
শিক্ষক দিবস প্রসঙ্গে কিছু কথা
একটা শিক্ষকের সবচেয়ে বড় গুন তার নিয়মানুবর্তিতা, ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দরদ,আর সর্বোপরি 'কাজে ও কথায় মিল'। অর্থসর্বস্ব এই যুগে মানুষের সব শ্রেয় ও মহৎ ঢেকে দিচ্ছে অর্থ ও সস্তা জৌলসের হাতছানি।এই পরিস্থিতির শিকার আমরা কম বেশী সকলেই।
অনেক বছর শিক্ষকতা করার সূত্রে আমার মনে হয়েছে, জনপ্রিয়তা ও আদর্শ খুব বড় কোন পার্থক্য নয়। ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য মুল শর্ত হচ্ছে আদর্শ। আর,একজন আদর্শবান শিক্ষকের পক্ষে জনপ্রিয় হওয়া খুবই সম্ভব।
আবার অনেক শিক্ষকই জনপ্রিয় হতে পারেন,কিন্তু আদর্শ নন।এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা না উল্লেখ করলেই নয়।
এক পরিচিত দাদা এখনো শিক্ষকতা করেন,তিনি বিদ্যালয়ে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন বা আজও আছেন।
"তুমি তো স্কুলে ভীষণ জনপ্রিয় শুনেছি..." একদিন আমি হাসিমুখে বলতেই অত্যন্ত সহজ সরল মানুষটি আবেগের বশে আমাকে বলেই বসলেন,"স্কুলের পাশে একটা দোকানে আমার বলা'ই আছে,বুঝলে ভায়া...! এইট থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত ছেলেরা ওখান থেকে বিস্কুট,পাউরুটি, ঘুগনি..,এমনকি সিগারেট বিড়িও নেয়..মাসের শেষে আমি পেমেন্ট করে দিই।"শুনে সেদিন বুঝেছিলাম,ওই শিক্ষক দাদার তুমুল জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণটা কি? ছাত্রদের প্রতি অসম্ভব দরদী মানুষটি কোথায় রাশ টানতে হবে,সেটা আর উনি বজায় রাখেন নি।এক্ষেত্রে তাই উনি জনপ্রিয় হলেও আদর্শ যে নন,তা ছেলে মেয়েরা বড় হলেই অচিরেই বুঝতে পারবে।
তবে আমার মতে, আদর্শ যদি 'কান' হয়,জনপ্রিয়তা হলো 'মাথা'।আদর্শকে সারাজীবন টেনে ধরে থাকলে জনপ্রিয়তা আপনা আপনিই আসবে।
এই দিনটায় একটা বিশেষ ঘটনা খুব মনে পড়ছে,যা শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে ধ্রুবতারার মতোই উজ্জ্বল। তখন আমি অষ্টম শ্রেণী।শ্রেণী শিক্ষক ছিলেন অমল বাবু(নাম পরিবর্তিত)। অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষক মহাশয় অঙ্ক করাতেন খুব সুন্দর।আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। একদিন দেখি নবকুমার স্কুল বসার পর ক্লাসে ঢোকার অনুমতি চাইছে অমলবাবুর কাছে।"স্যার আসবো..?" বলতেই অমলবাবু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন।বললেন,"কটা বাজে..সে খেয়াল আছে?" নবকুমার শুনে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললো,"মায়ের রান্না চাপাতে দেরী হয়ে গেছিলো..!তাই...."
স্যার শুনে বললেন,"আসতে পারিস,তবে হাত পাত.. দুটো ছড়ির ঘা দিই;তারপর নিজের জায়গায় বসবি।"
নবকুমার ক্লাসে মনে হয় সবথেকে সিনিয়র ছিলো।ইয়া তাগড়াই চেহারা,আমরা সবাই ওকে সমীহই করতাম। তবে কথা বলতো খুব আস্তে..। অমন চেহারার সঙ্গে যেটা মোটেই মানানসই ছিলো না।
স্যারের কথা শুনে হাত পাতলো নবকুমার।অমলবাবু ছড়ি দিয়ে ওকে মারতে উদ্যত হয়েছেন,এমন সময় খুব ঠান্ডা মাথায় বলে বসলো নবকুমার,"স্যার, মারবেন পরে...আমার একটা কথার উত্তর দেবেন?"
স্যার ছড়ি হাতে ধরে গম্ভীরভাবে বললেন,"বল..."
"স্যার,আমি দেখেছি,আপনি প্রতিদিন ছুটির ঘন্টা পড়ার আগে স্কুল থেকে বেরিয়ে যান....তাহলে আপনিও তো স্যার প্রতিদিন আমার মতোই..."
শুনে হাত থেকে ছড়িটা পড়ে গেলো অমলবাবুর। আমরা তো হতভম্ব গোটা ক্লাস।
আসলে স্যার ট্রেন ধরার জন্য নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষন আগে চলে যেতেন,নাহলে আবার অনেক পরে ট্রেন যে....!প্রত্যেকের বুক ঢিপ ঢিপ করছে..কি হয় কি হয়….! সবাই ভাবছি,নবকুমারের কপালে কি দুঃখটাই না আছে..!
তবে ঘটনার শেষ অংশটুকু মনে দাগ কেটেছিলো আরো বেশী।
অমলবাবু নবকুমারকে জড়িয়ে ধরে বললেন,"এটা তুই ঠিক বললি তো..!আচ্ছা,আজ থেকে আমি আর যাবো না।কিন্তু কাল থেকে তুইও স্কুল বসার আগেই আসবি কেমন? যা..বস,বাবা।"
এখনো ভাবি,কত বছর আগে নবকুমার আর অমলবাবুর কথোপকথনের কথা।
শিক্ষক হওয়ার পর বারংবার মনে পড়ে এই ঘটনা,যা আমার 'আমি'কে দুটো শিক্ষা দিয়েছিলো।প্রথমত,তুমি যা ছাত্রদের বলো,তা কাজে করার চেষ্টা করো।আর দ্বিতীয়ত,মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলাও।কারণ কবিগুরু তো যথার্থই বলে গেছেন,'অপরাধ করা ছাত্রদের ধর্ম,আর ক্ষমা করা শিক্ষকের ধর্ম।'
এই করোনা আবহ কেড়ে নিয়েছে শিক্ষক জীবনের অনেকগুলো মাস, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো কত সোনালী মুহুর্ত..! তবে এই কঠিন সময়ে আমার মতোই অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাই চেষ্টা করে চলেছে অবিরত বিদ্যালয় নির্বিশেষে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে থাকার।
এখন শুধু আমরা অপেক্ষায় আছি স্কুল খুললেই একগাল হেসে কবে ছাত্র ছাত্রীরা বলবে...."গুড মর্নিং স্যার।"
সাহিত্যিক পাভেল ঘোষ
শক্তিগড়, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ



2 Comments
সুন্দর লেখা। অনেক অভিনন্দন জানাই।
উত্তরমুছুনশিক্ষক দিবস প্রসঙ্গে কিছু কথা. ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুন