
আমার প্রিয় শিক্ষকেরা
গত শতাব্দীর আশির দশকে আমার স্কুল জীবন অতিবাহিত করি গড়িয়াহাট ফার্ণ রোডে অবস্থিত, ‘জগদ্বন্ধু ইনস্টিটিউশন’ এ অধ্যয়ন করে। এই ঐতিহ্যশালী বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুবাদে আমি স্বভাবতই বহু গুণী স্বনামধন্য শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। এইসব শিক্ষা গুরুরা আমাদের নিরন্তর দস্যিপনা এবং নব নব ফাঁকিবাজির উপায় উদ্ভাবনের অনবদ্য কৃতিত্ব সত্ত্বেও আমাদের সঠিক পথে চালনা করতে সদা সতর্ক ও সক্ষম ছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে নাম করতে হয় প্রবাদ প্রতিম পন্ডিত, বর্তমানে প্রয়াত ‘শ্রী শ্রী জ্যোতিভূষণ চাকী’ মহাশয়ের। তাঁর প্রগাঢ় প্রজ্ঞা বোঝবার মতো উপযুক্ত বুদ্ধি আমাদের ছিল না, শুধু জানতাম যে স্যার বহু ভাষায় পারদর্শী। সেইসব ভাষার মধ্যে , পালি এবং প্রাকৃত ভাষার কথা আমি এক্ষণে স্মরণ করতে পারি। সৌভাগ্যক্রমে স্যারের কাঁকুলিয়ার ফ্ল্যাটে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল, কারণ স্যারের ভাই, শ্রী বিশ্বপতি চাকী মহাশয়ের কাছে আমি টিউশন পড়তে যেতাম। তিনিও নামী শিক্ষক ছিলেন, স্যারের আর এক ভাই সুপ্রকাশ চাকী ছিলেন পরিচিত সঙ্গীত শিল্পী, ছোট ভাই অপূর্ব চাকী মহাশয় পরে আমাদের স্কুলের শিক্ষক রূপে যোগদান করে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু, আজ শুধু শ্রী শ্রী জ্যোতিভূষণ চাকীর কথা। চাকীবাবুর বাড়িতে আমরা পড়তে যেতাম খুব সকালে, কারণ বাড়ি ফিরে আবার দশটার সময় স্কুলে যেতে হত। সেই সকালেই দেখতাম প্রতিদিন সকালে জ্যোতিভূষণ স্যারের কাছে বহু দর্শণার্থীর ভিড়। তারা কেউ গবেষণারত ছাত্র, কেউ নামী অধ্যাপক, কেউ প্রবন্ধ লিখিয়ে। এঁরা সবাই আসতেন স্যারের পরামর্শ নিতে, সেইসব পরামর্শ, সেইসব আলোক বিতরণ তিনি করতেন হাসিমুখে, অক্লান্ত ভাবে এবং বিনা পারিশ্রমিকে।
কয়েক বছর আগে আমাদের বিদ্যালয়ের এক ছাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায়, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার সম্বর্ধনা উপলক্ষ্যে আমাদের মতো প্রাক্তনীদেরও আমন্ত্রণ জানায়। সেই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপরিচিত লেখক, গবেষক ও পুরাণ বিশারদ শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী মহাশয়। তিনি সেদিন জ্যোতিভূষণ চাকী সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে এমন কোনও পন্ডিত গবেষক নেই, যাকে কখনও না কখনও চাকীবাবুর দুয়ারে গিয়ে তাঁর জ্ঞান ভিক্ষা করতে হয়নি।” সেই মুহূর্তে স্যারের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমার আবেগে গলা বুজে আসছিল। পাঠক হয়তো দেশ পত্রিকায় চাকীবাবুর বহু জ্ঞানগর্ভ রচনা পাঠ করে থাকবেন।
স্যার সাধারণত আমাদের বাংলা পড়াতেন, কিন্তু দরকার হলে ইংরেজি, ইতিহাস ক্লাসও নিতেন। সব বিষয়ই ছিল ওনার নখদর্পণে। আমাদের প্রবল দুষ্টুমিতেও উনি কদাচিৎ ধৈর্য হারাতেন। আমার এক সহপাঠী একবার পরীক্ষা চলবার সময় চাকীবাবুকে গার্ড দেখে প্রবল উৎসাহিত হয়ে পড়ে একটু খোলামেলা ভাবেই হল কালেকশনে ব্রতী হয়েছিল, সেদিন দেখেছিলাম ভোলে ভালা সদাশিব মানুষটির রুদ্র রূপ। তবে সে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। চাকী বাবু মানেই অগাধ জ্ঞান আর অসীম শান্তির সহাবস্থান। আমি একটু ভালো বাংলা লিখতে পারতাম বলে লেখার জন্য উৎসাহিত করতেন। আমার প্রথম গল্প ছাপা হয় স্কুল ম্যাগাজিনে তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে গল্পের মনোনয়ন এবং প্রশংসাও এসেছে তাঁর কাছ থেকেই, সে পুরষ্কারের তুলনা হয় না। তারপর মাধ্যমিক পাশ করবার পরে পরেই আশ্চর্যজনক এবং অপ্রত্যাশিত ভাবে শিক্ষা সংসদের পত্রিকায় একই পাতায় ছাপা হয়েছিল এই অধম এবং সেই মহান শিক্ষকের লেখা। কাগজ হাতে পেয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেছি, রসিক তিনি পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলেন শিক্ষক আর ছাত্র আজ একাসনে বসলো। আমি লজ্জায় পালানোর পথ পাইনি। সে কাগজ আজও অমূল্য সম্পদ জ্ঞানে রক্ষা করছি।
আমাদের আর এক কিংবদন্তী শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত শিল্পী শ্রী শ্যামল দত্তরায় মহাশয়। উনি আমাদের বিদ্যালয়ের অঙ্কণ শিক্ষার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন, স্যার দুর্দান্ত ছবি আঁকতেন এটুকু শুধু বুঝতে পারতাম। বড়ো হয়ে যখন চিত্র শিল্পের ওপর একটু আকর্ষণ বোধ করেছি, তখন গিয়ে জানতে পেরেছি স্যার হলেন আধুনিক চিত্রকলার জল রঙ এর পেন্টিং এর পথিকৃৎ শিল্পী। লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রী হয় তাঁর এক একটি পেন্টিং।
প্রথম ব্যাপারটা নজর আসে দূরদর্শনে শ্যামলবাবুর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেখে, দু:খের বিষয় তখন আমি স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে গেছি। এখনও চোখে ভাসে ধুতি পাঞ্জাবি পরা আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ জোড়া নিয়ে স্যারের তারকা উপস্থিতি।
প্রথম ব্যাপারটা নজর আসে দূরদর্শনে শ্যামলবাবুর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেখে, দু:খের বিষয় তখন আমি স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে গেছি। এখনও চোখে ভাসে ধুতি পাঞ্জাবি পরা আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ জোড়া নিয়ে স্যারের তারকা উপস্থিতি।
বশিষ্ঠবাবুকে দুষ্টু ছেলেরা আড়ালে ডাকতো চিংড়ি বলে, কিন্তু সেকথা ঘুণাক্ষরে স্যারের কানে যাওয়ার কথা স্কুলের সবথেকে বিচ্ছু ছেলেটাও কল্পনা করতে পারতো না, ক্ষর্বাকৃতি, শীর্ণকায় আপাত শান্ত চেহারার বশিষ্ঠবাবুর এমনই ছিল দাপট। মনে আছে স্যার আমাদের ইতিহাস পড়াতেন এবং হোমওয়ার্ক থাকতো, লম্বা পড়া মুখস্থ করে আসা। পড়া না পারলে স্যার মোটা স্কেল (অত মোটা স্কেল কোন দোকানে বিক্রী হতো না, স্যার নিশ্চয়ই কোনও ছুতোরের কাছ থেকে যোগাড় করেছিলেন। )দিয়ে মেরে হাত প্রায় ফাটিয়ে দিতেন। সব ছাত্রই প্রাণের ভয়ে সাধ্য মতন পড়া মুখস্থ করে আসার চেষ্টা করতো।
আমাদের সময়ে আন্ত:স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগীতা হত না, হত আন্ত:স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় ক্রীড়া নৈপুণ্যর থেকে শক্তি প্রদর্শনই মুখ্য ছিল। ক্লাসে সবথেকে গায়ের জোর যাদের, তারাই ক্লাস টীমে সুযোগ পেতো। তবে বাৎসরিক স্যার বনাম ছাত্রদের ক্রিকেট ম্যাচ হত, আমার স্মরণকালে ছাত্ররা কোনদিন জিততে পারেনি। স্যারদের টীম অনেক শক্তিশালী ছিল। ফিজিকাল সাইন্স স্যার সুপ্রতুল বাবু নির্মম ভাবে ছাত্রপক্ষের বোলারদের প্রতিবছর তুলোধনা করতেন। ভূগোল স্যার অলোকবাবু ছিলেন কালিঘাট ক্লাবের প্রাক্তন ক্রিকেটার, যে ক্লাব ক্রিকেটে একটি বড় দল হিসেবে পরিগণিত। শোনা যায় হাঁটুর আঘাতের জন্য অলোকবাবু ক্লাব ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ান, তবে স্কুলের নবম দশম শ্রেণীর কিশোরদের পক্ষে উনি তখনও বড় শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন। হতে পারে ছাত্ররাও স্যারদের একটু সমীহ করে খেলতো। জীবন বিজ্ঞান স্যার মান্নাবাবু ছিলেন আর একজন দক্ষ ক্রিকেটার।
আমাদের সময়ে আন্ত:স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগীতা হত না, হত আন্ত:স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় ক্রীড়া নৈপুণ্যর থেকে শক্তি প্রদর্শনই মুখ্য ছিল। ক্লাসে সবথেকে গায়ের জোর যাদের, তারাই ক্লাস টীমে সুযোগ পেতো। তবে বাৎসরিক স্যার বনাম ছাত্রদের ক্রিকেট ম্যাচ হত, আমার স্মরণকালে ছাত্ররা কোনদিন জিততে পারেনি। স্যারদের টীম অনেক শক্তিশালী ছিল। ফিজিকাল সাইন্স স্যার সুপ্রতুল বাবু নির্মম ভাবে ছাত্রপক্ষের বোলারদের প্রতিবছর তুলোধনা করতেন। ভূগোল স্যার অলোকবাবু ছিলেন কালিঘাট ক্লাবের প্রাক্তন ক্রিকেটার, যে ক্লাব ক্রিকেটে একটি বড় দল হিসেবে পরিগণিত। শোনা যায় হাঁটুর আঘাতের জন্য অলোকবাবু ক্লাব ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ান, তবে স্কুলের নবম দশম শ্রেণীর কিশোরদের পক্ষে উনি তখনও বড় শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন। হতে পারে ছাত্ররাও স্যারদের একটু সমীহ করে খেলতো। জীবন বিজ্ঞান স্যার মান্নাবাবু ছিলেন আর একজন দক্ষ ক্রিকেটার।
আমাদের স্কুলের একটা গর্বের জায়গা ছিল ডিবেট। ডিবেটে আমাদের স্কুল বিভিন্ন জায়গায় বহু পুরষ্কার জয় করত। আমাদের ক্লাসের সুমন চক্রবর্তী ডিবেটে বিশেষ দক্ষ ছিল এবং স্কুলের প্রতিনিধিত্ব করত। এক সহপাঠী সুমনের চেহারার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা জগজীবন রামের চেহারার সাদৃশ্য আবিষ্কার করে ওকে জগজীবন রাম ওরফে জগু বলে ডাকতে আরম্ভ করে এবং সুমন অচিরেই পিতৃদত্ত নামটি হারিয়ে জগুতে পরিণত হয়। জগজীবন প্রসঙ্গের অবতারণা হেড স্যার বীরেশ্বরবাবুর দাপটের কথা বোঝাতে, ক্লাসে গালিগালাজ করবার জন্য বীরেশ্বরবাবু জগুকে একবার প্রবল বেত পেটা করেছিলেন। কোনও দুটি ক্লাসের মধ্যবর্তী সময়ে স্যার আসার আগে আমরা যথারীতি প্রবল হই হল্লা করছিলাম, সেইসময় বীরেশ্বরবাবু ক্লাসের বাইরে এসে দাঁড়ান। আমরা ওনাকে দেখেই স্বভাবতই ভয়ে চুপ করে গেছিলাম, জগু স্যারকে দেখতে পায়নি এবং একটি সদ্য শেখা গালাগালি কোনও বন্ধুকে প্রয়োগ করেছে, সেই মুহূর্তে ক্লাসও নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু সেই অসাংবিধানিক শব্দটি যেন আমাদের কর্ণপটাহ বিদীর্ণ করে দিলো। স্যার ক্লাসের ভেতরে তখনও প্রবেশ করেননি, জগু ব্যাপারটা উপলব্ধি করে দারুণ আতঙ্কে স্যারকেই বলে বসেছিল, “স্যার আমি তো কোনও গালাগালি দিইনি।” বীরেশ্বরবাবু কাউকে মারতেন না, তাঁর উপস্থিতি ছাত্রদের হৃৎকম্প বাড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু সেদিন তিনি ক্ষেপে গেলেন, বললেন, “তোকে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি, তবে কেন তুই একথা বললি ?” তারপর শুরু হল বেতের বাড়ি। যা অনেকটা শচীনের বিখ্যাত মরু ঝড়ের সঙ্গে তুলনীয়।
ইংরেজির শিক্ষক মহাপাত্র বাবুকে দোঁপে বলা হত, কারণটা বলতে পারব না, নামটা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের থেকে পেয়েছিলাম, তারা পেয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী ছাত্রদের কাছ থেকে। মহাপাত্রবাবু মাঝে মাঝে ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন এবং আমাদের তুমুল গোলমাল সেই সুখ নিদ্রা ভঙ্গ করলে, বেল্ট ধরতেন ছাত্র দমনের জন্য। সেই সময় স্যারেদের কাছে ছাত্র পেটানো জলভাত ছিল এবং তারজন্য পুলিশ কেস হত না, বাড়ির লোকজন তারজন্য স্কুলে হামলা করতে আসত না, সেটা ভালো ছিল না খারাপ, সে বিতর্ক এখন তোলা থাক।
মহাপাত্র বাবুকে বেল্ট এগিয়ে দিত আমাদের ক্লাসের বিচ্ছু ছেলে অনুপ, অনুপের যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল যে বেল্ট দু ফেত্তা করে নিয়ে মারলে একটুও লাগে না, ও সব সময় বেল্ট ডাবল ফোল্ড করে মহাপাত্র বাবুর হাতে ধরিয়ে দিত এবং মহাপাত্র বাবু এই রহস্য কোনওদিন ধরতে পারেননি। মাঝে মাঝে উনি বেল্ট দিয়ে মেরে যখন ভিক্টিম ছাত্রটির মুখে প্রত্যাশিত যন্ত্রণার অভিব্যক্তি দেখতে পেতেন না (অনুপ সবাইকে বলে রেখেছিল মুখে উ: আ: করবি আর খুব লাগছে এমন ভাব করবি। কিন্তু সব ছাত্রের অভিনয়ের মান প্রথম শ্রেণীর ছিল না।), তখন ছাত্রটিকে গন্ডার বলে উল্লেখ করতেন।
মহাপাত্র বাবুকে বেল্ট এগিয়ে দিত আমাদের ক্লাসের বিচ্ছু ছেলে অনুপ, অনুপের যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল যে বেল্ট দু ফেত্তা করে নিয়ে মারলে একটুও লাগে না, ও সব সময় বেল্ট ডাবল ফোল্ড করে মহাপাত্র বাবুর হাতে ধরিয়ে দিত এবং মহাপাত্র বাবু এই রহস্য কোনওদিন ধরতে পারেননি। মাঝে মাঝে উনি বেল্ট দিয়ে মেরে যখন ভিক্টিম ছাত্রটির মুখে প্রত্যাশিত যন্ত্রণার অভিব্যক্তি দেখতে পেতেন না (অনুপ সবাইকে বলে রেখেছিল মুখে উ: আ: করবি আর খুব লাগছে এমন ভাব করবি। কিন্তু সব ছাত্রের অভিনয়ের মান প্রথম শ্রেণীর ছিল না।), তখন ছাত্রটিকে গন্ডার বলে উল্লেখ করতেন।
ইংরেজি গ্রামারের শিক্ষক অধীরবাবুর সুর করে ক্লঅঅঅস বলা ভোলা যাবে না। ওনার প্রিয় উক্তি ছিল, “গরম গরম ভাত খেয়ে স্কুলে আসবি আর রেলের চাকায় হাওয়া লাগাবি।” রেলের চাকায় কীকরে হাওয়া লাগায় তা অবশ্য কোনওদিন বুঝতে পারিনি।
জীবন বিজ্ঞান শিক্ষক সলিলবাবুর প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ, পড়াতেনও দুর্দান্ত। আমাদের ক্লাসের জয়ন্ত সদ্য গজানো ডানায় ভর করে স্যারকে নানা প্রশ্ন করে বিরক্ত করত, ওর বোধহয় আশা ছিল স্যারকে এইসব করে অপ্রস্তুত করা যাবে, এতে ক্লাসের ক্ষতি হত খুব। কয়েকদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করে স্যারের জয়ন্তর উদ্দেশ্য ধরতে অসুবিধা হয়নি, উনি একদিন জয়ন্তকে বললেন ক্লাস ডিসটার্ব করা বন্ধ কর, তুমি স্কুলের পরে আমার কাছে প্রশ্নগুলো নিয়ে এস, আমি উত্তর দিতে না পারলে এই স্কুলে পড়ানো ছেড়ে দেব। জয়ন্তর আর কোনওদিন আজেবাজে প্রশ্ন করবার সাহস হয়নি। প্রশ্ন করায় কোন ভুল নেই, কিন্তু ক্রমাগত প্রশ্ন করবার উদ্দেশ্য বুঝতে স্যারের অসুবিধা হয়নি।
জীবন বিজ্ঞান শিক্ষক সলিলবাবুর প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ, পড়াতেনও দুর্দান্ত। আমাদের ক্লাসের জয়ন্ত সদ্য গজানো ডানায় ভর করে স্যারকে নানা প্রশ্ন করে বিরক্ত করত, ওর বোধহয় আশা ছিল স্যারকে এইসব করে অপ্রস্তুত করা যাবে, এতে ক্লাসের ক্ষতি হত খুব। কয়েকদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করে স্যারের জয়ন্তর উদ্দেশ্য ধরতে অসুবিধা হয়নি, উনি একদিন জয়ন্তকে বললেন ক্লাস ডিসটার্ব করা বন্ধ কর, তুমি স্কুলের পরে আমার কাছে প্রশ্নগুলো নিয়ে এস, আমি উত্তর দিতে না পারলে এই স্কুলে পড়ানো ছেড়ে দেব। জয়ন্তর আর কোনওদিন আজেবাজে প্রশ্ন করবার সাহস হয়নি। প্রশ্ন করায় কোন ভুল নেই, কিন্তু ক্রমাগত প্রশ্ন করবার উদ্দেশ্য বুঝতে স্যারের অসুবিধা হয়নি।
যখন এইসব স্মৃতিচারণা করি তখন নিজেকে বড়ো ভাগ্যবান মনে হয়। শিক্ষকেরাও মানুষ, তাঁদেরও ভুল ভ্রান্তি হত, তাঁরাও ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন, অকারণেই হয়তো কখনও রাগারাগি করেছেন, কিন্তু সেইসব ছাপিয়ে তাঁরা ছিলেন স্নেহশীল, সদা সতর্ক গুরুমশাই। সেই অসাধারণ মহীরুহদের ছত্রছায়ায় আমার বেড়ে ওঠা, নির্মোহ ভঙ্গিমায় তার স্মৃতিচারণ করবার চেষ্টা করলাম, যদি মোহাবিষ্ট হইও, পাঠক বুঝবেন, সেটা অবশ্যম্ভাবিও বটে। মহাবটদের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা তো সহজ নয়, আর কেই বা চায় তা! আজ যৎসামান্য জীবনে যেখানে পৌঁছেছি তা তো তাঁদেরই অবদান। আমার সমস্ত শিক্ষকদের সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে শেষ করলাম, পাঠকদের ভালো লাগলেই আমার প্রয়াস সার্থক হবে এবং তা হবে আমার তরফ থেকে যথার্থ গুরুদক্ষিণা।



0 Comments