সোমা সাহার ছোটগল্প

অবসাদ

আজ চারমাস হয়ে গেল সুধাংশু বাবুর বড় ছেলে শৌর্য বাড়ি এসেছে।বহুবছর পর একটানা এভাবে ওর বাড়িতে থাকা,যদিও সেটা সম্ভব হয়েছে কোভিড ১৯ এর কারণে।সুধাংশু বাবুর দুই ছেলে।বড়োছেলে শৌর্য্য,আর ছোট ছেলে সৌম্য।শৌর্য একটা ইঞ্জনিয়ারিং কোম্পানীর উচ্চ পদস্থ কর্মচারী,মাস গেলে প্রায় ১.৫ লাখের কাছাকাছি পায়।সুধাংশু বাবু ব্যবসাদার মানুষ।দুইছেলেকে বড়ো করতে একসময় ভীষণ রকমের কষ্ট করতে হয়েছে ।ব্যবসা খুব একটা ভালো চলত না।মুদিখানার দোকান ছিল ওনার,এখন তার সাথে টুকটাক সুদের কারবারও করেন। বড়ো ছেলের চাকরী হওয়ার পর উনি অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন।এখন মোটামুটির ওপর সৌম্যর পড়াশোনার সবটাই শৌর্য দেখে।তার পাশে সুধাংশু বাবুর বৌ রত্না দেবী ক্যান্সারের রুগি,কেমো নিতে হয়,তার সাথে সুগার প্রেসারও আছে।সবমিলিয়ে ডাক্তার ওনাকে সাবধানে রাখতে বলেছেন।রত্নাদেবী প্রায় দিনই সুধাংশুবাবুর কাছে শৌর্যর বিয়ে নিয়ে কথা তোলেন।মরার আগে বড়োছেলের বৌকে আশীর্বাদটা করে যেতে চান।অনেক বোঝানোর পর ইদানিং শৌর্য বিয়ে নিয়ে আর আপত্তি তোলে না।হয়তো মায়ের ইচ্ছাটা বুঝতে পারে।

সকাল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে,পথ ঘাট সব ভিজে।সুধাংশুবাবু সকাল সকাল বাজারে গেলেন।সময় বেঁধে দিয়েছে পৌরসভা থেকে।ভোর চারটে থেকে সকাল দশটার মধ্যে বাজার করে নিতে হবে।তারপর পুরো দিন দোকানপাট বন্ধ।খোলা থাকবে  কিছু খাবারের দোকান।এদিকে রত্না দেবী ঘরের কাজ সেরে সকালর জল খাবারে কী করা যায় ভাবছেন। লক্ষ্মী সব কাজই করে দিয়ে যায়,শুধু রান্নাটা রত্নাদেবী নিজের হাতে করেন।কষ্ট হয়,তবুও তিনি নিজের হাতে স্বামী পুত্রদের খাওয়াতে চান।
হঠাৎ রত্নাদেবী খেয়াল করলেন,আজ অনেকবেলা হয়ে গেল তবুও শৌর্য এখনও ঘুম থেকে উঠে আসেনি।পরে ভাবলেন হয়তো বৃষ্টির দিন তাই ঘুমটা জোরালো হয়েছে।ওনার মনে পড়ল ওনার ছোট বেলার কথা।বৃষ্টির দিনে কিছুতেই ঘুম ভাঙতে চায়ত না,আর ওনার মা তাড়াতাড়ি তুলে দিতেন পড়ার জন্য।অনেকবছর আগের কথা,তখন মেয়েদের পড়াশোনার তেমন চল ছিলনা,তবু সেইসময়ে রত্নাদেবী অনেকদূর পড়েছিলেন।সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। তবে ভাগ্যক্রমে আজ এইরকম অবস্থায়।সুধাংশুবাবুর মা ওনাকে নিজে পছন্দ করে নিয়ে এসেছিলেন বাড়ির বৌ করে।দাবিদাওয়া ছিল না কোনো।মেয়ে সুন্দরী তার ওপর শিক্ষিত।এরকমই বা কজন পায়!তখন যদিও সুধাংশু বাবুদের অবস্থা বেশ ভালো ছিল।মা অর্থাৎ রত্নাদেবীর শ্বাশুরি মারা যাওয়ার পর ভায়ে ভায়ে সম্পত্তি নিয়ে মনোমালিন্য হওয়ায় আস্তে আস্তে সংসারে ভাঙন ধরে।তারপর সুধাংশু বাবু আলাদা ব্যবসা শুরু করেন আর ওনার ভাই আলাদা। পুজো পার্বণে কথাবার্তা হয়,তবে মনের টানটা তেমন নেই।
"এ হে হে!চটিতে সব কাদা লেগে গেছে গো!"
সুধাংশুবাবু বাজার থেকে ততক্ষণে ফিরেছেন।দুইহাতে দুটো ব্যাগ,ছাতাটা বগলে জায়গা পেয়েছে,আর চটিতে কাদা।
"কলতলায় রাখো,আমি পরে জল দিয়ে কচলে ধুয়ে দিচ্ছি,"
"তুমি করতে যাবে কেন?আমিই করে দিচ্ছি"
রত্বাদেবী আর কিছু বলেনা।বাজারের জিনিসগুলো বের করতে থাকে।সুধাংশু বাবু জিজ্ঞেস করে,"কই ছেলেরা কি ওঠেনি?"
রত্না দেবী বলেন,"বড়ো ছেলে ওঠেনি,ছোটটা অনলাইনে ক্লাস করছে ওপরের ঘরে"
সুধাংশুবাবুর ছোট ছেলে এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে।টিউশনের স্যাররা অনলাইনেই ক্লাস করান।
"আজ এখনও শৌর্যটা উঠল না কেন বলোতো!শরীরটা খারাপ টারাপ নয় তো!"
রত্না দেবী বলেন,"মনে হয় ঠান্ডা ঠান্ডা দিন তো তাই..."
"একটা দরকার ছিল গিন্নী"
"কী দরকার?".
" না মানে,বিমল, আমার বন্ধুটা এল আই সির এজেন্ট তো,তাই ধরেছে যদি একটা..."
"একে দিনসময় ভালো যাচ্ছে না,সব চাপ ছেলেটার ওপর,তারপরে তোমার আবার,যত্তসব কথা তোমার!"
সুধাংশুবাবুর কথায় রত্নাদেবী একটু রেগে যান।লকডাউন পরিস্থিতিতে ছেলেটা আজ প্রায় চারমাস বাড়িতে বসে। মাইনের হাফ কাটছে প্রতিমাসে।তারপরে সংসারের সব দায়িত্ব,মায়ের ঔষুধ সব খরচ।এতকিছুর পর কোনমুখে বলা যায় এল আই সির কথা!
        ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে দশটা।তখনও একনাগাড়ে  ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে।সৌম্য পড়া শেষ করে খেতে নেমেছে।রত্না দেবী দাদাকে ডাক পাঠাতে বলায় ও আবার ওপরে উঠে যায়।দরজা আটকানো ভিতর থেকে,যদিও আটকেই শোয়। বেশ কয়েকবার দরজায় টোকা মেরে আর "দাদা দাদা" করে ডাকার পর কোনো সাড়া না পেয়ে নীচে গিয়ে বলে"দাদা তো সাড়াই দিচ্ছে না,তুমি গিয়ে ডাকো"।
ভাই এর আওয়াজ শুনে শৌর্য উঠে আসে,তখনও চোখ মুখ ফুলে।ঘুমের কারণে নাকি অন্যকোনো!
        রত্নাদেবী ওদের খেতে দিয়ে ঠাকুর ঘরের পুজোর কাজটা সারে।সৌম্য পাশের বাড়ি রিন্টুদের বাড়ি যায় খেলতে।শৌর্য উঠোনের সিঁড়িতে বসে কী যেন আগাপাঁচতলা ভেবে যায়।আজ অনেক কটা দিন হয়ে গেছে বাড়িতে আছে।মাথার উপর চাপ পড়ছে বেশ।দেশের মধ্যে হয় কাজে যাওয়া যায় কোনোভাবে ব্যবস্থা করে,কিন্তু ফ্লাইট যতদিন না চলছে ততদিন তো যাওয়াও যাবে না।অথচ একলা থেকে থেকে মন কেমন বিষন্নতায় ভুগছে।হঠাৎ শৌর্য গলগল করে ঘামতে লাগে।সুধাংশু বাবু ঘর থেকে খাবার থালাটা রাখতে যেতেই চোখে পড়ে শৌর্যর অবস্থা। তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে চোখে মুখে জল ছিটায়।শৌর্য স্বস্তি বোধ করে।কিন্তু যতই হোক সুধাংশু বাবু বাবা,ছেলের জন্য চিন্তা থেকেই যায়।তাই পাশের বাড়ির হাতুড়ে ডাক্তার নীলকমলের কাছে নিয়ে যান ওকে।প্রেসার মাপিয়ে ডাক্তার বলেন অনেকটা প্রেসার বেশি আছে।আর ওর একটা ছোটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে।কয়েকটা ঔষুধ দেন। 
       বাড়ি ফিরে শৌর্য নিজের ঘরে এসে বসে।হঠাৎ ওর ফোনটা বেজে ওঠে।রিসিভ করতেই একটা উত্তজিত কন্ঠস্বর শুনতে পায়"ভাই,সব চলে গেল আমাদের,শুনেছ কোম্পানী অনেক লস খেয়ে গেছে,তাই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।" ফোনটা হাত থেকে পড়ে যায় শৌর্যর।আবার আগের মতো ও ঘামতে থাকে।খাটের একটা ডান্ডি ধরে কোনোরকমে বসে।একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আলমারিটার দিকে।তারপর বাথরুমের দিকে যায়।বাথরুমের ওপরের তাকে বাথরুম পরিস্কার করার সব সরঞ্জাম তোলা থাকে।সেখান থেকে একটা ছোট্ট শিশি নামায়।মুখটা খুলে গলায় ঢালে।বর্ষাকালে সাপ ব্যাঙের প্রকোপ বাড়ে।তাই কার্বোলিক অ্যাসিড আনানো ছিল।শৌর্য নিঃশব্দে পাড়ি দেয় চির ঘুমের দেশে।দীর্ঘরাত ও শান্তিতে ঘুমায়নি।এইঘুম সেই কথা-ই বলে।

গল্পকার সোমা সাহা
কাটোয়া, কাঠগোলা পাড়া, পূর্ব বর্ধমান,











0 Comments