
ঘুম-ঘোর
রর্বাট স্পিটজার নামে একজন আমেরিকান ডাক্তারবাবু প্রথম ডিস্থাইমিয়া (Dysthimia) শব্দটি ব্যবহার করেন; একে persistent Depressive Disorder(POD)বলা হয়।এছাড়াও অবসাদ বা বিষণ্ণতার হাজারো স্তর আছে,রকমভেদে যারা ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়,যা সর্বদা ভাষায় প্রকাশে কিছুটা অসম্ভবও বৈকি।বস্তুত, বিষণ্ণতা, অবসাদ,মন খারাপ ইত্যাদি গুলি এক ভয়ংকর চক্রব্যূহের মত এবং অনুভূতির এক মারণযজ্ঞ,যেখানে দৈনন্দিন জীবনযাপন এর সুখ-শান্তির আহূতি দেওয়াইই রীতি।এককথায় এই সমস্ত মানসিক কোণ,বিভিন্ন নিরাকার এবং আত্মিক জটিল জ্যামিতি এঁকে দিয়ে যায় কঠিন সম্পাদ্যের মত,যার সমাধানকৃত উপসংহার পাওয়া বড় কঠিন।ঠিক কী হয় বিষন্নতা বা অবসাদে? এর সাথে ঘুমের কীই বা সম্পর্ক? এই জটিল অনুভূতি নিয়ে একপ্রকার যুগে যুগে জেরবার হয়ে এসেছে,দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন মন। বিষণ্ণতা ঠিক নির্দিষ্ট করে কোন কারণে আসে,কোন কারনেইবা আসে অবসাদ একথা বলা দুষ্কর।কোন একটি সাময়িক মানষিক আঘাত, পরিবর্তন বা ধাক্কায় বিষন্ন হতে পারে মন দীর্ঘমেয়াদি ভাবে; আবার দীর্ঘকালীন পুঞ্জিভূত উদ্বেগের গর্ভতলে তিলতিল করে জমা হতে পারে বিষন্নতা,মনখারাপের পোষাকে বা হয়তো,সম্পূর্ন অন্য অজানা অভূতপূর্ব কোন হেতু ডেকে আনতে পারে বিষন্নতা বা অবসাদ।দেহ যেমন ব্যাধিজনিত দুর্বলতা রোগ লক্ষণে সতর্ক করে,মনও একই ভাবে তার নিজস্ব সাংকেতিক ভাষায় নিরন্তর সজাগ করতেই চায়,বলতেই চায়,'তুমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছ,ফিরে এসো,এপথ অন্ধ গলির মত,সর্বগ্রাসী, যেও না যেও না,ফিরে এসো!'কিন্তু মনের গোপন কুটিরের অন্তস্থঃতল থেকে উৎসারিত ধ্বনি যে বেশির ভাগেরই ইন্দ্রিয়গোচর হয় না।পরিনামে অপার, অসীম এক শূন্যতা ছেয়ে যায় মন জুড়ে;চিকিৎসা বিজ্ঞান যাকে Depression বা Dysthymic Disorder,chronic Depression Obsessive Compulsive Disorder(OCD) বা হয়তো পর্যায় ফেরে অন্যকিছুও বলে।কিন্তু কার্যত এ হল,পর্যায়ক্রমিক ভাবে ভিতরে ভিতরে ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে যাওয়া ছাড়া বোধহয় আর কিছুই নয়।নির্দিষ্ট বিষয় ভিত্তিক কিছু অমূলক চিন্তা বা কিছু সূত্রবিহীন,নামগোত্রহীন চিন্তা সৃষ্টি করে গভীর উদ্বিগ্নতা, যা ধীরে ধীরে বা তার চেয়ে ধীরে বাসা বাঁধে মনের বিভিন্ন কোণায়।
অবসাদ বা বিষন্নতার অনুঘটক হল কিছু অমূলক বা অপ্রাকৃত ভয় বা উল্টোটি।এই ভয় যার জন্ম হয় অনিরাপত্তা থেকে।আবেগজাত নিরাপত্তাহীনতা,জীবিকা বিষয়ক নিরাপত্তাহীনতা,কর্ম বিষয়ক নিরাপত্তাহীনতার রসায়নগাঢ়ে প্রস্তুত হয় জটিল মানবিক ভীতি।যার পরিণামে নেমে আসে ভয়ংকরতম উৎকণ্ঠা, উদ্বিগ্নতা আরও অনেককিছু আর অনিদ্রা।অজস্র বিনিদ্র রজনী ছায়াপথের ভয়ানক অন্ধকার কৃষ্ণগহ্বরের মতই গোগ্রাসে গলাধঃকৃত করতেই চায় কোমল মনটিকে।মানুষ হেরে যেতে থাকে! নিজের সাথে নিজের এক অসম মল্লযুদ্ধে রক্তাক্ত হয়ে যায় মন।মন অবিরাম নিষ্কৃতি পেতে চায় এই টানাপোড়েন থেকে।এখান থেকেই জন্ম হয় Escapism বা পলায়ন প্রবৃত্তি।বর্তমান মুহূর্ত যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে মানুষের মন যখন ভয় আর উদ্বেগে ক্লান্তিকর ভাবে ভারি হয়ে ওঠে,তখন মৃত্যু হাতছানি দিতে থাকে অবিরত।শুনলে চমকে উঠতে হয়,THE LANCET নামক এক স্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল ২০১০ সালে একটি সমীক্ষা করেন,এবং সামনে আসে অতি মর্মান্তিক এক তথ্য, তা হল,সেই বছর ভারতে শুধুমাত্র আত্মহত্যাজনীত কারনে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ১৮০০০০ এর মত মানুষের এবং আরো মনে রাখতে হবে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যা করেন প্রায় ৮০০০০০০ এর মত মানুষ।খুবই যন্ত্রণাকর তথ্য এবং ক্রমবর্ধমান, একথা বলাই বাহুল্য নয় কি?
'অবসাদ নেশা করে যায় ঘুম ঘোর
অবসাদ জোরে ফেলে আসা ভুল ভুল স্মৃতি
অবসাদ করে অবিরাম বিব্রত
অবসাদ খোঁজে অসময়ে নিষ্কৃতি?'
এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে,বিষণ্ণতা, অবসাদ এগুলির সাথে ঘুমের কী বা সম্পর্ক! কার্যত বিষন্নতা যে অবসাদের আঁতুরঘরে লালিতপালিত করে মনের যে অসহ্য পরাজয়বোধ,তা বড়ই পলায়ন প্রবৃত্ত হয়।ক্লান্তিকর অনিদ্রাও ডেকে আনে ঘোর ভাব।চেতন আর অচেতন এর দোটানায় অচেতন জয়ী হতে থাকে।শুধু ঘুম,শুধু ঘুম,মন চিৎকার করতে থাকে,ঘুম দাও ঈশ্বর।অতিত,বর্তমান,ভুল,বেশি ভুল,কম ভুল,ভুলবোঝাবুঝি সমস্তটাই মনখারাপের বর্শা হয়ে বিদ্ধ করে চেতনকে,সে অচেতনের আড়ালে আশ্রয় পেতে চায়,তাই চায়,আপ্রান চায় ঘুম।কখনো অভিশাপ বা কখনো আশির্বাদ হয়ে দাওয়াই হয় স্লিপিং পিলস্! চমকে উঠতে হয়,যখন জানতে পারা যায়,প্রত্যেকদিন প্রতি দশলাখে প্রায় ২৫০০ এর মত মন বিষণ্ণতার স্বীকার হন।এও এক মহামারি, নিশ্চিত।



0 Comments