জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের মুক্তগদ্য


প্রিয় শিক্ষক 

শিক্ষকতা করতে গিয়ে জীবনে বহু শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।চিনেছি অনেককে-সরল,জটিল,ধূর্ত,কুটিল,উদার,কৃপণ,ভালো শিক্ষক ...আদর্শবান,দায়িত্বশীল,ফাঁকির গবেষক...ইত্যাদি ইত্যাদি।তবে বহু ভালো শিক্ষককে দেখেছি, নিবেদিতপ্রাণ জাত শিক্ষক।
আজ এমন একজনের কথাই বলবো।তাঁর নাম বিবেক রায় - ছাত্রদের কাছে বিবেক স্যার।তিনি ছাত্রছাত্রী অন্ত প্রাণ অথচ পড়া আদায় এবং শ্রেণি-শৃঙখলা রক্ষায় তিনি এতই কড়া যে তাঁকে এক ছাত্র-বিরোধী হিংস্র মানুষ বলে দেগে দিতে স্বঘোষিত দরদিদের লাইন পড়ে যাবে মনোবিজ্ঞানের অলীক পাণ্ডিত্য দিয়ে সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষককে লক-আপে পাঠাতে তাঁদের কয়েক মিনিট  মাত্র লাগবে।
আজও আমি স্বপ্নে সেই শিক্ষককে দেখি তিনি রাত্রে হোস্টেলের ঘরে ঘরে দরজা ঠেলে দেখছেন ছাত্ররা পড়ছে কি না।পড়লে মুখে আলোর উদ্ভাস আবার ঘুমোলে মুখের অন্ধকার অচিরে সরিয়ে কৃত্রিম রাগে ও ব্যঙ্গে ফাঁকিবাজ ছাত্রটিকে তুলে দিচ্ছেন।তারা চোখেমুখে জল দিয়ে ঘুম কাটিয়ে পড়ায় ফেরার পর তিনি বিছানায় যাচ্ছেন।অথবা ছাত্রদের ভয় জাগিয়ে বলছেন, রাত্রে দরজা খোলা রাখবি। মাধ্যমিক শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি সারারাত ঘুমুবো না।রাত বারোটা থেকে চারটে তোরা ঘুমুবি,আমিও ঘুমুবো।তারপর ভোর চারটে থেকে ছটা টানা পড়া।একসময় এমন অভ্যাস তৈরি হয় স্যার বাথরুম উঠে কাশি দিলেও ছাত্ররা সচকিত হয়ে ওঠে,কিছু বলতেই হয় না।
সেই মাধ্যমিকের রেজাল্টে ছাত্রদের কঠোর পরিশ্রমের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা গেল।যার প্রকৃত কারণ সেই বিবেক স্যার।দেখা গেল প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সেই স্কুলের ফলাফল অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।চারিদিকে জয়জয়কার পড়ে যায়।স্যারের অবদানের কথা ছাত্রছাত্রীদের মনে গেঁথে যায়,ইতিহাস হয়তো মনে রাখে না।
মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করে এবার দূরের উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়তে যাবে ছেলেমেয়েরা।বিবেক স্যার সেই মাসের বেতন পেয়ে,তাদের নিয়ে ছুটির দিনে নদীর ধারে পিকনিকের আয়োজন করেছেন। কয়েকঘন্টা খুশি, আনন্দ, গল্প, কথায়, কবিতায়, গানে, রস-রসিকতায় কেটে যায়। ছাত্র-শিক্ষকের পবিত্র বন্ধন চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। তা দেখার মানুষ এখন দেখি না।আমি সেই বিবেক স্যারকে ভুলতে পারিনি।অনেকদিন কাছাকাছি ছিলাম।
সেই পিকনিকে একটি ছাত্র প্রশ্ন করে বসে,অবশ্য ভয়ে ভয়ে,স্যার,একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
-- নির্ভয়ে বল।এবার তোরা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়তে যাবি,তোদের সব কথা বলা যাবে।তোরা বড়ো হয়ে গেছিস।আর কোনো শাসন নয়,বকাবকিও নয়।
ছেলেটি বলে,স্যার আপনি এত বকেন,শাসন করেন, আপনার ছড়ির ঘা আর অপমানের ভয়ে সবার আগে আপনার পড়াটাই করতাম।মার খেলে আপনার উপর খুব রাগ হতো,কিন্তু পরে সেই রাগ কোথায় যেন উড়ে যেত।আপনি ভালোবেসে ডেকে হাসিমুখে যখন বলতেন,মার খেলি তো!একটু মনোযোগী হলেই তো হয়।
তখন মনে হতো আপনি আমাদের বাড়িরই একজন মানুষ। দাদা বা বাবার চেয়েও আমাদের ভালোবাসেন। এটা কেন হয় বলুন তো?
স্যার উত্তর দেন,ওরে বোকা ভালোবাসার জন্য।শাসনটা সাময়িক একটা ছলও বলতে পারিস।
তোদের মঙ্গলের জন্য আমাকে কড়া হতেই হয়েছে।সেটা সাময়িক।
অন্য একজন ছাত্র বলে,স্যার আমরা পরীক্ষার আগে রাত বারোটা পর্যন্ত আবার ভোর চারটে থেকে পড়তাম।আপনি দেখতে আসতেন,কখনো দূর থেকে কাশতেন।আমরা বলতাম,কাশিটা আপনার অ্যালার্ম। আপনি কি আমাদের জন্য সারারাত জেগেই থাকতেন স্যার?
স্যার থমকে যান,ভাবেন,তারপর তাঁর মুখে রসিকের হাসি ফুটে ওঠে।উত্তর দেন,আজ তোদের কাছে সত্যকে আড়াল করবো না।তবে একটা শর্ত মানতে হবে,তোরা ছাড়া আর কেউ একথা যেন না জানে।রানিং ছাত্ররা জানলে ওরা ফাঁকি দেবে।আসলে আমি রাত্রের খাওয়া সেরে একবার রাউন্ড দিতাম,তারপর শোবার আগে আর একবার।রাত্রে বাথরুম উঠলে একটা চক্কর দিতাম,আর বাকিটা কাশির অ্যালার্মেই কেল্লা ফতে হয়ে যেত।
ছেলেমেয়েরা হেসে ওঠে।বলে,স্যার আপনার জন্যই এত ভালো রেজাল্ট হয়েছে।হোস্টেল থেকে দশ-দশটা ফার্স্ট ডিভিশন,ছটা স্টার মার্কস,ব্লকে ফার্স্ট বয় আমাদের স্কুলের।সে তল্লাটের সেরা রেজাল্ট,রেকর্ড রেজাল্ট।বিবেক স্যার বলেছিলেন সেই দিনটা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা দিন।
বিবেক স্যারকে আমি চিনতাম।অতীত কাল বলে চিন্তা নেই এখনো রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখা হয়।বাজার থেকে ফিরছেন।
এখনো তিনি বিশ্বের সব ছাত্রছাত্রীর মঙ্গল কামনা করেন।
প্রণাম বিবেক স্যার।স্বপ্নের শিক্ষক।

   গদ্যকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
গোপেশ্বরপল্লি, বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া



 






























0 Comments