
এটাই নিয়ম!
নরেশ বর্মন এলাকায় একজন অভিজ্ঞ কৃষক বলে পরিচিত দীর্ঘদিন ধরে।একসময় তার প্রচুর জমি থাকলেও এখন জমির পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। সেই সূত্রে ফসলের পরিমানও খুব কম।জমির পরিমাণ কমে গেলেও এখনও অনেকে তার কাছে আসে চাষবাস সম্পর্কে সঠিক পরামর্শের জন্য।শোনা যায় নরেশ বর্মনের ঠাকুরদা জমিদার ছিলেন সেই এলাকার। কিন্তু নরেশ এখন এক দরিদ্র কৃষক। সে আজ কৃষক সম্প্রদায়ের বঞ্চিত,অবহেলিত, অভাবগ্রস্ত,দারিদ্রের প্রতিনিধি।
কাকভোরে উঠে নরেশ লাঙ্গল ঘাড়ে নিয়ে যেতে যেতে শুনতে পায়- অবনী দাসের ছেলের বই পড়ার শব্দ। নরেশ খুব কষ্ট পায়! তার ছেলের বয়সী,নরেশ বাবুর ছেলে। সে পড়ছে অথচ তার ছেলে বই পড়ার সুযোগ পায় না। বই না পড়ে তাকে চাষের কাজে সাহায্য করতে হয় জমিতে। অভাব-অনটনের চাদর গায়ে জড়ানো, নরেশ হতাশ হয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকে,'আমার ছেলেকে আমি কবে পড়াতে পারবো!'
পাঁচটা পেটের খাবার জোগাড় করতে নরেশের খুব কষ্ট।বাড়িতে বৃদ্ধা মা তাকিয়ে থাকেন কবে পরনের ছেঁড়া ধুতিটা পাল্টাতে পারবে। মেয়ে অঞ্জুর জামাটা অনেকটাই ছোট হয়ে গেছে, তার একটা জামা খুব প্রয়োজন। স্ত্রীকে সকাল বিকাল জোগাড় করতে হয় জ্বালানির খরকুটো। ভোরে নারিকেল গাছের একটি খোল জোগাড় করে এনেছে রান্নার জন্য।কিন্তু রান্নার জিনিস কখন পৌছাবে রান্নাঘরে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নাই।দারিদ্র্যের সমস্ত চিত্রপট যেন নরেশের পরিবারে ফুটে উঠেছে।
নরেশ খালি পেটে জমি লাঙ্গল দিতে দিতে- ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে দেখে,তার ছেলে রতন পান্তা ভাত নিয়ে এসেছে। সঙ্গে জলের বোতল। "তুই খাইছিস",নরেশের প্রশ্নে রতন উত্তর দেয়," না! মা তো সবটাই তোমাকে দিয়ে দিল।"
নরেশ পান্তা ভাতে আরও জল ঢেলে ছেলেকে বলল,'নে বাবা, তুইও খা,আমিও খাই। তারপর দুজনে জমিটায় আজকে লাঙ্গল দেওয়ার কাজ শেষ করে ফেলি। বলদ জোড়ার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে।তাড়াতাড়ি লাঙ্গল দেওয়া হয়ে গেলে বলদ দুটোর জন্য ঘাস কাটতে যাব। তুই বলদ দুটাকে সঙ্গে করে লাঙ্গলটা নিয়ে বাড়ি চলে যাবি।'
আধপেটা খাওয়া, কখনো না খেতে পাওয়া বলদগুলো আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে যায়। কষ্টের আবহে আরো শীততাপ বাড়িয়ে একদিন একটি বলদ মারা গেল! অসহায় হয়ে পরলো নরেশ! চাষ করবে কিভাবে? চাষ করে ফসল না ফলালে সংসার চলবে না! বলদ এর মৃত্যুতে নরেশ একেবারে ভেঙ্গে পরল! চিন্তার ভাঁজ কপালে নানা লেখচিত্র সৃষ্টি করে চলেছে একের পর এক!
কয়েকদিন যেতেই নরেশ ছেলেকে বলল,'চল! জমিতে, দেখি কি করে চাষ করা যায়,একটা বুদ্ধি করতে হবে।'
বাড়ির সকলেই অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে, কঙ্কালসার নরেশের দিকে।বাবাই বলল,'বাবা এখন তো আমাদের একটা বলদ,লাঙ্গল টানবে কিভাবে?'
ছেলের কথায় বাবা কোন উত্তর না দিয়ে লাঙ্গল এবং বলদকে সঙ্গে নিয়ে চলল জমিতে। ছেলে রতন পিছুপিছু চলল জলের বোতল হাতে নিয়ে। জমিতে পৌঁছানোর পর নরেশ ছেলেকে বলল,'জোঙানের একপাশে বলদ আর অপর পাশে আমি থাকবো, তুই পিছন থেকে লাঙ্গলের ফলাটি মাটিতে চেপে ধরবি। বলদের সাথে সাথে আমি এগিয়ে চললে জমি চাষ হয়ে যাবে।
বাবার এরকম অবস্থা দেখে ছোট্ট ছেলে রতনের মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল। একসময় তাকাতে লাগল ফাঁকা আকাশটার দিকে,খুঁজতে লাগলো স্বস্তির মেঘ।
দীর্ঘ কয়েক মাসের চেষ্টায় যখন জমিতে নরেশের হাতের জাদু আর উর্বর মাটির সংস্পর্শে ফলল সোনার ফসল, তখন নরেশের মুখে হাসি দেখা দিল। পরিবারে নেমে এলো আশার আলো। সোনালী ধান, এবার মুখ ফিরে তাকালে- নরেশ বৃদ্ধা মাকে কিনে দিবে ধুতি, মেয়ের জন্য জামা এবং আরো অনেক কিছু- যা,স্ত্রী বলতে বলতে থেমে গেছে, আর বলে না...।
কৃষকের ঘরে যখন ধান উঠে, তখন বাজারে ধানের দাম নাই। বাজার মন্দা! কৃষকেরা কখনোই ন্যায্য মূল্য পাবে না- এটাই নিয়ম। প্রয়োজনের তাগিদে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয় নরেশ।ধান ফলাতে যা খরচ,যা খাটুনি হয় তার কোনোটাই বিক্রির টাকায় পূরণ হল না। চিন্তায় পড়ে যায় নরেশ। এবারও সে ধানের উপযুক্ত দাম পেল না। কি আনবে আর কি বাদ দেবে। সংসারে তো সব কিছুরই অভাব! ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। কোনটা সবথেকে বেশি দরকারি আর কোনটা অল্প দরকারী- এই নিয়ে চলে অভাবের আঙ্গিনায় দাবা খেলা।
অবশেষে ঠিক করে,এবারের ধান বিক্রির টাকায় খাবার জোগাড় করবে,প্রাণে বাঁচবে আগে। অন্যান্য খরচ পরের মরশুমের ধান বিক্রির টাকায় করবে।
'নিশ্চয়ই আগামী মরশুমে উপযুক্ত দাম পাওয়া যাবে' -এই আশার পাথরে চাপা পরে যায় নরেশের কষ্টের পৃষ্ঠাগুলি। এই ভরসায় নরেশ আবার জমিতে ছুটে যায়, চাষ করে- সোনালী ধানে...ঘুচাবে দুঃখ...!
0 Comments