
দেবতার স্পর্শ
রবিবার। ছুটির দিন। ব্যস্ততা নেই। ঘড়ি মিলিয়ে সময়ের তালে পা মেলানো নেই। আজ দেরি করে দিন শুরু হয়। ছোটকা আর ছোটকাকীমা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। আজ তাদের স্কুল নেই। অন্যান্য দিনের থেকে রবিবারটা কেমন যেন আলাদা! সূর্যদেবের যেমন শনি-রবি নেই, আমারও রোববারের ঘড়ির কাঁটা নেই। রোজকার মত সকাল সকাল জাবনা কাটতে বসে গেছি। অবলা জীবগুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাঁ পেতে আছে। পেটের আগুন রবিবারে যা শনিবারেও তাই।
ছোটকা আমার কলেজে ভর্তির ব্যাপারে ছোটকাকীমার সঙ্গে কথা বলছে। কথাগুলো স্পষ্ট করে আমার কানে ধরা দিচ্ছে। মাধ্যমিক পাশ করে মাসখানিক হল বাড়িতে বসে আছি। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ধারে কাছে কোথাও কলেজ নেই। এইচ এস স্কুলও নেই। ছোটকা বেশ চিন্তিত। ছোটকাকীমা বলল, "কালীনগর রবীন্দ্রকলেজে ভর্তি করিয়ে দাও। বছর তিনেক হল কলেজটা হয়েছে। শুনেছি পড়াশুনাও ভাল হচ্ছে।"
আমার ছোটকা আর ছোটকাকীমা দু'জনেই স্কুলটিচার। পড়াশুনোর ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখে। --"প্রতিদিন পাঁচ-ছ মাইল হেঁটে কলেজ করতে পারবে তো !" ছোটকা খানিকটা আনমনা হয়ে কথাগুলো বলল। --"সবাই পারছে, ওই বা পারবে না কেন?" একটু জোরের সঙ্গে কাকীমা বলল।
সুন্দরবনের এ তল্লাটে ধারেকাছে না আছে কলেজ না উচ্চমাধ্যমিক স্কুল। পড়তে গেলে কালীনগর রবীন্দ্রকলেজ ছাড়া গতি নেই। আমি মনে মনে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছি। পড়তে গেলে লড়তে হবে। যেখানেই হোক পড়টা চালিয়ে যেতে চাই। আমার বাবার সামর্থ্য নেই শহরের কোনো কলেজে ভর্তি করে আমাকে পড়ানোর। বাবা-মার স্বপ্ন আছে সাধ্য নেই। বাবা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠেছে। দু'বেলা অমানুষিক পরিশ্রম করে। কাজেরলোক হিসেবে জামাই আদর পায়। মা ভগবানের উপর আমাদের চার ভাইবোনের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়েছে। আমাকে নিয়ে তার বেশি চিন্তা। আমি যে তাদের বড় সন্তান।
সময় সময় বোধহয় ভগবান স্বশরীরে ধরাধামে নেমে আসেন। মুস্কিলআসান হয়ে। হঠাৎ এই সাতসকালে দেবদূতের মত তপনদা এসে হাজির! সপ্রতিভ বুদ্ধিদীপ্ত চেহেরা। এ পাড়াতেই বাড়ি। ছোটকাকে দেবুদা বলে ডাকে। তপনদা কোনো ভণিতা না করে বলল,।-"ভাইপো তো ভাল নম্বর নিয়ে পাশ করেছে। ভর্তি কোথায় করলেন?" হঠাৎ এরকম প্রশ্নর জন্য ছোটকা বোধহয় তৈরি ছিল না। একটু হকচকিয়ে গেল। বলল, কলীনগর রবীন্দ্রতে দেব ভাবছি।" তপনদা যেন হাতে মোয়া পেয় গেল। "চিন্তাটা আমার উপর ছেড়ে দেন দেবুদা। আমি বিরুকে আমার কলেজে ভর্তি করে দেব।" --"তোমার কলেজ মানে, তুমি যে কলেজে পড়ছ?" --"হ্যাঁ বৌদি, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।"
--" সে তো ক্যানিংয়ে। থাকা খাওয়ায় তো অনেক টাকার ব্যাপার!" তপনদা কাকীমার কথায় একটু মুখ টিপে হাসল। বলল, -"এক পয়সা লাগবে না। শুধু দায়িত্বটা আমাকে দিন ।"
এর পর আর কোনো কথা থাকে না। ছোটকাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। মনে মনে হয়তো এটাই চাইছিল ছোটকা। ছোটকাকীমা খানিকটা ম্লান। অনেক কাজের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ছিল যে!
পরদিন, সোমবার সকাল সকাল আমরা বেরিয়ে পড়লাম। তিনটে নদী পেরিয়ে ধামাখালিতে পা রাখলাম। এখান থেকে ভ্যানরিক্সা করে সরবেড়িয়া তারপর বাসে করে ক্যানিং ডকঘাট। ডকঘাট থেকে নৌকা করে মাতলা নদী পেরিয়ে ক্যানিং। ক্যানিংটাউন। কলকাতার পুবমুখো প্রবেশদ্বার।
আমি এর আগে গ্ৰামের বাইরে পা রাখিনি। শহর তো স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা! ছবিতে বাস, ট্রেন, লরি দেখেছি। আজ স্বচক্ষে চাক্ষুষ করব। বাসে চড়ব। ছুঁয়ে দেখব ! ভিতরে ভিতরে আমি উত্তেজনায় ছটফট করছি। বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি বাস দেখব, শহর দেখব ---রেলগাড়ি দেখব। এখন বেশ ভালভাবে বুঝতে পারছি, কেন লোকে বলে, "লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে। " বিস্ফারিত দু'চোখ জুড়ে চলমান পৃথিবী গিলছি। চোখ বুজলেই পৃথিবী অন্ধকার!
ভ্যানরিক্সায় উঠে তপনদা মুখ খুলল।--"বিরু, তুই ভগবান দেখেছিস ?" ভগবানকে আবার দেখা যায় নাকি! তবে দেখিনি বললে ভুল হবে। মুখ ফুটে বললাম, "দেখেছি"। তপনদা কেমন যেন ব্যাকফুটে চলে গেল। আশ্চর্য হয়ে বলল, " কোথায় ? মন্দিরে!" বললাম, "এইতো আমার সামনে বসে।" হো হো করে হেসে উঠল তপনদা। --"তুই তো ভাল কথা বলিস। আমি ভেবেছিলাম, হদ্দবোকা।"
"তুমি আমার জন্য দেবতার দূত। আমি তোমাকে ভালকরে চিনি না। দু' তিনবার মাত্র দেখেছি । কাকার বাড়িতে । তুমিও আমাকে ঠিকঠাক জান না, চেনও না। অথচ----কথাটা শেষ করতে দিল না তপনদা। হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিল। বলল, -"তুমি একটা বিচ্চু, তোমাকে চিনব না। তুই তো ধোকা দিয়ে গোলটা দিলি ।" মনে পড়ে গেল স্কুলের এক্সস্টুডেন্টের সঙ্গে কারেন্টস্টুডেন্টের ফুটবল ম্যাচের কথা। একমাত্র গোলটা আমি দিয়েছিলাম। তপনদা বলল, -"গোলকিপার কে ছিল জানিস? আমি ছিলাম। গোলদাতাকে চিনব না !" ব্যাপারটা এখন জলের মত পরিষ্কার হল।
দুপুর সাড়েবারোটা নাগাদ ক্যানিংয়ে পৌঁছে গেলাম আমরা। জীবনে প্রথমবার শহর দেখলাম। স্টান্ডে বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ,ছুটে গেলাম বাসটা ছুঁয়ে দেখতে। পিচ ঢালা মসৃণ পাকা রাস্তায় চলমান গাড়ির স্রোত দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। ছবি আর বাস্তব এখন মিলেমিশে একাকার। ধাবমান জীবনে থমকে আর এক স্তব্ধ জীবন। তপনদা চিৎকার করে উঠল।-"বীরেশ্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে চল ট্রেন দেখে আসি।" এক ছুটে পৌঁছে গেলাম ক্যানিং স্টেশনে। রেলগাড়ি দেখার কথা জীবনে ভুলব না। ছবির সঙ্গে মেলাতে পারলাম না। কোনো গাড়ি এত লম্বা হতে পারে! স্বপ্ন এসে বাস্তবের হাত ধরেছে। শহরে কেন এসেছি, কী তার উদ্দেশ্য বেমালুম সব ভুলে গেলাম।
তপনদা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বাসে উঠল। -"আধঘন্টার বাস রাস্তা। কলেজ স্টপেজে নেমে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। তারপর আমাদের স্বপ্নের কলেজ।" তপনদা গড় গড় করে বলে গেল।
বাস থেকে নেমে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তপনদা বলল,-" তোকে সাক্ষাৎ ভগবানকে দেখাব। দেবতা স্বর্গে থাকে না। দেবতা মানুষের মধ্যে থাকে। যদি তোর চোখ থাকে, বোধগম্যতা থাকে তবেই অনুভব করতে পারবি।" বললাম, -"কার কথা বলছ?" --"আমাদের ভাইসপ্রিন্সিপ্যাল ।"
হাঁটতে হাঁটতে তপনদা ভাইসপ্রিন্সিপ্যাল সুধীন্দ্র ভট্টাচার্যের গল্প বলতে লাগল। কীভাবে এই অজ পাড়াগাঁয়ে তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কীভাবে রাজ্যের সেরা সেরা ছাত্রদের কলেজের শিক্ষক করে নিয়ে এসেছিলেন। কেমন করে হতদরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের আলোর দিশা দেখিয়ে আসছেন সেসব কথা। তপনদা বলল, -"এক মানুষ গড়ার কারিগর, এক মানুষ গড়ার দেবতাকে আজ সাক্ষাৎ দর্শন করবি ।"
আমি বিস্ময়ের ঘোরে পথ চলছিলাম। একটা কথা মনের ভিতর পাক খাচ্ছিল। সাহস করে এতক্ষণ বলতে পারিনি। এখন সেটা বলে ফেললাম।-"তপনদা, আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে হবে! আমাদের তো সে সামর্থ্য নেই। ছোটকা কী দেবে বলেছে ?"
তপনদা আবার মুখ টিপে হাসল। বলল, "সব ওই দেবতারই দান। দরিদ্র ছাত্রদের জন্য হস্টেল অ্যলাউন্স, স্টাইপেন্ড-- পড়াশুনোর ভার সব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বছরভর নিখরচায় থাকবি, খাবি, পড়াশুনো করবি আর বছর শেষে দু'একশ টাকা পকেটে আসবে। তাতে তোর জামাপ্যান্ট , হাতখরচের পয়সা চলে আসবে।"
এতক্ষণে ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। কুয়াশার অন্ধকার কেটে আলো ফুটল।
"দেখিস, ফেল করলে কিন্তু সব বন্ধ হয়ে যাবে। " তপনদা সাবধান করল।
ডানদিকে নারকেল দেবদারু আর শিশুগাছের ফাঁক দিয়ে সাদা ধবধবে একটা বিল্ডিংয়ের অংশ দেখা যাচ্ছে। তপনদা সোৎসাহে আঙুল তুলে বলল, "ওই দেখ, আমাদের স্বপ্নের কলেজ।"
আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। জয়ের লাফ। স্বাধীনতার লাফ। আলোর দেশে পৌঁছানোর লাফ।
সৌম্য, প্রশান্ত, দেবতুল্য একটা মানুষ চেয়ারে বসে আছেন। পরনে খদ্দরের গেরুয়া পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি । আধপাকা লম্বা চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। কাঁচা সোনার মত উজ্জ্বল রং। বড় বড় উজ্জ্বল চোখে কালো ফ্রেমের পুরু চশমা। মুখে স্মিত হাসি লেগে। ভাইসপ্রিন্সিপ্যাল বসে আছেন। মানুষটাকে দেখে সম্মোহিত হয়ে গেলাম। কেমন যেন আবিষ্ট হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। নিজের সব অনুভূতি, অস্তিত্ব, অবলোকন শক্তি নিমিষেই মহাশূন্যে ভেসে গেল।
তপনদাকে দেখে স্যার মাথা তুলে তাকালেন। তপনদা হিস্ট্রি অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। কলেজের অধিকার বোধটা অন্যদের থেকে একটু বেশি মনে হল। ভণিতা না করে তপনদা বলল, -" স্যার আমার এই ভাইটাকে ইলেভেনে ভর্তী করাতে হবে। হতদরিদ্র অভাগা ছেলে। হস্টেল না পেলে পড়াশুনো করতে পারবে না।" গড় গড় করে কথাগুলো বলে তপনদা থামল। স্যার আমাকে দেখলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, "কী নাম?" -"আজ্ঞে--স্যার বীরেশ্বর মন্ডল।"
মার্কসিটটা দেখে বললেন, "হস্টেল দিতে পারব না। সব সিট ফিলড্ আপ হয়ে গেছে।" তপনদা নাছোড়। -"স্যার, ছেলেটাকে বাঁচান। অনেক আশা নিয়ে এসেছি। না হলে ও হারিয়ে যাবে।" স্যার একটু যেন কপট রাগ দেখালেন। "সব কলেজ ঘুরে আমার এখানে এসেছিস। অনেক দেরি করে ফেলেছিস।"
তপনদা জোড়হাতে টানা অনেক কথা বলল। কেন দেরি হয়েছে তার ব্যাখ্যা।
স্যার আর একবার আমার দিকে তাকালেন। বললেন, -" পড়াশুনো করতে এসেছিস না রাজনীতি করতে?"
ঘাবড়ে গেলাম। পাথরের মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ইলেভেন সায়েন্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। হস্টেলও পেয়ে গেলাম। আমার কলেজ জীবন শুরু হয়ে গেল। গ্যাস বেলুনের মত হাওয়ায় ভাসছি। "নাউ আই আম ফ্রী ,ফ্রী ফরম স্টারভিং, ফ্রি ফরম বন্ডেজ--"।
আশির দশকের প্রথম দিক। হস্টেলে ইলেকট্রিসিটি নেই। হ্যারিকেনের আলোয় পড়াশুনো। প্রায় ছশো ছাত্রের ছাত্রাবাস। চার চারটা ঢাউস বিল্ডিং। সামনে সান বাঁধানো বিশাল পুকুর। কলেজের চারপাশ গভীর খাল দিয়ে ঘেরা। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া খালের ধার বরাবর। একদম নিশ্চিন্ত আশ্রয়। আমার স্বপ্নের নন্দনকানন।
এক একটা রুমে চারজন করে ছাত্র। চারটে ফালি খাটে আমাদের সংসার। মাথার বালিশের পাশে বই জড়ো করা। খাটের নীচে থালা, বাটি, গ্লাস।
খুব ভোরে দরজায় খট খট আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেখি স্যার দাঁড়িয়ে। হাতে হ্যারিকেন। বললেন, " ভোরের বেলা পড়িস না! ভোরের পড়া খুব কাজের। কাল থেকে যেন এর অন্যথা না হয়।" মানুষটা চলে যাচ্ছেন আর একটা ঘরের দরজার দিকে। পিছনে পিছনে একটা জ্যোতির্ময় আলো দেখলাম। ভোরের আলো কিনা ঠিক বুঝলাম না। সন্ধ্যায় সেই একই দৃশ্য। স্যার এক ঘর থেকে আর এক ঘরের দিকে এগিয়ে চলেছেন। হাতে হ্যারিকেনের নিভু নিভু বাতি।
অবিবাহিত মানুষটা হস্টেলের একটা রুমে থাকেন। তিন তিনটে বিষয়ে মাস্টার্স। বঙ্কিম সাহিত্যে ডক্টরেট। স্যারের লেখা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ইংলিশ গ্ৰ্যামার আমাদের পাঠ্যপুস্তক। এমন মানুষ সাধারণ ভাবে আমাদের সঙ্গে, আমাদের সুখে দুখে আছেন ভাবতে অবাক লাগে। স্যারকে দেখার পর নিজের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গেলাম। নিজেকে আবিষ্কার করলাম সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে।
এ কে স্যার আজ আসেননি। কলেজের করিডোরে গল্প করছি। স্যার এসে হাজির। বললেন, -"চল আজ তোদের ইংলিশ লিটারেচারের ক্লাস নেব।" সব দিকেই মানুষটার নজর। কেউ কোনোভাবে ফাঁকি দিতে পারত না। গরমের সময় দেবদারু গাছের নীচে বসে ক্লাস নিতেন। ক্লাস করতে করতে কবিগুরুর কথা মনে পড়ত। এমন সহজ করে, এমন প্রাঞ্জল ভাবে আর কোন শিক্ষক বুঝিয়েছেন কিনা মনে করতে পারি না।
ইন্টার কলেজ ফুটবল টুর্ণামেন্ট চলছে। আমাদের কলেজ মাঠে সমিফাইনাল। আমার ক্লাশমেট শিবু গোলকিপার। আমি ফরোয়ার্ডে খেলছি। যাদবপুর কলেজের সঙ্গে খেলা চলছে। আষাঢ় মাস। বর্ষার সিজন। বিপক্ষ উইঙ্গারের বলসমেত একটা কিকে প্রচন্ড শব্দ করে শিবুর পা ভেঙে গেল। পড়িমরি করে সবাই মাঠে ছুটে এল। শিবু জলকাদায় শুয়ে অজ্ঞান। স্যার ছুটে এলেন। ক্যানিংয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দিলেন। ক্যানিং থেকে আমরা যন্ত্রণাকাতর শিবুকে নিয়ে ট্রেনে করে শিয়ালদা চললাম। নীলরতন হাসপাতালে শিবুকে ভর্তি করব বলে। সেই প্রথম আমার ট্রেনে চড়া। সেই প্রথম কলকাতায় যাওয়া।
নীলরতনে গিয়ে ইমার্জেন্সিতে বললাম, "আমরা ট্যাংরাখালি কলেজের ছাত্র। " কলেজের নাম করতেই অবাক কান্ড! আলাদীনের প্রদীপের মত বিস্ময়কর কান্ড ঘটে গেল! দশ বারোজন ডাক্তার ছুটে এসেছেন। সবাই স্যারের কথা জিজ্ঞাসা করছেন। একটু পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। উপস্থিত ডাক্তাররা সবাই আমাদের কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। জামাই আদর কাকে বলে সেদিন বুঝে ছিলাম। শিবুর রাজার হালে চিকিৎসা হল।
কলেজে ইউনিয়নের নির্বাচন। এস এফ আই আর ছাত্রপরিষদের ধুন্ধুমার লড়াই। ভোটপর্ব সাঙ্গ হতে, শেষ বিকেলে কীভাবে একটা ঝামেলা বাঁধল। দাবানলের মত সে গন্ডগোলের আগুন কলেজময় ছড়িয়ে গেল। রক্ত ঝরছে ছাত্রদের শরীর থেকে। সেই ভয়ংকর গন্ডগোলের মধ্যে স্যার এসে হাজির। বললেন, " তোরা আমাকে মার।"
নিমিষেই জল পড়ল আগুনে। বুদ্বুদের মত হাওয়ায় উবে গেল সব ঝামেলা। সবাই সবাইকে জড়িয়ে ক্ষমা চাইছে।
একবার আমার ধুম জ্বর। গা পুড়ে যাচ্ছে আগুনের তরাসে। স্যার এসে মাথায় হাত রাখলেন। কীভাবে জানিনা জ্বর উবে গেল। একটা স্বর্গীয় অনুভূতিতে মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। সেদিন খুব স্পষ্ট করে বুঝে ছিলাম, স্যার মানব শরীরে দেবতা। তপনদা ঠিক বলেছিল। দেবতা মানুষের মধ্যে থাকেন।
স্নাতক স্তরের কোর্স কমপ্লিট করে যেদিন কলেজ ছাড়ছি সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। বুক ভেসে গিয়েছিল চোখের জলে। কেন এমন করে কেঁদে ছিলাম আজ এতবছর পরে বুঝতে পারি। দেবতাহীন হয়েগিয়েছিলাম যে!



0 Comments