হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


সিদ্ধার্থ সিংহ'র অণুগল্প 
আবাহন

খুব ভয়ে ভয়ে আছে আবাহন। কখন কী হয় কিচ্ছু বলা যায় না। কাগজ খুললেই মৃত্যু। টিভি খুললেই মৃত্যু। ফেসবুক খুললেই মৃত্যু।
হয় গলা ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা, জ্বর। নয় মুখে স্বাদ নেই। নাকে গন্ধ নেই। এগুলো হলেই ব্যস, হয়ে গেল।
এক বন্ধু বলেছিল, তুই এত মদ খাস, এ রোগ তোকে ছুঁতেও পারবে না। কিন্তু তবুও... বাজার থেকে ফিরেই সোজা স্নানঘরে ঢোকে। জামাকাপড় ছাড়ে। সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করে। শেষে ডেটল জলে। ঘরে ঢোকার আগে খুব ভাল করে হাতে-পায়ে সেনিটাইজার স্প্রে করে।
কিন্তু যেই মুহূর্তে রাজ্য সরকার লকডাউন ঘোষণা করল, না, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নয়, এটিএম থেকে কুড়ি হাজার টাকা তুলে তড়িঘড়ি ছুটল মদের দোকানে।
সে যে কী ভিড় কহতব্য নয়। বিশাল লাইন। একশো চুয়ান্ন জনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে, ধাক্কাধাক্কি করে যখন সে মদের বোতল হাতে পেল তখন সূর্য ঢলে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত এতগুলো বোতল আনতে পারার আনন্দে সে যখন জামাকাপড় ছাড়া, হাত পা ধোয়া, সেনিটাইজার দেওয়া বেমালুম ভুলে গিয়ে সেলিব্রেশনের মুডে তড়িঘড়ি বোতল সাজিয়ে বসল। প্রথম চুমুক দিতেই সে চমকে উঠল। এ কী! না আছে কোনও গন্ধ। না আছে কোনও স্বাদ।

সাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহ
২৭/পি, আলিপুর রোড, কলকাতা




















 


মিশর রায়-এর তিনটি কবিতা 

সুতরাং সাময়িক

বাঁঁ দিকের জানালা দিয়ে
  শুক্তোর গন্ধ, 
সামনের জানালা দিয়ে
মাংস মাংস
ওরে কে আছিস? 
নাঃ কেউ নেই
শুধু মুখ থেকে খিদের গন্ধ। 

বাঁ দিকের জানালা দিয়ে
হাস্নুহানার গন্ধ আসছে, 
সামনের জানালা দিয়ে
ফেরিওয়ালার ঘাম
ওরে কে আছিস? 
নাঃ কেউ নেই
শুধু মুখ থেকে খিদের গন্ধ। 

বাঁ দিকের জানালা দিয়ে
মানুষ গন্ধ আসছে
সামনের জানালা দিয়ে
হিংসে হিংসে
ওরে কে আছিস? 
নাঃ কেউ নেই

মুখ থেকে খিদে জমা পাথর গন্ধ
ওরে কে আছিস? 
নাঃ কেউ নেই,,,

উপন্যাস

ঝড়ো রাতের গল্প গুলো রাত্রি মেখে মেখে
আফিম নেশায় বেড়েই চলে নরম ভোরের সন্ধানে 
মন মাতলো ছন্দে সুরে,ঠিকানা প্রস্তুতে
একটি গোলাপ রক্তিম সে,তোমার অপেক্ষাতে।

ঘুমন্ত উপন্যাস, ঘুমন্ত তুমি
আর  ঘুমন্ত ছায়া পথ
লগ্নে লগ্নে তোমার নাভি
উদগীরণ ইচ্ছে স্রোতে
অনাবিল সৃষ্টি করন
ঝরছে তোমার স্তনবৃন্তে

তবুও আমি ভেসে চলি
পবিত্র তুলসীর আবরণে
শব দেহ আজ বাড়বাড়ন্ত 
সব টাই আজ যন্ত্রনা ধারণ এ,,,

শূন্য

এখানে কোনো দরজায় নেমপ্লেট নেই, 
টোকা  দিলেই – 
দরজা খুলবে, আপন কেউ নেই।
যেখানে  খুন  করার  আবেগ  নেই, 
যেখানে অযথা মৃত্যুর সারি নেই।

স্বর্গ নেই, নরক নেই, 
তাই ধর "ম" নেই।
মানচিত্রের ফাটল নেই, 
তাই রাজা নেই, 
অতএব প্রজা নেই।

সূর্য ডুবলে--
আরো মোলায়েম একটা সূর্য ওঠে-
যে যার সামনের দরজায় টোকা দেয়, 
আমি একমুঠো মাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে ।

তোমরা----
সেই দেশের একটা নাম দাও-।

কবি মিশর রায় 
মুকুন্দপুর, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 



















































উদয়ন চক্রবর্তী'র তিনটি কবিতা 

একটা অসম্পূর্ণ কবিতা

যে কোনো সময় বিনা প্ররোচনায়
ইচ্ছে মতো পংক্তি তে বসিয়ে
দিচ্ছে কেউ যতি চিন্হ পূর্ণচ্ছেদ,
প্লাস্টিক কাপড়ে মুরে শবদেহ গাড়ির
সীমিত আয়তক্ষেত্রের আকাশ মুখি বুকের ওপর
মুহূর্তে ইতিহাস হয়ে উদাসী দুলকি চালে চলেছে
হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া কবিতার শেষ লাইন
ধূসরতার বিষাদ ব্যথা বুকে পংক্তি নির্মাণে,
সে পংক্তির কান্না শোনার কেউ নেই কাছাকাছি
শুধু সবাই জানতে পেরেছে সে মৃত তৈরি করেছে
অসম্পূর্ণ কবিতার একটা যুক্তিহীন অন্তমিল
আর মৃত্যু হচ্ছে কবিতার শেষ পূর্ণচ্ছেদে।

সভ্যতার জাইগোট

নদী তার বিষাদ নৈরাজ্য নিয়ে না ভেবে
মানুষের কাছে সোহাগ চেয়ে
অনুগত হতে চায় সাগরের সহবাসে
চাঁদের চুম্বন পেয়ে জোৎস্নায় তরুণীর
আবেগে মানুষের প্রেমপত্র পড়ে দেখতে চায়
দু পাড়ে জীবনের কোলাহল গলে গেলে
নদীতে মিশে যায় সভ্যতার জাইগোট
মেঘেরা নদীর কাছ থেকে প্রাণ সঞ্চয় করে
ঝরে পড়ে সবুজ ধানে জমাট দুধ হয়ে সহস্র খিদে এক ধারাবাহিক ইতিহাস বুকে
জীবিত মানুষের অহংকার বাঁচে সে নিসর্গ অনুকম্পায়।


কিন্তু

সাঁকোর মাঝখানে এক দাঁড়কাক
ঘার কাৎ করে চেয়ে দেখে
সাঁকোর দু-প্রান্তে শিকারী সময় লেজ নাড়ছে
পেরিয়ে আসা পথ পেরোতে হবেই
যতটা ধুলোঝড় আর কুয়াশা বিছানা পাতুক
স্মৃতি তারাদের চোখে চোখ রেখে
শিশিরভেজা হবে অবাধ্য শরীর রোদের আবাসে
কথারা বিষ আর মধু মুখে নিয়ে ভেসে যাবে
মেঘেদের সাথে ফানুসের পিঠে চেপে
জীবন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে সমাপ্তি রাতে
পর্দা নেমে আসবে কুমির কান্না বুকে জড়িয়ে
প্রিয়জন যত ঘুমে কাতর নিজস্ব দিগন্ত রেখায়
শত্রুরা যারা লিখে রেখেছে ডাইরি
এক সাথে বলবে লোকটা ভালো ছিল কিন্তু---।

কবি উদয়ন চক্রবর্তী 
কোন্নগর, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ 






























পীযূষ কান্তি সরকারের অণুগল্প 
এপার-ওপার

আকাশবাণী - দূরদর্শনের পরিচিত কণ্ঠ তথা সুন্দর মুখাবয়বের অধিকারি হেডমাষ্টারের স্নেহধন্য চয়ন স্যারের টেবিলের চারপাশে ঘুরঘুর করতো ছাত্রের দল। সেদিন কথায়-কথায় সিঞ্চন বলেই ফেলল, " কুন্তল স্যার বলেছেন, ভালো ছড়া-কবিতা লিখতে পারলে উনি পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দেবেন।" চয়নের ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল।বলেই ফেললেন, "এখানে কেন? যাও না তাঁর টেবিলে গিয়ে উদয় হও না চাঁদ !"
       মাস দুই পরে ছোটোদের একটি নামী পত্রিকায় সিঞ্চনের কবিতা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাওয়ার পর চয়ন স্যারের অনুগামীর সংখ্যা কমতে শুরু করল। সেদিন রবীন্দ্র-নজরুল-জয়ন্তী। ছাত্র-শিক্ষকের মিলোনৎসব।
মঞ্চে চয়ন স্যার ঘোষণা করলেন, "এবার রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পের বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন আমাদের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী কুন্তল বিশ্বাস।"
        ছাত্রদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলেও কুন্তল স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় তাঁর বক্তব্য রাখলেন।
         গ্রীষ্মের ছুটির পর যথারীতি স্কুল খুললো। চয়ন দেখলেন ছাত্ররা সকলে তাদের প্রিয় কুন্তল স্যারের টেবিলের চারপাশ মুখর করে তুলেছে।

সাহিত্যিক পীযূষ কান্তি সরকার
উত্তর ব্যাঁটরা, কদমতলা, হাওড়া






রিঙ্কি বোস সেনের ছোটগল্প 
দোলনা 

ঘরের দরজাটা আস্তে করে খুলে পা টিপেটিপে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো তিথি। শ্রাবণী বাঁ'হাতটা চোখদুটোর উপর রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে। জেগেই আছে, ঐ একটা ভাতঘুম চোখে লেগে থাকলে যা হয়। তিথি অবশ্য ঘুমোয়নি, সারাদুপুর ছাদে ছিল, প্রতীকের সাথে। কিছু একটা হচ্ছিল সেখানে। শ্রাবণী ঠিক জানে না কী হচ্ছিল, জানার চেষ্টাও করেনি। শ্রাবণীর ভালো লাগে না সবার সব ব্যাপারে নাক গলাতে। যে যেভাবে থাকতে চায় থাকুক। এক ছাদের তলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে হলে একে অপরের অনেককিছুর প্রতিই উদাসীন হতে হয়। শ্রাবণী অনেক আগেই এই স্বভাব রপ্ত করে নিয়েছে, পবিত্রের চলে যাবার পর তো আরও বেশি করে নিজেকে সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো থেকে সরিয়ে রেখেছে।
___ 'সংসার বড় জটিল জায়গা, তার চেয়েও বেশি জটিল সংসারের চৌহদ্দির মধ্যেকার সম্পর্কের সমীকরণগুলো।' __
 এটা পবিত্র প্রায়ই বলত শ্রাবণীকে, সাথে আরও বলত,
__'যত পারো আমার উপর ছড়ি ঘোরাও গিন্নী, দোষ নেই কিন্তু আমি গেলে এই অভ্যাস কিন্তু ছাড়তে হবে...ছড়ি সরিয়ে রেখে ওদেরকে লাঠি করে বাঁচতে হবে, মনে রেখো'।
শ্রাবণী মনে রেখেছে, ভোলেনি কিছুই। শুধু পবিত্রের কথাগুলোই নয় শ্রাবণী ওর বাবার কথাগুলোও মনে রেখেছে। 

গ্রামের মেয়ে শ্রাবণী, গ্রামেই পড়াশোনা, গ্রামেই বড় হওয়া। তাই ছোট থেকেই খুব সাদামাটা, অনাড়ম্বর কিন্তু অকৃত্রিম একটা প্রাকৃতিক আবহের মধ্যে শ্রাবণীর বেড়ে ওঠা। মাটির গন্ধে, ঘাসের স্পর্শে ওর ছেলেবেলা কেটেছে। দুই দাদা'র জন্মের প্রায় বারো বছর বাদ শ্রাবণীর জন্ম। আর তাই বাবার একেবারে আদরের দুলালী ছিল সে। বাবার কাছে পড়া, বাবার সাথে খেলা, গল্প শোনা এসব ছিল শ্রাবণীর নিত্যদিনের অভ্যাস। গরমের সন্ধ্যেবেলাগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের মায়াবী। লোডশেডিং হলেই ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে আকাশের তারা গুনতে গুনতে শ্রাবণী শুনতো, জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত কিন্তু হার না মানা ওর বাবার কথাগুলো ,
__' মনা, জীবনে যাই আসুক না কেন এই মাটির কথা মনে করবি, এই মাটির মত সহ্যশক্তি রাখবি। এই মাটি সবকিছুকে ধারণ করে রেখেছে, পরম যত্নে লালন করছে। পরিবর্তে কী চাইছে? কিছুই না। রোদে শুকিয়ে, জলে ভিজে...শুধুই দিয়ে চলেছে। তুইও এমন করেই তোর চারপাশ'টাকে লালন করবি, ধারণ করবি, নরম মনের কিন্তু শক্ত মানসিকতার মানুষ হবি ...বড় হবি, একদিন সংসার করবি, কর্তব্য পালন করবি অথচ দেখবি পরিবর্তে তেমন কিছুই পাচ্ছিস না, মন খারাপ করবি না, এই মাটির কথা মনে করবি আর নিজের কাজটুকু করে যাবি। দেখবি জীবনের গল্প কী সুন্দর তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে'।

কথাগুলো সেই তখন থেকেই শ্রাবণী মনের মধ্যে
সযত্নে লালন করে এসেছে কিন্তু তাতে গল্প যে তরতরিয়ে এগিয়ে গেছে তা নয়। জীবনের প্রথম ধাক্কাটা খায় এগারো -বারো বছর বয়সে যখন বাবা'টা ওর হঠাৎ করেই খুব অসময়ে চলে যায়, মাত্র চারদিনের জ্বরে। বাবা'কে হারিয়ে ছোট্ট শ্রাবণী তার পৃথিবীটাকেই হারিয়ে ফেলে। সংসারে যদিও অভাব ছিল কিন্তু তবুও এদিকওদিক করে হেসে-খেলেই চলে যাচ্ছিল। অভিযোগ বা অতৃপ্তি ছিল না কোথাও। কিন্তু বোধহয় স্বল্পে সন্তুষ্ট থাকা মানুষদের সুখ স্বয়ং বিধাতারও সহ্য হয় না। আর তাই তো সুখী পরিবারে আছড়ে পড়লো বাঁধভাঙা দুঃখের ঢেউ। শ্রাবণীর দাদা'দের মাথা ভালো ছিল তাই মোটামুটি কাজকর্ম খুঁজে নিতে অসুবিধা হল না। শ্রাবণীও পড়াশোনায় খারাপ ছিল না কিন্তু সেইভাবে আর পড়াটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারলো না। রূপরং ছিল বেশ ভালো।আর তাই পবিত্রর পিসে-পিসী শ্রাবণীদের গ্রামে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে শ্রাবণীকে দেখা মাত্রই উঠেপড়ে লাগে, শ্রাবণীকে এক কাপড়ে নিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। শ্রাবণীর মা আর দাদা'রাও আর দেরি করল না। মাত্র ঊনিশেই সে ঢুকে পড়ল সংসার রাজ্যে। শ্রাবণীর মনে পড়ে গ্রামসুদ্ধু লোকের মুখে তখন একটাই কথা,
__ 'এমন সম্ভ্রান্ত পরিবার, সরকারি চাকুরে পাত্র! সুবোধ দাঁড়িয়ে থেকেও এমন সম্বন্ধ করতে পারতো কিনা সন্দেহ,  মেয়েটা সত্যি কপাল করে এসেছে,'। 

শ্রাবণী সত্যি কপাল করে এসেছে কিনা জানে না, এই নিয়ে কোনোদিনই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেনি সে। মাত্র এগারো-বারো বছরের কাঁচা বয়সে জীবনের মস্ত বড় খুঁটিটাকে হারিয়ে যে অপূরনীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল শ্রাবণীর মনে তারপর আর ভাগ্য - সৌভাগ্য নিয়ে ভাবার মত কোনো বিলাসিতা কারোর থাকে না। তবে এটা ঠিক খুব ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত ভাবে নিজের ক্ষতস্থান লুকিয়ে রাখতে শিখে যায় সে। বাবা'কে সদ্য হারিয়ে খুব যখন কষ্ট হত, কান্না পেতো তখন মাটির দিকে তাকিয়ে বাবার মুখটা আর বাবার কথাগুলো মনে করত শ্রাবণী...। আজও তাই করে, যখনই বুকের ভিতরে একটা চাপ লাগে, চোখদুটো বুজে, মাথা ঝুঁকিয়ে বাবার মুখটা মনে করে, মনে করে সেই কথাগুলো, 
__'সংসারে কাজটুকু করে যা... ঐ কাজটুকুর জন্যই তো আসা, সংসারের ছন্দ-তালে নিজেকে ঢেলে দিবি, দেখবি সুখ আপনা-আপনিই তোর কাছে এসে ধরা দিয়েছে।' 
এইভাবেই একটা অদ্ভুত সুন্দর জীবন দর্শন তৈরি হয়ে যায় শ্রাবণীর। আজ জীবনের শেষ ধাপে এসেও সেই দর্শনই শ্রাবণীর অন্যতম সম্বল। এই দর্শনের উপর ভর করেই প্রতীক-মৌমীর সংসারে সে আপন সুরে টিকে থাকতে পারে, তানাহলে তো চোখের সামনে অনেককেই দেখলো বৃদ্ধাশ্রমের দিকে ঝুঁকতে বা হয়তো পৃথিবীর এক কোণে একচিলতে জমিতে একাকীত্বের ঘেরাটোপে শেষ প্রহরের অপেক্ষা করতে। 
__' ঠাম্মি, ঘুমচ্ছো?' 
বিছানায় শ্রাবণীর পা'য়ের কাছে এসে বসল তিথি।মাথার উপর থেকে হাত'টা সরিয়ে শ্রাবণী তিথির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, 
__' নাহ দিদিভাই! ঘুম আর কই, ঐ একটু তন্দ্রা...কেন বল, কী বলবে তুমি?' 
___' তোমাকে একটা জিনিস দ্যাখাবো'
___' কী দ্যাখাবে?'
__' ও তুমি চল, নিজেই দেখবে'
শ্রাবণী ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে আলগোছে চুলটা খোপা করে, 
__' যাবো, পম্পাদি আসুক, চা'টা খাই, তারপর না হয় যাবো, কেমন?' 
তিথি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে শ্রাবণীকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় পা'য়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। শ্রাবণী কয়েক সেকেন্ড সেদিকেই চেয়ে বসে রইল। মনে পড়ে গেল বছর নয়-দশের সেই মনা'কে, তিথির মতই এইরকম চনমনে, উচ্ছ্বাসে ভরা বাবার আদরের দুলালী ছিল সে। মুখ খুললেই তার বাবা বুঝে যেতো সে কী চাইছে। ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো কত ছবি।

___' কী করছিস রে মনা?' 
পিছনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সুবোধ। মনা এক মনে প্লাস্টিকের বালতির বড় ঢাকনাটার দু'পাশে উলের কাঁটা দিকে দুটো ফুটো করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কোনো উত্তর দিল না। সুবোধ এবার লুঙ্গিটাকে জড়ো করে মনার পাশে এসে বসল, তারপর ফিসফিস করে, 
__' কী বানাচ্ছিস, আমায় বলবি না?' 
__' দোলনা', 
দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে গায়ের সব জোর দিয়ে ঢাকনায় ফুটো করার চেষ্টা তখনও অব্যাহত। সুবোধ একটু মুচকি হেসে, মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে, 
__' দোলনা চড়তে ইচ্ছে হয়েছে বুঝি?'
__' হুম'
__' তা কোথায় বাঁধবি এই দোলনা? '
__' কেন ওই আম গাছ'টার ডালে!'
সুবোধ একবার চোখ তুলে আম গাছ'টা দেখে নিল।তারপর উঠে বাড়ির পিছন দিকে গেল,সেখানে রয়েছে যাবতীয় বাতিল জিনিসের স্তুপ, সাইকেলের পুরনো টায়ার থেকে শুরু করে পুরনো হ্যারিকেন, কৌটো, বালতি সব কিছুরই অংশবিশেষ। সুবোধ মিনিট পনেরো সন্ধান চালালো তারপর খাজানা জিতে ফেলার মত একটা আনন্দ নিয়ে মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়ে তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিকের ঢাকনার সাথে উলকাঁটা দিয়ে।
__' শোন মা, তুই বরং এই ঢাকনা'টা রেখেই দে কখন আবার তোর মা এইটার খোঁজ করবে, চেঁচামেচি করবে...দ্যাখ আমি কী পেয়েছি'।

 আড়াই বাই এক ফুটের কাঠের একটা পাটা। দেখা মাত্রই মনা'র চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো।একটা শক্তপোক্ত কাঠের পাটা, সামান্য একটু বাঁকা, কিন্তু তা হোক, দোলনা তো হবে...অনেকটা উঁচু করে দোলা তো যাবে। 
___' চল একটু দড়ি নিয়ে আসি তারপর আচ্ছা করে সেই দড়ি এই পাটায় জড়িয়ে  আম গাছের ঐ যে ডাল'টা দেখছিস ওইটায় বেঁধে ঝুলিয়ে দেবো...তারপর আমার মনা'মা মনের সুখে দোলনা ঝুলবে...ঠিক আছে?'
একমুখ হাসি নিয়ে ঘাড় নেড়ে দেয় মনা। তারপর বাপ-বেটি বেরিয়ে পড়ে পাশের মুদি থেকে শক্ত দড়ি কিনে আনতে। আম গাছের একটা ডালে বাঁধা হয় দোলনা, সারা দুপুর চলে সেই দোলনা পর্ব। বিকেল হলে দোলনা পুরো তৈরি। মনার তখন সে কী রোমাঞ্চ, ধীরে ধীরে দোলনায় চেপে বসল, সুবোধ পিছন থেকে হাল্কা করে দোলনা'টা ঠেলে দিতেই সেটা ধীরে ধীরে পেন্ডুলামের মত এগোতে পিছতে লাগলো। মনা'র বুকে সাহস বাড়তে লাগলো আর তার সাথে দোলনার গতি, ক্রমাগত পা'দুটো আগে-পিছে করে শরীরটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল সে। সুবোধের দুচোখে তখন জল, আবেগের জল... মেয়ে'টা যে তার বড্ড প্রিয়। এমন করেই মেয়েটা যেন হেসেখেলে থাকে, স্বপ্নের হাত ধরে এমন করেই যেন উপরে, আরও উপরে, সে উঠতে পারে, স্বপ্নের উড়ানে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। 

__' দিদিমা চা' 
পম্পা চা'য়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকে এসে দাঁড়ালো।নিমেষে শ্রাবণী ফিরে এলো তার স্মৃতির গলিপথ থেকে... যেন কত সহস্র যুগ পার করে সে এক রূপকথার রাজ্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে একসময় ছিল এক রাজা আর তার এক রাজকন্যা। খুব সাদামাটা রাজপাট ছিল তাদের, কিন্তু সুখ ছিল ঝুড়ি ঝুড়ি... তৃপ্তি ছিল আকণ্ঠ। সামান্য একটা বাঁকাচোরা কাঠের পাটা দিয়েই তারা কাটিয়ে দিতে পারতো কিছু সুখের প্রহর। রাজকন্যা পারতো তার স্বপ্নের আকাশ ছুঁয়ে দেখতে, আর সেই রাজকন্যের আকাশ-ছোঁয়া আনন্দ আর খিলখিল হাসির মধ্যে রাজা পেতো রাজ্য জয়ের সুখ, তৃপ্তি। আর এই নিদারুণ তৃপ্তির জোয়ারেই একদিন টুপ করে চোখ বুজে কালের অতলে হারিয়ে গেল সেই রাজা। সেইদিন থেকে রাজকন্যার স্বপ্নের দোলনাও যেন মাটিতে আছড়ে পড়লো। আর সেইভাবে আকাশ ছুঁয়ে দেখা হয়ে উঠলো না রাজকন্যার।
__' জানলাগুলো খুলে দিই দিদিমা?' 
শ্রাবণীর দুচোখে জল, আঁচল দিয়ে খানিক মুছে নিয়ে,
__' দিবি? দে তাহলে, দাদা- বৌদি চা খেলো?'
__' না, দাদা- বৌদি তো বেরোলো',
__' বেরোলো?  কোথায়?'
__ ' ঐ যে জন্মদিনের জন্য কীসব কেনাকাটা বাকি, আমায় বৌদি রাতের রান্না বলল আর বলল দরজাটা লাগিয়ে দিতে, তোমায় কিছু বলেনি?'
__' নাহ!'
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো শ্রাবণীর বুকের ভিতর থেকে। 
__' দাদারা কেমন গো? তোমায় কিছু বলেও যায় না?'__
শ্রাবণী এবার প্রকৃত অনুভূতিকে কাবু করে নিয়ে, 
__' বলে যেতেই হবে এমন কি কোনো কথা আছে? আমি ঘুমোচ্ছি ভেবে, হয়তো আমি ব্যতিব্যস্ত হব এই ভেবেই বলেনি...তিথি আছে তো? যা ওকে ডেকে দে, বল ঠাম্মি এখন রেডি...আর তুই যা বৌদি রান্না যা বলেছে দ্যাখগে'।
 শ্রাবণীর কথার ঝাঁঝ বুঝতে পম্পার অসুবিধা হল না। শ্রাবণীকে আড়াল করে ভালো রকম একটা ভেংচি কেটে জানলাগুলো খুলে ঘর থেকে পা' ঠুকে বেরিয়ে গেল সে। 

শ্রাবণী খাট থেকে উঠে জানলার ধারে এসে দাঁড়ালো। জানলার বাইরে এক ব্যস্ত পৃথিবী, কতকত মানুষ, কত গাড়ি...কত গতি আর ছুটোছুটি... শ্রাবণীর নিথর, নিস্তব্ধ পৃথিবীর মত নয়। পবিত্র চলে যাবার পর থেকে শ্রাবণীর জীবন প্রায় একেবারেই নিস্তরঙ্গ, হঠাৎ করেই যেন থমকে গেছে। প্রতীক-মৌমির সংসারে অভাব কিছুই নেই, আর তাই অভিযোগ করারও কিছু নেই। শুধু ওরা যেখানে খুব ব্যস্ত, শ্রাবণীর সেখানে শুধুই অবসর...অসামঞ্জস্যটা ঠিক এইখানেই। তিথি'টা অবশ্য তার সরল সাহচর্যে সেতুর মত দুই প্রান্তকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বড় মিষ্টি মেয়ে'টা, বড় মায়া। 
___' চলো ঠাম্মি'
তিথি পিছন থেকে এসে শ্রাবণীকে জাপটে ধরল।
__' কোথায় যাবো দিদিভাই?'
__' ছাদে'
__' ছাদে? কেন তোমার টবে নতুন গোলাপ এসেছে বুঝি?' 
__' উফ! অত বলতে পারবো না, যেতে বলেছি চল ব্যাস!' 

শ্রাবণীকে একপ্রকার হাত ধরে টেনে ছাদের দরজায় এনে দাঁড় করালো তিথি।
__' ঠাম্মি এবার তুমি চোখ বন্ধ কর'
__' একী! কেন?'
__' কর না!  আমি তোমাকে একটা দারুণ জিনিস দ্যাখাবো, তুমি চোখ বন্ধ কর...চোখ খুলতে বললে তবেই খুলবে, তার আগে খুলবে না কিন্তু!'__
শ্রাবণী অনুগত ছাত্রীর মত তিথির কথা শুনে চোখদুটো বন্ধ করল। তারপর তিথির হাত ধরে ধীরে ধীরে এক'পা দু'পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। 
__' ব্যাস, ব্যাস ঠাম্মি এইখানেই দাঁড়াও, কিন্তু চোখ খুলবে না'। 
শ্রাবণীকে দাঁড় করিয়ে তিথি হাত ছেড়ে এগিয়ে গেল। শ্রাবণী দাঁড়িয়ে, চোখ বুজে। শুনতে পেলো তিথির উচ্ছ্বসিত গলা, 
__'এইবার চোখ খোলো ঠাম্মি'।

শ্রাবণী এবার চোখ খুললো। তিথি দুলছে, চোখেমুখে তার সে কী আনন্দ, তৃপ্তি! খিলখিল করে হাসছে আর পা'দুটো আগেপিছু ছুঁড়ে জোরে জোরে দুলছে আর বলছে,
__' দ্যাখো ঠাম্মি, বাপি আমার জন্য অর্ডার দিয়ে আনিয়েছে,দুপুরবেলা লোক এসে ফিট করে দিয়েছে, আমার জন্মদিনের গিফট... ভালো হয়েছে? ...আমার খুব ইচ্ছে ছিল জানো, আমার একটা দোলনা থাকবে, আমি ভাবিইনি বাপি সারপ্রাইজ দেবে! এসো না ঠাম্মি, আমরা একসাথে দুলবো...আমার খুব খুব আনন্দ হচ্ছে, ঠাম্মি তোমার হচ্ছে?' __
শ্রাবণীর দুচোখ ভিজে এলো।হাঁটুদুটো কেমন যেন কেঁপে উঠল। ছাদের একপাশে রাখা বেতের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে,
__' হচ্ছে বৈকি, তোমার আনন্দ হচ্ছে দেখে আমারও খুব আনন্দ হচ্ছে! আনন্দ কর দিদিভাই, এইটাই তো আনন্দ করার বয়স তোমার,  খুব আনন্দ কর, তুমি তো তোমার বাপির রাজকন্যা, আদরের রাজকন্যা'।__
তিথি আরও একবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। পা'দুটো দিয়ে হাওয়া কেটে ভারি লোহার বাহারি দোলনা'টাকে সামনে পিছনে দোলাতে লাগল।দেখে মনে হচ্ছে যেন এক চনমনে প্রজাপতি, রঙিন ডানায় ভর করে আকাশ ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছে। শ্রাবণী দেখছে এক মনে, তিথিকে আর সাথে মনা'কেও। অদ্ভুত এই জীবনের গল্প! সময়ের সাথে কত কিছুই বদলে যায়, হারিয়ে যায় কিন্তু গল্প তবুও তরতরিয়ে এগিয়ে চলে, চলতেই থাকে...আর সেই গল্পের হাত ধরেই নতুন চেহারায় ফিরে ফিরে আসে সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে থাকে এক রাজা আর তার আদরের রাজকন্যা। বাবার মুখ'টা স্পষ্ট দেখতে পেলো শ্রাবণী, মনে পড়ে গেল সেই কথাগুলো, ' সংসারের ছন্দ-তালে নিজেকে ঢেলে দিবি, দেখবি সুখ আপনা-আপনিই তোর কাছে এসে ধরা দিয়েছে'। ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শ্রাবণী, আঁচলটা টেনে নিয়ে কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিল আর তারপর ধীরে ধীরে দোলনার দিকে পা বাড়ালো।

   সাহিত্যিক রিঙ্কি বোস সেন
রাধানগর পাড়া, পূর্ব বর্ধমান


প্রচ্ছদ- মৌটুসী ঘোষ 
































রাক্ষস
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

তারপর অজস্র মেঘ জমে সাম্রাজ্য

বৃষ্টি-বাতাসের সৈন্যদল ক্লান্তিহীন
আর আছে কোটালের স্রোত
ঘর নয়,কাগজের ঘর বেহুলার ভেলা
ভেসে যায় বিছানা বাসন পালিত পশু
হাতছুট চলে যায়
অজস্র মুখ চেটো জল হাঁটু ছাড়িয়ে বুক
বুক থেকে মুখ টেনে নেয় জলের রাক্ষস
তারপর....

জলকে মরণ বলে ডাকি


            কবি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
গোপেশ্বরপল্লি, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া
















উড়াল 
সুধাংশুরঞ্জন সাহা

মনখারাপের চিত্রনাট্য ঘিরে জমে ওঠে মেঘ।
বেজে ওঠে ঝড় বাদলের তুমুল আবহ।
নষ্টপ্রেম অশ্রুদিঘিতে একা একা  সাঁতার কাটে।
বিষণ্ণ স্টেশন অথবা নির্জন খেয়াঘাট ঢুকে পড়ে
জীবনের নানান অজ্ঞাত সরণিতে ।

ধরা যাক, যদি এমন হত যে, 
সারা দুনিয়াটা
একটাই মাত্র দেশ।
মৃত্যু বলে কিছু নেই।
ভুল ভ্রান্তি নেই।
ভালো মন্দ নেই।
ঝগড়া বিবাদ নেই।
পাপ পূণ্য নেই।

আছে শুধু উড়াল আর উড়াল।
ভাবের উড়াল।
কল্পনার উড়াল।
বিস্তারের উড়াল।
নিজেকে প্রকাশের উড়াল।
কিংবা মুক্তির উড়াল।

তাহলে কেমন হতো সেই পৃথিবীটা !

       কবি সুধাংশুরঞ্জন সাহা
সন্তোষ রায় রোড, শিবম অ্যাপার্টমেন্টস, কলকাতা





















স্বয়ম্ভূ
গৌতম কুমার গুপ্ত 

বীরত্ব দেখাবে বলে পিছিয়ে দিয়েছে মৃত্যুতারিখ
অসুখ তাড়িয়ে সুখে দিয়েছে হাত
হাতের মুদ্রায় নৃত্যগীতে তাল ঠুকছে দিবারাত
চু্লে দিয়েছে ফোঁপানো আলবেটের ফণা
জন্মদিনের কেক মোমবাতি হাত্তালি ফিবছরে একবার

সে কেঁদেছিল কেন শৈশব কেড়ে নিয়েছে দুর্যোগ
কানাগলির ভেঁপুতে একদা ছোটবেলার গান
আঠারো বয়সে সে এক উঠতি পহেচান
জন্মদিনের সুখপায়েসে কচ্চিৎ বেলুনের রঙমহল
নিজের খোলতাই খুলতে খুলতে কখনো ঐশ্বরিক

একটি স্বয়ম্ভূ প্রয়াসে ব্যস্ত রেখেছিল বড়োবেলার মান
করুণা চায় নি দয়াভিক্ষা নয় এককে নিজেরই সম্মান
অসুখে দিয়েছে তালা সুখের ইমারতে স্ব রচনার ভিত
কোথাও কখনো বলেছে কাউকে জেগে আছো নাকি তবে

কবি গৌতম কুমার গুপ্ত 
সুভাষপল্লী, বেনাচিতি, দুর্গাপুর



















 

মানুষ প্রতিনিয়ত পেছনের দিকে হাঁটে
প্রেমাংশু শ্রাবণ

নিজের প্রতিবিম্বর পেছনেই লুকিয়ে থাকে
পারিজাত ইতিহাস
ব্যক্তিগত দাঁড়ি কমা,যতি চিহ্ন।

একটি সবুজ চিঠির মৃত্যু চোখে ভাসে---
একটা ট্রেন সমান ঝমঝম নিয়ে
যা মিলিয়ে গেছে শূন্যতায়!
একটা মিস করা টিকিট আজও বুক পকেটে
হৈ-হুল্লোড়। 

হাঁটতে থাকি।হাঁটতেই থাকি...
অনন্ত স্টেশনের দিকে
লুডু কোর্টের মতো পথে পথে ফেক আইডি, 
মিথ্যুক সাপ।

ছোবলে ছোবলে বারবার ফিরে আসছি
ফেলে আসা পথে
মানুষ প্রতিনিয়ত পেছনের দিকে হাঁটে...

কবি প্রেমাংশু শ্রাবণ 
যশোর, বাংলাদেশ

















কোলাজ 
সুমন সরকার

কতকগুলো এলোমেলো শব্দ জুড়ে
একটা সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করতে হবে-
যা অর্থবহ, ইঙ্গিতবাহী ও প্রাসঙ্গিক..

অবিন্যস্ত চিন্তাভাবনা গুলোকে সাময়িক দূরে সরিয়ে মন-মাঝারে ডুব দিই--
যত গভীরে যাই, নেমে আসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি---

সূ্র্যোদয় থেকে সূর্যান্ত পর্যন্ত তো
কত ঘটনাই ঘটে,
সবই হয়তো প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়,
কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনাও কি প্রাকৃতিক?
সবই কি শব্দগুচ্ছে বেঁধে,
বাক্য গঠন করা যায়?

এতো হিংসা, বিদ্বেষ, দাঙ্গা, হানাহানি--
এগুলো কি আদৌ অর্থবহ,
ইঙ্গিতবাহী নাকি প্রাসঙ্গিক??
কি লাভ এই সাময়িকীতে রিপুতাড়িত
এই ব্যাধিগুলো কে স্থান দেওয়ার?
শব্দগুলোকে বেঁধে বাক্য সম্পূর্ণ করার?

অন্তরের অন্তঃস্থলে অবগাহনের পর
উঠে আসে এক পরম প্রশান্তি...
মনঃশ্চক্ষুতে দেখতে পাই কিছু প্রাণী,
এখনো স্পষ্ট নয় তাদের মুখাবয়ব,
শুনতে পাই এলোমেলো কিছু শব্দ,
নদীর ঢেউ, পাতার মর্মর শব্দ মিশে যাচ্ছে
তাদের পদধ্বনিতে---
সেতারের মুর্ছনায় সঙ্গত দিচ্ছে
তাদের সমবেত কন্ঠস্বর। 

কান পেতে শুনতে চেষ্টা করছি কিছু শব্দ,
আরো, আরো কিছু শব্দ--
'পৃথিবী', 'পরিচয়', 'একমাত্র', 'আমরা', 'আমাদের', 'চাওয়া', 'বাঁচা', 'মানুষ'--

হাহাকার করতে করতে শব্দগুলো ক্রমাগত চক্রাকারে আবর্তিত হয়,
বিভ্রান্ত,দিশাহীন হয়ে যাই কালস্রোতে-

আবার একবার অবগাহনের পালা...
এরপর হঠাৎ এক আশ্চর্য আলোয়
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় মুখাবয়ব গুলো,
জিয়নকাঠির স্পর্শে শ্রুত শব্দগুলো
অর্থপূর্ণ, ইঙ্গিতবাহী ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে
ধীরে, ধীরে....

হৃদয়ের ক্যানভাসে শব্দগুলোকে জুড়ে
লিখে ফেলি এক সম্পূর্ণ বাক্য-
''আমাদের একমাত্র পরিচয়, আমরা মানুষ,   পৃথিবীতে বাঁচতে চাই ॥''


কবি সুমন সরকার 
রাধানগর শিবতলা, পূর্ব বর্ধমান 










ইচ্ছে 
মৌটুসী ঘোষ

মনে করো আমি আবারও হাসপাতালে ভর্তি,
হয়তো সেই দরজায় দাঁড়িয়ে-
জন্ম-মৃত্যুর প্রকোষ্ঠে,
তোমার কথা ভাবছি অবিরত!
ঠিক সেইসময়েই হঠাৎ তুমি এলে,
দেখলে বছর পাঁচেক পরে-
আমার মুখে অক্সিজেনের মাস্ক,
না না আমি মরিনি,
মরলে কেন তোমার কথা ভাববো!
অদ্ভুত তো সেই একইভাবে হাতটা
আমার মাথায় স্পর্শ করলে,
তখন তুমি ডাক্তার নও,
হয়তো প্রেমিক হিসেবেই,
নয়তো আমাকে না দেখতে 
পাওয়ার আকুলতায়! 
বললে, "ভালো হয়ে যাবি, ধৈর্য্য ধর।"
এত রুক্ষ কথা কে শুনতে চেয়েছে,
আমার বয়েই গেছে তোমায় দেখতে,
হাতে গোলাপ নেবে, তবে না বলবে-
গোলাপ না হলেও শিউলি তো থাকবেই।

তারপরেই চিন্তিত মুখে আড়ালে চলে গেলে,
সেখান থেকেও আমাকেই দেখলে,
ভাবলে কষ্ট করে দেখি যাকে,
কষ্ট করেও পাই না তাকে,
তাই দিলে অসীম কষ্ট তাকে!
আমি তখন হাসছি আর হাসছি,শুধুই হাসছি...

কবি মৌটুসী ঘোষ 
পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 


প্রচ্ছদ: মৌটুসী ঘোষ 















বিমল মণ্ডলের অণুগল্প 
পার্থক্য 

অনুরূপা সারাদিন সংসার আর সতীনের একটা ছেলের ভালো- মন্দ নিয়ে সারাদিন কাটায়।সতীনের ছেলেটার বয়স  প্রায়ই  উনিশ। স্বামী নিখিল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। অনুরূপার  একবছর  হলো বিয়ে হয়েছে।তার নিজের কোনো ছেলেপেলে হয়নি এখনও। সংসারের  সদস্য বলতে এই তিন জন।সতীনের ছেলে অর্থাৎ  আকাশ কলেজে পড়ে।

নিখিল  বউ মারা যাওয়ার  পর বড্ড বাউণ্ডুলে হয়ে গিয়েছিল। ছেলের ভালো মন্দ কিছুই সে খবর রাখত না। সারাদিন স্কুলে না গিয়ে আজেবাজে নেশাও করতো। পাড়ার সরকার- গিন্নি একদিন ডেকে বলল,' নিখিল  তুই বিয়ে করবি? ভালো মেয়ে আছে।' নিখিল  চুপ করে শুনে আবার বাড়ি চলে আসে। তারপর নিজের থেকে  বিয়ের প্রস্তাব দেয়,শুধু ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে।

অনুরূপা  শিক্ষিতা। অনাড়ম্বর ভাবে বিয়ে হয়।আকাশও বেশ খুশি নতুন মাকে পেয়ে।অনুরূপার বয়সও খুব একটা  বেশি নয়। বাইশ কিংবা তেইশ বছরের মতো হবে। সারা পাড়ায় নিখিলের বউয়ের  সুনাম ছড়িয়ে গেল। 

অনুরূপা স্বামীর খেয়াল যতটা রাখে তার চেয়ে বেশি খেয়াল রাখে তার ছেলে আকাশের। তাই পাড়ার কেউ কেউ বলে থাকেন,' নিখিলের বউ বেঁচে থাকলে এতো আদর পেতো না আকাশ।' আকাশও অনুরূপা কে পেয়ে হাসি খুশিতে থাকে।

সাম্প্রতিক করোনা আবহে আকাশে হঠাৎ জ্বর আসে। নিখিলেরও উপসর্গ বিহীন  করোনা পজেটিভ ধরা পড়েছে।অনুরূপা দু'জন কে বেশ চিন্তিত। নিখিল ১৪দিন বাড়ির মধ্যে আলাদা থাকলেও আকাশ কিন্তু  অনুরূপার কাছেই থাকলো। কারণ তার রিপোর্ট আসেনি বলে।তা ছাড়া অনুরূপা আকাশকে ছাড়া এক মুহূর্তে থাকতে পারে না।  
দু'তিন দিনের পরেও আকাশের জ্বর কমার লক্ষ্মণ দেখা গেল না।পাড়ার লোকেরা বাড়িতে আর আসে না। নিখিল একদিন ছেলেকে দেখতে এসে অনুরূপা আর ছেলের  মধ্যে আদর আর  মুখে আনন্দের হাসি দেখে নিজের ঘরে গিয়ে আকাশের মায়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে।

কবি বিমল মণ্ডল 
                 কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ




 

নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • ধোঁয়াশা অথবা ছেলেবেলার ডাকনাম ~ সুকান্ত মণ্ডলের কবিতা
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

সুজিত রেজের কবিতা

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

গুচ্ছ কবিতায় ~ দালান জাহান

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

বর্ণজিৎ বর্মনের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates