
তুচ্ছ
পাড়ায় ঘন ঘন পুলিশের গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। দু'দিন আগে অমন একজন দাপুটে নেতা নিজের বাড়ির কাছেই খুন হয়ে গেল, তার জন্যে গোটা এলাকায় এখন টানটান উত্তেজনা। পার্টির লোকজন থেকে শুরু করে ছোট-বড়- মাঝারি মাপের নেতার দল ছোটাছুটি করছে।পুলিশ একে-ওকে ডেকে পাঠাচ্ছে, গাড়িতে তুলছে, ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে টানা জেরা করছে। এর মাঝে আবার একটা ধিক্কারমিছিলও বেরিয়েছিল। এক পার্টি অন্য পার্টির ঘাড়ে দায় চাপাতে ব্যস্ত। সবমিলিয়ে,এলাকার মানুষজনকে নানা উদ্বেগ আর অশান্তির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
ওপাড়ার দুর্গামন্দির থেকে অবশ্য এখন জোরে জোরে ঢাকের শব্দ বাতাস দাপাচ্ছে। মাইকের আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে শোনানো হচ্ছে চণ্ডীপাঠ। একটু আগেই মহাষ্টমীর বলিদানপর্ব শেষ হল। কিছু লোকের জমায়েত সেখানে।
তবে বেশি ভিড় এ-পাড়ায়। খানিকক্ষণ আগে পরপর কয়েকটা গাড়িকে ঢুকতে দেখে বাতাসে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়েছিল।খোদ মন্ত্রী এসেছেন নেতার বাড়িতে। তিনি অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন,পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরাধীকে শনাক্ত করতে নির্দেশ দিলেন।মন্ত্রীর সঙ্গে ছায়ার মতো লেপ্টে রয়েছে পার্টির কর্মীরা।
তারপর মন্ত্রী যখন চলে যাওয়ার জন্যে গাড়িতে উঠতে যাবেন, ঠিক তখনই এমন একটা কান্ড !
"চলে যাচ্ছ কেন? থামো.., থামো.. "
পুলিশের নজর এড়িয়ে হঠাৎ খোদ মন্ত্রীর গাড়ির একেবারে সামনে এগিয়ে এসে ভজার মা গলা ফাটাচ্ছে, "খুনটা আমার সামনে হয়েছে। চাপ চাপ রক্তে ভেসে গেল জায়গাটা, আমি নিজের চোখে দেখলাম। কিন্তু তোমাদের তো এতটুকু হেলদোল নেই দেখছি।"
সকলে অবাক। মন্ত্রীও রীতিমতো তাজ্জব। পার্টির ছেলেরা তড়িঘড়ি ছুটে এসেছে, "এই, সরো.. সরে যাও এখান থেকে..। মাথাখারাপের রুগি একটা..."
"মাথা তোমাদেরই খারাপ। কেন যাব এখান থেকে? এর বিচার না হলে এক পা'ও নড়ব না বলে দিচ্ছি। খুনের তদন্ত করতে এসেছ, অথচ আমি যে খুনটা নিজের চোখে দেখলাম তার কেন বিচার হবে না ?"
ভজহরি ছুটে এসে মায়ের হাত ধরে টানাটানি করে, "ওঃ, তোকে আর সামলাতে পারি না..! কতবার বলি কোত্থাও বেরোবি না, তবু...। চল্ ,বাড়ী চল্।"
"ঘরে আটকে রাখো না কেন ? দরকার হলে চাবিও দিতে হবে।" গাড়ির কাচ তুলে দিয়ে মন্ত্রী বিরক্ত গলায় বললেন।
ভজার মা এত সহজে থামবে না। গাড়ির বন্ধ দরজায় ঝুঁকে পড়ে সে আরও জোরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেছে,"ওঃ, খুন করাটা যদি দেখতে ! আহা,বেচারি কেমন ঠকঠক করে কাঁপছিল ! ওর চোখ দু'টোর দিকে কেউ একবারও নজর দিয়ে দেখেছে ?গলাটা যখন হাড়িকাঠে ঢুকিয়ে দিল তখন কী চিৎকার, কী চিৎকার ! এমন একটা রক্তারক্তি কাণ্ড হচ্ছে, আর ওদিকে সেই সময় ঢাক বাজানোর যা ধূম !...ও মন্ত্রীঠাকুর, একটা খুনের জন্যে এত ছোটাছুটি,অথচ আর একটা যে খুন হয়ে গেল তার কি কোনও বিচার হবে না?"
একরকম জোর করেই ভজার মা'কে টানতে টানতে সরিয়ে আনা হল সেখান থেকে। এরপর গাড়িটার স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে যেতে আর কোনও বাধা নেই। পুলিশদের সঙ্গে পার্টির কর্মীরাও এখন খানিকটা স্বস্তি পেয়েছে। উঃ,কী সব উটকো ঝামেলা ! ঘটনাটা নিয়ে কম হাসাহাসি হচ্ছে না।মন্ত্রীর মুখ থেকে বিরক্তির ছায়াটাও তখনও পুরোপুরি সরেনি।গাড়িতে তাঁর পাশে বসা দলেরই এক কর্মী অস্ফুটে বলল,"ফালতু! ...পাগল-ছাগলের কাণ্ড আর কাকে বলে ! "



0 Comments