
আমার প্রিয় শিক্ষক
আপনি যদি আমায় ঘুমের মধ্যেও জিজ্ঞাসা করেন, বোধহয় উত্তর পাবেন, সিনেমা । সত্যি বলতে, আমি আমার সংক্ষিপ্ত জীবনে খুব কম শিক্ষকই পেয়েছি, মনে রাখার মতো । আমি পড়েছিলাম কোথায়, আর এখনও বিশ্বাস করি, প্রকৃত শিক্ষক তাঁর ছাত্র বা ছাত্রীদের শেখান না, বোঝান না । বরং অনুপ্রাণিত করেন । প্রশ্ন হল, কী দিয়ে ?
এর উত্তর দিতে গেলে ফিরে যেতে হবে, আমার ছেলেবেলায় । অতীত সবসময় সুখের নয় । তাই আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই — চাই বা না-চাই । কিন্তু আজ এমন একজন মানুষের কথা বলব, যাঁকে ভুলে গেলে পাপ হবে । আমি তাঁকে কোনোখানে কোনো দিন সাজগোজ করতে দেখি নি । উৎসবে অনুষ্ঠানেও ধুতি-পাঞ্জাবির সাথে বড়োজোর একটা শাল জড়াতে দেখতাম । তিনি একটা বাগানে আমাদের পড়াতেন । একচালা একটা ঘর ছিল সেই বাগানে । স্যারের দাদা সেই বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন সারাটা দিন । আমরা শৈশবের অত্যধিক উৎসাহে আবিষ্কার করেছিলাম, কোনো কোনো গাছে নাম লেখা আছে । আমরাও নাম লিখতাম — কাজটা সহজ হত কলাগাছের ক্ষেত্রে ।কারণ তার কাণ্ড নরম। কিন্তু কয়েক দিন পরেই দেখতাম, আমাদের নামের আদ্যক্ষর মলিন হয়েছে, এক মাস পরে প্রকৃতির নিয়মেই তা হারিয়ে যেত । শিখেছিলাম, কাজ করে যেতে হয় । কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয় । সেই বাগান-ঘরের শিক্ষামন্দির ছিল আমার শৈশবের শান্তিনিকেতন ।
স্যার আমাদের নানা গল্প শোনাতেন । তাঁর বাড়ির অদূরেই ছিল সাধারণ পাঠাগার । তিনি আমাদের ক্লাস ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত প্রায় সব বিষয় পড়াতেন । বাবার তখন এত সাধ্য ছিল না যে, প্রতি বিষয়ের আলাদা শিক্ষক রাখবেন । আর আমরাও এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত খুশি ছিলাম । কারণটা সহজেই অনুমেয় — একাধিক শিক্ষক মানে খেলার সময় উধাত্ত । সেই বেশ ভালো ছিল । কিন্তু লেখাপড়ার থেকেও স্যারের কাছে যে জিনিসগুলো মূলত শিখেছিলাম, জীবনে ন্যূনতম চাহিদা রাখতে , বড়োদের শ্রদ্ধা করতে, নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, সমালোচনা হজম করতে, জীবনটা উপভোগ করতে আর সবচেয়ে বড়ো কথা, পড়ার বইয়ের বাইরেও বই পড়তে । সেই ক্লাস ফোর থেকে দু বেলা লাইব্রেরি যেতাম । এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট আমাদের দুনিয়াটা বদ্ধ জলায় পরিণত করেছে । আমরা এখন শ্যাওলার মতো বাঁচি !
আজ ফিরে চাইলে ভাবি, তিরিশ-চল্লিশ টাকায় কী করে কেউ পড়াতে পারে ! চাহিদা এত কমতে পারে ! আসলে তিনি টাকার জন্য পড়াতেন না, পড়াতেন ভালোবেসে । তিনি যতবার বকেছেন, প্রতিবার অনুভব করেছি ভিতরে ভিতরে তিনিই কোথাও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছেন । তারপর বড়ো হলাম । মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স, এম-এ, ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা প্রকাশ, প্রথম চাকরি, প্রতিবার দেরিতে হলেও, তাঁর কাছে মিষ্টি হাতে গিয়েছি । তিনি আমার নিয়ে যাওয়া মিষ্টি আমাকেই জোর করে খাইয়ে দিয়েছেন, প্রায় প্রতিবার । আজও যখনই তাঁর কথা মনে করি, একটা গন্ধ মনে পড়ে যায় । তাঁর বাড়িতে গেলেই গন্ধটা পেতাম — ভালো-মানুষের গন্ধ । এই যে চোখের কোণে প্রাপ্তির আনন্দাশ্রু চিকচিক করছে, স্যার সুবল দত্ত মশাইয়ের কাছে এই আমার পরম পাওয়া । তিনি সম্পর্কে আমার জ্যেঠু ও হন — কিন্তু স্যার বলতেই ভালো লাগে । ভালো থাকবেন স্যার ।



0 Comments