অন্তরা দাঁ'র মুক্তগদ্য


মাষ্টারমশাই'রা যখন চুপিচুপি আসেন...

আমাদের একটা নিঝুম ছেলেবেলা ছিলো, শরৎকালের নীল আকাশে'র মত বেদাগ আর ঝলমলে! সেখানে মাঝে মাঝে ধূসর মেঘ যে করে আসতো না তা নয়, তবে কিনা জল ঝরে সব পরিষ্কার হয়ে যেত আবার! আমাদের সেই কচুপাতা মাথায় করে জল আটকানো'র নামে মিছিমিছি ভেজা'র দিনে, যাদের হাঁটু আঁকড়ে বড়ো হয়ে উঠলাম, যারা শেখালো দিনের বেলা সূয্যি ওঠে আর রাত্তিরে সাগরের বুকে টুপ করে ডুবে যায় তারা আমাদের বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন, সব গুরুজন মানুষ। কিন্তু বে-আক্কেলে, বাঁদর-বজ্জাত আমাদের অত্যাচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে  কিম্বা লেখাপড়া শিখে জজ-ব্যারিষ্টার হবার স্বপ্ন দেখে যখন তেনারা ইস্কুলে দিলেন ভর্তি করে, ততদিনে আমরা 'মাষ্টারমশাই' বুঝতে শিখে গেছি। সেই নিরুপদ্রব ছেলেবেলায় বাড়ি'র আদর শাসন ব্যতিরেকে যাঁদের প্রশ্র‍য় অথবা তিরষ্কার কপালে জুটেছিলো অমোঘ নিয়মে, এখানে তাঁদের জন্য একটি প্রণাম রাখলাম। প্রিয় শিক্ষক সেই অর্থে তো মা কে নিয়ে অনেকজনই, আলাদা করে তাঁদের শ্রেনীবিভাজন ঘটানো'র সাধ্য অন্ততঃ আমার মত লিখিয়ে'র নেই, জীবনে ভালো'র চাইতে মন্দ স্মৃতি'ই বেশি মনে পড়ে কিনা! ছোটবেলায় মা কতবার আদর করে চুমো খেয়েছে এ'কথা ভুলেছি বেমালুম কিন্তু সন্ধেবেলা পড়তে বসে হ্যারিকেনের তেলটুকু পা-পোষে ফেলে দিয়ে তাতে জল ভরে রাখা'র অপরাধে খুন্তিপেটা'র স্মৃতি অমলিন! দপদপ করে নিভে গেলে যে সেদিনের সন্ধে'র ভয়ঙ্কর কেশব নাগ থেকে মুক্তি পাবো, এ বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিন্ততা, সেই দুঃসাহসিক পদক্ষেপে সাহায্য করেছিলো! এ হেন বাঁদর এবং গাধা গোছের স্পেসিমেনে'র যে কিভাবে মাষ্টারমশাইদের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা আজও বর্তমান তা এই লেখা'র শেষে নিশ্চয়ই বলবো। এক্ষনে দু-একটি প্রসঙ্গে'র অবতারণা না করলে এ লেখা সম্পূর্ণ হবে না তাই পাঠকদের সনির্বন্ধ অনুরোধ, অদ্যকার শিক্ষকজাতি'র একটি  নিদর্শনে'র আত্মগ্লানি'র সাথে থাকুন, দু-এক টুকরো সময় নেবো মাত্র। ফ্রি-প্রাইমারি ইস্কুলে'র সেইসব ঝরঝরে সুন্দর দিনে, একটি দিদিমনি আমার সমস্ত ভাবুক সত্তাটিকে ভীষণ প্রশ্র‍য়ে, আদরে, স্নেহে এবং আত্মনির্ভরতায় পত্রেপুষ্পে ছেয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে আর খুঁজে পাইনি, যোগাযোগ নেই, আমার সামান্যতম হিজিবিজি লেখা'র, যা'তা গদ্য পদ্যের প্রথম পাঠক ও সমালোচক, মা ব্যতিরেকে তিনিই।আজ যখন দু'একটা পত্র-পত্রিকা'য় ছাপা'র অক্ষরে নিজের ডায়েরি'তে লিখে রাখার কথাগুলো দেখি, একধরনের অননুভূত সুখে বুকের ভেতর কেমন করে আসে, পুজো এলে যেদিন ঠাকুরের চোখ আঁকা হতো, সেরকম দমবন্ধ করা সুখ, তখন খুব মনে পড়ে তাঁর কথা! 

চিরকালে'র ঘেঁতো আমি, দাদামশায়ে'র কাছে যেটুকু শিখেছি, তাই ভাঙিয়ে আজকের রুটিরুজি, সেটুকু শেখাতেও তাঁর কালঘাম ছুটে গিয়েছিল, এই গেছো, প্রায় নির্বোধ প্রাণীটি'র হাজার আব্দারেও বিরক্ত না হওয়া মানুষটি'কে ও আমার দেওয়া হলোনা কিছুই। তাঁর সমস্ত আশায় জল ঢেলে আমি... 
সে অন্যকথা, বলবো আরেকদিন। 

জীবনের শেষদিকে'র পাল্লায় চড়ে বসা'র পর যখন আজ পিছনে তাকাই, দেখি প্রায় সবার'ই মতো ভুল হয়ে গেছে সব। আর সেই ভুলের ক্যাক্টাসে ফুল হয়ে ফুটে আছে শৈশবে'র সেইসব ইস্কুলের দিন। আমি চিরদিনের ইস্কুল-পালানো পাবলিক, অথচ আজ আমার ইস্কুলে'র ছানাগুলো'র দিকে তাকিয়ে ভাবি হাজার চেষ্টা করলেও আর ইস্কুল -পালানো হবে না আমার আর ! ছিঃ, কেন যে এমন অযাচিত বেড়ে উঠলাম, বড় আর হলাম কই! তবুও জীবনের সব শিক্ষা, মূল্যবোধ জড়ো করে চেষ্টা করেছি নিজের কাছে অন্তত সৎ থাকার, তবুও অবমাননা জোটে, যুগের ফসল, আধুনিকতার ললিপপ চুষেছ, মজা দ্যাখো এখন! মন সঙ্কুচিত হয়ে আসে! হা-ক্লান্ত, বেয়াড়া রকম ক্লাসে'র ধাক্কা সামলে সন্ধেবেলায় নিজের মুখোমুখি হই, খুব স্ট্রেস হয়, আজকাল রাস্তাঘাটে আর কেউ মাষ্টারমশাই শব্দ'টা ব্যবহার করে না, বলে মাষ্টার!! 
তখন একলা অন্ধকারে চুপিচুপি আমার মাষ্টারমশাই'রা আসেন, আমার কাঁধে হাত রাখেন, বলেন —দুঃখ করিসনি, আমরা সক্কলকে তোদের মত ভালো রেসাল্ট করাতে পারিনি, এত এত নম্বর পাওয়াতে পারিনি কিন্তু সমাজের বোঝা তো করিনি রে! তোরা এত এত সম্মান পাস, পুরষ্কার, প্রতিযোগিতা, ছেলেপুলেগুলো এমন ধারা কেন বল দিকি! কি যে সব শিক্ষা'র বহর, মেডিক্যালের ছাত্র ড্রাগ নিচ্ছে, বাংলা'র ছাত্রী অশ্লীল ছবিতে, আত্মহত্যা, খুন, আমরা তোদের তো অমন হতে দিই নি বাপু! 
চোখ জলে ভরে আসে, হ্যাঁ মাষ্টারমশাই আপনারা জিতে গেছেন! 

টুং করে একটা মেসেজ আসে, প্রিয় ছাত্রী'টি লিখেছে, 
—শিক্ষকদিবসে প্রণাম নেবেন।
 আজও ফেসবুকে'র মতো জোলো প্ল্যাটফর্মে'ও স্নেহের ছাত্রীটি লেখে, 
—আপনার হাসি আমার প্রেরণা। 
চমকে পেছন ফিরি ততক্ষনে মাষ্টারমশাই'রা সব চলে গেছেন দল বেঁধে, ওদের যে রোজ শিক্ষকদিবস!    

         গদ্যকার অন্তরা দাঁ 
 কাঁটাপুকুর উত্তর, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ       



























0 Comments