হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


আসমান জমিন ফারাক ছিল না
(কবি শঙ্খ ঘোষকে নিবেদিত)
সুধাংশুরঞ্জন সাহা

আসমান জমিন ফারাক ছিল না সেদিন।
এতো ধীর, স্থির, আজ মনে মনে ভাবি।
কতোদিন গেছি তাঁর ঈশ্বরচন্দ্র আবাসনে।
তুমুল আড্ডার মাঝে
প্লেট ভর্তি মিষ্টি আসতো, চা বিস্কুট আসতো
মৃদু হাসিমাখা মুখে তিনি শুনতেন বেশি,
বলতেন খুব কম এবং কদাচিৎ।
দু'একটি শব্দে তিনি বোঝাতেন তাঁর 
তীব্র উপস্থিতি। বদলে যেতো আড্ডার বাঁক।
সেই আলোচনায় থাকতো সাহিত্য,দর্শন,
বিজ্ঞান, অর্থনীতি,রাজনীতি, রবীন্দ্রনাথ
অথবা শান্তিনিকেতন।
শেষবার যখন গিয়েছিলাম অন্য একদিনে।
কুড়ির জানুয়ারির কোন এক সকালে।
গিয়ে দেখি তিনি নিচে নামছেন
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে বিদায় জানাতে।
পরে তাঁর সঙ্গে গেলাম সেই পরিচিত ঘরে।
আমরা ছিলাম কয়েকজন, ছিল একটা শিশুও।
সেই শিশুকে দেখে তাঁর কী আনন্দ!
তাকে ঘিরেই তাঁর যত কথা, জিজ্ঞাসা।
সেদিন বুঝলাম তিনি শুধু কবি নন, মনীষী।
তাকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

       কবি সুধাংশুরঞ্জন সাহা
৫৭/৬ এ/২ সন্তোষ রায় রোড
শিবম অ্যাপার্টমেন্টস
কলকাতা - ৭০০০০৮














 

সৌমিত্র চ্যাটার্জী'র দুটি কবিতা 

আমি শুনতে পাই না

জানালা দিয়ে শব্দ ভেসে আসে
আমি শুনতে পাই না
শ্রাবণের ডাকে প্রাণিত প্রশান্ত নদী 
মেহনতি ঢেউ এর গর্জন 
সংবহনের ক্লেশে

আমি শুনতে পাই না 
বীজ ফোটে ভাবনার 
বৃষ্টির বাদামী ধোঁয়ার অবকাশে

দেখতে পাইনা আমি, মেঘ
তুমি উড়ে যাও 
মদালসা প্রেমে...

আলোড়ন

ভেসে আসে আলোড়ন 
বাষ্প জড়ানো অর্বাচীন আকাশে 
শির শিরে মনের শীর্ণ মাস্তুলে 
জমেছে দুর্বলতা
সারি সারি কল্পনা, শূন্যের সাদা চাদর

ভেঙেছিল পাড় মিষ্টিজলের পতনে
জাড্যের মত বাড়ে কমে স্রোত
পাঁজর-কাঁপানো সক্ষম বালিয়াড়ি
ডুবেছে অবিরত  

পিছনে উপদ্রুত মরু, ছায়াময় দুর্ঘটনা
ধ্বংস হয়েছে হৃদয়ের কলরোল
বুকে নিয়ে হেমন্তের
অপ্রত্যাশিত বারুদ...

কবি সৌমিত্র চ্যাটার্জী
শংকরপুর, পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ
















কবিতার 
জয়ীতা চ্যাটার্জী

কবিতা তো সাদা আগুনে জ্বালা বিস্ময়
ভেসে ওঠা ম্লান, খনির ভেতর থেকে মনি,
মায়ের মুখ যেমন হয়।
কবিতা তো পৃথিবীর ধাতুর মতন,হলুদ পাখিটা যেমন,
বা মাংসের গিঁট ছেঁড়া মন।
কবিতা তো সকালের মেঘ থেকে বিকেলের মেঘ,
আমার দক্ষিণের ভেজানো কপাট,
হাত থেকে ছেড়ে যাওয়া গরম রেত।
কবিতা তো বানিয়েছে শরীর তার কুয়াশায়
এ পৃথিবী বোঝেনি তার গল্প,
জানেনি তার দহন হায়।।

কবি জয়ীতা চ্যাটার্জী
নাগবাগান রোড, শ্যামনগর, পশ্চিমবঙ্গ








ইছামতী
মোহনা মজুমদার 

যতটা বন্যতায় মানচিত্র এঁকে রাখো
প্রজাপতির ডানায় চেপে-
ততটাই যত্নে প্রেমিকার বুকে লিখে রাখো বিষন্নতা
নীলচে গালিচা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বুনো অর্কিড
ভেসে যায় ইছামতীর ঘোলাটে জলে -
স্তব্ধতার ভেতরেও যে আর্তনাদ প্রেমিকের ছোঁয়া খোঁজে-
তাকে লুকিয়ে রেখো ডিলিটেড ম্যাসেজের ভীড়ে -
গোধূলি আলোয় রাঙা হোক রেজিকনেশন লেটার
উল্টে পাল্টে যাক ত্রিকোনোমিতির শেষ ধাপ। 

কিছু ব্যাথারা অব্যক্ত, কিছু শূন্যে আবহমান। 
রয়ে যাওয়ার ভেতর যেভাবে কিছু সমঝোতা
সালোকসংশ্লেষ ঘটায়, 
একটা একটা দিন ফুরিয়ে আসে ,
জমে থাকা কিছু আবর্জনা বহন করে নিয়ে যায়
শেষ পর্যন্ত !
কথা ফুরোয়,তবু রয়ে যেতে হয় ,মুখোমুখি-
মাঝে রয়ে যায় একগুচ্ছ ছুঁতে না পারা হিসেব। 
প্রয়োজনীয়তা আর ঐচ্ছিকের মাঝে যতটা দূরত্ব
মাঝে পড়ে থাকা কিছু উপস্থিতি আর অস্তিত্বের লড়াই-
যেটুকু অনুভূতি অবশিষ্ট আছে তাকে আজ
ভাসিয়ে দেবো ইছামতীর ঘোলাটে জলে।

কবি মোহনা মজুমদার 
গড়িয়া, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 





























শব্দহীন 
( কবি 'শঙ্খ ঘোষ' স্মরণে )
দীপক বেরা 

"কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়" 
এমনই নিচু স্বরে উচ্চারণের পংক্তির মধ্যে 
তুমি এক লুকিয়ে থাকা বিক্রমী তেজ
যা কখনওই
বিজ্ঞাপনের রঙ বাহারে ঝলসে ওঠে না 
অন্তরে নিরন্তর ধিকি ধিকি জ্বালায় পোড়ায়
তুমি মধ্যবিত্তের আত্মবিক্ষণের উপায় 
মনের গহীনে নিহিত পাতালছায়ার সঙ্গে 
আকাশপরিধির দ্বন্দ্ব কে খুঁজে পাওয়ার ভাষা 
তুমি সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে
নিচু স্বরের এক সংবেদী প্রতিস্পর্ধা
তুমি 'শব্দহীন' এক বহমান প্রত্যয়ী প্রতিবাদ! 

  কবি দীপক বেরা
   হরিদেবপুর, টালিগঞ্জ, কলকাতা


*ছবিঋণ- সুব্রত চৌধুরী














পতাকা 
সোমনাথ বেনিয়া 

বাড়িটাকে সবাই পাগলদের বাড়ি হিসাবে জানে। দুটো পাগলির এবং একজন পাগলের বসবাস। সম্পর্কে ভাই-বোন। যাই হোক তাদের একটা নারকেল গাছে তিনটে রাজনৈতিক দলের সদস্যরা তাদের যে যার দলের পতাকা বেঁধে গেছে। এই দেখে ছোটো পাগলির গালাগালি শুরু। তবুও কে শোনে পাগলদের কথা! তখন ছোটো পাগলি এসে সব পতাকাগুলো খুলে বড়ো পাগলি ও পাগল দাদাকে নিয়ে ছাদে উঠলো। তিনজনে তিনটি পতাকা নিয়ে মিছিলের ভঙ্গিতে ছাদে ঘুরতে লাগলো আর হাসাহাসি শুরু করে দিলো। ঠিক সেই সময় ধপ করে একটি শব্দ হলো অর্থাৎ নারকেল পড়লো। ছাদ থেকে যতটা উঁকি দিয়ে দেখা যায় ততটা তারা দেখলো। দেখতে না পেয়ে তিনজনে নিচে নেমে আসলো। এদিক-ওদিক যত্রতত্র খুঁজলো। কিন্তু পেলো না। অবশেষে হতাশ হয়ে তিনজনে পতাকাগুলোকে ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিয়ে বাড়ির ভিতর চলে গেল। 
     এদিকে সুভাষ কাকিমা নারকেল পড়া খেয়াল করতে পেরেছিলো। তিনজনের কাউকে দেখতে না পেয়ে চুপিসারে পতাকাগুলো সরিয়ে তার তলা থেকে নারকেল তুলে নিজের ঘরের দিকে দ্রুত হাঁটা লাগালো। একেই ড্রেন, তার উপর পতাকা নিয়ে মেতে থাকায় তিনজনের কারোর মাথা কাজ করেনি। নারকেল তো পাওয়া গেল কিন্তু আজ প্রায় ছয়-সাত বছর হতে চললো, কাকিমার একমাত্র ছেলে কোন পতাকার তলায় চাপা পড়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে গেল, তা তিনি এখনও জানতে পারেননি...

সাহিত্যিক সোমনাথ বেনিয়া
নিমতা, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ


*ছবিঋন- লালিত কাপুর 























গগনপার
শৌভিক চ্যাটার্জী 

রাগি সূর্য প্রতিজ্ঞা করেছে সব পুড়িয়ে ছারখার করে ছাড়বে।মনে হচ্ছে আকাশ থেকে যেন জ্বলন্ত পারদ ঢালছেন ভগবান।চামড়া চটচট করে পুড়ে যাচ্ছে।রাস্তার ধারের বাড়িঘর গুলোকে মনে হচ্ছে বৈশাখের দুপুরে ঘর্মাক্তকলেবর,ক্লান্ত।সারিসারি বাড়ি ঝিমোচ্ছে।গাছপালা গুলোরও একই দশা।কেমন যেন রক্তশূন্য ভাব।থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে।
আর দাঁড়িয়ে আছে গগন। তিন মাথার মোড়ের মাথায়,এই ভর দুপুরে একজন মধ্য তিরিশের মানুষ ঠায় দাঁড়িয়ে।
            গগন কাসুন্দি ফেরি করে রাস্তায় রাস্তায়।বকুলপুর থেকে শিয়ালদা গামী ট্রেনে উঠে নেমে পরে কোন একটা জনপদে।তারপর সারাদিন ফেরি করে কাসুন্দি। কোনদিন পাঁচশো টাকার কাজ হয়।কোনদিন দুশো।আবার কোনও কোনও দিন শিকে ছিঁড়লে হাজার খানেক টাকারও কাজ হয়।ব্যবসায় গগনের কোনো ইনভেস্টমেন্ট নেই।পুরো টাকা মালিককে দিয়ে দেয়।মালিক টোয়েন্টি পারসেন্ট দেয়।পাঁচশো টাকার কেনাবেচা হলে একশো টাকা গগনের।সরল হিসেব।

গগন অনেকটা গরীব।গগনের সংসার চলে না।সংসার বলতে তিনজনই থাকার কথা।গগন,ওর বউ সন্ধ্যা আর মেয়ে মালতি।কিন্তু দিন পনেরো হল,গগনের বউ ওর পাশের পাড়ার শ্রীধর বৈরাগ্যের সাথে ভাব ক'রে পালিয়েছে।শ্রীধরের ব্লাউজের দোকানে কাজ করে সন্ধ্যা।গগনের বিশেষ দুঃখ হয়নি।শ্রীধরের পয়সাকড়ি আছে।সন্ধ্যাকে ভালোই রাখবে।ভেগে যাওয়ার দু পাঁচদিন আগেই গগনের বউ একদিন অনেক রাতে আদিখ্যেতা গলায় বলেছে,
'শ্রীধরদা আমার বুকের দিকে তাকায়।'
'তুমি কী করে জানলে তাকায়?'
'ও,তুমি বুঝবে না।মেয়ে মানুষে সব বুঝতে পারে!'
'তুমিও ওর দিকে চেয়ে থাকো বুঝি?'
'তা মাঝেমাঝে! বেশ লাগে জানো। বেশ শক্তপোক্ত ব্যাটাছেলে যাকে বলে আরকি!'
গগন একদৃষ্টে চেয়েছিল বউ এর চোখের দিকে।এমন দীঘল চোখ বড় একটা দেখা যায় না।এমন চোখ থাকলে যে কোনো পুরুষের বুক শুষে খালি করে দেওয়া যায়।গগনেরও তাইই হয়েছিল।বিয়ের সময়।সন্ধ্যার খুব একটা দোষও নেই।দুবছর হল,ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে পড়ে গিয়েছে গগন।মাজায় ভয়ঙ্কর চোট।তারপর থেকে সম্ভোগ করার শক্তি খুইয়েছে গগন।সম্ভোগের পিছুপিছু আদর,সোহাগ সবই গেছে।সারারাত ছটফট ক'রে, ভোরবেলা সন্ধ্যাকে কুয়ো তলায় গায়ে জল ঢালতেও দেখেছে গগন।তবু একবারও গায়ে হাতটুকু দিতেও দেয়নি সন্ধ্যা।গগনের পৌরুষের একমাত্র এবং শেষ চিহ্ন ওদের মেয়ে।ওরই ঔরসজাত।সবাই বলত,'বাপের মুখটা কেটে বসানো,থুতনির জরুলটা পর্যন্ত বাপের মত!'
ভালবাসা,স্নেহ,মায়া,মমতা সবটাই ওই মেয়ে।বাপের মেয়ে অন্ত প্রাণ। মেয়েরও আজন্ম তাই।সেও বাপ ছাড়া কিচ্ছু বোঝেই না।কাজে বেরবার সময় রোজ ছুটে আসে।জুলজুলে চোখ ক'রে বাপের দিকে তাকায়।গগন জানে মেয়েকে। বোঝেও।সারাদিনের কাজের শেষে গগন চকোলেট নিয়ে ফেরে।মেয়ে বাপের কোলে বসে সে চকোলেট খায়।তারপর বাপের গালে একটা চুমু খায়।বাপ বেটির কপালে চুমু খায়।বাপ মেয়েকে,'মা,মা রে!'বলে ডাকে।মেয়ে একমুখ আদর নিয়ে বাপের কোলে জড়সড় হ'য়ে বসে।যার একচোখ ভাষা,তার কন্ঠে স্বর দেয়নি ভগবান।গগনের মেয়ে মূক ও বধির। নপুংসক স্বামী আর পঙ্গু সন্তানে অতিষ্ঠ হয়ে থাকত সন্ধ্যা।চারবছরের মেয়েকে প্রায় একা কোলেপিঠে করে রাখত গগন।মাকে ফেলে বাপের গায়ের ওপর  ঘুমোত মালতি। মেয়ের গন্ধ লেগে থাকত বাপের শরীরে,মনে আর আত্মায়।সেই গন্ধ নিয়ে সারাদিন কাদুন্দি বেচত গগন।মনে হত,স্বর্গের লক্ষী ঠাকুর মেয়ের গন্ধ হয়ে আশীর্বাদ করছেন গগনকে।
       সন্ধ্যার ওপর গগনের খুব রাগ।নাহ্!সে ও শ্রীধরের সাথে পালিয়েছে বলে না।ওর জন্যই বাড়ি ফিরে মেয়ের মুখটা আজ আর দেখতে পায় না গগন।মেয়েটার একটাই ছবি ছিল।লাল টুকটুকে ফ্রক পরে,হাতে বল নিয়ে।গগনই স্টুডিয়োতে গিয়ে তুলে এনেছিল।বাঁধিয়েও এনেছিল।'ওই ছবিটাই একমাত্র ভরসা ছিল,সেটাও নিয়ে গেল মাগী!'একমাত্র ভরসা কারণ,দিন সাতেক হল,গগনের মেয়েটা মারা গেছে।আর নেই।তিনদিনের ধুম জ্বর।আর ভীষণ শ্বাসকষ্ট নিয়ে মেয়েটা চলে গেল।হাসপাতালে বেড পেয়েছিল কিন্তু কেউ ভালো করে ছুঁয়েও দেখল না।মেয়েটা বাপের সামনেই গুঙিয়ে গুঙিয়ে চলে গেল।কথা তো বলতে পারত না,কিন্তু ওই অস্ফুট গোঙান থেকেই গগন শুনতে পেত,'বাবা,খুব কষ্ট হচ্ছে!'চোখের সামনে চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটা মারা পড়ল।বেখয়ারে।আসলে গগনের সংসারে কেউ নেই।ফাঁকা।সংসারে গগনও নেই।গগনেরও সংসার নেই।
 
[২]
    
এই প্রখর দুপুরে,প্রায় অজানা শহরের তিনমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে গগন।হাতের কাসুন্দির ব্যাগ বড় ভারী।তবু কিছুই মালুম পাচ্ছেনা ও।আসপাশের সমস্ত ঘুমন্ত বাড়ি গুলির মধ্যে,একটা বাড়িতে চোখ আটকে আছে গগনের।আবিষ্ট চোখে,এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে গগন,বাড়িটার দিকে।একতলা বাড়ি।বোঝা যায়,সারা বাড়ি গভীর তন্দ্রায়।কিন্তু ছোট্ট একটা মানুষ বাইরের বারান্দায় খেলছে।খেলনাবাটি।ছোটো ছোটো হাঁড়ি,কড়াই,হাতা,খুন্তি,স্টোভ সাজিয়ে  তৈরি করেছে কল্পনার সংসার।আপন মনে কীসব বকবক করছে।সেই এক মুখের ধাঁচ। ঘাড় পর্যন্ত কোঁকড়া চুল।শ্যামলা রঙ।দীঘির মত ভড়াট চোখে।হাসি হাসি মুখ।'মা,আমার মা,মালতি মা।মা তুই এখানে!'মেয়েটিকে দেখে অদ্ভুত ভ্রমে ভাসতে থাকে কন্যা হারা পিতা।একপ্রকার অবশ হয়েই এগিয়ে যায় গগন।ছোটো গ্রিলের গেট খুলে,বারান্দায় উঠে যায়।পারিপার্শ্বিকতার ধরাছোঁয়ার বাইরে,পিতৃত্বের এক স্বর্গসুখে আচ্ছন্ন হতে থাকে গগন।শিশুটিকে কোলে তুলে কপালে চুম্বন এঁকে দেয়।'মা,মা গো কোথায় ছিলি তুই!'
শিশু কন্যাটি চমকে ওঠে।চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।বাড়ির ভিতর থেকে রূদ্ধশ্বাসে বাইরে আসে মেয়েটির মা,বাবা এবং আরো কেউ কেউ।'এই তুমি কে?'গগন নিরুত্তর। সে তার হারানো মেয়ের চোখের জল মোছাতে ব্যস্ত।
'চোর,চোর ছেলেধরা ছেলেধরা..!
ভয়ার্ত চিৎকারে জুটে যায় বেশ কিছু মানুষ।
'এর আগেরটাও তার মানে এই করেছিল!'
'মালকে পুলিশে...'
'ধ্যার পুলিশ।ক্যালাও..'
কলার ধরে গগনকে নামিয়ে আনা হয় রাস্তায়।গগনের চোখ তখনো মেয়েটিতেই আটকে।পিছন থেকে ঘাড়ে কেউ একটা রদ্দা মারলে গগন পড়ে যায়।তারপর বুকে নেমে আসে লাথি।মুখে লাথি।পেটে লাথি।তলপেটে লোহার রড় জাতীয় কিছু একটা দিয়ে প্রবল আঘাত।মাথায় একটা থান ইঁট দিয়ে বারি দেয় কেউ।মাথা উপচে রক্তে থইথই করছে রাস্তা।
গগন চোখ বুজচ্ছে। আহা!কী আরাম।ওই তো আর একটু এগোলেই মালতিকে ছুঁতে পারবে গগন।লাল টুকটুকে জামা পড়ে,হাতে বল নিয়ে খেলছে মেয়েটা।দুহাত বাড়িয়েছে বাপের দিকে।গগন এগিয়ে যাচ্ছে সাদা আলোর দিকে।

শৌভিক চ্যাটার্জী 
কালনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ





















হালখাতা 
সৌমী গুপ্ত 

গ্রামের বাজারের মুখেই দোকানটা নতুন খোলা হয়েছে।নাম পরিধান।পয়লা বৈশাখের দিন উদ্বোধন। সুবিমলবাবু সকাল থেকে ব্যস্ত।উপচে পড়া ভিড়ে ঠাসাঠাসি লোকজন। মাঝেমধ্যেই বাবার কথা মনে পড়ছে। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দিনে পয়লা বৈশাখ এলে বাবা হাত ধরে মালিকের দোকানে নিয়ে যেত। সারাদিন কাজকর্ম করতে করতে ক্ষুধার্ত চোখ চলে যেত সাজানো মিষ্টির প্যাকেটের দিকে। ক্ষিদেটা যখন মরে যেত তখন হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত মাছি ভনভন করা মিষ্টির প্যাকেটটা।তাই গোগ্রাসে গিলত সে। 
বাইরে কাঠফাটা রোদ। সবকিছু সামলাতে গিয়ে সুবিমলবাবু ঘেমেনেয়ে একসা। এরইমধ্যে হইহট্টগোল শুনে বাইরে এসে দেখেন দোকানের একপাশে থরেথরে  রাখা  মিষ্টির প্যাকেটের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকা জীর্ণ পোশাক পরিহিত ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে কয়েকজন তিরস্কার করছে,"কোত্থেকে এসে জুটেছে যত হাড়হাভাতে হ্যাংলা!" 
সুবিমলবাবু হুংকার ছাড়লেন ওখানে দাঁড়িয়েই,"এই ন্যাপা ভিতর থেকে একটা তিরিশের গেঞ্জি আর মিষ্টির প্যাকেট দে দেখি ছেলেটার জন্য...আর এইযে আপনারা একটু সরুন তো...এতক্ষনে আমার হালখাতা সফল হল।"

সাহিত্যিক সৌমী গুপ্ত
১৬২, রাইফেল ক্লাব রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ












সবই প্রতীক্ষা, সবই বিস্ময়
অমিত চক্রবর্তী

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি জ্যোর্তিময়,কি বলব তোমায়
আজ সকালটাই দ্যাখো –
মতি নন্দীর স্টপার পড়ে ফোঁপানি খানিক
অজানা, ভ্রান্তপথে ঘোরা কিছুক্ষণ
তারপর যৌবন মোহানায় নির্বাণ খোঁজা।
ডেবি হ্যারির গোলাপি অধরে। তাঁর বয়সও এখন
সত্তরের ওপর। মুচো মিসট্রাস্ট,জ্যোর্তিময়
মুচো মিসট্রাস্ট। অথচ যা কিছু নবীন
সবই বাঞ্ছনীয় নয়। আপনমনে দেওয়ালে
দাগ কাটাই কি ধর্ম এখন,গেঁথে দিই তবে                কবিতার অংশ
চার দেয়ালের মধ্যে – গ্রাফিতি, বীরত্ব,আঁকিজুখি
সবই প্রতীক্ষা, সবই বিস্ময়, সবই ম্লান
দ্বিরাগমনের আশা। কোনদিন সে দাঁড়াবে এসে –
এক বিষণ্ণ ভোরে, হঠাৎ ঝড়,জয়ধ্বনি
বড্ড কষ্ট পাচ্ছি, বাবুল,মনখারাপে ত্র্যস্ত ছিলাম কদিন
আজ সকালে আবার কবিতা পড়ে,দৌড়ে…



কবি অমিত চক্রবর্তী
ম্যানহাটান, আমেরিকা














মনের আলো

দিনের আলোর তীব্রতা যখন ফুরিয়ে আসে
     তখনই কিন্তু অন্ধকার নেমে আসে না 
বরং আবছা আলোয় মনের প্রদীপ জ্বলে 
হৃদকমলের কোষগুলো পুড়তে থাকে
     আর ছড়াতে থাকে জ্বালাধরানো আলো
     ধীরে ধীরে জ্বালা প্রশমিত হলে-
     আলো যায় নিভে, নামে অন্ধকার 
হ্যাঁ,মনের প্রদীপ নিভে গেলেই প্রকৃত অর্থে-
     নেমে আসে নিকষ অন্ধকার
                    অনিবার্য অন্ধকার 


কবি পার্থ সারথি চক্রবর্তী 
কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ












উড়ান 

আজ, নববর্ষের প্রভাতী শুভেচ্ছায়
কথামালার কবিতা উপহার ছাড়া
সেরকম মহৎ কিছু দেওয়ার নেই আমার
শুধু জানি, 
আবার শুরু হবে একটা দীর্ঘ উপন্যাস
বিবিধ ঘটনাক্রম, চরিত্র সংলাপ ও দৃশ্যাবলি
অভিনব মঞ্চসজ্জা, আর তার জটিল বিন্যাস।

পাখিদের ওড়াউড়ি দেখি
পাড়ার হাবলু টা পায়রা ওড়াচ্ছে, 
আমি আর উড়তে পারি না কেন?  
বুড়ো শালিক টা খুঁটে খুঁটে দানা খায় 
বয়স হয়েছে, পালক খসে পড়েছে দু-চারটে 
আদিগঙ্গার পাড়ে ভাত ফুটছে টগবগ করে 
বাড়াভাতের থালায় দাঁড়কাক মুখ দিতে যায় 
রে-রে করে তেড়ে আসে মালতির মা
প্রাত্যহিকতার রোজনামচায় ভোট-যুদ্ধ
খেলা,.. আর খেলা ভাঙার খেলা 
ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, কর্কশ-কদর্য চর্চায় মাতোয়ারা
ভেসে আসে অজানা শব্দ, বিচলিত নই
দাম্ভিকতার টুকরো ছবি ভাসে আঠাশের আয়নায়! 

দিন কাটে, বয়স বাড়ে উপন্যাস ফুরোয় না
বছর ঘুরে যায়, আবার ভোট আসে 
ঘটা করে প্রত্যেকবার নববর্ষও আসে.. 
ও বলে--
বিদ্যুৎ, ওষুধ? এত খরচ! কিন্তু, কীভাবে? 
জীবনে একটা উড়ান উড়তে চেয়েছিলাম
আমি আর উড়তে পারি না, 
শুধু ওড়াউড়ির ভাণ করি, এই সামান্য বেতনে!

  কবি দীপক বেরা
   হরিদেবপুর, টালিগঞ্জ, কলকাতা













একটি প্রেমের বিজ্ঞাপনে

ধরো,
আজ মৃত্যুর রাত
কাল আমার সমাধীতে ফুল দিতে যাবে--
তুমি ও তোমার মন।

ধরো,
আজ আমাদের দেখা হলো
বৈশাখ রাতের মেঘময় দুঃস্বপ্নের ভিতর
তুমি হীরের আংটি পরে বসে আছো
একটি প্রেমের বিজ্ঞাপনে।

আছি তোমার অপেক্ষায় 

ভোর হয়ে আসছে---
একটা স্বপ্ন এসে বলছে
বন্ধু, এবার ঘুমাও...
আর তোমার চুল ছুঁয়ে আসা বাতাস
বলছে---জেগে ওঠো।
ঘুম ও জেগে ওঠা---
দুটোকেই এক সঙ্গে নিয়ে
আছি তোমার অপেক্ষায়। 


বসন্তলিপি

আমাদের সব
পাতা-ঝরা প্রবণতা।
সে আসে তবু
ফাল্গুন ফিকে হয়ে যায় 
ধুঁকে ধুঁকে চৈত্র, 
মাধবীলতায় ছাওয়া 
এই যে কবিতাকুন্জ্ঞ
একদিন এভাবে 
ঝরে যাবে ঋতুহীন...


কবি প্রেমাংশু শ্রাবণ 
যশোর, বাংলাদেশ

























নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • ধোঁয়াশা অথবা ছেলেবেলার ডাকনাম ~ সুকান্ত মণ্ডলের কবিতা
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates