সমাজ বসুর ছোটগল্প


মালি ও চারাগাছের গল্প

নার্সিংহোমে বেরনোর মুখে ফোনটা বেজে উঠল।
--- হ্যালো!
---- আপনি কি কেয়ার সেন্টার নার্সিংহোমের ডক্টর শুভদীপ সেন বলছেন?
---- হ্যা,আপনি কে বলছেন?
---- আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি মদন পাল লেন থেকে বিনয় চৌধুরী বলছি। আমার এক পরিচিত পথ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আজ ভোরে আপনার নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছে। আপনি কাইন্ডলি যদি একটু তাড়াতাড়ি পেশেন্ট অ্যাটেন্ড করেন খুব উপকার হয়।
       মনে হয় ভদ্রলোক একটু বেশিই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কিন্তু ভদ্রলোকের বাড়ির এলাকা আর নামের সঙ্গে কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি।
---- আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি এখনই নার্সিংহোমে রওনা দিচ্ছি। পৌঁছে পেশেন্টের খবর নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি। পেশেন্টের নামটা যদি একটু বলেন। 
---- শমীক রায়। আমারই প্রতিবেশী।
---- ঠিক আছে।
---- আপনি আমায় নিশ্চিন্ত করলেন,ডক্টর সেন।
 ---- আচ্ছা আপনি কি মিত্র ইনস্টিটিউশনে দশ বছর আগে সায়েন্স সাবজেক্টগুলো পড়াতেন?
---- হ্যা, কেন বলুন তো!
---- স্যার,আমায় চিনতে পারলেন না! আমি আপনার শুভদীপ। আপনি আমায় শুভ বলে ডাকতেন। আমার জন্মদিনে একবার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের একটা ইংরেজি বই উপহার দিয়েছিলেন। বইটা এখনও আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
---- মনে পড়েছে,মনে পড়েছে। তুমি শুভ বলছো। বয়স হয়েছে ত, সবকিছু মনে রাখতে পারি না। তবে তোমার মুখটা পরিষ্কার মনে আছে। তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র ছিলে।
---- স্যার, আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে,বলে বোঝাতে পারব না। আপনি কি এখনও মদন পাল লেনের সেই বাড়িতেই আছেন?
----- হ্যা, পুরনো ভাড়ায় সেই একতলা বাড়িতেই আছি।
---- আমি এক্ষুনি আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। তারপরে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে নার্সিংহোমে যাব। আপনি কোথাও বেরোবেন না।
---- এত বছর পর বাড়িটা চিনতে পারবে তো?
---- কি বলছেন স্যার! ওই বাড়িতে কি কম গেছি। টিউশন ছাড়াও,নানা অছিলায় আপনার সাথে দেখা করতে গেছি। আপনার মত মহান শিক্ষকের ছায়ায় ছিলাম বলেই আজ আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি।
---- আরে না,না শুভ সবই তোমার চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফল। আমার মনে হচ্ছে, তুমি গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলছো। এখন ফোন রাখো।সাক্ষাতে সব কথা হবে।
---- ঠিক আছে স্যার, ফোন রাখছি।
       
মতিলাল নেহেরুর সিগন্যালে গাড়িটা দাঁড়াতেই স্যারের প্রশ্ন ভেসে এলো-- শুভ, তোর মনে আছে? একবার বর্ষাকালে স্কুলে আসার পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে খুব চোট পেয়েছিলাম। কিছুটা ছড়ে গিয়েছিল। ক্লাসে ঢোকামাত্রই স্কুলের ফার্স্ট এইড বক্স থেকে তুলো আর ব্যান্ডেজ এনে যত্ন সহকারে জায়গাটা বেঁধে দিয়েছিলি। তারপর টিফিন পিরিয়ডে দোকান থেকে দুটো পেইনকিলারকও এনেছিলি। 
---- আর আপনি ক্লাসে সবার মাঝখানে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তুই একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবি রে শুভ।
---- দেখলি তো, আমার কথা কেমন মিলে গেল। 
---- সবই আপনার আশির্বাদ স্যার। 
---- জানিস তো শুভ, ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য শিক্ষকদের মনে এক অপরিসীম শান্তির সঞ্চার করে। পাখির পালকের মত এক নরম সুখের অনুভূতি জাগায়। তোকে তো অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছে?
---- স্যার, বাড়িতে কারো আমার এই ডাক্তারি পড়ায় সায় ছিল না। কিন্তু,ক্লাসে আপনি প্রথম শ্রীমার বাণী শুনিয়েছিলেন। সবসময় অন্যের কল্যাণ করার চেষ্টা করবে। দেখবে, ঈশ্বর নিজে থেকেই তোমার কল্যাণ সাধন করবেন। আপনার সেই কথা আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। তাই বাড়ির সবার অমতেই আমি ডাক্তারি পড়েছি।
---- তোর সব মনে আছে?
---- আপনার আরো অনেক শিক্ষাই মনে আছে। আপনি বলেছিলেন,যে শিক্ষা মানুষকে পথ দেখায় না,সৎ পথে চলতে শেখায় না,সে আবার কিসের শিক্ষা?
---- সে আমার কথা ছিল না রে শুভ। স্বামীজীর কথা। তাঁর বাণী পড়ে আমি তোদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতাম। তুই সেই বাণীর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছিলি বলেই, জীবনে সফল হতে পেরেছিস।
---- স্যার, আমার আমার  যেটুকু সাফল্য,তার পেছনে আপনার কাছ থেকে শোনা স্বামীজীর সেই বাণীই প্রধান উৎস। নিজের উপর বিশ্বাসই হল ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস,ইহাই উন্নতিলাভের একমাত্র উপায়। তা স্যার, আপনি এখন কি করছেন?
---- বাড়িতে সেই চারাগাছ পুঁতে চলেছি।
---- মানে বুঝলাম না। 
---- তোকেও যেমন একদিন আমার কর্তব্যের মাটিতে পুঁতেছিলাম, ঠিক সেইরকম....
---- হ্যা স্যার, এইবার বুঝেছি। আপনিই তো আমায় নিজের হাতে অনেক যত্নে পুঁতেছিলেন। আপনার নিরলস পরিশ্রম আর আন্তরিক পরিচর্যাতেই আমি বেড়ে উঠেছি। 
---- নারে শুভ, তোর বিশ্বাস আর একাগ্র অধ্যাবসায়ের আলো বাতাসেই তুই এইরকম একটা সুন্দর গাছ হতে পেরেছিস। 
       কথার ফাঁকে কখন যে নার্সিংহোমে পৌঁছে গেছি টেরই পাইনি।
----- স্যার আসুন, আমরা এসে গেছি।  
     লাউঞ্জে ডাক্তারবাবুকে আসতে দেখে জুনিয়র ডাক্তার,নার্স,ওয়ার্ডবয় সবাই সপ্রতিভ হয়ে পড়ে। তাদের সবার চোখ স্থির হয়ে যায়,ডাক্তার সেনের সঙ্গে মানুষটিকে দেখে। ধুতি আর শার্ট পরা নিতান্তই বয়স্ক এক সাধারন মানুষ, তাঁর সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিন নম্বর কেবিনের দিকে। 
---- আপনারা সবাই আসুন। এই মানুষটির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার মাস্টারমশাই। আমার প্রিয় শিক্ষক,শ্রী বিনয় চৌধুরী। এনার শিক্ষাতেই আমি আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছি।
       এরই মধ্যে সবাই একে একে মাস্টারমশাইকে প্রণাম করতে শুরু করেছে। 
---- স্যার আপনি কাঁদছেন?
---- আমার সেই ছোট্ট চারাগাছটা আজ এত বড় একটা গাছ হয়েছে, সেই আনন্দে চোখের জল বাঁধ মানছে নারে।

  গল্পকার সমাজ বসু 
 মিলন পার্ক, গড়িয়া, কলকাতা

















0 Comments