শুভ্রাশ্রী মাইতির কবিতা


বিষণ্ণ পদাবলী কথা

দুঃখ পেলেই মা ভাঙা আলমারি থেকে সযত্নে বের করে আনত
দিদিমার দেওয়া পুরানো,তোবড়ানো কাঁসার ঘটিটাকে। ঘুঘুডাকা দুপুরের নির্জন পুকুরঘাটে ঘটিটাকে চকচকে করে মেজে ঘুমিয়ে পড়ত ঠাকুরঘরের পাশের দাওয়ায় আঁচল বিছিয়ে। বুকের কাছে আঁকড়ে থাকা ঘটিটার গা বেয়ে তখন পিছলে যেত দুপুরের ছায়ারোদ।ছোটবেলা থেকে দেখা দৃশ্যগুলো মনের গভীরে প্রশ্নের বুড়বুড়ি কাটলেই মা তাদের শান্ত করে ফিসফিসিয়ে বলত--ঘটির ভেতর দুঃখগুলোকে জমা করে রাখিস,বুঝলি !                                  
চকচকে করে মাজলে সুখ ঠিকরে পড়ে ঘটির গা বেয়ে।  তখন কি বুঝেছিলাম, কে জানে!                                    এখন বুঝি,মা আসলে একা হতে চেয়েছিল দুঃখের কাছে।              
ঘুম-ঘুম মায়াবী উপত্যকায় বিষণ্ণতাকে সই পাতিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিল সুখের সাথে।
সেই থেকে বিষণ্ণতার সাথে লতায়-পাতায় আমার এক গভীর আত্মীয়তা।
বিষণ্ণতা এখন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে থাকে হাওয়ায়।
দারিদ্র্য ,অবসাদ, আর মৃত্যুর অন্ধকার গভীর বিষণ্ণতা
কেশবতী কন্যের ঘন কালো চুলের মতো ঢেকে ফেলে
বন্ধ কারখানার গেট,নেভানো উনুন, মন-কেমনের জানালা আর আই.সি.ইউ এর হিমশীতল বেডগুলোকে।
বৃষ্টির মতো ফোঁটা ফোঁটা বিষণ্ণতা ঝরে পড়ে ভেজা চুলের ডগা থেকে মাটিতে।
বাজারে গেলে একব্যাগ আনাজের সাথে এককেজি বিষণ্ণতা ফ্রি।
আর সব কিছুর দাম লাগলেও বিষণ্ণতার কখনো দাম লাগে না কোনদিন।
এখন আমার চোখের পাড় ধরে কাজলকালো বিষণ্ণতার বৃষ্টিভেজা পিছল পথ।
কতদিন হাত ধরিনি হৃদয়জনের,কতদিন কাঁধে মাথা রাখিনি প্রিয় বন্ধুর।
কতদিন যাইনি ইচ্ছেনদীর কূলে,কতদিন চোখ রাখিনি নরম বেলফুলে।
কতদিন শরীরে মাখা হয়নি পরাগরেণু,বুকের গভীরে ভরা হয়নি মাটির সোঁদা গন্ধ।
আঁজলাভরা জলের পিপাসা বাড়তেই বিষণ্ণতার মেঘ গুলো জমাট বেঁধে ওঠে মনের আকাশে।
আমি ফিরে আসি সেই পুরানো ঘটির কাছে।
ভাল করে মেজে ঘষে দুঃখগুলোকে সযত্নে ভরে দিই ঘটিতে।
হলুদমাখা আঁচলটা পেতে শুয়ে পড়ি ঘটিটার ঠিক পাশে।
একটা জোছনামাখা ঘুম মার গায়ের গন্ধ মেখে গান শোনায় আমায়।
আমি ঘুমিয়ে পড়ি গান শুনতে শুনতে।
জানি,একটা আলোমাখা ভোর ঠিক অপেক্ষা করবে বুড়ো বটের পাশে।
প্রিয় ঘুম নেমে আসে চোখের পাতা জুড়ে গভীর বিশ্বাসে।

কবি শুভ্রাশ্রী মাইতি
মহিষাদল, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ 












0 Comments