ইন্দ্রানী দত্ত'র স্মৃতি আলেখ্য



ইতিহাসে পাতিহাঁস

তখন খুব সম্ভবত অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি,নতুন শ্রেনী আর পুরনো বন্ধু নিয়ে একপ্রকার বেজায় খুশি,তার উপরে নিজের  ক্রমিক সংখ্যা যখন সবার প্রথমে  তখন আনন্দ হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয় ,আসলে বয়স অল্প থাকার সুবিধা বোধকরি এই একটাই,ছোটো ছোটো সাফল্যে আত্মতুষ্টি অনেকখানি,যা বড় বয়সে জীবনে আর কোন রেখাপাত করে না,তখনকার একটা শ্রেনীতে প্রথম হওয়ার  লড়াই,এখন জীবন যুদ্ধের কাছে ফিকে হয়ে আসে,এখন শুধু লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাড়না,আত্মতুষ্টি এখন কেবলি হাতছানি দেয়,তাকে ধরার সাধ্য হয়না!!!নতুন শ্রেনী,নতুন বইয়ের গন্ধ আহা ! বেশ,বেশ!!পড়শুনায় ফাঁকি দেবার মতো মন বৃত্তি বা বদ অভ্যাস আমার কখনোই ছিলো না,তার উপরে ভগবান ওই বয়সে অনাবশ্যক আত্মসম্মানবোধ একটু বেশিই আমাকে দিয়ে ফেলেছিলো  তাই  বিদ্যালয়ের পড়া প্রতিদিন না করে গেলে যদি  বকা খাই শিক্ষিকা মহাশয়ার  কাছে , তাহলে লজ্জায় মুখ দেখানো দায় হয়ে যাবে এ ভেবেও পড়া আমি করেই যেতাম ,তাই জীবনে কখনো বেতের ঘা আমার হাতে কিংবা পিঠে নিজ স্থান দখল করতে পারে নাই..যদিও আমাদের বিদ্যালয়ের  শিক্ষিকারা কখনোই আমাদের কঠিন শাস্তি দিতো না,

"তবুও বাল্যকালের ভয়,
কে করিবে জয় !!!"

কয়েকটা দিন এগোলো ,একদিন জ্বর বাবাজি বিনা আমন্ত্রণে আমার ঘাড়ে এসে চাপলো,তাই সেই দিন আর বিদ্যালয় যাওয়া হলো না,তখন এত মোবাইল ছিলো না তাই যথারীতি ইস্কুলের পড়া জানার আর উপায় রইলো না,কি করি পরের দিন একরাশ ভয় নিয়ে ইস্কুলে গেলাম,মনে মনে ভাবলাম আমি যেহেতু পড়াশুনা রোজ করি সেহেতু আজ না করার কারন বললে ঠিক রেহাই পাবো,কিছুই বলবে না আমাকে ,তাই শ্রেনীকক্ষের ফার্স্ট বেঞ্চের ধারে,নিজ স্থানে স্বমহিমায় বসলাম,তখন কি আর জানতাম এই ছিলো মোর ঘটে !!!! একে একে সব পিরিয়ড কাটলো ভালোই,যাক আর দুটো ঘন্টা পড়লে হাফ ছেড়ে বাঁচি  ,এর মধ্যেই গুনঞ্জন শুনলাম আজ  নাকি কাল যিনি ইতিহাস পিরিয়ড  নিয়েছিলেন সেই নতুন এক শিক্ষিকাই পিরিয়ডটি নেবেন ৷

প্রিয় শিক্ষিকা : শ্রদ্ধেয়া টুম্পা হালদার

একি !আমি তো কাল আসিনি ,কি পড়া দিয়েছিলেন উনি,জিজ্ঞাসা করতে করতেই বাজলো  ঘন্টা!!না মানে ইতিহাস দিদিমনি আসলো বলে !!যাইহোক এত স্টুডেন্ট থাকতে উনি কি আর আমাকে পড়া ধরবে !!!তাই  খামাকা চিন্তা করে  লাভ নেই,যথারীতি ইতিহাস  নেওয়ার জন্য নতুন শিক্ষিকা এলেন,অবশ্য বাকিদের কাছে না হলেও আমি যেহেতু গতকাল বিদ্যালয় আসি নি আমার কাছে উনি নতুন ই,বেশ গম্ভীর,মার্জিত পোষাক ,তেমন আমার কল্পনায় থাকা আদর্শ শিক্ষিকা স্বরুপ ব্যবহার,বেশ ভালো লাগলো,উনি এসেই  বই খুললেন, আর আমাকেই সবার প্রথম করলেন আগের দিনের পড়া দেওয়া থেকে প্রশ্ন ,আমার কাছে সেদিন আর ওটা ইতিহাস প্রশ্ন ছিলো না,ওটা ছিলো প্রশ্ন বান,সোজা কপালে এসে বিঁধলো যেন,নে এইবার সামলা,কপালের আর দোষ কি,সব দোষ ওই অনামুখো জ্বরের..!! আমি একটু হতচকিত হয়ে গেলাম তারপর  চুপ করে স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো দাড়িয়ে  রইলাম, ইতিহাস দিদিমনি  খানিকটা কড়়া গলায় বললেন, পড়া না করে ইস্কুলে আসা !!!!কান ধরে উঠবোস কর ১৫ বার..
আমি আর কি করি,ওই জীবনের প্রথম উঠবস করলাম,চোখে জল এলেও তাদের অভিকর্ষের টানে গাল অবধি আসতে দি নি,এর আগে ভেবেছিলাম কোন এক সময় সগর্বে বলিবো  বুঝলি এই আমি !!! আমি কখনো কান ধরি নাই জীবনে,কিন্তু তা আর বলা হলো না !!! ..পরের দিন বিদ্যালয়ে যাওয়াও হলো না,দুটো পা এ ব্যাথাতে  দাড়াতে পারছিলাম না,না আমি একটুও দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বাড়িয়ে বলছি না, তবে শুনেছিলাম অনেকে ত্রিশ,পঞ্চাশ বার  উঠবস করেও এইরূপ সমস্যা অনুভব করে নি আমার যে কেন  এমনটা হয়েছিলো তার কারন সত্যিই অজানা ছিল, হতে পারে মনের সাথে সাথে  আমার পা দুটোও বোধ হয় লজ্জিত হয়ে ছিলো খুব,তাই সেদিনের মতো এগিয়ে যেতে দেয় নি আর..!!মা একটু গরম ছেঁক দিয়ে দিতেই অমনি পা একদম যাকে বলে ঠিকঠাক আরকি..!!!

এই ঘটনার পূর্বে কখনো কেউ একটু জোরে কথা বললেই  আমার ভীষণ রাগ হতো,মনে মনে গজগজ করতাম না এমন নয়,খুব করতাম,অযথা মনে মনে অভিমান,রাগ পুষে রাখতাম যাকে অপরিনত বয়সের ন্যাকামি বললেও খুব একটা দোষের হবে না !
কিন্তু বিশ্বাস করুন সেই দিন আমার জীবনের প্রথম উঠবস করানো,বলা বাহুল্য ওই উঠবসই আমার জীবনের শেষ উঠবস,এই প্রথম ও শেষ উঠবস করানো ইতিহাস বিষয়ের সেই দিদিমনির প্রতি আমার একটুও রাগ হলো না ,বরং পা এ ব্যাথা কমে যাওয়ার পরে ইস্কুলে গিয়ে ওনার ক্লাস করার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম...
পরে বুঝলাম দিদিমনির প্রতি শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় আর ভালো লাগা  তৃতীয় দিনেই হঠাৎ  অনেকখানি বেড়ে গেছে,একি !!উঠবস এর ভিতর এ কি ঔষধ ছিলো,!!ঠিক বুঝলাম নাতো...!!

 যাইহোক তারপর  প্রায় তেরো বছর অতিক্রান্ত,আজ যখন প্রিয় শিক্ষিকা বিষয়ে লিখতে হবে দেখলাম তখন এক নিমেষেই ইতিহাস বিষয়ের সেই শিক্ষিকার গম্ভীর মুখটা নিজের অজান্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো, এখন বুঝি সেদিনের পর আমার সেই 
শ্রদ্ধেয় দিদিমনিটির  প্রতি  যে ভালো লাগা শুরু হয়েছিলো,আসলে সেই ভালো লাগার   ডাকনামই হলো  "  প্রিয় শিক্ষিকা "..

          গল্পকার ইন্দ্রাণী দত্ত
রথতলা,পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ 


















0 Comments