🔸প্রবন্ধ:
🔰শেখ আসমত 🔹পূর্ব মেদিনীপুর🔹
📚যে কবির কাব্যে মৃত্যুঞ্জয়ী চির-যৌবনের জয়ধ্বনি শুনেছিলাম, শুনেছিলাম অগ্নিবীণার সুর-ঝংকার,যিনি ধীর -স্থির অচঞ্চল বাংলা কাব্যে ব'য়ে এনেছিলেন দুর্বার কালবৈশাখীর ঝড়, সেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামই আমার প্রিয় কবি। তিনি তো এই পরাধীন জড়তাগ্রস্ত সমাজের বুকে সঞ্চারিত করেছিলেন নব যৌবনের শোণিত ধারা । তাঁর কবিতা গুলি নব ভারতের সঞ্জীবনীর মন্ত্র,তাঁর সংগীত সর্বহারাদের কান্নার বাণী । তাঁর সংগীত ও কবিতায় সেদিন নবযৌবন জলতরঙ্গের বিপুল আবেগে নেচে উঠেছিল "হিমালয় চাপা প্রাচী । " বিদ্রোহের জয়ধ্বজা উড়িয়ে ধূমকেতুর মতো নজরুল ইসলাম দুর্বার পদবিক্ষেপে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠা ভূমিতে আবির্ভূত হলেন। তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটিই, প্রকৃতপক্ষে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তার প্রবেশের প্রথম ছাড়পত্র স্বরূপ । উদাত্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন--" বল বীর- বল, উন্নত মম শির, শির নেহারি, আমারি নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির । বল বিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি' চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি' উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর ।"কেবলমাত্র এই বিদ্রোহী কবিতাতেই বাংলা কবিতার আসরে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত হলেন । কবি নজরুল হলেন বাংলার বিদ্রোহী কবি ।বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রাম । ধর্মপ্রাণ দরিদ্র পিতা নাম রেখেছিলেন দুখুমিঁয়া । পিতৃবিয়োগের পর কবি কিশোর নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন এবং অল্প বয়সেই তাকে হতে হয় গ্রামের মক্তবের মৌলবী ও মসজিদের তরুণ ইমাম । এই সময়ে লেটো গানের দলে গান রচনা ও সুর- সংযোজনার প্রয়াসের মধ্যে নজরুল প্রতিভার প্রথম বিকাশ পরিলক্ষিত হয় । পরে,রুটির দোকানে চাকরি ও সিয়ারশোল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি- এ সবই নজরুলের জীবনের চমকপ্রদ ঘটনা । কিন্তু তার চেয়েও চমকপ্রদ ঘটনা হলো তাঁর বাঙালি পল্টনে যোগদান । কারও মতে, তিনি করাচি পর্যন্ত গিয়েছিলেন; কারও মতে, মেসোপটেমিয়ায় । সে যাই হোক, সেনাবাহিনীতে যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়ে তিনি হাবিলদার পদে উন্নীত হন। প্রথম মহাযুদ্ধের অবসান হল । ছাঁটাই এর খাতায় নাম উঠল নজরুলের । মনে মহাযুদ্ধের স্মৃতি এবং হৃদয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবাগ্নি বহন করে দুদ্দাড় আবেগে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এলেন বাংলার "হাবিলদার" -কবি । এবার তিনি বিদ্রোহের বহ্নিচ্ছটা নিয়ে বাংলা কবিতার আসরে অবতীর্ণ হলেন। পুরাণ- কোরআন- গীতা -মহাভারতের গভীর জ্ঞান এবং আরবি-ফারসি -সংস্কৃত- বাংলা শব্দ ভান্ডার এর দুর্লভ চাবিকাঠি ছিল তাঁর হাতে । আর ছিল উদাত্ত কণ্ঠ এবং রাগ-রাগিণীর জ্ঞানের সঙ্গে বাংলার কীর্তন- বাউল -সারি- ভাটিয়ালির প্রতি প্রাণের টান ও সেই সঙ্গে ফরাসি গজলের প্রাণ মাতানো সুর- বাহার । নজরুল চিরযৌবনের কবি । প্রাণ-প্রাচুর্যই যৌবনের নিশ্চিত প্রাণ- লক্ষ্যণ । প্রথম মহাযুদ্ধের পর আশাভঙ্গ হেতু সেই যৌবন বিদ্রোহ ধর্মী । রক্তাক্ত কাপালিকের মতো সর্ব -শোষণ - শাসন -শৃঙ্খলা সবলে ভাঙবার দুর্জয় সাধনায় সেই যৌবন নির্মম ব্রতচারী । নজরুলের কাব্যে শোনা গেল সেই বিদ্রোহী যৌবনের নির্বোধ পদধ্বনি । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও বিস্মিত স্নেহে তরুণ নজরুলকে স্বীকার করে নিলেন । বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে নজরুল দেখলেন, দেশব্যাপী পরাধীনতার নীরন্ধ্র অন্ধকারে, ধনিক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নির্লজ্জ শোষণে সমগ্র সমাজে রচিত হয়েছে এক বিশাল শ্মশানভূমি । তিনি উদ্ধত কাপালিকের মতো সেই । শ্মশানভূমি তে উচ্চারণ করলেন শব - সাধনার ভৈরবী মন্ত্র--" কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী ।"বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন-- " আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ । " কারণ 'সোহহং '-আমিই সেই । আমার ললাটে ঈশ্বরের আশীর্বাদে ললাটিকা; আমি কারও কাছে মস্তক অবনত করতে পারিনা ।মানুষ যতদিন অজ্ঞতার অন্ধকারে বন্দি থাকে, ততদিন সে নিজেকে চিনতে পারে না, সন্ধান পায় না নিজের শক্তির । কবিতায় বললেন-' আমি সহসা আমারে চিনিয়া ফেলেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ ।" আত্মশক্তির সন্ধান লাভ করলে পরাধীনতার বন্ধন আর স্থায়ী হয় না । কবির বিদ্রোহ যেমন পরাধীনতার বিরুদ্ধে,তেমনি তাঁর বিদ্রোহ সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধেও । তাঁর দৃষ্টিতে সমস্ত সামাজিক ভেদাভেদই কৃত্রিম এবং মিথ্যা । তিনি বললেন-' ও কি চন্ডাল! চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র,ওই শ্মশানের শিব!' সামাজিক কুসংস্কার, জড়তা ও ক্লান্তি কর নৈষ্কম্মের মধ্যে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তিনি আগনি বিদ্রূপ বান নিক্ষেপ করে আবেগ মথিত কণ্ঠে বললেন- ' মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি টিকি দাড়ি নিয়ে আজও বেঁচে আছি বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি,এবার সব্যসাচী, যা হোক একটা তুলে দাও হাতে,একবার মরি-বাঁচি'তাঁর অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সর্বহারা, ফনিমনসা প্রভৃতি কাব্য গুলির মধ্যে শুনি ব্যাথার্ত বিদ্রোহেরই সোচ্চার জয়ধ্বনি । দেশে তখন একদিকে স্বাধীনতার আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি বিদেশির চক্রান্তে মাথা তুলে উঠেছে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা। স্বাধীনতা সংগ্রামের কান্ডারী কে ডেকে তিনি আদেশ করলেন-
" হিন্দু না ওরা মুসলিম,ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ,সন্তান মোর মার" এইভাবে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি মিলন মন্ত্র রচনা করে গিয়েছেন তিনি । নজরুলের কাব্য তাই হিন্দু মুসলমানের পবিত্র মিলন তীর্থ ।অন্যদিকে,সাম্রাজ্যবাদীর নিষ্ঠুর শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী করেছে বিদ্রোহের দুরন্ত অগ্নি উদগা । সাম্রাজ্যবাদীর পেষণ চক্র তলে নিষ্পিষ্ট মানবাত্মার আকুল ক্রন্দনধ্বনি তিনি শুনেছেন । তাই তিনি ব্যথাহত কন্ঠে উচ্চারণ করলেন-" বন্ধুগো,আর বলিতে পারিনা বড় বিষ জ্বালা এই বুকে,দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে ।রক্ত ঝরাতে পারি না তো একাতাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা-প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাসযেন লেখা থাকে আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।"নজরুল সেই রক্ত লেখার কবি,সেই ব্যথিত মানবত্মার কবি, আমার প্রিয় কবি । হাজার ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট বিদ্রোহী কবি ঢাকায় ইহলোক ত্যাগ করেন । ভারতে তাঁর মরদেহ আনবার সকল প্রয়াস ব্যর্থ হয় । শুধু তাঁর কবরের একমুঠো মাটি বর্ধমানের চুরুলিয়ায় কবিপত্নী প্রমিলা ইসলামের কবর ভূমিতে এসে পৌঁছায়। তিনি তো বিদ্রোহী যৌবনের কপালে জয় তিলক এঁকে দিয়ে তাকে দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার উত্তরণের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের একগুঁয়েমির দুর্লঙ্ঘতা তিনি আর লংঘন করতে পারেনি ।সমগ্র জাতি নজরুলের কবি প্রতিভার কাছে ঋণী রইল অসীম ঋণে ।
----------------------------------------------
0 Comments