
ডাউন মেমোরি লেন…
"বর্ষে বর্ষে দলে দলে আসে বিদ্যামঠতলে
চলে যায় তারা কলরবে,
কৈশোরের কিশলয় পর্ণে পরিণত হয়
যৌবনের শ্যামল গৌরবে।"
কবি কালিদাস রায় তাঁর "ছাত্রধারা" কবিতায় আবহমান ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের যে অপূর্ব স্মৃতিচিত্র এঁকেছেন, তা কালজয়ী। স্মৃতির সরণি বেয়ে তা আজও অম্লান। যদিও স্মৃতি সততই সুখের হয় না, তবু্ এই বিদ্যালয়-স্মৃতি আমাদের মনে চির জাগরুক থাকে। জীবনের ভিত, আদর্শ ও উদ্দেশ্য সবই গড়ে ওঠে এই বিদ্যালয় জীবনে। শৈশব থেকে কৈশোর এই ধ্রুপদী সময়ে আমরা শিক্ষক / শিক্ষিকাদের হাত ধরেই কল্পনার জগতে প্রবেশ করি। তাঁরাই আমাদের বৃহত্তর জীবনের পাঠ দেন। পরিচয় করিয়ে দেন সাহিত্য বিজ্ঞান ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাথে।
আমি সুন্দরবন অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। সেখানে তখন বিদ্যুৎ যায়নি, বিদ্যালয়ও ভালো ছিল না। তাই আমাদের পড়াশোনার জন্য পাঠানো হল দূরে শহর নিকটবর্তী স্কুলে। প্রথমে সরিষার কাছে মাথুর জে এম হাইস্কুল। সেখান থেকে ১৯৭৩ সালে বিজ্ঞান শাখায় নবম শ্রেণীতে ভর্তি হই ঐতিহ্যশালী মজিলপুর জে এম ট্রেনিং স্কুলে। তখনকার প্রধান শিক্ষক শ্যামাপদ হালদার মহাশয় আমাকে একটি ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেন। এখনকার মত ১০+২ তখন ছিল না। নাইন থেকে স্ট্রিম ভাগ হয়ে যেত। সায়েন্স, আর্টস, কমার্স। ইলেভেনে গিয়ে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হত। হায়ার সেকেন্ডারি । ১৯৭৬ সালে এই সিলেবাসে শেষ পরীক্ষা হয়। আমরাই শেষ ব্যাচ। তারপর থেকে ১০+২ শুরু হয়েছে ।
যখন ক্লাস টেনে উঠলাম তখন স্কুলে এলেন এক নতুন ইংরেজির শিক্ষক নতুন হাওয়া নিয়ে। স্কটিশচার্চ থেকে সদ্য পাশকরা তরুণ । অবিন্যস্ত এলোমেলো চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সম্ভবত টি এস এলিয়টের "ওয়েস্ট ল্যান্ড" কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ক্লাসরুমে ঢুকলেন। তারপর রবীন্দ্রনাথের "আফ্রিকা" । "বাংলার মুখ" কবি জীবনানন্দ দাশ।শেষে রবীন্দ্র গান,"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে"।
সমস্ত ক্লাসরুম তখন স্তব্ধ।গরম জলের মত সব সময় ফুটতো যে শ্রেণীকক্ষ, আজ সেখানে কোন শব্দ নেই। আমাদের চোখে অবাক বিস্ময়। কী দেখছি আমরা। এতদিনের কড়া শাসনের বাঁধাধরা নিয়মের উলটো হাওয়া। কণ্ঠের ঝড় উড়িয়ে নতুন স্যার যখন থামলেন তখন তাঁর পাঞ্জাবির সবকটা বোতাম খুলে গেছে। আস্তে করে চেয়ারে নয়, টেবিলে পিঠ ঠেকিয়ে বললেন, বাবুরা, আমি কাশীনাথ সেন, আপনাদের নতুন ইংরেজির শিক্ষক।( হ্যাঁ, আপনিই বলেছিলেন)। তারপর ক্লাস শুরু হল। মুহূর্তে মন জয় করে নিয়েছিলেন সবাকার।যখন শেষ হল, ক্লাসরুমের বাইরে তখন হেডস্যার দাঁড়িয়ে। দুটো ক্লাস পার হয়ে গেছে।
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সাহিত্য পাঠ বেড়ে গেল। ক্লাসে মনোযোগও। ওই সময় দুটো ঘটনা ঘটল। প্রথমটি আমরা সহপাঠীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে স্কুলে প্রথম একটি দেয়াল পত্রিকা বের করলাম ।বন্ধু বিশ্বনাথ দের মুক্তোর মত হাতের লেখা আর অলংকরণে শোভিত হয়ে বের হল "অনির্বাণ"। যা স্কুলে প্রভূত সাড়া ফেলল। ওই বছরই সরস্বতী পুজো শুরু হল। কাশীনাথ বাবুর উৎসাহে পরের বছর প্রথম মুদ্রিত স্কুল ম্যাগাজিনও প্রকাশ পেল।
তাই প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমার জীবনে মজিলপুর জে এম ট্রেনিং স্কুলের স্মৃতি অমলিন। সমস্ত সহপাঠী আর শিক্ষকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে আটপৌরে নির্লোভ সহজ-সরল স্বপ্ন সন্ধানী যে জ্ঞানতপস্বী শিক্ষক সেদিন আমার বুকে সাহিত্যকে ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমার জীবনের অবলম্বন ও পাথেয় হয়, সেই কাশীনাথ সেন মহাশয়কে শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই। ডাউন মেমোরি লেন ধরে আজ আর একবার আমি আমার প্রিয় শিক্ষককে বিশেষ দিনে স্পর্শ করি।



1 Comments
আন্তরিক ধন্যবাদ 🙏 জানাই
উত্তরমুছুন