকে  চিংড়িমাছ তুলছে।হরিণ কাদায় পা ডুবিয়ে গাছের পাতা টেনে খাচ্ছে।কাঁকড়ার ইতিউতি ছোটাছুটি আর গর্তে ঢুকে পড়ার লুকোচুরি খেলা দেখতে বেশ মজার।দোবাকি ওয়াচটাওয়ার থেকে প্রায়ই বাঘের দেখা মেলে,আমারা দক্ষিণরায়ের মানে বাঘের পায়ের ছাপ দেখলাম,কিন্তু বাঘমশায়ের দেখা পেলাম না। প্রচুর হরিণ,বন্য শূকর দেখে লঞ্চে উঠলাম। পথে বেশ বড় একটা  কুমীরকে কাদার সঙ্গে রঙ মিলিয়ে শুয়ে থাকতে দেখলাম।বনমোরগের অপরূপ রঙের শোভা দেখে একেবারে সবাই মুগ্ধ।এবার ফেরার পালা।সহযাত্রীরা বাড়ি ফিরে গেল।আমি কিন্তু গোসাবাতে ছেলের বাসাতে ক'দিন থেকে কাঁকড়ার ঝোল আর টাটকা গলদাচিংড়ির মালাইকারি খেয়ে তবেই ছেলের সাথে শনিবার বাড়ি ফিরলাম,সাথে ছিলেন গোসাবা হাইস্কুলের দুই মাস্টরমশাই।ছেলের  বাসার পাশেই বেশ বড় গোসাবা হাইস্কুল। ওনাদের কাছে জানতে পারলাম প্রায় বারশো ছাত্র-ছাত্রী এখানে পড়ে। শহরের মত ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর ঢেউ এখানে এখনো আছড়ে পড়ে নি।গ্রামের সরলতা আছে বলেই এখানকার মানুষেরা বড় আন্তরিক।মাঝে গোসাবাতে দুদিন সুন্দরবন উৎসব উপলক্ষে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখেছিলাম।বাড়ি ফিরতে তাই ইচ্ছে করছিল না,তবু তো ফিরতেই হয়।বিদায় সুন্দরবন,বিদায় গোসাবা।
                 -----------------------------------------







              ✍আশরাফুল মণ্ডল🔹দুর্গাপুর🔹



🔴 বাঁচিবার অধিকার জন্মগত ভাবিয়া গলিত ধাতুসকল একদা প্রাণপণ প্রয়াসে স্বীয় যাপন ক্রিয়ায় নিয়োজিত হইয়াছিলেন। অনন্তর তাহারা অনুধাবন করিলেন, তাহাদের নিরন্তর কায়ক্লেশে সমাধা করা প্রচেষ্টা সমূহ খুড়ার কলের আয়ত্তাধীন। প্রত্যেকের চরণ যুগলে যে অদৃশ্য রজ্জুবন্ধন রহিয়াছে তাহা উন্মুক্ত করা কাহারও কদাপি সাধ্য নহে - এমত ভাবনায় পরিচালিত হইয়া ধাতুগণ নাসিকায় তৈল সেবন করিয়া নিদ্রাভিভূত হইয়াছিলেন।

কিন্তু এক্ষণে নানাবিধ দুশ্চিন্তায় তাহাদের নিদ্রার ব্যাঘাত হইতেছে। নিরন্তর বোধ হইতেছে তাহাদিগের বাঁচিবার অধিকার লুপ্ত হইয়াছে। চতুর্দিকে কোলাহল : বাঁচিতে চাহি! বাঁচিতে চাহি! গলিত ধাতুর এতাদৃশ আর্তস্বর মুমূর্ষুর লক্ষণ মাত্র। উত্তমরূপে বাঁচিতে হইলে জমাটবদ্ধ হওয়া একান্ত জরুরি বলিয়া প্রতিভাত হইতেছে।

গলিত ধাতুরা জমাট বাঁধিবার নিমিত্ত সচেষ্ট হইবেন কি এক্ষণে!!!


              
           🌈অমিত দেশমুখ🔹দক্ষিণ ২৪ পরগণা



🌳 বিদ্যালয়ের উঠোন জুড়ে
বসিয়ে সবুজ গাছ
হেডমাস্টার ভাষণ দিলেন
পাঁচই জুন যে আজ ।

পরিবেশের গুরুত্ব সব 
শুনলো ছাত্র দল
পাত্র এনে গাছের গোড়ায়
ঢাললো কেহ জল।

শাল শিশু কদম শিরিষ 
কতই গাছের মেলা।
সমস্ত দিন তাদের সাথে
কাটলো সবারই বেলা।

এমন মহা সমারোহেই 
দিনটি হলো শেষ।
উঠোন ভরা সবুজ দেখে
বললো সবে বেশ।

একে একে দিন চলে যায়
দশই জুনে এসে
গাছ গুলো সব চক্ষু মেলে
থাকে উপবাসে।

ভুললো সবাই দশই জুনে
পাঁচই জুনের গাছ
ছাগলে খায় নরম পাতা
আনন্দেতে আজ ।





                    ✍শুভায়ন বসু🔹দুর্গাপুর


🎈 আজ সৈকতের জন্মদিন। তবে আজকাল আর এসবের খেয়াল রাখে না ও ।জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। বাবা-মা দুজনেই মারা গেলেন, পিঠোপিঠি এক বছরের মধ্যেই। শ্রাবন্তীর সঙ্গে মিউচুয়াল সেপারেশনও হয়ে গেল বেশ কয়েক মাস । তবে রুপা আসে মাঝে মাঝে স্কুলের ছুটিতে। গোটা দিনটা ওর সঙ্গে কাটিয়ে, বিকেলেই ফিরে যায়। শ্রাবন্তীই ওকে পৌছে দিয়ে চলে যায়, কিন্তু নিজে ঢোকেনা এ বাড়িতে,নিয়ে যাবার সময়ও। দীর্ঘদিন বাক্যালাপ নেই দুজনের ।
আজ যে ওর জন্মদিন সেটা অবশ্য ভোরবেলাতেই জেনে গেল সৈকত। না, শ্রাবন্তী বা রুপা কেউই আজ এখনও বার্থডে উইশ করেনি।আসলে আজকাল বহু অনলাইন সাইটই জন্মদিনের মেসেজ পাঠায় সকাল-সকাল।ওর ব্যাঙ্ক,এমনকি ওর কোম্পানি পর্যন্ত। তারপর ফেসবুক খুললে তো বড় বড় করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। সুতরাং ভুলে থাকা আর হল না সৈকতের।
যা হোক জন্মদিন বলে কথা। কত যেন হল বয়সটা ? সৈকত বুঝল,এই একবছরে শরীরের বয়স যত না বেড়েছে, মনের বয়স বেড়েছে তার বহুগুণ। একা থাকার যন্ত্রণা নিয়ে একটা বছর কেটে গেছে, আরো কত বছর যে এভাবে কাটাতে হবে! মনটা ভারী হয়ে গেল। সৈকত ভাবল, প্রথমেই মা বাবার ছবিতে গিয়ে একটা প্রণাম সেরে আসবে। যতদিন ওঁরা জীবিত ছিলেন, এটাই তো করত দিনের শুরুতে। তারপর সবাই মিলে কত কিইনা হত সারা দিনটাতে । হইচই ,আনন্দ, উপহার, দারুন দারুন খাবার,বিকেলে ঘুরতে বেরোনো, বড় রেস্তোরাঁয় ডিনার সারা ,একেবারে জমজমাট। বিয়ের পরেও তার ছেদ পড়েনি। শ্রাবন্তী সারপ্রাইজ গিফট দিত একটা। আশ্চর্য ব্যাপার,সৈকত যেটা ক’দিন ধরেই কিনব কিনব ভাবছিল,কিন্তু কোন না কোন কারনে কেনা হচ্ছিল না,সেটাই শ্রাবন্তী কিনে এনে হাজির করত। একটা সাধারণ স্কুলে পড়িয়ে, জমানো সব ক’টা টাকাই হয়ত সেদিন শেষ করে ফেলত ও। রুপা আসার পরও সেই আনন্দের দিনগুলোয় কোন ব্যতিক্রম হয়নি ।বাবা-মার ততদিনে বয়স হয়েছে, ওঁনারা আর কোথাও বেরোতে চাইতেন না। তবু সকালে উঠে ওঁনাদের প্রণাম করা দিয়েই দিনটা শুরু হত। শ্রাবন্তীর আবদারে ওই দিনটা ছুটি নিতেই হত সৈকতকে।
কিন্তু আজ? আজ আর কেউ নেই,কোথাও নেই।আজ একা একা জন্মদিনটা হয়ে গেছে বড়ই জৌলুসহীন, বিরক্তিকর ।আজও তাই অফিস ,আজও ক্যান্টিনের ঘ্যাঁট আর মাছের ঝোল । আউটিং,শপিং, গিফট সব তো কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। সময় থাকতে যদি সংসারের ভাঙ্গনটা রোখা যেত!মেনে নিত না হয় আরো কিছু ।কিন্তু রূপা? ওকে কেন ছিনিয়ে নিল শ্রাবন্তী? রুপা তো সৈকতের চোখের মনি ছিল, কি দোষ ছিল মেয়েটার?
ফ্রেশ হয়ে একটা মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে নিল সৈকত ।মা-বাবার ছবিতে ফুল দিয়ে প্রণামটা সেরে, আবার সে সব খুলে ফেলে অফিসের জামাকাপড় পড়তে হবে। কাজের মেয়েটা জলখাবার বানিয়ে দেয় এসময়। রান্নাঘরে তারই ঠুংঠাং শব্দ।
প্রতিবারই নতুন এক একটা ভাবনা এসে ভিড় করে মা-বাবার ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালে। এবারও সেই একই। মা যেন কি বলতে চাইছেন, বাবা যেন মৃদু হেসে আশীর্বাদ করছেন।‘ কি বলছ মা?’, কান পেতে শুনতে চাইল সৈকত ।প্রণাম করে মাথাটা তুলতেই স্পষ্ট শুনল, মা বলছেন ‘বাবা, এই নে, পায়েসটুকু খেয়ে নে। আজ যে তোর জন্মদিন।‘ চোখটা ভিজে গেল সৈকতের। মা? পায়েস ?কোথা থেকে আসবে? সব শেষ হয়ে গেছে।
 কিন্তু অদ্ভুতভাবে সৈকতের নাকে তখনই ভেসে আসতে লাগল পায়েসের গন্ধ। কোথা থেকে আসছে ?কি ব্যাপার? পিছন ঘুরতেই চমক। একহাতে পায়েসের বাটি আর অন্য হাতে প্রসাদী ফুল-মিষ্টি প্লেটে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রূপা। ‘একি তুই ? কখন এলি ?’ সৈকত অবাক। ‘এগুলো কি ?’ রুপা খিলখিল করে হেসে বলল ‘হ্যাপি বার্থডে বাবা। এই নাও,তোমার জন্য মা পাঠিয়ে দিয়েছে।‘ মা ? আরো একরাশ বিস্ময়। শ্রাবন্তী এখনো মনে রেখেছে ?
মেয়েকে আদর করে, ওর হাত ধরে আবার মা-বাবার ছবিটার কাছে গেল সৈকত । মার মুখে তখন যেন এক চিলতে হাসি লেগে রয়েছে,বাবারও চোখ থেকে যেন একরাশ খুশি ঝরে পড়ছে। পাশে তাকাতে, সেই একই হাসিটা সৈকত দেখতে পেল রুপার মুখেও ।
            -------------------------------------------------



       💢 হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়🔸মালঞ্চ,দুর্গাপুর🔸 



🔴 জলের আয়নায় রেখেছি ধ্বনিময় বৃষ্টিপাত
হলুদ ঘাঘরা থেকে লেসকাটা ঝালর
চেনা অচেনা অনেক সহজ কামিনী ফুলের গন্ধ
স্তব্ধতা থেকে উঠে আসা মাকড়সার জাল
ধীরে ধীরে সরে যায় লেজবিহীন টিকটিকি
আজ চিনতে পেরেছ কি এমন নিপুণ উপহার
এখন বুঝি নি:স্বতা তোমার ও সম্বল
মনে আছে নিশ্চয় একদিন তুমিই 
স্তব্ধতার কথা বলতে আর আমি কোলাহল
জুই গাছগুলির কেপে ওঠার কথা বলতে
আমি কাঠটগরের চুইয়ে পড়া কান্নার
ঝগড়াঝাটি,মতানৈক্য গুলি কথা শুরু করেছে আবার, এখনো কৃপণতা মহিয়সী?
কেন এত ধ্বংসের দিকে যাওয়া
জেনো,একদিন ঠিক পাতাঝরানোর শেষ হবে
বাথটবে জলপরীরা নাচবে
এই শবরীর অপেক্ষাও শেষ হবে
ঠাকুরভাসান কুয়াশা জন্ম শেষ হবে
রাতের আকাশে উঠবে কোজাগরী চাঁদ
এই পরাভব এই গ্লানি মুছে ফুটে উঠবে
পার্থিব বিজ্ঞাপন...

  ✒️ আবদুস সালাম🔹রঘুনাথগঞ্জ,মুর্শিদাবাদ🔹


🔰 নীরব স্রোতে ঢাকা পড়ছে আমাদের অস্তিত্ব,আমাদের ইতিহাস
মুখোশ পড়ে নিয়েছি;অতএব
ত্রিকাল দর্শনের কথা বলতে দ্বিধা নেই
ক্ষুধার তাড়নায় চোখে সর্ষেফুল দেখি
সময়ের চোখে আমরা সব খ‍্যাপা বাউল
নীরব আস্ফালন গুলো পড়ে আছে সন্ত্রাসের পাড়ায়
এখন গৃহবন্দীই ভরসা
পাওনাদার,বাড়ি ভাড়া,কাজের মাসী সব উৎপাত বন্ধ
পায়ের নীচে মাটি নাই
কাজকর্ম উঠেছে শিকেয়
বেগবান নদীতে এখন পড়েছে চড়া
মন্দির মসজিদ এখন বন্ধ
সাধুর দল ব‍্যস্ত গোমূত্র বিতরণে
মৌলভী ব‍্যস্ত ঝাড়ফুঁক নিয়ে
নারী স্রোতে ভিজে যায় কোলাহল
ভারি হয়ে আসে সংসার
ভরসা কখন যে  বরষা হয়ে গেছে কে জানে



               📚 সুজিত রেজ🔹চুঁচুড়া , হুগলি🔹


🔴 রুদ্ররৌদ্র পিঠ সেঁকে দেয়                                                   ফুটিফাটা কাছিমখোল,
  হাতের যশে আসছে ভেসে
               অসময়ে মাদলবোল ।

সাঁওতালি নাচ সঙ্গে দোসর
              কোঁড়া কালো হিম মেঝেন ,
জলদেবতা জ্বালিয়ে দিল
              জলের ভেতর নীল ওভেন ।

বনপলাশি  বনের পিসি 
                পিরিতচাষি দরজা হাট ,
কাঁপছে পিলার কাকতাড়ুয়ার
                সোনার তরী খুঁজছে ঘাট।

শরীর জুড়ে সা-রে-গা-মা-র 
                সুর তুলে যেই চলে গেলে,
তোমাকে আমার পড়বে মনে
                 যখন উঠব মতিঝিলে ।


              𒀯 শাশ্বতী চক্রবর্তী🔸ডানকুনি, হুগলি🔸



🔴 শত শত ক্ষত জমতে জমতে,
আজ সিলিং টাও ছাপিয়ে গেছে,
কংক্রিটের ছাদ ভেদ করে আকাশ
ছুঁই ছুঁই,শীতের শুষ্কতা ক্রমশ গ্রাস
করে নিয়েছে সরল মনের ভাষা।
বোবা মন আজ কাঁদতে ভুলে গেছে।
সমস্ত দরজায় আজ তালা,
চাবি খুঁজে নিয়েছে তার অন্য ঠিকানা।
অপেক্ষা শুধু সেই বসন্তের;
ফাগুন হাওয়া আর পলাশের।


         🔴 অমিত দেশমুখ🔹দক্ষিণ ২৪ পরগণা🔹



◥◤ অচেনা মানুষ যদি ভালবাসতে চায়?
ভালোবাসা দেবো।

অচেনা মানুষ যদি ফুল ভালোবাসে?
ফুল গাছ এনে দেবো ।

অচেনা মানুষ যদি সঙ্গ চায়?মুহূর্ত চায়?
সঙ্গ দেবো। ভালোবাসা দেবো।

অচেনা মানুষ যদি পুব দিকে গেলে রেগে যায় ?
পুব দিকেই যাবো।


       🔰 চন্দন কুমার  কুণ্ডু🔹তেঁতুলমুড়ি, বাঁকুড়া🔹


🔵 রোদে,গরমে আর অনাহারে বাচ্চাটাও কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে মায়ের দুটো পা বড় বড় ফোসকায় ফুলে উঠেছিল। খাবার ফুরায়,জল ফুরায়, রাস্তা ফুরায় না। দিন শেষ হয়,রাত পার হয় আশা ফুরায় না। পৌঁছাতেই হবে গন্তব্যে। এক হাতে বস্তা অন্যহাতে বাচ্চাটার হাত;দাবানলের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া হরিণীর মত। বাচ্চাটাও কাঁদতে ভুলে গেল মাকে দেখে;ভুলে গেল মায়ের বুকের দুধ খেতে। ঠিক সময় মাকে পৌঁছাতে হবে গন্তব্যস্থলে।

কিন্তু হেঁটে তো পৌঁছান যাবে না। সময় যে নেই। খবর পেল শ্রমিক স্পেশাল চালু হয়েছে। যা দ্রুত পৌঁছে দেবে গন্তব্যে। মা ছেলের হাত ধরে চলে এল স্টেশনে। ট্রেন এল না। সময় শেষ হল। মা পৌঁছে গেল গন্তব্যে,ছেলে পড়ে রইল। মায়ের মুখের ঢাকাটা সরিয়ে দিয়ে দুনিয়াকে মায়ের গন্তব্যে পৌঁছানোর সংবাদ জানিয়ে দিল সে ।
             -----------------------------------------------

              আশরাফুল মণ্ডল🔸দুর্গাপুর🔸





যা হচ্ছে ভালো হচ্ছে না
বলে ফেলি যদি
অদৃশ্যে কার দাঁত কিড়মিড় শুনি
আমি ভয়ে ঘেমে নেয়ে-
আরাধ্য দেবতার কাছে হাতজোড় করে বসি
অন্য কোনো ভক্তের স্তুতিতে দেবতা
হয়তো আবেশে চোখ বুজে থাকেন

আমি খতম হয়ে যেতে পারি।



     💠 বিভাসকান্তি মণ্ডল🔸কাশীপুর,পুরুলিয়া🔸



🔴 নির্জনতার ভাষা জানো বলেই
তোমার দেরাজ ভরে আছে জীবনের গানে
নির্জনতার ভাষা জানো বলেই
তোমার উঠোনে সন্ধ্যা নামে সিঁদুর ছড়িয়ে
নির্জনতার ভাষা জানো বলেই
তোমার বন ভরে উঠে সবুজে ফুলে পল্লবে
নির্জনতার ভাষা জানো বলেই
তোমার ভরা কোটাল স্রোত মুখর হয়ে আছে

নির্জনতার ভাষা জানলে
                        বিবমিষা জাগে না
                          সূর্য ডোবে না
                         বাতি নেভে না
                         রাত তামস হয় না

নির্জনতার ভাষা জানলে
                       ভূমি উর্বর হয়
                       বান ডাকে মধ্য রাতে
                       কুয়াশায় ভরে ক্ষেত
                       ফসলের গানে ভরে ধরাতল



            🔴 সৌরভ বর্ধন🔹শান্তিপুর, নদিয়া🔹



🔰 দুর্দান্ত সব ধ্বনি প্রবেশ করছে কানে
অথচ আমি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না।
শ্রবণের অতীত হয়ে সেই গান
কোটি কোটি কম্পাঙ্কের চেতনায় ভেঙে যাচ্ছে।
আমার চেয়েও পুরনো একটা গাছের কোটরে
বেয়ে যাচ্ছে একটা পূর্ণাঙ্গ গোসাপ...

ক্রমে ক্রমে
পীত হরিৎ নীলাভ আলোকে আমার ঘর
যেন একের পর এক মহাসূর্যকে পেরিয়ে যাচ্ছে।
ক্লান্ত হয়ে আসছে চোখ
অবসন্ন প্রাণবায়ু পারলে ধুলোদের বালি হয়ে যায়
অচেতন পড়ে থাকে সাগরতীরে,অনন্তের ভারে অসহ্য 
আমি খুঁজে ফিরি আমারই ঘরের শেষতম বিন্দু...

দেখি একটা ঘুঘুপাখি এই সমস্ত রাতটুকু শুষে নিয়ে
হেঁটে যাচ্ছে ভাটার দিকে, চোখ বন্ধ করে।





        📚 পরেশ নাথ কোনার🔸নেতাজী সুভাষপল্লী, দুর্গাপুর🔸



🔵 উঁচু প্রাচীর ভাঙতে হবে
আয়রে তোরা শাবল নিয়ে,
আর কতকাল থাকবি পড়ে
অন্ধকারে হত্যে দিয়ে ।
ওপারে তে আছে যারা,আছে
তাদের খোলা আকাশ মুক্ত বায়ু,
তোরা মিছে আছিস পড়ে অন্ধকারে
ক্ষয় করছিস পরমায়ু ।
তোরা আছিস মাটির কাছে
মাটি হলো তোদের মা,
তোরা গায়ে মাখিস মাটি
মাটি তোদের সুদামা ।
ভাঙতে গেলে জাগতে হবে
আর কতকাল থাকবি শুয়ে,
নইলে ঘানি টানতে হবে
অদৃষ্টের সেই দোহাই দিয়ে।
ছিঁড়তে হবে বাধা বাঁধন
মাখতে হবে নূতন আলো,
দেখবি তখন রক্ষী যারা
রব তুলবে গেল গেল ।
প্রাচীর যদি ভাঙতে চাস
পরতে হবে নূতন সাজ,
সৈনিক তো তুই নিজেই এখন
ভাঙতে হবে স্থবির রাজ । 



                 🔴 দেবনাথ সুকান্ত 🔸দুর্গাপুর🔸



🔰 এই এক উচ্ছ্বাসে ডুবে যাব
কখনওবা সারাৎসারে গলিত মোমের কাছে হাত পেতে
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে গলা পর্যন্ত ঋণে ডুবে

উঠোন পেরনো দায়,দরজার শেকলে লেগে যে কঠিন অসুখ 
ছাদের কিনারে দেখি সে ক্লান্তি জন্ম নিচ্ছে

এস জন্ম
এস জন্মাবধি প্রেমের নামে পুড়ে যাওয়া স্মৃতি ফলক
মাটির গভীরে কোথাও সমাধির গায়ে লেখা আছে
‘অনন্ত প্রতীক্ষার পর’
তাকে ফের জন্মদি সমুদ্র সৈকতে

জল আর মাটির সীমারেখায়
এক দুখী রাজকন্যা আর এক উদাস সন্ন্যাসিনী থাকে
রোজ রাতে যেটুকু স্বপ্ন আসে তার রং
জেসাসের কটি থেকে খসে পড়া টুকরো কাপড়ে মেশে
আমি কর্মযোগী  
হাত থেকে পড়ে যাওয়া ফাইলে বা স্প্যানারের গায়ে
মূল্যহীন ঘাম লেগে থাকে

স্থূল 
স্থূল বড় চাহিদা অন্তহীন


                  🔰 প্রনব রুদ্র🔹বিবেকানন্দ পল্লী, মালদা🔹


🍂 তাকানো যেত নদীর জলের স্নানদৃশ্যে
যা খুশি ভেবে অধিক হাঁটতে গিয়ে
গরম অন্তর্বাসের ঘষাতে ঊরুছাল উঠে যায়
একটা গোপন তিল দেখার আনন্দে
নিতম্বে দোল খায় পাখির বাসা
সাপের চেঁরা জিভের ফাঁকে
ডুবে যায় কত পৌরুষ শ্বাস।

গোপনে বৌদির স্বামী হলে
তার সন্তান কাকা বা মামা ডাকে
পরের জমিতে ভাগচাষে সঠিক ফসল মেলে না
কর্ষণকালে সাময়িক মালিক হওয়া মাত্র।

একটা শুদ্ধদৃশ্যের লোভে
গমক্ষেতের পাশে ব'সে থাকা যায়
হাওয়ার দোল খাওয়া গাম্ভীর্য দেখে
শিশির সকাল শরৎকাল বুনে খায়।

কে জানে ময়ূর পেখম মেলে
সৌন্দর্য দেখাতে না রাগের বহিঃপ্রকাশে
সুনামির ফুলে ওঠা জলে
সাগর নিজেকে ধরে রাখবে কোন সাহসে ?
                                     
🔹গল্প:


              ✒️ ঋভু চট্টোপাধ্যায়🔸দুর্গাপুর🔸



🔰-বাবা, তুমি কি পার্টি কর ?
সুকান্তের কথাগুলো বাবার কানে যেতেই বিছানায় শুয়ে শুয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করে,‘কেন’রে আমার পার্টি করাতে কি হবে?’ সুকান্ত এই মাত্র বাইরে থেকে ঘরে ফিরল।বৈশাখের গরম, এর মধ্যেই বাইরে লু বইছে।চোখ মুখে রুমাল বাঁধা থাকলেও সারাটা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।কোন রকমে পা’দুটো ধুয়েই বাবার কাছে গেল।ওষুধের পাওয়ার এই সময় কমে যাওয়ার জন্য বাবার শরীরও শিথিল হয়ে যায়।প্রতিদিনই এই সময়টাতে শুয়ে থাকে, মা টুকটাক যতটা পারে হাতে হাতে এগিয়ে দেয়।এর বেশি কিছু করতে পারে না। মাকেও সকাল থেকে উঠে একা একা সব কাজ করতে হয়, বাবাকে দুপুর একটার মধ্যে খাবার দিতে হয়, তারপর ওষুধ দেওয়া। ওষুধ খাওয়ার  ঘন্টা খানেক পরে ওষুধ কাজ করতে আরম্ভ করে, তাও প্রতিদিন করে না।তখন কথা জড়িয়ে যায়।সেদিনও জড়ানো গলাতেই উত্তর দেয়,‘আমি তো সেই অর্থে কোন পার্টি করিনি, তবে চাকরি করতে একটা ইউনিয়নে নাম লেখাতে হয় এই পর্যন্ত।’
–কোন ইউনিয়ন, ডান না বাম?
-মাঝামাঝি।
-হবে না, বাবা।
শেষের কথাগুলোতে সুকান্তের জমে থাকা শ্বাস জড়িয়ে গেল।কিছুক্ষণ চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলে, ‘চেনা জানা কেউ নেই?’
-কি করবি? অত ডান, বাম এই সব জিজ্ঞেস করছিস কেন?

                                             ২

কথাগুলো একটাও খারাপ বলেনি।কিন্তু শুনে সুকান্তের খুব কষ্ট হয়।সত্যিই তো এম.আই.এসের এই অল্প টাকা, এতে বাবার ওষুধ, সংসার খরচ চলবে কি করে।মা’কে কিছু বললেই এখন রেগে যায়, কিন্তু এতে যে কিছু করবার নেই, না পারে নিজে বুঝতে, না পারে অন্যকে বোঝাতে। কানের কাছে টিক টিক না করলেও মায়ের কষ্টটা বুঝতে পারে।ভাই রেগুলার কলেজ ছেড়ে ওপেনে ভর্তি হয়ে পড়া আরম্ভ করেছে, বলে, ‘যদি পার্ট টাইম কিছু কাজ  করতে পারি।’
–পার্টটাইম কাজ! সেও তো পাওয়া বেশ কঠিন।
সুকান্ত এম.এ রেজাল্ট বেরোনোর পর এক দিনও অপেক্ষা করেনি।প্রায় সব স্কুলেই বায়োডেটা জমা দিয়েছে।সেই সঙ্গে যে সব স্কুলের অফিসে দেখা করতে দিয়েছে তাদের প্রত্যেক স্কুলেই প্রিন্সিপাল  বা হেডমাস্টারের সাথে কথাও বলেছে।
সুকান্ত কয়েকটা টিউসন করে, ভাইকেও একটা কম্পিউটার সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছে।নিজেও সেই সেন্টারে স্পোকেন ইংলিশের ক্লাস করায়।সব ঠিক আছে কিন্তু খরচ তো দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।তার মাঝে প্রতিমাসে বাবার ডাক্তার ওষুধ আর টেস্টেই তো তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা এক্কেবারে বাঁধা।
কারখানা বন্ধ, সুকান্তরা যদি কিছু চেয়ে বসে এই ভয়ে দুপক্ষের আত্মীয় স্বজনরাও সব যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিয়েছে।এম.এ পড়বার সময় রিমা পাশে ছিল, খুব হেল্প করেছে।এর থেকে বেশি কিছু তো আর বলা যায় নি। রিমা বললে সুকান্তের কাছে সেই সময় কোন উত্তর ছিল না।শেষ যেদিন দেখা হয় বলে, ‘চল না দুজনা একসাথে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার জন্যে খাটি।’
একসাথে খাটা! বেশ ভালো, সপ্তাহে অন্তত কিছুটা সময় রিমার সাথে থাকা যাবে, কথা বলা যাবে। তারপরেই মাথায় চাপ লাগে। এটা সম্ভব নয়। রিমার বাবা তখনও চাকরি করেন।কিন্তু সুকান্ত কিভাবে সব কিছু ছেড়ে পরীক্ষার জন্য খাটবে?
খেতে বসে একদিন মা বলে, ‘বাবু, আশীষকে একবার বল না, যদি মডেল স্কুলটাতে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যায়, শুনেছি ওর নাকি ওখানে ভালো হাত আছে,স্কুলটাও বেশ ভালো, ভালো পেমেন্ট দেয়।একদিন ঘোষালদার বৌ বলছিল, ওর ছোট মেয়েটা ওখানে তো কাজ করে।’
আশীষদার কম্পিউটার সেন্টারেই সুকান্ত স্পোকেন শেখায়, ভাইও ঐ সেন্টারে শেখে। মডেল স্কুলের কমিটির মেম্বারদের প্রত্যেকের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক।
আশীষদাকে বলতেই দাদা কিছু সময় চুপ থেকে বলে,‘এক কাজ কর, একটা বায়োডেটা দিয়ে এস, আমি কথা বলে রাখব, তবে ক্যাশপাতি কিছু লাগবে।’
-ক্যাশপাতি! তাও কত?
-কথা বলি,তারপর তোমাকে বলব।
বাড়িতে কথাগুলো বলতে বাবার থেকে মা বেশি আনন্দ পায়, ‘ভাইটাও একটু শান্তিতে পড়তে পারবে, রাত জেগে জেগে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’
বাবা কিছু না বললেও বোঝা যায় আনন্দ পেয়েছে।এর মাঝে অবশ্য সুকান্ত আরোও কয়েকটা স্কুল ঘুরে ঘুরে বায়োডেটা দিয়ে এসেছে।কয়েকটা জায়গায় ইন্টারভিউও দিয়েছে।একটা স্কুল জয়েন করতেও বলেছে।তবে পেমেন্টটা এক্কেবারে খুব কম।সেজন্যেই একটু দোনোমোনো করছে।বাবা জয়েন করবার কথা বললেও মা বারণ করে বলে, ‘না’রে আগে আশীষদা কি বলে দেখ, তারপর সিদ্ধান্ত নিবি।’ কয়েকদিন পরেই আশীষদা ডেকে পাঠিয়ে বলে, ‘শোনো, এমনিতে সব কিছুই হয়ে গেছে, তবে একটা চিঠির প্রয়োজন।’
-চিঠি! কার চিঠি?
-কার মানে কোন বড় নেতার।
-বড় নেতা? কাদের ?
–কাদের বোঝো না, যারা আছে।
 সুকান্ত বাড়িতে এসে কাউকে কিছু না বললেও কয়েকদিন ধরে যুদ্ধ আরম্ভ করে, কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে সেরকম ভাবে কোনদিন ইউনিয়ন অফিসে যায় নি, ইউনিয়ন মানে কয়েক বছর কলেজ ফেস্টে একটু আধটু অনুষ্ঠান, বা ইন্টার কলেজ কম্পিটিসনে যাওয়া।শহরেও কোন দিন কোন মিটিং মিছিলে যায় নি।তবে টুকটাক কবিতা লেখার সূত্রে একটা লেখক সংগঠনে মাঝে মাঝে যায়।তাও সৌম্যদার পাল্লায় পড়ে।একদিন বিকালে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা নদীর তীরে বসে বসে সৌম্যদার সংগঠনে নাম লেখানোর কথা বলে।চমকে ওঠে সুকান্ত।কবিতা লিখতে গেলেও সংগঠন!এতো মহা জ্বালা। কথাগুলো সৌম্যদাকে বলতেই লেকচার আরম্ভ করে। সমাজ, শিক্ষা, ইত্যাদি।কয়েকদিন পরেই একটা সভাতে কবিতা পড়তে আমন্ত্রণ পায়, সেখানেই সুকমলদার সাথে আলাপ হয়।নেতা মানুষ, প্রথম আলাপেই ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি ঢাকা গালের ভিতর দিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কি পড়া হয়?’
সুকান্ত ‘কেমিস্ট্রি’ বলতেই ভ্রু কুঁচকায়।‘কেমিস্ট্রি আর কবিতা, দুটোই তো দুটো মেরু।’
-কিন্তু মাথা হাত একজনেরই।
-ভালো।
তারপরেই সৌম্যদার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বুঝলি কবিতা লিখতে গেলে পড়াশোনা দরকার।তোর মত অগাবগাদের কবিতা হবে না।’
কথাগুলো শুনতে শুনতে সুকান্তের ভালোই লাগছিল।তারপরেই যেখানে কবিতার অনুষ্ঠান হত, সেখানে ঠিক কবিতা পাঠ করতে ডাক পেত।শহরের অনেকগুলো পত্রিকাতে নিয়মিত লেখাও প্রকাশ পেতে লাগল। ভালো লাগলেও মাঝে মাঝেই চাকরি আর বাড়ির অবস্থাটা খোঁচা লাগত।পত্রিকা পৌঁছাতে প্রায়ই এর ওর বাড়ি যেতে লাগল, যোগাযোগ হতে লাগল সংগঠনের বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিদের সাথে।
আশীষদার কথা শুনে সব থেকে প্রথমে সুকমলদার কথাই মনে এল।পরের দিনই চলে গেল, সুকমলদাকে এর আগে বহুবার বাবা-মায়ের কথা, বাড়ির কথা, ভাইয়ের কথা বলেছে।সেদিনও সব কথা শুনে ভালোভাবেই বলে উঠল, ‘সব বুঝলাম, কিন্তু একটাই প্রশ্ন, তোমার বাবা কি ইউনিয়ন করতেন এটা না জানলে তো কিছু হবে না।’ বাড়ি ফিরে অনেক ভাবনা চিন্তার মধ্যেও সুকমলদার সাথে কিছুতেই বাবাকে যোগ করতে পারল না।মাঝের ইউনিয়নের অনেক ভোজবাজি, এখানে কেউ কারোর জন্য বিনা কারণে একটা শব্দও লিখে দেবে না।
 সৌম্যদার কথাও মনে পড়ল।লেখক সংগঠনের পাশে মাদার সংগঠনেও ভালো যাতায়াত। প্রায় বিভিন্ন মিছিল মিটিং এ যায়। কিন্তু সৌম্যদাকে বলতেই সব শুনে  অসীমদার সাথে দেখা করতে বলল। অসীমদা আবার লেখক সংগঠনের পাশে শিক্ষক সংগঠনের নেতা। সুকান্তকে বহুবার বহুজনের বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছে দিতে পাঠিয়েছে, কিন্তু কোন বারেই এক পয়সা বাস ভাড়া দেয়নি।
সৌম্যদার মুখে কথাগুলে শুনে বলে উঠল, ‘অসীমদাকে বলে কিছু হবে?’ পরেরদিনেই দাদাকে ফোন করতেই সন্ধেবেলা তাদের পাড়ার পার্টি অফিসে আসতে বললেন।সুকান্ত আর কিছু ভাবে নি।যে পার্টি অফিসের কোন দিন চৌকাঠ মারায় নি সেখানেই কয়েকটা সন্ধে কাটালেও অসীমদাকে পেল না।অথচ বাড়ি ফিরে  ফোন করতেই প্রতিবারেই বলে উঠলেন, ‘ আরে বোলো না, এমন একটা কাজে আটকে গেছিলাম, বেরতে পারলাম না।তুমি কষ্ট করে আরেকবার কাল এসো।’ মা  সব শুনে বলে, ‘কালকে কাল শাপে খেলেই মুশকিল। ছেড়ে দে, আর যেতে হবে না।’ সুকান্তের খারাপ লাগলেও কিছু করবার নেই।
  কয়েকটা দিন পরে এক সন্ধের দিকে আশীষদার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,‘দাদা, চাকরিটা কি চিঠি ছাড়া হবে না?’
আশীষদা কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকবার পরে জিজ্ঞেস করে, ‘চিঠি পেলে না?’
সুকান্তের শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, কি উত্তর দেবে? যে সৌম্যদারা কয়েকমাস আগে পর্যন্ত সংগঠন, সমাজ, সাহিত্য, করে ঝাঁপাচ্ছিল, বলেছিল কোন  সমস্যায় পড়লে অবশ্যই আসবে। কিন্তু বহুবার তাদের বাড়ি, পার্টি অফিস গেলেও, একটা চিঠির ব্যবস্থা করতে পারল না?
-না’গো হল না।
–ঠিক আছে,আমি দেখব তবে টাকা হয়ত একটু বেশি লাগবে।
বাড়ি ঢুকলেই মায়ের মুখটা প্রতিদিনই আরো ছোট হতে আরম্ভ হয়ে যায়।সুকান্তের রাতে ভালো করে ঘুম হয় না। মাঝরাতে চমকে ওঠে,চারদিকে অন্ধকার, তারমধ্যে হাজার হাজার কঙ্কাল সঙ্গে কত রকেমর অদ্ভুতুড়ে সব মূর্তি। একসাথে শরীরের থেকে রক্ত মেদ মাংস সব খাবলে খুবলে টেনে নিচ্ছে।মৃত্যু কি এর থেকেও কঠিন?
দিন দুই পরে সন্ধের সময় সুকান্ত টিউসন পড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলে মা কথায় কথায় বলে, ‘বাবুরে যদি স্কুলে কিছু না হয় তবে অন্য কোন জায়গায় একটা চাকরির ব্যবস্থা কর।’
–না, মা অন্য কোন চাকরি করতে পারব না, স্কুলেই ভালো,সময় পাবো, বাবার ওষুধ, ডাক্তার সব করব কিভাবে?
-কিন্তু এভাবে আর কত দিন হবে বল?
এবার সুকান্ত কোন উত্তর দিতে পারে না।আরেকটা স্কুলে ইন্টারভিউ হয়ে গেছে,শুধু জয়েনিংটা পরে জানিয়ে দেবে বলেছে।হেডমিস খুব ভালো, পেমেন্টটা কম, তবে বলেছে টিউসন পাওয়া যাবে,ফোন নম্বরটা আছে,ফোন করতে হবে। সামনের মাসে বাবার ইউ.এস.জি আছে।নার্ভের রোগের ওষুধে লিভারের ওপরও চাপ পড়ে।সরকারী হাসপাতালে বাবা যেতে পারবে না,অপেক্ষার লাইনে দাঁড়ানোর জন্যেও শান্তির প্রয়োজন।তার আগে আশীষদাকে শেষবারের মত একবার জিজ্ঞেস করতে হবে।
নতুন স্কুলটা এমনিতে ভালো।পেমেন্ট কম হলেও স্টুডেন্ট গুলো ভালো।কয়েকদিন পড়ানোর পরেই ক্লাস টেনের একটা টিউসন ব্যাচও আরম্ভ  হয়।স্কুলের সবাই খুব খুশি।শুধু মা মাঝে মাঝেই বলে, ‘বাবু, পেমেন্টটা খুব কম।’ সুকান্ত উত্তর দেয় না।মডেল স্কুলের একজনের কাছ থেকে জানতে পেরেছে রিক্রুটমেন্টের সব প্রসেস হয়ে অ্যাপয়েনমেন্ট লেটারও টাইপ হয়ে গেছিল। শুনে কষ্ট হয় নি,দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছিল।সঙ্গে সঙ্গে আশীষদার কাছে গিয়ে সব জিজ্ঞেস করতেই আশীষদা বলে, ‘আমি সব জানি, কিন্তু আমারও তো ব্যবসা আছে, আমি কারোর নাম করতে পারব না।তোমার চাকরিটা হলে আমার ভালো লাগত, তবে দেখা যাক।’
সুকান্ত এই কথাগুলো  বাড়ির কাউকে আর বলে নি।নতুন স্কুলের আসা-যাওয়ার রাস্তায় মডেল স্কুলের পাশ দিয়েই যেতে হয়। অনিচ্ছা সত্বেও চোখ চলে যায়।স্যার ম্যাডাম আরো অনেক ছাত্র ছাত্রির ভিড়।পাশ কাটিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে বেশ অসুবিধা হয়, অথচ সবকিছু কত স্বাভাবিক।
স্কুলে ঢোকার কয়েকমাস পরেই সৌম্যদা ফোন করে, ‘কোথায় আছো?একবার কমিউনিটি সেন্টারে এস, একটা প্রতিবাদ সভা আছে,তুমি তো অনেকদিন কোন সভাতেই আসছ না।’
সুকান্ত নিজের থেকে কোন প্রশ্ন করে না,উত্তর দেয় শুধু ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’।সৌম্যদা ফোন কাটতেই কন্টাক্টে গিয়ে দুটো নাম ডিলিট করে দেয়। বাইরে গুমোট গরম থাকলেও  সুকান্তের এতক্ষণে নিজেকে একটু হালকা লাগে।
              ---------------------------------------------


          📚 রমলা মুখার্জী🔸বৈঁচী, হুগলী🔸



🔘 একটা বড় ঝড় নামুক পৃথিবীর বুকে-
উড়ে যাক নাশকতা,সন্ত্রাস ।
হানাহানির হাজিরা খাতায়
   অনুপস্থিতির নীরবতায়
    জীবন-মৃত জীব-কূল
        শান্তিতে বাঁচুক।
       লাল রক্তের বদলে
       সবুজ বনের ছায়া নামুক...
প্রচন্ড বেগে একটা প্রলয় আসুক
   ওলট-পালট করে দিক সব
       পৃথিবীর জ্বর কমে 
         শীতলতা ঘিরুক...
     মহাকাশের ময়লা যত
         হয়ে যাক সাফ।
ওজনের সব ছ্যাঁদা রিপু হয়ে
      লুপ্ত-প্রায় জীবেদের 
            জীবন জাগাক।
চরম পরিব্যক্তি একটা ঘটুক...
     মানুষের জীবন থেকে 
            লোভ যাক বাদ ।
          নতুন সে প্রজাতি 
     পৃথিবীর সব কান্না মুছিয়ে
       দ্বিধা,দ্বন্দ্ব,ভয় ঘুচিয়ে
      ভালবাসার অক্সিজেনে
      প্রতিটা ফুসফুস ভরাক ।
নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • ধোঁয়াশা অথবা ছেলেবেলার ডাকনাম ~ সুকান্ত মণ্ডলের কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

টেলিফোন ~ ডা: অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

টেলিফোন ~ ডা: অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates