নিমাই জানার মুক্তগদ্য



এক ধ্রুব পদের জন্য তপস্যা

তিনি ঘুমের কথা বলতেন । ঘুম থেকে উঠলেই আবার পরক্ষনেই ঘুমিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন । অংক তার মনের গভীরতায় অতন্ত্র প্রহরীর মতো জেগেছিল হিমালয়ে । ক্লাস সিক্স অথবা সেভেন পর্যন্ত অংক গুলো আমার থেকে ব্যস্ত অনুপাতের সম্পর্ক স্থাপন করেছিল বারবার। অনুভব করতাম অংক মানেই একটা শূন্য গোলক । অংক কি একটি ত্রিভুজাকার নাকি বহুভুজাকার ? অংক একটি জলরঙের মতো কোনো-এক অবয়বহীন একটা নারী শরীর । তিনি বলতেন অঙ্ককে একটা নারীর মতো ভাবতে ।চোখের আড়াল করতে নেই পরক্ষণে মনের আড়াল হয়ে যায়। গভীর রাতে তাকে নিয়ে ধ্যান করতে হয় । ধ্যান করেছি বাল্মীকির মত । মহাভারত অথবা রামায়ণ অথবা এনসাইক্লোপিডিয়ার গভীর রসে উদ্ভূত করেছি অসংখ্য ঘাম বিন্দু । কখনো হাফ ইয়ারলি বা অ্যানুয়াল পরীক্ষার খাতায় নম্বরের ভগ্নাংশ অনেকটা দূরত্ব রেখেই চলে গেছে মেঘের মতো , কুয়াশার মত । আমার মেধা তালিকায় অসংখ্য কুয়াশার বিন্দু এসে জমাট করে গেছে আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণা । আমার মনের ভেতর আর ঘুম আসছে না কতগুলো সমীকরণের জন্য । আমি ছবি হতে দেখেছি সন্দীপ স্যারকে । প্রতিটি নক্ষত্রের বিন্দু হয়ে ছুটে যেতেন আমার দুই চোখে, আসলে তিনি তো আবৃত্ত দশমিক ভগ্নাংশ । আমার অভাবের দিনেও কখনো সামন্তরিক অথবা বৃত্তের ক্ষেত্রফলের ভেতর ফুটিয়ে তুলছেন মহেশ্বরীর জ্বলজ্বলে চোখ । তৃপ্ত হয়ে যাচ্ছেন তিনি । ক্রমশ রামায়ণের সত্য পালনের পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন ইতিহাস অথবা ভূগোল , জৈবিক বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব পাঠের লিরিক । প্রতিটি ছন্দের বিন্যাস ও সমবায় শিখিয়ে যাচ্ছেন অকপটে । আমি তার মহানুভবতার কথা দেখেছি রাতের জোছনায়। আমি তার অবয়ব দেখেছি ঘুমের ঘোরে । ঘুমের ঘোরে দেখেছি একটি সাদা খাতা জমা দিয়ে যাচ্ছি পরীক্ষা না দিয়েই । সব ভুলে যাচ্ছি কঠিন অংক গুলো । ভুলে যাচ্ছি তার সরল সমাধান । আমার পাশে তিনি বসে বসে আমার হাতের আঙুলের গাঁটে অংক ধরিয়ে দিচ্ছেন । ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনে নীল রঙের ছত্রাক ফুটে উঠেছে । আমি ছবি বলেই ভাবতেই,  তিনি লিখে দিচ্ছেন অনেক বিকেলের মসলা মুড়ি । এভাবেই লাঠি হাতে অকপটে শিখিয়ে যাচ্ছেন বিকেলের হলুদ আলো । এখনো তার আলো পেতে চাই । আলো নিয়ে ছুটছি আর এক আলোর দিকে । আমার সব বিন্দু দিয়ে মহা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে আছি । শুকতারা হয়ে গেছেন তিনি । ওই আলোছায়া আকাশগঙ্গা দেখতে দেখতে আমি কখন তানপুরা ভেঙে ফেলছি ‌ আমি কখন পেন্সিলের শক্ত কাঠে দাঁত কামড়ে নুন স্বাদ নিতে নিতে  আনমনা হয়ে এঁকে যাচ্ছি কোন একটা আবছা গোল চশমার ফ্রেম । ছায়াছবি রঙের অসংখ্য বিন্দু আমার কপালে বসিয়ে দিয়ে শিখিয়ে যাচ্ছেন ধ্রুবপদ এর সঙ্গে কেমন করে অসংখ্য বিন্দু কপালে নিলে রামচন্দ্র হওয়া যায় । আমি এক দীর্ঘ বাল্মীকির তপস্যায় বসলাম ।।

গদ্যকার নিমাই জানা
রুইনান, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর












0 Comments