হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


জীবনের ছলাৎছল্ 
দীপক বেরা 

দামাল কৈশোরে চিনেছিলাম 
ঘাস মাটি আগুনের সমতার সমীকরণ 
পৃথিবীর বুক জুড়ে বেড়ে ওঠার আশ্চর্য খেলা।
তারপর --
অমীমাংসিত সূত্রে নির্মিত অনিয়মের বাঁধ 
ভাঙতে থাকা কোষকলার অবাধ্য প্রোটিন 
ভেঙে যায় দীর্ঘ সংযমের বাঁধ, তখন
অসমাপ্ত লিখনের উপরে নদী বয়ে যায় 
নদী লেখে তার স্রোতময় ভ্রমণ-বৃত্তান্ত 
ধ্বংসের উপত্যকার গভীর থেকে 
বেরিয়ে আসে অবিকৃত সব ফসিল
জলাধার মাটি নদী ও নদীর সভ্যতা
ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত প্রতিটি অক্ষর! 

বারণ ছিল তাই ওঠেনি সূর্য এতদিন 
মেঘের নিবিড় অবরোধ ভেঙে 
নেমে আসে সেই সোনালী রোদ্দুর 
নদীর বুকের ভিতর তখন অক্লান্ত গতি
কেবলই বয়ে চলার গতি, আবহমান.. 
মাটির সঙ্গে শুয়ে মাটির গন্ধমাখা কথকতা
কত গল্পগুচ্ছ কথামালা আছে তার 
সংগোপনে লিখে রাখা প্রেম কাব্যিকতা 
অনেকদিন পর পান্ডুলিপির শরীর খুলে
দুর্বার সাহস এসে পাশে দাঁড়ালে
অক্ষরমালায় শব্দের বাক্যবিন্যাসের ভিতর 
অনন্ত থেকে অসীমের পথ ধরে 
ভেসে আসে ভাসমান নৌকার গান 
সেদিনের পরিচিত সেই অবিকল 
বহমান জীবন তরঙ্গের ছ লা ৎ ছ ল্ ! 

  কবি দীপক বেরা
   হরিদেবপুর, টালিগঞ্জ, কলকাতা





















কবিতা 
শুভশ্রী গুহ দে

ভেবে রেখেছি পরজন্মে কবিতা হয়ে জন্মাবো,তারপর প্রকাশক।
ছেপে দেবো আমায়,তোমার কোন এক প্রিয় কবিতার ব‌ইয়ে।
যখন তুমি পরম মমতায় ব‌ইটি খুলবে,সে‌ই ব‌ইয়ের কোন এক পৃষ্ঠায়;
হয়তো ঊনিশ,বিশ কিংবা ত্রিশ এ আমি থাকবো কালো ছাপা অক্ষরের লেখা হয়ে।
চিনতে পারবেতো আমায়? হয়তো পারবে হয়তো বা না।
অন্ধকারে যখন জোনাকিরা নিজেদের জ্বালাবে ,
একটা দুটো তারা খসে পড়বে তোমার মনের ছাতে,
তখন আমার সমস্ত লা‌ইন,দাড়ি,কমা খুঁটিয়ে
খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে পড়ো কিন্তু।
তোমার কাছে আমার কিছু গল্প জমা আছে;
আমার মেয়েবেলার মহাকাব্য।
কোন এক ব‌ইমেলা সংখ‍্যায় ছেপে দেবো ফাগুনের শেষে।
দেখবে কবে নীলপাহাড়ি ছুঁয়ে ফেলেছে অলকানন্দা উচ্ছ্বাসে।
পড়া হয়ে গেলে পৃষ্ঠাটি ছিঁড়ে ফেলতে পারো,
তবে যেটাই করো কবিতাটিকে তোমার শব্দকোষ থেকে একটা পরিচয় দিও।

শুভশ্রী গুহ দে
                                  পুণে, ভারত 



















সুদীপ্ত বিশ্বাসের তিনটি কবিতা 

স্বপ্ন কথা 

সেই মেয়ে মাঝে মাঝে পাশে এসে বসে 
মেলে দ্যায় তার চুল, হাসে মৃদু মৃদু
যখন ঘুমিয়ে আমি আধো আধো ঘুমে
স্পর্শ পেয়ে ধড়ফড় জেগে উঠি সুখে
রাতের আকাশে চাঁদ একা ভেসে যায়
সবাই গভীর ঘুমে, নিশুতি নিঝুম
শেষ রাতে চুপচাপ একা জেগে থাকি
তার স্পর্শ, তার গন্ধ জড়ানো শয্যাতে... 

ছাই মাখা স্মৃতি  

নদী চেয়ে চেয়ে আমি ফুরিয়ে গিয়েছি
অতীতের কত ছবি ভিড় করে আসে
মাটি খুঁড়ে পাই শুধু শাদা হাড় গোড়
দুহাতে সরিয়ে শুধু  চুপচাপ বাঁচি
জল, তুমি জল নিয়ে আসো না কখনও 
দাউ দাউ তাই শুধু জ্বলে পুড়ে মরি
পোড়া মনে শুধু ছাই, ছাই মাখা স্মৃতি ...

কালচিত্র

জীবনটা তো গেল প্রতীক্ষায়
অঢেল সময় নেই কারও, ঘণ্টা বাজে
কারা যেন ডাকে, আয় আয়...
পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছি গাছ
সহস্র স্রোতের টানে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে
তুমি কি নদী হবে না আজ?
নদী হও, হও নদী, বয়ে যাও
অজস্র ধারায়। দুকূল ভাসিয়ে নদী
আমাকে পাগল করে দাও।
ভেসে যাওয়া ? সেটাও সার্থক।
শ্মশান যাত্রীরা চলে গেলে, পাখি ডাকে-
গৃহস্থের খোকা হোক।

কবি সুদীপ্ত বিশ্বাস 
রানাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ




রচয়িতা দাঁ'র ছোটগল্প
দূরদ্বীপবাসিনী

"আজি ঝড়ো ঝড়ো মুখর বাদরদিনে..."

ঘরের মধ্যে একা একাই গুন গুন করে চলেছে দীপা। কর্মসূত্রে চারদিনের জন্য কালিম্পং এসেছে ওরা। টীমে একটি মাত্র মেয়ে দীপা ফলে তার জন্য হোমস্টের একটা সিঙ্গেল রুম বরাদ্দ হয়েছে। কাল রাত থেকে এখানে বৃষ্টি হয়েই চলেছে, তাই আজ সবাই অফিসে ডুব মারার প্ল্যান করেছে। এই প্রথমবার বিয়ের পর নাবিককে ছেড়ে একা বাইরে এসেছে দীপা। নানারকম বাস্তব অবাস্তব অযুহাত খাঁড়া করে এতদিন বাইরে যাওয়াটা আটকে রেখেছিল দীপা, কিন্তু সেটা তো সবসময় সম্ভবপর নয় আফটার অল যত ভালো চাকরি কেউ করুক না কেন, 'চাকরি যে করে সে চাকর'। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং আরও কিছু অসুবিধার কথা বলে কলকাতা থেকে কালিম্পং পাঠানো হয়েছে চারজনের একটি টীমকে। নাবিক আসতে চেয়েছিল কিন্তু এতো শর্ট নোটিশের অর্ডার, ও ঠিক ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি। অতএব চারদিনের অনন্ত বিরহ। সারাদিন কাজের ফাঁকে দু-একটা কথা আর রাতে ভিডিও কল, তাও যদি ভাগ্যক্রমে নেটওয়ার্ক থাকে। দীপাদের কর্মক্ষেত্রগুলো সাধারণত এরম জায়গাতেই হয়, শহর বা লোকালিটী থেকে একটু দূরে হয়।

চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা, সেখানে নানারকম পাহাড়ি গাছ, ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়ি ঝর্ণার কুলকুল শব্দ, কত রকম পাখির ডাক, শহরের কোলাহলের বাইরে নিস্তবদ্ধতা, দূষনমুক্ত খোলা আকাশ, মনোরম আবহাওয়া সবমিলিয়ে রোম্যান্টিক পরিবেশ। আর এরম পরিবেশে মনের মানুষটার সাথে বিলীন হয়ে যেতে না পারার যে বেদনা তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। ভালোবাসায় যখন দুজনের হৃদয় ও আত্মা এক হয়ে যায় তখন আর চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হবার ভয় থাকে না। কিন্তু দুটো শরীর, মন, হৃদয়, আত্মা একত্রে বিলীন হয়ে যাবার পরও যদি আবেগঘন মুহুর্তে বা কোনও রোমান্টিক পরিবেশে প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাবার মুহুর্তে কাছে না থাকা মনের মানুষটি র জন্য বিরহে মন হাহাকার না করে, হৃদয়ের গভীরে পরম শান্তিতে বাস করা মানুষটিকে যদি কাছে টেনে ভালবাসার উষ্ণতায় ও আদরে  ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে না করে তাহলে ধরে নিতে হবে সে হয় পাথর নয় সাধু-সন্ন্যাসী, যিনি সকল মোহ-মায়া ত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছেন। এখনকার উন্নত প্রযুক্তির যুগে অন্তত ভিডিও কলিং এর দৌলতে দূরত্ব কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে ঐ 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো' ধরনের কিন্তু তার জন্যে ও দরকার দ্রুত গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট পরিষেবার। নইলে অদৃশ্য সুদর্শন চক্র কাবাব মে হাড্ডির রোল প্লে করবে। দেখলেন হয়তো আপনার পুরুষ সিংহটি হঠাৎ করে আপনার অসাক্ষাতে, আপনার কোনও রকম চোখ রাঙানি ছাড়াই তোতলামি করতে শুরু করেছেন।আপনার অনুপস্থিতিতে কার চোখ রাঙানিতে এরূপ তোতলামি করছে তা অনুসন্ধান করতে এবং এরূপ অবিবেচকের মত পরিষেবা দেবার জন্য আপনি যখন  ইন্টারনেট কোম্পানির মালিকের ওপর রেগে গিয়ে তাকে খিস্তি দিয়ে তার গুষ্টির ষষ্ঠী পূজো করছেন তখন আপনার বরটি হয়তো অপরপ্রান্ত থেকে দেখছেন আপনার মত বাঘিনীও হঠাৎ শক পেয়ে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন, আর যেভাবে থেমে থেমে কথা বলছেন তাতে  মনের আড়াল না হলেও, কয়েক দিনের স্পর্শের অভাবে মানুষ কিভাবে রোবোটে পরিনত হয়ে গেল তা নিয়ে বিস্তর দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে।আর যে হতভাগারা এরম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে সমুদ্র সমতল থেকে পাহাড় চুড়োয় ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রেমালাপ করেছেন তাদের অনেকেই ঐবিশেষ মুহুর্তের সাক্ষী নিশ্চয়ই আছেন যখন দুজনের কথোপকথন বেশ মাখোমাখো জায়গায় পৌঁছে গেছে, সামনে থাকলে যে কোন সময় দুজনের মধ্যে তুফান সৃষ্টি হতে পারতো ঠিক সেই সময় সুদর্শন চক্র ঘুরতে শুরু করল। যাইহোক, গতকাল থেকে ইন্দ্র দেব দীপার প্রেমের বিরূদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন যে এই দুই অসহায় প্রেমিক - প্রেমিকা থুরি নববিবাহিতা স্বামী-স্ত্রীরও এরম করুন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রাত থেকেই কালিম্পং এর যে অঞ্চলে দীপা আছে তার নেটওয়ার্ক নেই। ভিডিও কল তো দূর ফোনে বিবেকের গলার আওয়াজ শোনার সুযোগটাও মিলছে না। একবার কষ্ট করে অন্যের ফোন থেকে কানেক্ট করে কথা বলেছিল দীপা কিন্তু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সে আর কতক্ষণ প্রেমালাপ সম্ভব! আর এটাই মূল কারণ অফিস ডুব মারার। এত দূরে আসার জন্য এমনিতেই মন খারাপ তার ওপর নেটবিভ্রাটে আরো মুড অফ, তাই অফিসে গিয়ে কাজ দেখানো অযৌক্তিক। দীপা তাই আজ ঘরে থেকেই বৃষ্টি উপভোগ করবে মনস্থ করেছে। হোমস্টের সুবিধা হল এখানেই ঘরোয়া খাবারের ব্যবস্থা থাকে, তাই দুপুরের লাঞ্চের চিন্তাও নাই।
 
জানলা দিয়ে দূরের মেঘাচ্ছন্ন পাহাড়ের দিকে একমনে চেয়ে থাকতে থাকতে দীপা টাইম মেশিনে করে চলে গেল বেশ কয়েক বছর আগের দিনগুলোতে। পাহাড় সবসময়ই দীপার খুব পছন্দের।বরফে ঢাকা পাহাড়চুড়ো হোক বা সবুজ পাহাড়ি গাছে ঢাকা পাহাড় কিম্বা উদ্ভিদবিহীন ন্যাড়া পাহাড় যেখানে পাহাড়ের গায়ে শুধুই রঙের বৈচিত্র্য সবই পছন্দ দীপার। পাহাড়ি নদী, ঝরনা, আঁকা বাঁকা রাস্তা, সরল মানুষজন, ভেড়ার পাল,লোম ওয়ালা কুকুর, পাহাড়ের ঢালের চা-বাগান এবং পিঠে ঝুড়ি, বুকে বাচ্চা নিয়ে কাজ করা চা বাগানের শ্রমিক সবই টানে দীপাকে। কয়েক বছর আগে দীপা তখন ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা শেষ করেছে। পুজোর সময় বাড়িতে বসে চূড়ান্ত বোর হয়েছে কারন ওর সব বন্ধুরা তাদের বয়ফ্রেন্ডদের সাথে ঠাকুর দেখতে যেতে বা ঘুরতে যেতে ব্যস্ত। আর দীপা তখনও সিঙ্গেল, কালের নিয়মে দু-একটা প্রেম আসব আসব করছিল কিন্তু ফুল ফোটার আগেই শুখিয়ে ঝরে পড়ে গেছে বিভিন্ন কারনে। সেসব নিয়ে আফশোষ নেই দীপার। কিন্তু কতোদিন পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে অথচ তিন-চারদিনের জন্য ঐ জোঁকের মত লেগে থাকা বয়ফ্রেন্ড গুলোকে ছেড়ে ঘুরতে যেতে পারছে না ওর বন্ধুগুলো, এটাই তখন সবচেয়ে বিরক্তিকর লাগত দীপার । আর আজ ওর নিজের ও সেম হাল। একসময় প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ায় যে পরম শান্তি লাভ করত, একা একাই বেরিয়ে পড়ত রাধিকার মত অভিসারে প্রকৃতি রূপী কৃষ্ণকে আপন করে নেবে বলে; এখন কৃষ্ণ বদলে গেছে আর এই রোমান্টিক পরিবেশ, অফিস অর্ডার সবকিছুই জটিলা-কুটিলার ভূমিকা পালন করছে নাবিকের সাথে মিলিত হতে না দিয়ে। এখন দীপা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সেইসময় ওর বন্ধুগুলো কেনো তিন-চার দিনের জন্য একলা ঘুরতে আসতে পারত না। তখন এগুলোকে ন্যাকামো মনে হত, কিন্তু এখন বুঝতে পারে মন থেকে ভালোবাসলে আর একলা হওয়া যায় না।আর তখন তো ইন্টারনেটের ও এত কম দামে অ্যভেলেবিলিটি ছিল না। নাবিকের সাথে দেখা হওয়ার আগে অনুভূতি গুলো অন্য ছিল, পরিচয়ের পর মূলত সম্পর্কে জড়িয়ে পরার পর অনুভূতি গুলো নতুন রূপ, রস, গন্ধ পেয়েছে।

সেবার কালীপুজোর আগে দীপা বন্ধুদের আশা ছেড়ে দিয়ে একাই বেরিয়ে এসেছিল এই কালিম্পং এরই উদ্দেশ্যে। তখন টিউশনের জমানো টাকায় ঘোরা, তাই সস্তায় নিরাপদ স্থানই বেশি গ্রহনযোগ্য। আর তার জন্য হোমস্টেই আদর্শ।  অনেকদিন ধরে পড়াশোনা, টিউশন, কম্পিটিটিভ এক্সাম প্রভৃতির চাপে ভারাক্রান্ত দীপা সেবার কিছুদিন শুধু নিজের মত করে পাহাড়কে উপভোগ করার জন্য কালিম্পং এসেছিল। উঠেছিল যে হোমস্টেটাতে, সেটা ছিল পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে, ছোট্ট দোতলা একটা বাড়ি। একতলাটাতে মালিকের ঘর, একটা ছোট্ট কিচেন গার্ডেন আর তারপাশ দিয়ে উঠে গেছে কাঠের ঘোরানো সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠলে সামনে ছাদ আর দুটো ঘর। একটা সিঙ্গেল, একটা ডবল। সিঙ্গেল ঘরটা ফাঁকা পেয়ে ওটাই বুক করেছিল দীপা। পাশের ঘরটাও বুকড। ঘরের সামনে একটা ছোট্ট ছাদ সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ছাদে একটা টী-টেবিল, আর কয়েক টা ফুলের টব দিয়ে সাজানো। এক কথায় অসম্ভব সুন্দর। দীপার কপাল জোরে এই ঘরটার আগের রেন্টার কোনও কারনে আগের দিন রাতে চেক-আউট করে গেছেন তাই এই ঘরটা ফাঁকা ছিল। নাহলে এই পিক  সীজনে ঘর পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। হোমস্টের মালকিন ফুলমতিয়া, ইয়ং মেয়ে,একটা দশ-বারো বছরের ছেলেকে নিয়ে থাকে। বর একটা অন্য মেয়েকে নিয়ে অন্য জায়গায় থাকে। হোমস্টের নীচে একটা কমন ডাইনিং রুম, তার পাশেই কিচেন। ফুলমতিয়া নিজেই রান্না করে খাওয়ায়, ভাত, রুটির সাথে লোকাল খাবার ও পাওয়া যায়। দুপুরে খাবার সময় পাশের ঘরের অতিথির সাথে দেখা হল।অদ্ভূত রকম শান্ত একটা ছেলে, কেমন একটা অন্যমনস্ক ধরনের। 

ডাইনিং টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখা রয়েছে। দীপা একটু আগেই নেমেছে। নর্থ বেঙ্গল এর আগেও বহুবার এসেছে দীপা,তাছাড়া এবার একা, কেউ শেয়ার না করলে গাড়ি ভাড়াতেই সব পয়সা শেষ হয়ে যাবে, তাই খুব একটা ঘোরাঘুরির প্ল্যান নিয়ে আসেনি ও, তবে সুযোগ পেলে দশ মিনিটে পিঠে একটা ছোট ব্যাগপ্যাক নিয়ে বেরিয়ে পড়তে সবসময়ই প্রস্তুত সে। সকালে চেক ইনের সময় ই বাচ্চাটাকে দেখেছে, মূলতঃ ওর সাথে ভাব জমাতেই দীপা ঘর থেকে ফ্রেশ হয়ে, বাড়ির লোকের কুশল মঙ্গল খবর নেওয়ার দায়িত্ব শেষকরে ও নীচে নেমে এসেছে। খাবার সময় ফুলমতিয়া কাঞ্চাকে বলল, "আঙ্কেল কো বুলালো বেটা"। কাঞ্চা একছুটে ওপরে চলে গেল, নীচে এসে বলল, "আঙ্কেল শো রাহা থা, লেকিন বোলা আ রাহা হ্যায়"।এরপর তিনি আসেন। দীপা এবং সেই অতিথির সাথে তিনি প্রায় জোড় করেই কাঞ্চাকে ও খেতে বসিয়ে দিলেন।আর খেতে খেতে ওর সাথে গল্প ও জুড়ে দিলেন। দীপার বেশ ভালোই লাগলো তার আচরন কিন্তু তার দীপার প্রতি কোনও আগ্রহ নেই, সুতরাং আগবারিয়ে অচেনা পুরুষের প্রতি আগ্রহ দেখানোটা দৃষ্টিকটু, তাই পরিচয় হল না। ফুলমতিয়া পরিবেশন করার সময় অতিথি বললেন, "যাদা মাত দিজিয়ে ভাবি, তবিয়ত ঠিক নহী হ্যায়।" সামান্য কিছু খেয়েই উঠে চলে গেল সে। লাঞ্চের পর দীপা ও চলে আসে। বিকেলের দিকে একটু আশপাশ টা কাঞ্চাকে নিয়েই ঘুরতে বেরিয়েছিল, তারপর  সন্ধ্যে বেলায় ফুলমতিয়ার হোম মেড ফ্রায়েড  মোমো আর  স্যুপ।তখনই শুনলো পাশের ঘরের ছেলেটা ও নাকি কলকাতা থেকে এসেছে দুদিন হল । কাঞ্চাকে নাকি খুব ভালোবাসে, খেলে গল্প করে ওর সাথে। কলকাতা শুনে পরিচয় করার ইচ্ছেটা বেরে গেছিল দীপার কিন্তু রাতে খেতে এলো না ছেলেটা, দীপা জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, তার নাকি জ্বর এসেছে।এরম অচেনা অজানা জায়গায়  পাহাড়ি এলাকায় এসে জ্বর বাঁধালো ছেলেটা, দীপার কেমন মায়া হল। রাতে খাওয়া সেরে ঘরে ঢোকার আগে দেখল পাশের ঘরের দরজাটা খোলা, ঘরে লাইট জ্বলছে। দীপা কি ভেবে ঘরে নক করে বলল, "May I come in" ।হ্যাঁ, না কোনও স্পষ্ট শব্দই এলো না, কেমন অচৈতন্য হয়ে পড়ে রয়েছে একটা মানুষ। দীপা উত্তরের আশা না করেই এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, "আপনার কি জ্বর এসেছে?", "কিছু ওষুধ খেয়েছেন?" কিন্তু কোনও উত্তর ই স্পষ্ট ভাবে বোঝা গেল না। দীপা বাধ্য হয়ে নিজেই কপালে হাত দিয়ে দেখল বেশ জ্বর গায়ে ছেলেটার। পাহাড়ি অঞ্চলে তাড়াতাড়ি রাত নেমে আসে। আর এতো রাতে কাকে বিরক্ত করবে না করবে কিছুই বুঝতে পারলো না দীপা আবার ঐ অবস্থায় ফেলে আসার মত অমানবিক কিছু হতে পারে না। দীপা নিজের ঘর থেকেই কিছু বিস্কুট, জল, ওষুধ এনে ছেলেটাকে খাইয়ে দিল। ছেলেটা প্রায় ঘোরের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু এত রাতে একা একটা মেয়ে অন্য একটা পুরুষের ঘরে থাকবে এসব ভেবে দীপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে চলে আসছিল, কিন্তু হঠাৎ দীপার ওড়নাতে টান লাগল, ছেলেটা মুঠো করে ধরে যেন একটা আশ্রয় খুঁজছে। দীপা যেতে পারল না, নিজের ওড়না ছিঁড়ে, আর যে কৌটো করে ছেলেটার জন্য খাবার  এনেছিল সেটাতেই জল নিয়ে ছেলেটার মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিল। অন্য সময় হলে দীপার খুব বিরক্ত লাগত, বেড়াতে এসে এসব ঝামেলায় জড়াতে কিন্তু ছেলেটাও এখানে এত অসহায় যে নিমেষে দীপার মধ্যে মাতৃসত্তা উন্মোচিত হল। প্রায় সারারাত মাথায় জলপট্টি দিয়ে ভোরের দিকে জ্বর প্রায় কম দেখে রোগীর গায়ে, নিজের গায়ের চাদরটাই ভালো করে চাপা দিয়ে দীপা নিজের ঘরে ফিরে যায়। ঘন্টা খানেক পর সেই অপরূপ মূহুর্তের আবির্ভাব হল মূলতঃ যার জন্য ফিরে ফিরে আসা হিমালয়ের পাদদেশে, সূর্যের আলোর প্রথম কিরন, রক্তিম আভা ছড়িয়ে পরেছে শ্বেত শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। প্রতিবারের মত একই রকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে  দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা বছর চব্বিশের মেয়ে। মুগ্ধতা কাটিয়ে পিছনে ঘুরতেই ধাক্কা খেল ওরই চাদর গায়ে দেওয়া একটা বছর ত্রিশের ছেলের সাথে। এই প্রথম ভালো করে দুজন দুজনের চোখের দিকে চেয়ে দেখল। কি যেন একটা মায়া, মুগ্ধতা মেশানো আবেদনময় দৃষ্টি ছিল সেই চোখে। ক্ষনিকের জন্য দুজন দুজনের দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে লাজুক হরিনীর মত চোখ নামিয়ে নিল দীপা।পাশ দিয়ে ঘরে চলে যাবার সময় আবার পথ আটকে দাঁড়ালো অচেনা পুরুষটি তারপর নিঃশব্দে গায়ের চাদরটা খুলে দীপার গায়ে জড়িয়ে দিল। মাথা উঁচু করে আরেকবার চেয়ে দেখল দীপা, তারপর ছুটে ঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ কোনো এক আবেশের মধ্যে আচ্ছাদিত হয়েছিল দীপা। তারপর আস্তে আস্তে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বারবার পাশের ঘরের অচেনা অতিথির চোখ, প্রথম দেখা, স্পর্শ এইসব ফিরে ফিরে আসতে লাগলো দীপার ভাবনায় আর আগের রাতে বিনিদ্রিত অবস্থায় রোগীর সেবা করার পরও চোখে ঘুম এল না সহজে। নিজের আচরনে নিজেরই বিষ্মিত লাগছিল দীপার, যে দীপা বাড়িতে কুটো নেড়ে দুটো করে না বলে মায়ের কাছে বকুনি খায়, তার হঠাৎ কি এমন হল যার জন্য সে একটা অচেনা অজানা ছেলের সেবার জন্য রাত ভোর করে দিল! এইসব ভাবতে ভাবতেই সে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল।

দীপা হোম স্টের সিঁড়ি বেয়ে নেমে একা একাই কোথায় যেন হেঁটে যাচ্ছে। চারপাশের মনমুগ্ধকর পরিবেশ। আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, যার একপাশে খাড়া পাহাড় অপর পাশে খাদ। দীপা হেঁটে চলেছে। কোনও দিকে ওর কোনও হুঁশ নেই, কোথাও যাবার তাড়া নেই আবার থেমে থাকার কোনও ক্লান্তি ও নেই। কোনও গন্তব্যের ঠিক নেই, আবার হারিয়ে যাবার ভয় ও নেই। কোনও এক অমোঘ টানে দীপা হেঁটে চলেছে। খাদের নীচ দিয়ে স্রোতস্বিনী পাহাড়ি নদী তার খরস্রোত নিয়ে বয়ে চলেছে। আর অপরদিকে খাড়া পাহাড়। সেখানে নানারকম পাহাড়ি গাছ।হঠাৎ দীপা ঐ গাছপালার আকর্ষণে ঐদিকে হাঁটতে শুরু করল। নানারকম গাছ, নানারকম ফুলের জমাট গন্ধ, পাখির কলরব এসবের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকল দীপা। দীপা দিকশূন্যর মত আরও গভীরে যেতে থাকল। হঠাৎ একদল খারাপ লোক দীপার পথ আটকে ধরল। দীপা প্রানপন ছুটতে আরম্ভ করল কিন্তু রাস্তা খুঁজে পেল না। এভাবে দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটতে ছুটতে দীপা ধাক্কা খেল একটি ছেলের সাথে। তাকিয়ে দেখল ওরই পাশের ঘরের সেই ছেলেটা। ঘুম ভেঙ্গে গেল দীপার। অসময়ে ঘুমিয়ে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে উঠতে। ঘুম ভাঙার পর দীপার খেয়াল হল "ছেলেটার নাম টা তো জানা হল না! শরীর কেমন আছে সেটাতো সকালেই জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল! সকালে কি যে হল আমি যেন নিমেষে কোথায় হারিয়ে গেলাম!!"

দীপা ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে আগে পাশের ঘরের দিকে গেল, ঘর বন্ধ। দীপা শশব্যস্ত হয়ে নীচে নেমে এল। ফুলমতীয়াকে জিজ্ঞেস করল। ফুলমতীয়া বলল," ভাইয়া তো সুবা মে নিকাল গ্যায়া বহিন। "

দীপা : কাঁহা গ্যায়া?

ফুলমতীয়া: ওতো পাতা নহী। বোল রাহা থা দার্জিলিং কে তরফ যা রাহা হ্যায়। চেক আউট করকে গ্যায়া।
এক মুহূর্তে দীপার সমস্ত উত্তেজনা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। দীপার মনে হতে লাগল "আর দেখা হবে না তাহলে? কোনও রকম কনট্যাক্ট নম্বর ও তো নেওয়া হয়নি, আর কনট্যাক্ট হবে না তাহলে? একই শহরে ই তো থাকে, তাও কি একবার দেখা হতে পারে না? কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে আবার দেখা হবে"। এসব ভাবতে ভাবতেই সারাদিন নষ্ট হল, কোনও কিছুতেই ঠিক মন বসছে না দীপার। আর পাশের বন্ধ ঘরটাকে দেখলেই আরও মন খারাপ করছে। শুধু একবার আলাপ করার জন্য আরেকবার দেখা হবার জন্য দীপার মন উদ্বিগ্ন হতে থাকে।

সন্ধ্যে বেলা দীপা বাইরের ছাদে বসে একমনে আকাশের তারা গুনছিল, তার সাথে চলছে পছন্দের গান, "আভি না যাও ছোড় কার...", হঠাৎ একটা অচেনা মনগ্রাহী কন্ঠস্বর :-

-দূউউরদ্বীইপবাসিনী

দীপা : (চমকে তাকিয়ে) আপনি?? আমার নাম জানলেন কি করে?

-বুঝলেন ম্যাডাম, আপনি মন থেকে কিছু চাইলে সেটা কিছুতেই আপনার থেকে দূরে থাকতে পারে না।যতদূরেই থাকুক আপনার কাছে ঠিক চলে আসবে আর এতো মাত্র দুঘন্টার পথ। 

দীপা : (হতচকিত হয়ে) মানে? আমার উদ্দেশ্যে বলছেন? আমি তো কিছু চাইছিলাম না।
-সত্যি?

দীপা : হ্যাঁ! কি চাইব আমি এখন হঠাৎ?
-সত্যি ই কিছু চান নি? ভেবে দেখুন তো....মনে মনে কারো জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন না? 

দীপা : না, না তো কারো জন্য তো প্রতীক্ষা করছিলাম না। আর... যদি করিও বা আপনি কি করে জানলেন? আপনি কি ম্যাজিসিয়ান? 
-ম্যাজিসিয়ান? নদীর তল বুঝতে গেলে বুঝি ম্যাজিসিয়ান হতে হয়? মানুষের মন ও তো নদীর মতো, কখনো প্রবহমান আবার কখনও স্হির। ছলছল করে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী যেমন পাহাড়ের সৌন্দর্য্যকে বিশেষ মাত্রা দেয় তেমনই সহজ  সরল প্রফুল্লময় মন বাইরের সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তোলে। 

দীপা : তবে, আপনি বুঝি ডুবুরি? 

-স্বচ্ছ পাহাড়ি নদীর তল খুঁজতে গেলে কি  ডুবুরি হতে হয়? আমি নাবিক।  জীবন সমুদ্রের মধ্যে ভেসে বেড়াই, দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে, হয়তো বা খুঁজে ফিরি কোনও দূরদ্বীপবাসিনীকে।

ফুলমতীয়া দুজনের জন্য চা নিয়ে আসে। টেবিলে রাখতে রাখতে বলে, "ভাইয়া, মিলা আপকো জো ছোড়কে গ্যায়া?"

দীপা : ছোড়কে গ্যায়া! ক্যায়া ছোড়কে গ্যায়া? আগর ছোড়কে যায়ঙ্গে তো তুম যব সুবা মে আয়ে থে রুম ক্লিন করনে কে লিয়ে তব হি তো মিল যানা চাইয়ে থা।

ফুলমতীয়া : পাতা নহী বহিন। মেরা তো কুছ নহী মিলা। অ্যায়সাই জাদা সামান তো নহী থা ভাইয়া কো সাথ। ভাইয়া বোল রাহা থা কৌই মেহেঙ্গা বালা চীজ  ছোড়কে গ্যায়া ও মে ঢুন নেহী পাউঙ্গি।

দীপা :আচ্ছা। এমনকি জিনিস ছেড়ে গেছেন আপনি যেটা আপনি ছাড়া কেউ খুঁজে পাবে না? 

নাবিক: মন। ভাবী, আপকো বহীন কো থোরা হেল্প করনে কে লিয়ে বলিয়ে না, উনকো পাস হো সাকতা কাল রাত নে যব মেরা ভুখার আয়ী ঔর ঔ মেরা শর কে পাস বঠে হুয়ে থী তব হী খো গ্যায়া।

ফুলমতীয়া: তব বহীন আপ থোরা মদত কিজিয়ে। ঘর আকে মেহেরবানকা কুছ খো জায়েগা ইয়ে হামলোগোকে লিয়ে আচ্ছা নহী হ্যায়। 
(ফুলমতীয়া চলে যায়) 

দীপা :Biscuit নেবেন? 

নাবিক :না হয় আমার কথা আপনার ভালো লাগেনি, তাই বলে কাল এত কষ্ট করে যাকে বাঁচালেন আজ তাকে বিষ কীট মানে বিষাক্ত কীট দেবেন? 

দীপা :আপনার সাথে কথায় পারব না।

নাবিক: শুধু কথা কেন? কথা বার্তা বন্ধুত্ব ভালোবাসা সবকিছুতেই আমাকে হারানো সহজ নয়।

দীপা :Wow! What a self confidence? Have to cultivate...

নাবিক :Sure.. আমি তো হাত বাড়িয়েই রেখেছি.... Will you be my friend?

দীপা : বন্ধুর আসল নাম টা কি জানতে পারি? কি বলে ডাকব?

নাবিক : কেন? নাবিক নামটা কি খারাপ? দূর দ্বীপের বাসিন্দার বিভিন্ন রূপকে যে খুঁজে পায় সে তো নাবিক ই হয়। বরং আপনার এই বিশাল নামটা কে রেখেছেন বলুন তো মিস মিত্র। দূউরদ্বীপবাসিনী।

দীপা(হাসতে হাসতে) : আমার ঠাকুর্দা। সবাই আমায় দীপা বলেই ডাকে।

নাবিক : আচ্ছা দীপা, সকালে চেক আউট করার সময় দেখলাম আপনি কলকাতা থেকে আসছেন, কলকাতার কোথায় থাকেন জানতে পারি কি?

দীপা : না জানতে পারেন না। বন্ধুদের এভাবে আপনি আজ্ঞে করলে কিচ্ছু জানা যায় না।
নাবিক (কান ধরে) : sure.. আমার ই ভুল আর আপনি না... এবার তো বল কলকাতার কোথায় গিয়ে নোঙর ফেললে তোমায় খুঁজে পাব? 

দীপা (মৃদু হেসে) : আমি বালিগঞ্জে থাকি। তুমি? 
নাবিক:আমি সল্টলেক। 

দীপা : আচ্ছা একটা প্রশ্ন কাল থেকে মাথায় ঘুরছে। তুমি তো একা এসেছো, তবে ডবল রুম বুক করার কারন। 

নাবিক : যদি হঠাৎ দোকা হয়ে যাই(সজোরে হাসতে হাসতে)। আসলে আমার এক বন্ধুর আসার কথা ছিল লাস্ট মোমেন্টে ক্যান্সেল করে দিল। এটা আগে থেকেই বুক করা ছিল, এসে লোকেশন টা মেইনলি আউটসাইড ভিউটা পছন্দ হয়ে যায় তাই থেকে গেলাম পাশের টা বুকড ছিল তখন। আর এটা লাস্ট মোমেন্টে ক্যান্সেল করলে রিফান্ড পাওয়ার কোনো চান্স ও ছিল না তাই...।

আর তাই তো তোমার সাথে ও দেখা হয়ে গেল বলো, এটা আমি বুক করে রাখলে কাল রাতে মাথার কাছে বসে থাকার জন্য কাকে পেতাম বলোতো এই বিদেশ বিভুঁইয়ে। কাল যখন খুব জ্বর এসেছিল মায়ের কথা মনে পরছিল। আমার মা ও ঘুরতে খুব ভালোবাসতেন। গত ফেব্রুয়ারিতে আমাদের ছেড়ে ঐ আকাশের তারা হয়ে গেছে। তারপর কাল রাতে তুমি এলে, মা চলে যাবার পর আর কেউ কখনো এভাবে সেবা করেনি। আজ সকালে এখান থেকে চেক আউট করে দার্জিলিং যাবার কথা ছিল তারপর সেখান থেকে তিনচুলে। সকালে তো কোনও কথা বলার আগেই তুমি পালিয়ে গেলে, বেরোবার সময় দেখলাম ঘর বন্ধ তাই আর বলার সুযোগ হলনা। কিন্তু তারপর চেক আউট করার পর মনে হল যাহ্ তোমাকে তো থ্যাংকস জানানো হল না! সারাদিন মনটা খুব উচাটন করছিল তাই এ যাত্রায় তিনচুলে ক্যান্সেল করে তোমার শরণাপন্ন হলাম হে দেবী।

দীপা :ও তার মানে থ্যাংকস জানাতে এসেছিলে?
নাবিক : থ্যাংকসের সাথে সাথে ঐ মূল্যবান জিনিস টাও যে খুঁজতে এসেছি যেটা বললাম তখন... মন। খুঁজে পেলে আমাকে বোলো কিন্তু।

হঠাৎ দীপার ঘরের কলিং বেলটা বেজে উঠল। লাঞ্চ এসে গেছে। কলিং বেলের ক্যাড়ক্যাড়ে আওয়াজে সম্বিত ফিরে এলো দীপার। বৃষ্টিটাও ধরেছে। দীপা ভাবল, "আর একটা দিনের বিরহ তারপর আশ্রয় নেব নাবিকের বুকে। আর ইন্দ্র দেব কি এতটা অপ্রসন্ন হবেন আমার ওপর, আজও কি একটু কথা বলতে পারব না একটা বার চোখের দেখা দেখতে পারব না। নেটওয়ার্ক তো রয়েছে দেখছি লাঞ্চ টা সেরেই ফোন করব।" 

সাহিত্যিক রচয়িতা দাঁ 
কলেজস্ট্রীট, কলকাতা - ৯, পশ্চিমবঙ্গ 































 











খিদের পাণ্ডুলিপি 
সুধাংশুরঞ্জন সাহা

দুঃখসমগ্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে বুঝেছি,
বিশ্বাস এক একরোখা জেদী সরলরেখা।
অন্যদিকে তাকাবার ফুরসত নেই তার।
অসমবয়সী খিদের গল্পবিবাদ
এবং সবুজ ধানের বনিবনা নিয়ে
মুহূর্তরা হারিয়ে যায় সময়ের আবর্তে।
শুধু বেঁচে থাকে হাহাকার,
বৃক্ষনিধনকথা আর পরিযায়ী পাখির
বাসাবদল আখ্যান!

সবুজ ধানক্ষেত ক্রমশঃ সোনালি রঙে মাতায় মাঠ।
গোপনে তৈরি হয় অস্বচ্ছ জোট,
শুরু হয় রক্তক্ষয়ী ধানকাটার কাজিয়া।
ধানের শীষে রক্তে লেখা হয় খিদের পাণ্ডুলিপি।

       কবি সুধাংশুরঞ্জন সাহা
সন্তোষ রায় রোড, শিবম অ্যাপার্টমেন্টস, কলকাতা


















সঞ্জয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের দুটি কবিতা 

তুমি কবিতা

অদ্ভুত এক অন্ধকার ভেঙে ছিলাম,
তোমাকে পেতে আমার
বাঁধা স্বপ্নগুলো ছাড়া পেয়ে বুনেছিল সবুজ বীজ।

আমার হাতে‌ ধরা ছিল সদ্য ফোঁটা বকুল ফুল, ছিল উদাসী হাওয়ার মাতলামি !
আর ছিল বিরোধী হওয়ার অভিশাপ।

সবটুকু নিয়ে বেঁচে ছিলাম চেনা আকাশের নিচে,
বৃষ্টিভেজা দেওয়ালে  তখন আর _
স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ পেতাম না ।

তাই খুলে রেখেছি দরজা আবার যদি আসো,
ঠিক তখনই কবিতা সামনে হাসিমুখে আসে।

ঘুম ভাঙা স্বপ্ন

কেউ ঘুমন্ত সমুদ্রকে
একদিন গোধূলি বেলায় ভালোবেসে
বলেছিল প্রবালের গান শুনতে যাবে।

কিন্তু সেবার আঘাত পেল,
মৃত্যুর কালো ছায়া নিয়ে 
চাঁদের আকর্ষণে হাজির হল আদিম উন্মাদনা !

সমুদ্রের ঘুম নিয়েছিল কেড়ে
তান্ডব নৃত্য ক্ষয়ক্ষতি দেখে
বাকি জীবন সমুদ্র অতীতের 
মধুর স্মৃতিটুকু নিয়ে ছিল‌ বেঁচে।

তাই কেউ আর কোনদিন
ভাঙতে চায় নি ঘুমন্ত সমুদ্রকে।

কবি সঞ্জয় কুমার মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 


























মুক্তি দাশের অণুগল্প 
ফিফটি-ফিফটি

রথের মেলায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে সনাতন একসময় একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পাঁপড়ভাজা খাচ্ছিল। এরপর সে কাঠিগজা কিনে খাবে। তারপর একটু নাগরদোলায় চড়ে উপরনিচ বাঁই-বাঁই করে ঘুরলেও ঘুরতে পারে। এরকমই সে ভেবে রেখেছে।

ঠিক সেইসময় সে শুনতে পেল মাইকে অ্যানাউন্সমেনট হচ্ছে : "সাত-আট বছরের একটি ছেলে মেলায় হারিয়ে গেছে। নাম রাহুল। গায়ের রং ফরসা। পরণে ক্রীম-রঙা জিন্সের ওপর মেজেন্টা কালারের টি-শার্ট। খুঁজে পেলে সন্ধানকারীকে হাতে হাতে নগদ দশহাজার টাকা দেওয়া হবে।"  ইত্যাদি ইত্যাদি। সনাতন তেমন গা করল না। সে মনের সুখে পাঁপড়ভাজা খেতেই থাকল।
  
এমনসময় পেছনদিক থেকে কেউ একজন তার হাত ধরে মৃদু অথচ হ্যাঁচকা টান দিল। সনাতন ঘুরে দেখল, একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোঁপাচ্ছে। সনাতন শরীরটা নিচু করে জিগেস করল, "কী হয়েছে খোকনসোনা, কাঁদছ কেন?" 

তেমনি ফোঁপাতে ফোঁপাতে ছেলেটি বলল, "আঙ্কেল, ও আঙ্কেল...আমি না হারিয়ে গেছি। ওই যে মাইকে বলছে, শুনতে পাচ্ছ না? আমার নামই তো রাহুল। আমাকে আমার বাবার কাছে পৌঁছে দেবে?"

এক লহমার জন্যে বিদ্যুৎচমকের মতো দশহাজার টাকার ব্যাপারটা সনাতনের মাথার মধ্যে ঝিলিক মেরে গেল। সে নির্বিকার মুখে হাত বাড়িয়ে বলল, "এসো না, এসো...তোমার কোনো চিন্তা নেই। ভয়ও নেই। তোমাকে ঠিক তোমার বাবার কাছে পৌঁছে দেব।"  বলে ছেলেটির হাত ধরে মেলাকমিটির অফিসের দিকে এগোতে শুরু করে দিল সনাতন। কিছুটা এগিয়েছে, ছেলেটি সনাতনের হাত ধরে দাঁড় করাল। তারপর বলল, শুনেছ তো আঙ্কেল, আমাকে খুঁজে দিলে বাবা কিন্তু দশহাজার টাকা দেবে?" 

সনাতন নিপাট ভালোমানুষের গলায় দার্শনিকের মতো বলল, "হুম শুনেছি, কিন্তু বাবা, টাকাটাই তো আর সব নয়, এইযে তোমাকে খুঁজে পেতে তোমার বাবার হাতে তুলে দিচ্ছি..."

মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে ছেলেটি বলে উঠল, "তুমি শুধু বাবার হাতে আমায় তুলে দেবে, বুঝলে? তারপর ফিফটি-ফিফটি...রাজি?"

সাহিত্যিক মুক্তি দাশ 
১৩৫, অঘোর সরণী, রাজপুর, কলকাতা














আমরা সবাই একা  
সুজিত কুমার মালিক 

নিকোটিনে বন্দি রেখে
মুহূর্তেরা প্রাক্তনী হয়,
একান্ত ব্যক্তিগতগুলো
আরও নিউক্লিয়ার হতে থাকে...
সীমাহীন জগতের সীমিত পরিসরে
একলা হেঁটে চলা... 
আলোকের মরীচিকায়
প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনি শুনি--
বেষ্টিত জনারণ্যে
আসলে আমরা সবাই একা !

কবি সুজিত কুমার মালিক
মইখণ্ড, হেলান, আরামবাগ





















সিদ্ধার্থ দাসের দুটি কবিতা

রেনবো ক্লিনিক

বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোলে মাঝামাঝি কোথাও থামবে
—এটাই রীতি। সে স্বপ্নের কোন ধারাবাহিকতা নেই।

যেটা পারি— চিনিয়ে দিতে,
যেটা পারি না— ছিনিয়ে নিতে।

গল্পের গরু সময়মত গাছ থেকে নামতে চায় না।
খুশির খবর সবার আগে। দুঃখ নিয়ন্তা ঝিলিক, সুমতী।
—যেটা পড়ে থাকে, গড়পড়তা।

যত আলো তুমি চাইলে
আমি বললাম— ভালো থেকো ততোধিক।

জাস্টিস

আদর্শ মুছে ফেলা যায়?
দূর নীলিমায় সপ্রতিভ ঋতু তিনটি ঠেকেছে।
শীত গ্রীষ্ম ভরসা।

বৃষ্টি সেদিন আকাশ থেকে রিনিঝিনি নেমে হয়েছিল পরমা
ভাগ্যিস লেখা হয়নি, তা-ও দিত ধুয়ে।

প্রমান ছাড়া হাঁটছে শহর নিরুদ্দেশ।
হাওয়া খুলে স্থির দাঁড়িয়েছে ট্রাক।
আজতক।

কবি সিদ্ধার্থ দাস
নোনা (দাসপাড়া), উলুবেড়িয়া, হাওড়া











পার্থ প্রতিম হালদারের ছোটগল্প 
বিকৃত ক্ষুধা

[প্রথম পর্ব]

মহানগরের বুকে দিনের আলো নিভে আস্তে আস্তে রঙিন অন্ধকার নেমে আসছে । বাড়ি ফিরছে সারাদিন পরিশ্রমে ক্লান্ত মানুষেরা । শুধু ক্লান্তি নেই মহানগরের যৌনপল্লির পতিতা দের। কারণ যৌনপল্লি তে কখনও রাত নামে না । ঘুম আসে না, ক্লান্তি আসে না। চলে দেহ ব্যবসা ও নারী মাংসের দর দাম।চলে রূপ অনুযায়ী দর কষাকষি ও দেহপসরার বিকিকিনি। ওঠা নামা করে সস্তায় মেক আপ করা আকর্ষণীয় মুখের বাজার দর । এ যেন প্রেমহীন প্রেমের নগরী। কারণ এখানে টাকার বিনিময়ে আদর সোহাগ ভালোবাসা বিক্রি হয়। সাজানো হয় প্রতিদিন নতুন নতুন কুঞ্জ তথা বাসর। আর প্রতি রাতে কত শত পুরুষেরা যে তাদের বাসর সজ্জার সঙ্গিনী হয় তার নেই ঠিক।
                
তবে শুধু যৌনপল্লির পতিতা দের কথাই বা বলি কেন, এমন অনেক মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে আছে যারা প্রতি রাতে সাজগোজ করে, টি শার্ট - জিন্স - কুর্তি বা টপ পরে গায়ে পারফিউম মেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে । টাকার বিনিময়ে কারোর সাথে রাত কাটিয়ে আসে। তারা কিন্তু হয়তো বা বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত মেয়ে । যারা প্রথম প্রথম অনেকের সাথে ভার্চুয়াল সম্পর্ক তৈরি করে নেয়,পরে তা বাস্তবে পরিণত করে । যাতে করে চলে যৌনতৃপ্তি উপভোগ, চলে ব্যাবসাও। ঘুচে যায় একাকীত্ব। যারা অনেকর কাছে কর্ল গার্ল বলে পরিচিত। এই ডিজিটাল যুগে তারা অনলাইনের মাধ্যমেও বুক হয়ে যাচ্ছে । আবার কোথাও ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে অনেকে সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে।
               
তবে শুধু কর্ল গার্ল নয় । ছেলেরাও এখন আর পিছিয়ে নেই। তারাও নাকি তাদের পুরুষত্ব বিক্রি করছে বিভিন্ন কর্পোরেট বিজনেস ম্যান দের স্ত্রীর কাছে বা অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত কিছু বেপরোয়া নারীর কাছে । আবার সমাজে এমন অনেক মহিলা আছেন যারা পেটের দায়ে পতিতা বৃত্তি করেন না, করেন স্বভাবে বা চরিত্র দোষে । করেন সবার চোখের আড়ালে ।তাই সমাজে পতিতা বলে তারা পরিচিত হয়নি। স্বামী বা পরিবারের চোখে ধুলো দিয়ে তারা নিশ্চিন্তে অনেক অনেক লোকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক করছেন বা শারীরিক সম্পর্ক করে বেড়াচ্ছেন। সেখানে শিকার টি সন্তানের বয়সী হলেও তাদের কোন সমস্যা নেই। লজ্জা নেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে , ব্যবসায়ে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে পতিতা লয়ের মেয়ে গুলোর। যারা কিনা পেটের দায়ে শরীর বিক্রি করছে , খদ্দেরের অপেক্ষায় ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে রাত জেগে বসে থাকছে।
          
তবুও অন্ধকারময় পঙ্কিল জটিল জীবন কে আচ্ছন্ন করে , দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য আলো আঁধারি রঙিন গলিতে, হাসি মুখে, এলোমেলো ভাবে শাড়ি পরে,নানারকম বডি মুভমেন্ট বা এক্সপ্রেশন করে বারবিলাসিনীরা শিকার ধরার চেষ্টা করে । ঠোঁটে রঙ মেখে, টানা টানা চোখে কাজল পরে মায়া জাল বিস্তার করার চেষ্টা করে। অধর ও কপোল রঙিন তুলিতে চিত্রিত করে । আবার কখনও মেদ যুক্ত ফর্সা পেট , ট্যাটু আঁকা গভীর নাভি বা চর্বি হীন শ্যামলা রঙের পেট বের করে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ বা স্লিভলেস ব্লাউজ পরে,আর কাঁধের কাছে ব্রা এর ফিতে টা একটু বের করে রেখে পুরুষ কে আকৃষ্ট করে এইভাবে বিচিত্র ছলনায় বড় বড় শহরের বাজারের মোড়ে তারা খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকে। আর ক্লান্ত পথচারী দের কে নানান ইশারা ও বিভিন্ন ছলনায় প্রলুব্ধ করে। এরাও নাকি আবার এমন অভিশপ্ত রাত গুলো তেও ঝলসে যাওয়া চোখে হাজার হাজার স্বপ্ন দেখে। তাই তাদের দিকে যদি একটু সহানুভূতি দৃষ্টিতে তাকানো যায় তাহলে জানা যাবে তাদের জীবনের করুণ ইতিহাস , শোনা যাবে তাদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।
       
কলকাতার শোভাবাজারে একটা কাজে গিয়ে রমজানের মনে হলো ,'নার্গিস কে একটি বারের জন্য দেখে আসি। অনেক দিন হলো তাকে দেখিনি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। সেই কবে পেপারে তাকে দেখেছিলাম। তারপরে আর কখনও নার্গিসের সুন্দর মুখ খানা দেখার সৌভাগ্য হয়নি।' সোনাগাছির গলি দিয়ে যেতে যেতে, এমন টি ভাবতে ভাবতে রমজান দেখতে পেলে কয়েক টা মেয়ে ছোট ছোট জামা পরে রাস্তার দুপাশে লাইন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বা পান চিবোচ্ছে, কেউ আবার সিগারেট টানছে। কারোর হাতে বা গুঠকার প্যাকেট। মেয়ে গুলোর বয়স বারো - তেরোর বেশি হবে না। কিন্তু তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হয় তারা যেন অনেক পরিনত। রমজানের এখনও মনে আছে , এক জ্যোৎস্না রাত্রি তে ছাদে বসে নার্গিসের মুখে পতিতা দের জীবন যাত্রার সেই গল্পের কথা । তখন ছোট ছোট বাচ্চা মেয়ে দের কথাও নার্গিস একবার তাকে বলেছিল। বলেছিল ছোট ছোট মেয়েদের কে কোন এক ওষুধ খাইয়ে যৌনপল্লির মাসি নাকি তাদের কে বড়ো করিয়ে দেয়। অর্থাৎ খুব দ্রুত তাদের শরীরের বৃদ্ধি ঘটিয়ে দেয়। যাতে করে বারো তেরো বছরের মেয়ে গুলো কে সতেরো আঠারো বছরের মেয়ে বলে মনে হয়।
            
এমন সময়ে হঠাৎ একটা চিৎকারে রমজানের ভাবনায় বাধা সৃষ্টি হলো। দেখতে পেলো পতিতা পল্লির মাসি বা সর্দারনী চীৎকার করে করে কোন এক মেয়ের চুল মুঠি ধরে ছোট এক ঝুপড়ি থেকে বের করে রাস্তায় আনছে । আর মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে সর্দারনীর পা জড়িয়ে ধরে বলছে, ' মাসি আজ দাঁড়াতে পারবো না। আজ দাঁড়াতে পারবো না মাসি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে । শরীর টা আমার ভালো নেই মাসি।' বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলে। রমজান কাছে গিয়ে মেয়ে টি কে দেখে হতভম্ব হয়ে বলে ফেললে, 'নার্গিস!'
               
নার্গিস ছিল তার বাবা মায়ের খুব আদরের মেয়ে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট ও সুন্দরী। তাই বাবা মা আদর করে তার নাম রেখেছিলেন জাসমিন। রাস্তার কন্ট্রাকটরের কাজ করায় জাসমিনের বাবার ইনকামও ভালো ছিলো। কিন্তু জাসমিনের যখন তেরো বছর বয়স তখন জাসমিনের বাবা জাসমিনের মাসি কে নিয়ে ফেরার হয়ে যান। তারপর থেকে লজ্জা ঘৃণা অপমানে, চরম দুঃখ কষ্টে নার্গিসের মা নানা রকম দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকেন । বোধহয় মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন । যার ফলে সন্তান সম পাড়ার ছেলে দের কাছে নিজের যৌন চাহিদার কথা প্রকাশ করে ফেলতেন বা কথা বলার সময় তাদের মনের যৌনতা কে উস্কে দিতেন । যদিও এসব তিনি মুখ ফুটে কখনও বলতেন না কিন্তু বিভিন্ন হাবভাবের মাধ্যমে পাড়ার ছেলে দের কে বুঝিয়ে দিতেন। শুধু তাই নয়, পাড়ার সন্তান বয়সী ছেলে বা বয়স্ক লোকেদের সাথে কখনও রাতের আঁধারে ঝোপ ঝাড়ে , কখনও বা নিজের বাড়ির বারান্দা তে, রান্না ঘরে বা বেডরুমে তিনি শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে থাকেন। যার ফলে বয়সের গোধুলি লগ্নে , যৌবন অস্তমিত হওয়ার আগে, উত্তপ্ত চুয়াল্লিশ বছর বয়সে প্রখর যৌবনের তাপে তিনি আরেক বার প্রেগনেন্ট হয়ে পড়েন। তারপর কোন এক শুভক্ষণে জাসমিনের মায়ের কোল আলো করে নার্গিসের ছোট ভাই আজাদের জন্ম হয়। তা সত্ত্বেও জাসমিনের মায়ের স্বভাব এখনও বদলায় নি - যেখানে তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশ হতে চললো। মায়ের এমন অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন দেখে মায়ের প্রতি জাসমিনের ঘৃণা চলে আসে । ঘৃণা চলে আসে নিজের প্রতি। নিজের বাবার প্রতি।

তাই মাত্র ষোলো বছর বয়সে হিন্দুর ছেলে ভুতোর সঙ্গে জাসমিন পালিয়ে যায়। পালিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে, বাসে করে। যাওয়ার সময় সে ভুতো কে বলে, 'আমি তোমাদের ধর্মের রীতি নীতি অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চাই। আমার খুব ইচ্ছে তোমাদের সমাজের বউ দের মতো শাড়ি, সাঁখা  ও সিঁথিতে সিঁদুর পরার । তুমি বোধ হয় জানো, যেদিন থেকে তোমার প্রেমে পড়েছি সেদিন থেকে তোমাকে নিয়ে কত কিছু ভেবেছি। ভেবেছি প্রতিদিন সকালে স্নান করে এসে ভিজে চুলে তোমাকে ডেকে তুলবো। তোমার পায়ের ওপর মাথা রেখে অনেক সেবা করবো।ঘোমটা মাথায় দিয়ে রোজ সন্ধ্যা বেলায় তুলসি মঞ্চে পুজো করবো ।' বলে জাসমিন ঝরঝর করে কেঁদে ফেললে। ভুতো কিছু না বলে জাসমিনের মুখ টা তার বুকে জড়িয়ে ধরলে।  এমন সময় জঙ্গীর মতো মুখোশ পরা কিছু মানুষ হাতে রক্তমাখা ছুরি নিয়ে হুড়হুড় করে বাসে উঠে পড়ে কারোর নাকের বাঁকা নথ, কানের দুল, গলার হার টেনে ছিঁড়ে নিতে শুরু করলে । কিন্তু বাসের একটি মানুষও ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারলে না। শুরু হলো মহিলাদের চীৎকার, আর্তনাদ। বয়ে গেল রক্তের বন্যা। এমতাবস্থায় ভূতো প্রতিবাদ করে উঠলে। রাগে গর্জন করে উঠলে। মারতে উদ্যত হলে । কিন্তু একা আর কতজনের সঙ্গে লড়বে  ? লোহার রড দিয়ে মাথায় মেরে ভুতো কে অচেতন করে ফেলে দিয়ে জাসমিন কে তারা তুলে নিয়ে গেলে । 

রাতের অন্ধকারে আট - নয় জন মিলে ফাঁকা মাঠে জাসমিন কে বারবার ধর্ষণ করলে। তারপর তার চোখ মুখ বেঁধে নিয়ে গেলে অজানা এক দেশে । কিন্তু অচেতন অবস্থা তে জাসমিনের যেন মনে হলো সে সাজগোজ করে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। তবে যখন তার চেতন ফিরে আসলো সে দেখতে পেলো কত গুলো সুন্দরী মহিলা তার সেবা করে চলেছে। ওষুধ খাওয়াচ্ছে। আর ঘরের বাইরে নারী মাংসের দর দাম চলছে। তিক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জাসমিন বুঝতে পারলে এটা পতিতালয়। কিন্তু এটা ভেবে সে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলেনি। কি হবে চোখের জল ফেলে? কারণ ভুতোর কাছে মুখ দেখানোর মতো এখন আর তার সেই সতীত্ব নেই। সমাজে নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা নেই। আশাও নেই। স্বপ্নও নেই।
                  
এমনটি যখন ভাবছে তখন বাইরে থেকে একজন পতিতা ওরফে রাধিকা ছুটে এসে হাসতে হাসতে বললে, 'এই এবার ওঠ্। ভালো করে সেজে নে। মাসি তোকে ডাকছে। বাইরে গিয়ে লাইট পোস্টের নীচে এবার রূপের পসরা মেলে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তো । তোকে দুই লাখ টাকা দিয়ে মাসি কিনেছে - তা কি এমনি  !  তোর থেকে ছয় লাখ টাকা তুলতে না পারলে মাসির রাতের ঘুম উড়ে যাবে রে । চল্ চল্ আর দেরি করিস নে। দেরি হলে আবার মাসি চীৎকার শুরু করে দেবে। ওঠ্ নার্গিস ওঠ্।' তখন জাসমিন বললে, 'আমার নাম তো জাসমিন। নার্গিস নয়।' এ কথা শুনে রাধিকা খিল খিল করে হেসে উঠলে। আর বললে, 'বাড়িতে আমার নাম ছিল মনীষা । কিন্তু গরীব বাবা মায়ের আদরের সেই নাম হারিয়ে গিয়ে কখন যে পতিতালয়ের রাধিকা হয়ে গেলাম বুঝতেও পারলাম না। তখন আমার সদ্য কুঁড়ি ধরা তেরো বছরের প্রস্ফুটিত যৌবন। অকালে আমার বুক ভরা ভালোবাসার সলিল সমাধি হয়ে গেল। নাম টা পরিবর্তন হয়ে গেল। হয়ে গেলাম রাধিকা।  অত কম বয়স থেকে বুক ভরা যৌবন ও ভালোবাসা নিয়ে প্রতি রাতে হাতে হাতে বদলাতে থাকলাম।' বলে রাধিকা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললে। রাধিকার চোখের জল মুছে দিয়ে তাকে একটু আনন্দ দিতে হাসতে হাসতে নার্গিস বললে , 'মোবাইলে লুকিয়ে লুকিয়ে এত পর্ণোগ্রাফি ভিডিও দেখেও কী ছেলে দের মনের সাধ মেটে না ? তাছাড়া এখন পাড়ায় পাড়ায় তো কত টুম্পা বৌদির আবির্ভাব ঘটে গেছে। তাও পতিতা লয়ে ছেলেরা যে কেন আসতে চায় ভেবে পাই না ।'

[দ্বিতীয় পর্ব]

নার্গিসের মুখে এমন কথা শুনে রাধিকা হি হি করে হেসে উঠলে । তারপর নার্গিসের গায়ে চিমটি কেটে, আড় চোখে নার্গিসের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে রাধিকা বললে, 'দূর হ। তাহলে তো আমরা বেঁচে যেতাম রে।'
                 
কিন্তু পতিতা পল্লি থেকে বাঁচার যে কোন রাস্তা নেই , মুক্তির যে কোন পথ নেই তা তারা ভালো করেই জানে। কিন্তু সময় প্রবহমান নদীর মতো। সমস্ত বাধা ঠেলে সে এগিয়ে চলে। সময়ের থেকে বড় আর কিছু নেই। আর তাই এই সময়ের হাত ধরেই নার্গিসের  জীবনে পরিবর্তন আসে। নতুন বসন্ত আসে। নার্গিস ওরফে জাসমিনের জীবনে আসে রমজান। রমজান কে পেয়ে নার্গিস যেন মুক্তির আকাশ খুঁজে পায়। ঘটনাক্রমে , অনেক বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে কয়েক মাসের মধ্যে তাদের বিয়েও হয়ে যায়। চলে যায় মুর্শিদাবাদে রমজানের বাড়িতে। কিন্তু রমজানের বাড়ির সংকীর্ণ গণ্ডি তে, বদ্ধ পরিবেশে সে আঁতকে ওঠে। আঁতকে ওঠে রমজানের মায়ের কাহিনী শুনে।
       
রমজানের মা লক্ষ্মী দাস বোলপুরের মেয়ে। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা। মুর্শিদাবাদে একবার ঘুরতে গিয়ে রমজানের বাবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তারপর সেই পরিচয় টা ধীরে ধীরে প্রেম পর্যন্তও গড়িয়ে যায়। কিন্তু রমজানের মা ভালো করে জানতেন বাড়ির লোক জানতে পারলে মুসলিম ছেলের সঙ্গে কখনও বিয়ে দেবেন না । তাই তিনি রমজানের বাবার সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ে করেন মুসলিম ধর্মের রীতি নীতি অনুযায়ী। নিজের ধর্মের সঙ্গে আত্মিক যোগ ছিন্ন করে দিয়ে , নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করে রোজাও করেন, নামাজও পড়েন। এখন বোরখাও পরেন। ভালোবাসতে শুরু করেন মুসলিম সমাজ সংস্কৃতি কে। কিন্তু একসময় তাঁর জীবনে আসে এক কাল রাত্রি । যা তাঁর সমস্ত চিন্তা ভাবনা কে ওলট পালট করে দেয়।
       
রমজানের বাবা সেদিন বাড়ি তে ছিলেন না।তিন বছরের ছেলে রমজান কে কোলে করে নিয়ে রমজানের মা ঘুমোচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে রমজানের চাচা ভাবি ভাবি বলে ডাকতে শুরু করলেন।বললেন বাড়িতে খুব বিপদ দরজা খুলে বেরিয়ে এসো ভাবি।আচমকা ঘুমের ঘোরে উঠে গিয়ে রমজানের মা দরজা খুললে। সঙ্গে সঙ্গে রমজানের দুই চাচা আর রমজানের বুয়ার তিন ছেলে রমজানের মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শুরু করলেন অশ্লীল আচরন।কিন্তু সেদিন রমজানের মায়ের চীৎকার শুনে, আর্তনাদ শুনে বাড়ির অন্যরা কেউ বেরিয়ে আসেননি।তাঁর ইজ্জত বাঁচানোর কথা কেউ ভাবেননি।আসেননি পাশের ঘরে শুয়ে থাকা রমজানের চাচিও। জানোয়ারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁরা রমজানের মায়ের পরণের শাড়ি টেনে খোলার চেষ্টা করেন। তখন আর্তনাদ করে কাঁদতে কাঁদতে রমজানের মা বলতে থাকেন ,'আমাকে ছেড়ে দাও ভাই সব । তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও। আমি পোয়াতি। পেটে আমার ছয় মাসের বাচ্চা। আমার বাচ্চা মরে যাবে। ছেড়ে দাও ভাই রা।তোমাদের পায়ে পড়ি।পায়ে পড়ি তোমাদের ছেড়ে দাও আমাকে।'সঙ্গে সঙ্গে রমজানের চাচা ও বুয়ার ছেলেরা মিলে রমজানের মায়ের মুখ হাত পা চেপে ধরলেন। আর একজন চাচা রমজানের মায়ের ওপরে উঠে বললে, 'তোর শাড়ি না খুললে তোর চীৎকার বন্ধ হবে না। তোকে ধর্ষণ না করা অবধি তোর লজ্জা দূর হবে না । তোর ছেলের বাবা হতে আমাদের খুব ইচ্ছে করছে।ইচ্ছে করছে তোকে ধর্ষণ করতে।' তারপর একে একে সবাই মিলে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করলে। যার ফলে পেটের বাচ্চা টা নষ্ট হয়ে গেল। বিছানা তে রক্তের বন্যা বয়ে গেল।
      
রমজানের মায়ের মুখে এমন ঘটনা শুনে ভয়ে আতঙ্কে নার্গিস ঝরঝর করে কেঁদে ফেললে। আর কাঁদতে কাঁদতে রমজানের মা কে বললে, 'মা তুমি কেন প্রতিবাদ করলে না ? বোরখার বন্ধন খুলে কেন বেরিয়ে গেলে না ?' তখন রমজানের মা বললেন, 'এতে মুসলিম ধর্মের অপমান। স্বামীর অপমান। হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী স্ত্রীর কাছে স্বামী হলেন দেবতা। যে দেবতা কে আমি এত ভালোবাসি, যে দেবতার টানে হিন্দু ধর্ম - সমাজ - সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়েছি। বেরিয়ে এসে মুসলিম ধর্ম নিয়েছি। সেই ধর্ম কে, সমাজ কে , সেই ধর্মের দেবতা তথা আমার স্বামী কে কী করে অপমান করি ? তাছাড়া হিন্দু সমাজও তো আমাকে আর গ্রহণ করবে না। তাই শত অপমান যন্ত্রণা সহ্য করেও এখানে থেকে গেলাম। তবে এখন আর আগের মতো আমার সমস্যা হয় না। এখন এই সমাজের সংস্কার, রীতি - নীতি, আচার - আচরণ আমারও রক্তের মধ্যে প্রবল বেগে বইতে শুরু করেছে। ওদের থেকে এখন আমিও আর আলাদা নই।' শাশুড়ির মুখে এমন টা শুনে নার্গিসের চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো । কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর নার্গিস বললে , 'মা গো হৃদয় টাকে এত পাষাণ কী করে করলেন। আমি তো পারবো না । আমি কখনও পারবো না। পারবো না আপনার মতো এত কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে । পারবো না নারীত্বের অপমান করতে । আমি চললেম।' - বলে বোরখার বন্ধন খুলে, বহু বছরের মরচে ধরা লাল কালো লোহার রডের জানলা ভেঙে নার্গিস রঙিন অন্ধকারে বেরিয়ে গেল।
             
তারপর প্রায় এক বছর নার্গিসের সঙ্গে রমজানের কোন যোগাযোগ ছিল না । সেই কবে ২০২০ সালের লকডাউনের সময়ে আনন্দ বাজার পত্রিকা তে একবার তার ছবি দেখেছিল মাত্র। তারপরে আর কখনও তাকে দেখেনি। কিন্তু আজ নার্গিস কে এমন অবস্থা তে দেখে রমজানের চোখে জল চলে আসলো। সুন্দরী প্রাণবন্ত নার্গিসের দাঁড়ানোর সেই ভঙ্গি, কাজল পরা টানা টানা চোখের চাউনি, শাড়ি পরার ধরণ, হাতের মেহেন্দি, রঙিন ঠোঁট, ফুল হাতা নেটের ব্লাউজ, নাকের বাঁকা নথ, কপালের ওপর পড়ে থাকা এক গুচ্ছ চুল, মুখের মিষ্টি হাসি, কালো গভীর রঙিন সেই চোখ সময়ের স্রোতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। যে রূপ দেখে রমজান একসময় তার প্রেমে পড়েছিল। বিয়েও করে নিয়েছিল। যে বাজার দরে একসময় সে জাসমিন থেকে নার্গিস বা নাগিন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল । সেই নার্গিসের কিনা আজ এই দুর্দশা। কারণ তার আর সেই আগের মতো রূপ যৌবন নেই। আগের মতো তাই তার ইনকামও নেই। সে এখন বিগত যৌবনা বা যৌবনহীনা । কুৎসিত, ব্যাধিগ্রস্ত ও শীর্ণ দেহের নারী। এক অজানা রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। সারাক্ষণ ব্লিডিং হচ্ছে। হাঁচি সর্দি কাশি জ্বর সারাক্ষণ লেগে রয়েছে। তবুও দু বেলা দু মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য হতাশ নয়নে কর্দমাক্ত নোংরা অপরিষ্কার পথের ধারে মিন মিন করে জ্বলা লাইট পোস্টের নীচে খদ্দেরের জন্য সে এখনও অপেক্ষা করে।
    
কিন্তু আজ তার শরীর টা একদম ভালো ছিলো না। তা সত্ত্বেও পতিতা লয়ের সর্দারনী বা মাসি তাকে দাঁড়াতে বাধ্য করাচ্ছে। কারণ বাইরে এক বীভৎস কুৎসিত চেহারার খদ্দের দাঁড়িয়ে আছে। মাসির মুখের  অশ্লীল ভাষা, অত্যাচার ও নির্যাতনে অবশেষে নার্গিস সেই বীভৎস চেহারার লোকটির হাত ধরে ছোট্ট ঝুপড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য হলে।তা দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে,চোখের জল মুছতে মুছতে,রঙিন অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে,আলো ঝলমলে শোভা বাজার মেট্রো স্টেশনের দিকে রমজান এগিয়ে গেল। 

লেখক পার্থ প্রতিম হালদার 
রামগোপালপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ 










নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • ধোঁয়াশা অথবা ছেলেবেলার ডাকনাম ~ সুকান্ত মণ্ডলের কবিতা
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates