
প্রায়শ্চিত
মিশকালো চৈত্র মাসের অমাবস্যার রাত। বাতাসে কেমন যেন মলিন ভাব। শিরশিরে কিছু উত্তরে হাওয়া পথ ভুলে এধার ওধার ঘুরে মরছে। ঘুম নেই আদুরের চোখে। দাওয়ায় শতছিন্ন মাদুরে নিজেকে মেলে রেখেছে সে। চেয়ে আছে ঘোর কালো আকাশের দিকে। অনতিদূরে শশ্মান কালী পুজোর মাইক বাজছে তখন।
আজই সে মায়ের মুখাগ্নি করে এল দামোদরের চড়ে। ত্রিভুবনে তার, নিজের বলে কেউ রইলো না আর। যে তার বাড়ি ফেরার পথ চেয়ে বসে থাকবে। কাজে বেরুনোর আগে কপালে তিলক টেনে বলবে দুগ্গা দুগ্গা।
এতকাল তার রাত কাটত কাল কি হবে তার চিন্তায়। মায়ের ওষুধ পথ্যের পিছনে অনেক গুলো টাকা যেত যে। তাই যোগান অক্ষত রাখতে তাকে সুযোগ বুঝে দিন দুপুরে বেড়ুতে হত। মা ছিল, কাজ ছিল। কাল থেকে তার আর কোন কাজের প্রযোজন রইল না। এমনিতেও সে নিজে মুখে মাকে কথা দিয়েছিল-“ তুই যে কদিন আছিস, সে কদিনই তারপর এই হাত কচলে ধুয়ে নেব”।
তাও যদি বউ টা থাকত তবে নতুন করে ভাবতে হত তাকে। সেবার লখিমপুরের মেলা থেকে ভানিকে তুলে এনেছিল। মেলায় মেলায় নাচ দেখিয়ে বেড়াত ভানি। প্রথম দেখাতেই যাকে বলে পা পিছলে আলুর দম। ছিদাম কানের কাছে শিরশিরে গলায় বলেছিল-“ ছুরিটাকে তুলে নিয়ে যাব নাকি, সর্দার?”
আদুর গলা হেঁকিয়ে সবাইকে সে দিনই বুঝিয়ে দিয়েছিল, এটা তোদের ভাবি হয়। সবসময় চোখ নামিয়ে কথা বলবি। তখন রক্তে জোড় ছিল। গায়ে ছিল অসুরের মত শক্তি। কালে কালে সেসব দিন গেছে। শেষের দিকটাই ডাকাতি ছেড়ে রেলের ওয়াগন ভাঙ্গা, কয়লা চুরি, বন্ধ কারখানার মাল পাচারে নামল সে। যদিও এসবে তার মন লাগত না। ডাকাতের একটা মান আছে চোরেদের তা নেই। তবু সংসারের খাতিরে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু কাজে মন না থাকলে যা হয়। শক্তিগড়ে কয়লা চুরি করতে গিয়ে আর পি এফের গুলিতে বাম হাতটা খোয়াল। তারপর দলটাকে টিকিয়ে রাখতে পারল না আদুর। সবাই বুঝে গেছিল নুলো সর্দার এখন তাদের গলার কাঁটা।
সোয়ামি যে হাতে পিছন ধোয় সে হাতেই তাকে আদর করে, তা ঠিক মেনে নিতে পারছিল না ভানি। আদুরের চোখের সামনে ছিদামকে ফুসলে সে ঘর ছাড়ল। আদুরও তার খোঁজ নিতে যায়নি কোনদিন। সে জানে ভানির কোন পিছুটান নেই। মধ্যগগনে আদুল যৌবন খোয়ালেও ভানি তখনও উদ্দাম যৌবনে ভরপুর। তাই তাকে আটকে রাখা বাতুলতা মাত্র। তবে হাতটা থাকলে, ছিদামকে একহাত দেখে নিত সে। তার সব জোড় ছিল এই বাঁ হাতে।
হাত হারিয়ে,বউ খুইয়ে এখন সে নেহাতই একটা ছিঁচকে চোর। কখনও সখনও এর ওর বাড়ি থেকে সুযোগ বুঝে বাসন পত্র, টেবিলে রাখা মোবাইল, হাত ঘড়ি চুরি করে। তা দিয়ে কটা দিন যায। ভাঁড়ারে টান পড়লে আবার বেরয় ছদ্মবেশে। কাল থেকে তার সেই ছদ্মবেশের কোন প্রয়োজন পড়বে না।
খিদে তেষ্টারও বেলায় নেই আদুরের। সে কিছু না খেয়েই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারে। তাই নিজেকে নিয়ে ভাবেনা সে। তবে একদিন খিদে ছিল, রাহুর মত খিদে। যা পেত তাই খেত। সময়ে খাবার না পেলে চিৎকারে সারা বাড়ি মাথায় করত। কোনকোন দিন কিছু না পেয়ে বুড়ি ঠাকমা নিজের চোঁয়ানো বুকটাই আদুরের মুখে ঢুকিয়ে দিত। আদুর বার দুই চঁ চঁ করে টেনে যখন কিছুই পেত না তখন চিল চিৎকার জুড়ত। ঠাকুমা আদুরের মাকে হেকে বলত-“ কোথায় গেলিরে মুখপুরি? পেটে একটা রাক্ষস বিইয়েছিস। দেখবি একদিন তোর এই ছেলেই সবাইকে গিলে খাবে”।
ঠাকুমার কথা রেখেছে আদুর। তখন তার বয়স বছর দুই হবে। এমনই এক অমাবস্যার দ্বিপ্রহরিক রাতে, বাবা বাটুল সর্দার রায়পুরের জমিদার বাড়ি লুট করতে গিয়ে আর ফিরল না। লোকে বলল, দলের ছেলেরা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ঠাকুমা বলত-“ রাক্ষসটা আমার ছেলেকে খেয়েছে”।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কথাটা আরও দৃঢ ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে আদুর। তার চোখের সামনে পুরোন আভিজাত্য ধুয়ে মুছে গেল দামোদরের জলে। দল উঠে গেল। দরিদ্রতার হাত থেকে বাঁচতে, এককালে সুপ্রসিদ্ধ বাটুল ডাকাতের বউ বাড়ি বাড়ি ঝি গিরি শুরু করল। কিন্তু রক্ত যাবে কোথায়! আর একটু বড় হতেই আদুর লোক জুটিয়ে গড়ে তুলল নতুন দল। তারপর একটার পর একটা ঘটনার প্রবাহে সে আজকের নুলো আদুরে এসে উপস্থিত হয়েছে।
অতীত কথায় ভাসতে ভাসতে চোখ দুটো তার বুজে এসেছিল। তখনই হঠাৎ কার যেন গলার আওয়াজ পেয়ে ধড়ফরিয়ে উঠল সে-“ মা তুই ফিরে এইছিস!”
“তোর জন্য যে ভীষণ মন কেমন করছিল রে। আমি ছাড়া যে তোকে দেখার কেউ নেই। তাই তোকে দেখতে চলে এলাম বাবা”
নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আদুর। চোখ ছলকে নোনা জল নেমে এলো-“ মা তুই আমাকেও নিয়ে চল তোর কাছে। এখান থেকে আমার মন উঠে গেছে”। পঞ্চাশ উর্দ্ধ আদুরের কান্না ধরা গলা বায়না করা বাচ্ছা ছেলের মত শোনাল।
“ধুর বোকা চুপ কর।দেখ কাকে নিয়ে এইচি”-আদুর মাকে অনুসরণ করে পাশের দিকে তাকাল। দেখল অন্ধকারের মধ্যে আরও একজন চুপ করে বসে আছে। তাঁকেও হুবহু তার মতই দেখতে। কেবল আদুরের চেয়ে শরীর স্বাস্থ্য অনেকটা ভালো।
“ইনি তোর বাবা। প্রনাম কর। ওখানে যেতেই দেখা হয়ে গেল। আমার কাছে সব কথা শোনার পর নিজেই বলল চলো নিজের চোখে সব কিছু একবার দেখি আসি। বাবাকে তোর মনে পড়ে আদুর?”
“তুই যে কি বলিস না মা! আমি ছোট থাকতে থাকতে উনি মারা গেছেন। ছবিতেও কোনদিন দেখিনি। আমার কখন ও মনে থাকে?”
বেশ বিরক্তি নিয়ে আদুরের মা ঝাঁঝিয়ে উঠল-“মরা মানুষকে কখন ও মরে যাওয়ার কথা বলে। মনে কষ্ট পাবে না। বল্ চলে গেছিলেন”
আদুর কথা বাড়াল না। হেঁট হয়ে বাবাকে প্রনাম করল। বাবা তার প্রনাম নিল ঠিকই তবে সে দিকে তার যেন কোন উৎসাহ নেই। তিনি অন্ধকারের মধ্যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এককালের ফেলে যাওয়া তার বসত বাড়িটাকে ভালো করে দেখতে থাকেন। মৃত্যুর ওপারে অন্ধকার বলে কিছু হয়না বোধহয়। না হলে এত ঘন অন্ধকারে, যেখানে একহাত দূরের মানুষকে ঠিক করে ঠাওর করা যাচ্ছেনা সেখানে উনি আতাল পাতাল কি দেখছেন!
“কি গো অত কি দেখছ? কিছু কি মনে পড়ছে?”
হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে, দাওয়া থেকে উঠোনে নামলেন আদুরের বাবা, মানে সেই মূর্তিমান বাটুল ডাকাত-“ বাড়িটার কি হালত হয়েছে। দেখে কান্না পেয়ে যায়। এককালে এই চৈত্র মাসের শেষ অমাবস্যার সময় শশ্মান কালীর পূজোর দিন বাড়িটা গমগম করত। তোমার মনে আছে বেনি? প্রদীপের আলোয় ঝলমল করত চারদিক। ডাকাত ভাইরা সারারাত হাঁড়িয়া খেয়ে কি আনন্দটাই না করত বল?”
বেনি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-“ মায়ের কাছে বলি দিয়ে সারা গায়ে রক্ত মেখে তুমি যখন বাড়ি ফিরতে, তোমায় দেখে আমার যে কি ভয় হত, তা যদি তুমি বুঝতে!”
“ভীতুর ডিম কোথাকার। ছেলেটাকেও সেভাবেই মানুষ করেছ। একটা অপদার্থ”
মা ছেলের পক্ষ নেয়-“ওর উপর চোটপাট করছ কেন? ছেলেটা কিছু বোঝার আগেই তুমি চলে গেলে। দলের ছেলে গুলো প্রথম কয়েক বছর থেকে ভেগে পড়ল। অগাদ জলে পড়লাম আমরা। তারপরও যে আমার ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াল, নতুন দল তৈরি করল, তা মনে জোড় না থাকলে হয়না। হাতটা যদি থাকত তবে দেখতে আজ ও কি করত। আর একটা কথা মনে রেখো এখনকার সময়ের সাথে তোমাদের সময়ের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ”।
-“তুমি ওর কোলে ঝোল টেনে কথা বলনা। বাটুল ডাকাতের বংশধরের একি অবস্থা, চোখে দেখে বিশ্বাস হয়না, শরীরে মনে এত রুখনো!” তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিটা আদুরের দিকে ঘুরিয়ে আবার সে বলতে শুরু করল-“ তোর মাকেই জিজ্ঞাসা করে দেখ, হাতে আমার রক্ত না লাগলে দুচোখে ঘুম আসত না। সেবার রাজনগরের জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করতে গেছি। দুর্গা পূজোর রাত। বাড়ির মেয়েরা সব গা ভর্তি গয়না পড়েছে। বুড়ো জমিদারের যুবক ছেলেটা এগিয়ে এসে পথ আটকাল আমাদের। আমি এক ঘায়ে ধড় থেকে ওর মাথাটা আলাদা করে দিয়েছিলাম”।
নিস্পলক আদুর বাবার দিকে চেয়ে থাকে। বাবার পিচ কালো শরীর জুড়ে সে তাজা রক্তের ছিটে দাগ দেখতে পায়। চোখে রক্তাক্ত হিংসা। ঠিক যেন হলুদ গায়ের উপর কালো ডোরা কাটা দাগ। কারও বাবা এত হিংস্র হতে পারে তা বিশ্বাস হয়না আদুরের-“ আজ যদি বলি তোমার সেই পাপেরই শাস্তি ভোগ করছি আমি”
“পাপ! কিসের পাপ?”- রাগ মেশানো বিস্ময় বেড়িয়ে এলো বাটুলের গলা থেকে।
বেশ উত্তেজনার সাথে আদুর বলে উঠল-“ বাবার সামনে ছেলেকে হত্যা করার পাপ। বউয়ের সামনে স্বামীকে হত্যা করার পাপ। মানুষকে মানুষ না মনে করার পাপ”
পাপ শব্দে আহত হতে হতে কান্নায় ভেঙে পড়ে আদুর। মাকে সে কথা দিয়েছিল সব পাপ ধুয়ে হাত কচলে নেবে সে। এক হাতে কি হাত কচলানো যায়। বংশের পর বংশ চলে আসা রীতি কি অত সহজে মুছে ফেলা যায়!
একা অন্ধকারের মাঝে উঠে দাঁড়ায় আদুর। এখন তার চারপাশে কেউ নেই। ছেলের আচরণে বিদ্ধ হয়ে তাঁরা ফিরে গেছে। আদুর কান পেতে শুনল, শশ্মান কালী পূজোর মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে। আকাশ এখনও গা ভাঙা দেয়নি। হাতে কিছুটা সময় আছে। আদুর গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। তাকে মায়ের পায়ে শেষ বলিটা যে দিতে হবে। বংশের যত পাপের আজ প্রায়শ্চিত করতে হবে তাকে।
গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে, বড় রাস্তার ধারে পুলিশ ফাঁড়ি। শেষ রাতের আলসেমিতে গোটা ফাঁড়িটা ডুবে আছে। টলমল পায়ে ঢুকল আদুর। অন ডিউটি অফিসার টেবিলে মাথা নামিয়ে ঘুমছিলেন। পা ঘষার শব্দ পেয়ে তার ঘুম ভেঙেছে। চোখ খুলে সামনে আদুরকে দেখে চমকে উঠলেন। আদুরের সারা গায়ে রক্ত। গলার কাছটায় কিসের যেন দাগ।
-“আমি আদুর মশান। আমি এই মাত্র একজনকে খুন করে এসেছি স্যার”
চমকের কিছুটা বাকি ছিল তখনও-“ বল কি! মার্ডার। কাকে? কেন?”
আদুর কোন উত্তর দিল না। একমনে খুনের কারনের খানা তল্লাসি শুরু করল। সেকি সত্যি জানে কাকে কেন খুন করেছে!
পুলিশের গাড়ি ছুটল ধুলো রাস্তা ধরে। সামনে বসে আদুর রাস্তা চিনিয়ে দেয়। হাতে তার হ্যান্ডকাপ। শশ্মান থেকে একটু দূরে গাড়ি থামল। মেজবাবু গাড়ি থেকে নামতেই বগিটা ঠেকল তার পায়ে। বগিটাকে দেখে তিনি ভাবলেন, এত বড় বগিটাকে চাগানো নুলো আদুরের পক্ষে কি আদেও সম্ভব। পা দশেক এগুতেই চোখে পড়ল লাসটা। দেখে মনে হচ্ছে এক কোপেই ধড় থেকে মাথাটা আলাদা করে দিয়েছে। মেজবাবু লাশটা দেখার সাথে সাথেই পিছনে ঘুরলেন। গাড়িতে আদুর নেই। একা হ্যান্ডকাপটা ঝুলছে।



0 Comments