
কিরীটি স্যার ও প্রেমালাপ
সত্যি কথা বলতে গেলে শিখেছি প্রতি নিয়ত নানান ভাবে নানান জনের কাছে । শিখছি আজও, তবুও কথাটা যখন উঠল তখন বলতেই হবে প্রিয় জনের কথা ।
তখন পড়ি স্কুলে, সালটা ১৯৮৩.; কিরীটিবাবু পড়াতেন বাংলা , ইতিহাস এসব। ক্লাস সেভেনে এ উনি ছিলেন ক্লাস টিচার ,পড়াতেন বাংলা গদ্য আর পদ্য। কত সুন্দর সহজ করে করতেন উপস্থাপনা । তবে কঠোর হলেও মন খুলে গল্প করতেন । ওনার ক্লাসে আমাদের মনে একদিকে ভয় অন্য দিকে উৎসাহ ছিল দেখার মত।একদিন এক বন্ধুর লুকিয়ে রাখা প্রেম পত্র চলে গেল ওনার হাতে । ভয়ে বুক কেঁপে উঠল সবার , এই রে এবার শুভজিত আরংধোলাই খাবে । ওর বাবাকে আবার স্যার না বলে দেন হেড স্যারের মাধ্যমে । সবাই উত্তেজনায় টানটান। স্যার কিন্তু পড়াতে শুরু করলেন গম্ভীর মুখে। উদাত্ত কন্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল কবিতার এক একটি শব্দ ।সবাই গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছে।
হঠাৎ স্যার ডাকলেন শুভকে । বেচারির মুখখানা তখন শুকিয়ে কাঠ। কোনমতে উঠে গেল । ধমকে উঠলেন স্যার, চুরি করেছিস ?
না,মানে আমি তো,তোতলাতে থাকল শুভ ।
-- হতচ্ছাড়া,তোতলাতে কে বললো । বলছি তুই কি চুরি করেছিস,করিস নি তো।তবে ভয় পাচ্ছিস কেন!!
-- স্যার, ভুল হয়ে গেছে আর করব না ।
আবার ধমকে উঠলেন কিরীটিবাবু, করবি না মানে ? কি করেছিস ?
-- স্যার, ঐ চিঠিটা ,মানে আর লিখব না । ছেড়ে দিন স্যার এবারের মতন।
ও এই ব্যাপার তাহলে । এটা তোর লেখা । কিন্তু আমি যে বুঝলাম না কিছু । এটা বোর্ডে লিখে দে চটপট,
বললেন স্যার ।
শুভ পারলে স্যারের পায়ে গড়িয়ে পরে । এবারের মতন ছেরে দিন স্যার ।
এবার কিরীটিবাবুর সেই বাজখাঁই গলা ,তাহলে তোর বাবাকে ডাকি কি বলিস । নে নে চট করে বোর্ডে লিখে ফেল । আর হ্যাঁ, ভুল লিখলে কিন্তু সোজা হেডমাস্টারের ঘরে নিয়ে যাব।
বোর্ডে শুভর কাঁপানো হাতে লেখা প্রেম পত্র ।
শুরু করলেন কিরীটি বাবু পড়া, না নিজে নন । অন্য এক বন্ধু মানসকে দিয়ে ।
মানসের পড়া শেষ হলে আবার উদাত্ত কন্ঠ কিরীটি বাবুর । প্রেম কয় প্রকার ও কি কি । রাগ , অনুরাগ, বিরাগ, ব্যাভিচারী রাগ , সঞ্চারী রাগ , পূর্ব রাগ, ইত্যাদি ইত্যাদি বিশ্লেষন করলেন । সব শেষে লেখাটির ভুল কোথায়, কেন এটি প্রেম পত্র হয়েও সঠিক নয়, কি দোষ ত্রুটি রয়েছে, আরও ভালো লেখা করতে কি ভাবে লেখা উচিত ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি জানালেন । মজার বিষয়, গোটা ক্লাসের ইনভলভমেন্ট করে দিলেন । বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে কে সঠিক লাইন লিখতে পারবে , তাদের বোর্ডে ডাকতে শুরু করলেন ।
অবাক সবাই । কেটে গেল পুরো পিরিয়ড। হাসি মুখে নিলেন বিদায় । শুধু যাবার আগে শুভর চিঠিটা ওকে দিয়ে করলেন জিঙ্গাসা, বল , এটা কি ঠিক লেখা না ভুল । দশে কত নম্বর পাবে এই চিঠি ।
গোটা ক্লাস চিৎকার করে উঠল, স্যার জিরো।
-- তাহলে , এটা কি করবি ?
শুভ কাঁদো কাঁদো হয়ে জানালো, স্যার ছিঁড়ে দেবো।
ঠিক , তা তো দিবি , কিন্তু আরও ভালো লেখা চাই ।
পরের দিন দেখব , কে কত ভাল লিখতে পারে প্রেমের চিঠি ।
আমাদের অজান্তেই স্যার, মনে পুঁতে দিলেন ভালোবাসার বীজ, আর জানিয়ে দিলেন, ওরে প্রেম করতে শুধু প্রেমিকা লাগে না । প্রেম হল নিখাদ ভালোবাসা । মা , বাবা, ভাই , বোন , দিদি , বন্ধু সবাই কে ভালোবাসা যায় । ভালবাসতে জানতে হয়।
আর আমার মত কয়েক জনের মনে বপন করলেন লেখার মন্ত্র । স্যার, আপনাকে প্রণাম । আজ আপনার অবদানে কলম দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রেমের কবিতা ও নানান লেখনী।



0 Comments