
অথিক গুরু পথিক গুরু গুরু অগণন
আমার মামার বাড়ি একান্নবর্তী।উৎসব-অনুষ্ঠানে তার ভার টের পাওয়া যেত। হৈ-হল্লার মধ্য দিয়ে নয়, সে সাহস ছিল না কারোর। সবাই কেমন চাপাস্বরে কথা বলত।কারণ, মাতামহ বাড়িতে আছেন। তবে রান্নাঘরের দাওয়ায় তরি- তরকারির বহর জানান দিত পাত পাড়বে কতজন। সাত টিন মুড়ি নামানো থাকত ঢারিতে।বড় এক কড়া কুমড়োর ছক্কা। চায়ের জল ফুটেই যেত পেল্লাই এক কেটলিতে। তখন গ্যাস ছিল না। পাটকাঠির ধিকিধিকি অঙ্গারে। বুকের মধ্যে সেই পাটকাঠির আগুন এখনও জ্বলে।পুড়ছে না কেউ , নিজেই পুড়ছি এ বেলা ও বেলা।
কারও কারও পুড়তে ভালো লাগে , কারও উড়তে , কারও আবার শীতলপাটি বিছিয়ে গা এলিয়ে দিতে। আমার পছন্দ চলনবিলের নৈর্ঋত কোণে বসে থাকতে। জমির আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে , ঘাসের শরীরের বিনম্র পুলক ধারণ করতে করতে , গরুর গাড়ির চাকার কৌণিক লিক ধরে , পদচারণার শব্দ- নৈঃশব্দ্যের অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোতে ভেসে কখন যে চলনবিলে পৌঁছে যেতাম , ঠাহর পেতাম না।
দেখতাম , মাতামহ বসে আছেন। মাছ ধরা চলছে। দিগঙ্গনাদের ছুঁয়ে জালের চলন। জেলেদের গলদঘর্ম অবস্থা। মাতামহ বলতেন , এরাই পৃথিবীর প্রাণশক্তি। অথচঅবহেলিত-শোষিত--- সর্বঅর্থে বঞ্চিত। জল ও মাছের যেমন সখ্য তেমনই উপরতলার মানুষের সঙ্গে এই নীচের তলার মানুষের হৃদয়-সম্পর্ক গড়ে না উঠলে মুক্তি নেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন : "পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমায় পশ্চাতে টানিছে।"
উৎসব বাড়িতে মাছের প্রয়োজন হত প্রচুর। মাছও উঠত জাল ভরে। বড় বড় হাঁড়িতে রাখা হত। তার আগে লাফ দিতে দিতে মাছগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ত। যাদের একটু বেশি প্রাণশক্তি , সেই মাছেরা হাঁড়িবন্দি হয়েও লাফ মারত জোরে। আমি সেগুলো ধরতে যেতাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতাম। দু'একটা ছিটকে আবার জলে গিয়ে পড়ত। মুক্তির শ্বাস নিত জোরে জোরে। আমার বীরত্বে আঘাত লাগত খুব। কেমন যেন মনমরা হয়ে যেতাম। দাদু বলতেন, "তুমি জেলেকাকুদের সবচেয়ে বড় মাছ একটা করে দাও।" আমি দিতে চাইতাম না। কথাটা শুনতে পাইনি ভান করতাম। দাদু ওদেরকেই মাছ তুলে নিতে বলতেন। ওরা নিজে হাতে তুলে নিত। তবে বড় বড় মাছ নিত না।বলত , পন্ডিমশায়, আপনার কাজের বাড়ি , বড়গুলো কাজে লাগবে। দিতে হয়। দিলে কমে না। দিলেই সবাই নেবে তাও না। এই শিক্ষা মাতামহের কাছে পেয়েছি।
উৎসব-বাড়িতে পর্যাপ্ত আলোর প্রয়োজন। তখন মামার বাড়িতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। আট-দশটা হ্যাচাক জ্বালা হত। আমাদের সঙ্গে নিয়ে দাদু হ্যাচাক জ্বালতেন। লখাই মামা থাকত সঙ্গে। শতকরা নিরানব্বই শতাংশ কাজ মামাই করত। কিন্তু আমাদের গোল করে বসতে হত হ্যাচাকগুলি ঘিরে। দাদু বলতেন, ভালো করে দেখো, কীভাবে জ্বালাতে হয়। তেল ভরো। হাওয়া ভরো। এসব তোমরা পারবে। তেল ভরতে গিয়ে বাইরে পড়ে যেত অনেকখানি। উৎকট গন্ধ উঠত। দাদু কোনদিন বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বরং বলতেন, তেল পড়া ও তেল পোড়ার গন্ধ ভালো লাগে। হাওয়া দেওয়ায় আমার উৎসাহ ছিল একটু বেশি। আগ বাড়িয়ে সেটাই করতাম। নজেলটার হাতল ধরে ভেতরে ঢোকানো ও বের করা। শেষ দিকে খুব কষ্ট হত। শক্তি লাগত বেশি। বাহাদুরি করে জোরসে ঢোকাতে গেলে বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ছিটকে পড়তাম।। দাদু হো হো করে হেসে উঠতেন। একটু বড় হলে হ্যাচাকের কাচ মোছার অনুমতি পাই। খুবই শক্ত কাজ। আঙুলের মসৃণ চলনে তার সিদ্ধি। শুকনো ন্যাকড়া নিয়ে এ পাশ ও পাশ বুলিয়ে যাওয়া। মাঝেমাঝে ঘুঁটের ছাইয়ের পরশ। হাত কাটার সম্ভাবনা অবশ্য কম। প্লাস্টিকের বলয় তার কারণ। হ্যাচাক জ্বালানো সকলের কম্মো নয়। তার জন্য দক্ষতার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে লখাইমামা সিদ্ধহস্ত। হ্যাচাকের মাথায় তেল উঠিয়ে , মুখে আগুন দেওয়া। তেল বেশি উঠে গেলে বিপদ। দপ করে আগুনের লেলিহান শিখা তখন গগনচুম্বী। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা। লখাইমামার মাত্রাজ্ঞান দেখে অবাক হতাম। দাদু বলতেন , মনে রেখো , যতটুকু দরকার ততটুকু তেল।
গদ্যকার সুজিত রেজ চুঁচুড়া, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ


0 Comments