ডা: নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস




আবর্ত 


প্রথম পর্ব 

মানিকপুরের সেন  বাড়িকে এই আধা শহরে না চেনবার লোক খুব কম। অরুন সেন কলকাতা কোর্টের 
এক সুপরিচিত আইনজীবী শুধু নয়, আইনের জগতে সারা ভারতের একটা পরিচিত নাম। মাঝেমধ্যে তাঁকে দিল্লী,মুম্বাই, জামসেদপুর, গৌহাটি দৌড়াতে হতো।  একটা সময় মুম্বাইর এক কোটিপতি মক্কেল  তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, কলকাতা ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে মুম্বাই এসে কাজ করতে। রাজি হননি অরুন। অরুণ বলেছিলেন, "ভার্মা সাহেব, মুম্বাইতে থাকলে কলকাতা থেকে টাকা হয়তো আমি কয়েকগুন বেশি রোজগার করবো, কিন্ত দু একটি জিনিস যে আমি হারিয়ে ফেলবো"! নিতিন ভার্মা দুটি বড় ব্যবসা।একটি মার্বেল,অন্যটি জুয়েলারি।অরুন সেনের মতো পোড় খাওয়া, দুঁদে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ যদি তাঁর কোম্পানির হাল ধরেন,তবে আর নিতিন ভার্মাকে ব্যবসা নিয়ে ভাবতে হয়না। ভার্মা অবাক চোখে তাকিয়ে বলেছিলেন,"স্যার, বলুন কি জিনিস,যা কলকাতায় আছে, আমি যদি আপনাকে এখানে arrange করে দিতে পারি "?
অরুন সেন হেসে বলেছিলেন, "কলকাতার উত্তাপ তো আপনি আমাকে দিতে পারবেন না ভার্মা সাহেব,
আপনি দিতে পারবেন না, দিনের শেষে বা সপ্তাহের শেষে প্রিয়জনের সাথে গান, গল্প,কবিতায়, নাটকে
একসাথে যাপন করবার মুহূর্ত,তাই আমি চিরদিন এই কলকাতারই রয়ে যাবো",
ভার্মা বলেছিলেন,আপনাকে যদি চেক দিয়ে আ্যামাউন্ট বসিয়ে নিতে বলি, তাহলে?
অরুন সেন, বলেছিলেন" তাহলেও না, জীবনের উত্তাপ কে আমি ভালোবাসি, তাই সেটাকে হারাতে চাইনা মিস্টার ভার্মা"।  নিতিন ভার্মা আর কোনদিন, মুম্বাই যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেননি অরুন সেনকে।

নীতিন ভার্মার শ্রদ্ধা বহুগুন বেড়ে গিয়েছিল এই মানুষটির প্রতি। একবার আগ্রহভরে অরুন সেনের কাছে  ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, সেন সাহেব, আপনার ঘর আমার খুব দেখার ইচ্ছে, " আপ যব বুলায়গা "।
নীতিন ভার্মা, এসেছিলেন কলকাতায়।  দেখেছিলেন অরুন সেনের বাড়ি এবং এক অন্যধরনের মানুষের সন্ধান পেয়েছিলেন তাঁর মধ্যে।  স্ত্রী মুক্তি সেনকে দেখে তাঁর ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া দিদির কথা মনে  পড়ে গিয়েছিল । নীতিন ভার্মা মুক্তি সেন কে বলেছিলেন, "you are my elder sister, আপনার দুই ছেলে আছে, তাঁরা well established, কিন্তু আমিও আপনার ছেলে হয়ে গেলাম আজ থেকে "।  অরুন সেন হেসে বলেছিলেন,"তাহলে, ভার্মা সাহেব কলকাতায় এসে আপনার একটা gain হয়ে গেলো বলুন "নীতিন, কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল,  
"এ অন্য ধরনের gain সেন সাহেব" তারপর  চোখের জল মুছে বললেন, "সেন সাহেব, আমার হারিয়ে যাওয়া দিদির সাথে ম্যাডামের অনেক similarity আছে, age ও এরকমই হবে, দিদি আমার হারিয়ে গিয়েছিলেন আমার ছোটবেলায়,দিল্লীতে এক মেলা থেকে , I mean a fair, তাই দিদিকে মন খুঁজে বেরায়  সবসময়.. । অরুন সেন বুঝেছিলেন, নীতিন ভার্মার ব্যাবসায়ী মনে,একটা,চাপা দুঃখ বোধ আছে।

মুক্তি সেন নিজে রান্না করে লুচি, ছোলার ডাল, পনীরের তরকারি, তাঁর নিজের করা তিন -চার রকমের আচার খেতে দিয়েছিলেন নীতিন ভার্মাকে। খুব হয়েছিল নীতিন। অরুন সেনের বাড়ি থেকে আসবার সময়, একটা কার্ড, মুক্তি সেনের হাতে দিয়ে বলেছিলেন নীতিন, "আমি একসময় তিন বছর কলকাতায় ছিলাম, ভাল বাংলা জানি, আমি আপনাকে, আজ থেকে আপনি আমার দিদি, আমি যদি কখনো  বলি, আপনি, আমার ঘর যাবেন তো!  মিস্টার সেনের মতো আমাকে নিরাশ করবেন না তো"! হেসেছিলেন অরুন। ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়েছিলেন মুক্তি সেন।মুক্তির চেহারায় আর চোখের মধ্যে এক অদ্ভুত মায়াভরা সারল্য লক্ষ্য করেছিলেন নীতিন।

এরপর অনেকবার অরুন সেন নীতিনের কোম্পানির কাজে মুম্বাই গেছেন, কিন্তু কোনবারই স্ত্রীকে সঙ্গে
নেননি। তার বছর তিনেক পর চিরদিনের জন্য চলে গেলেন অরুন সেন। অরুন একসময় স্ত্রীকে বলেছিলেন,"বাড়িটা থাকলো, তোমার  নামে, ব্যাঙ্কে টাকাও থাকলো, অসুবিধে হবেনা"। মানিকপুরের বাড়ি নিয়ে দুই ছেলের মধ্যে অশান্তি শুরু হল দু মাস কাটতেই। মুক্তি সেন  বোনের বাড়ি গেলেন মুক্তির বাতাসের সন্ধানে ।
মন টিকলোনা।স্বামীর বাড়িতেই যে তাঁর  সবটুকু পড়ে আছে।হাসি, কান্না, স্মৃতি, সুখ,দুঃখ।
মাস খানেক পর  নিজের বাড়িফিরে আসবার জন্য ব্যস্ত হলেন মুক্তি। ফিরে শুনলেন বাড়ি ভেঙে প্রমোটারকে দিয়ে দিচ্ছে দুই ছেলে। বাড়িতে ফিরে এলেন। কিন্ত এবার তিনি কোথায় যাবেন।চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে এলো।স্বামীর সাথে তাঁর  এত সাধের বাড়িটাও কি চলে যাবে! মিঃ রীতেশ আগরওয়াল বাড়ি, জমি সবটাই নিয়ে তিনটে ফ্ল্যাট আর কিছু টাকা দিয়ে দায় সারবেন।
মুক্তি জানেন বাঁধা দিয়েও তিনি কিছু করতে পারবেননা।আলমারিটা খুলে স্বামীর মুম্বাইতে
তোলা হাসিমুখের ছবিটা ব্যাগে ভরলেন। স্বামীর চিঠি,লাঠি,  আরও  কিছু স্মৃতি চিহ্ন। মনে পড়লো নীতিনের কথা। তাঁকে দিদি ডেকেছেন নীতিন।
ফোনের নাম্বারটা কার্ড দেখে ডায়াল করলেন।  কয়েকবার রিং হবার পর নীতিনের গলা
শোনা গেল, "হ্যালো, আমি কলকাতা থেকে, মুক্তি, মুক্তি সেন বলছি,অরুন সেনের.." 
"দিদি আপ, আপ ঠিক হ্যায় তো "? নীতিন উদগ্রীব হয়

দ্বিতীয় পর্ব 

"হ্যাঁ দিদি, আমি নীতিন, সব কুছ  ঠিক হ্যায় তো দিদি? " - নীতিন ভার্মার কথায় আপনজনের সুর
"কিছু কথা ছিল নীতিনজি  আপনার সাথে, সামনাসামনি তো কথা বলা সম্ভব নয় ,আপনি তো এখন মুম্বাইতে!"
"কিউ নেই দিদি,আপ যব বুলাওগী, সেন সাহাব আমাদের guardian ছিলেন।সবকুছ ছিলেন উনি।  আমার business আজ ভাল জায়গায়, সেন সাহাবের জন্য" - নীতিনের কথায় অরুন সেনের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার উষ্ণ প্রস্রবণ।
"সব ঠিক ভাবে চলছে তো দিদি,আপ কে লিয়ে, হর টাইম মেরা টাইম " - গলায় আন্তরিকতা দিয়ে বললেন, নীতিন ভার্মা।
আপনি যেমন বুঝবেন, বললেন মুক্তি।
"ঠিক আছে দিদি, কুছু চিন্তা করবেন না, আমি আসছি, কালকের ফ্লাইটে",বললেন নীতিন।
"কালকেই, আচ্ছা , মুক্তি সেন যেন টাটকা বাতাসে ভিজলেন।
"হ্যা দিদি আপনি রেডি থাকবেন, আপনাকে নিয়ে মুম্বাই চলে আসবো, পরের  দিন, ইভিনিং ফ্লাইটে"। 
নীতিন বললেন।
এখন কি করে যাব, নীতিন জি
হবে, হবে, আমি আপনার ছেলেদের permission নিয়েই, আপনাকে নিয়ে আসবো।
বাড়ির কথা, ছেলেদের কথা আর খুলে বলতে পারেন না মুক্তি, গলাটা ধরে আসে।
"মুম্বাই তো আপনারও ঘর দিদি, no hesitation, এখানে একবার তো আসতেই হবে আমি বলেছিলাম না! "
"বলেছিলেন, নীতিন জি"
কথা বলতে পারেন না মুক্তি।  ফোন রেখে দেন।  তার দুচোখ থেকে নেমে আসা জল বন্যার মতো ভাসিয়ে দিয়ে যায় দুই গাল।  অনেকক্ষণ ফোন ধরে দেওয়ালে টাঙানো স্বামীর হাসিমুখের  ছবিটার
দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন মুক্তি সেন।

নীতিন পরেরদিনই কলকাতায় চলে আসে। ওঠে এলগিন রোডের কাছে এক আত্মীয়র বাড়িতে।
ফোন করে অরুন সেনের বাড়িতে তারপরের দিন যখন আসে, তখন বিকেল পাঁচটা।
মুক্তি সেন আন্তরিক অভ্যর্থনা করে বসবার ঘরে নিয়ে আসেন নীতিন কে।
চা, ও কচুরি, সবজি, ছোলার ডাল আর জিলিপি নিজেই বানিয়ে রেখেছিলেন মুক্তি।
মুক্তি সেন খাবারগুলো প্লেটে সাজিয়ে নীতিনের  সামনে দিয়ে বললেন, "নীতিন জি, আগে খাবারটা খেয়ে নিন, তারপর আমরা কথা বলি "
নীতিন হাসলেন, জানেন, আমার দিদি, ঠিক এরকম করতো, খাবার নিয়ে আমার মুখে দিয়ে,তারপর নিজে খেতো!
হাসলেন মুক্তি, "আপনাকে তো আমিও ভাইয়ের মতো ভাবি",বললেন মুক্তি এইবার দিদি,এই যে আমাকে  আপনি ভাই বলেছেন,নলে ফেলেছেন,  আর কিছু  কখনো বললে না কিন্তু করতে পারবেন না "বললেন নীতিন।
বলুন, মুক্তি বললেন আপনার উপর একটা যেন ঝড় চলে গেছে মনে হচ্ছে। নীতিন বললেন, চুপ করে থাকলেন মুক্তি।

যাক খুব ভাল লাগছে, এই পুরী,সব্জি, জিলাবি খেতে, আমার বাঙালি dish খুব ভাল লাগে তাই নাকি, জানতাম না তো সেন সাহাব জানতেন, বলেছিলাম একবার আমি, নীতিন বলে।
খাওয়া হয়ে গেছে, হাত ধুয়ে আবার সোফায় বসে নীতিন বললেন, বলুন দিদি, ভাইকে ফোন করেছিলেন,কিছু ভারী ব্যাপার তো আছে মনে হয়, আপনি বলুন, without hesitation. নীতিন বললেন।


তৃতীয় পর্ব:

আমাদের এই বাড়ি নিয়ে  ঝামেলা  শুরু হয়ে গেছে নীতিন জি । বাড়ির কথা কি আর বলবো  । এ বাড়ি আমার husband মানে আপনাদের সেন সাহেবের প্রাণ, সেই বাড়ি হয়তো আমি আর রাখতে পারবোনা নীতিন জি। কথা শেষ করতে পারেন না মুক্তি সেন।
রাখতে পারবেন না, মতলব!  কি হয়েছে আমাকে problem টা বলতে পারেন  দিদিজি,বলেন নীতিন।
"কি যে বলি আপনাকে, থাক আজ নয় পরে যদি কোনদিন না হয় বলবো"।
গলা,ভারী হয়ে আসে মুক্তি সেনের।
"যদি কিছু mind না করেন একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো"?  খুব নরম গলায় জানতে চান নীতিন।
"বলুন নীতিন জি, আস্তে আস্তে বলেন মুক্তি।
বাড়িটা কি ছেলেরা sale করে দিতে চাইছে? বুঝতে চাইলো নিতীন।
"বিক্রি নয়, দুই ছেলেই একমত, ওরা প্রমোটার কে দিয়ে দেবে। প্রমোটার তার মতো করে বাড়ি ভেঙে,
ফ্ল্যাট তৈরী করবে।  আমাদের তিনটে ফ্ল্যাট আর কিছু টাকা দেবে, এটুকুই আমি জানি, এর বেশি কিছু
জানিনা নীতিনজি।
খুব কষ্টে ,কথাগুলো  বললেন  মুক্তি সেন।
"বুঝতে পারছি, দিদি জি,আচ্ছা প্রমোটারের নামটা কি আপনি শুনেছেন"?
"হ্যা,শুনেছি,রীতেশ আগরওয়াল"। মুক্তি সেন বলেন।
রীতেশ, রীতেশ, নামটা তো শোনা, তবে সেই রীতেশ কিনা জানিনা। সল্ট লেকে থাকে কিনা বলতে
পারবেন দিদি ?
না নীতিন জি, সেটা তো জানিনা মুক্তি সেনের কন্ঠে হতাশা।
"দেখছি কিছু চিন্তা করবেন না, শুধু আপনার ইচ্ছে মানে Wish এর কথাটা আমাকে বলুন"
নীতিন ভার্মার গলায় যেন আপনজনের সুর।
"বাড়ীটা,রেখে বাকী দশ কাঠা জমির উপর প্রমোটিং হোক, আমি বাঁধা দেবনা"।
"আচ্ছা আপনাদের মানে, সেন সাহাবের অন্য ব্রাদাররা, তাঁরা কিছু বলছেন না"?  নীতিন যেন কিছুটা বিস্মিত হয়।
"ওনারা চার ভাই। আমার husband, থার্ড। ওনার বড়ভাই মারা গেছেন বছর চারেক আগে।মেজভাই তাঁর ছেলের কাছে দিল্লিতে আজ প্রায় ছয়, সাত বছর। বয়স হয়েছে। উনি এখন আর কোন কিছুতেই মাথা দিতে চাননা। তাঁর ছেলেরাও চায়না,উনি কোনকিছুর মধ্যে ঢোকেন। বাকী রইল ছোট ভাই।  সে কলকাতাতেই থাকে, তবে যা বুঝেছি, সে আমার ছেলেদের সাথেই একমত"।  মুক্তি সেন এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যান।
ঠিক আছে দিদি, আমি দেখছি, আর বলুন কোন problem?
মুক্তি সেন মাথা নাড়লেন। 
চা আর কাঁসার রেকাবীতে করে বিস্কুট, চানাচুর দিয়ে গেল পরিচারিকা।
চা টা খেয়ে নিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে,বললেন মুক্তি।
চায়ের কাপটা তুলে নিলেন নীতিন।
"দিদি এবার বলুন, কবে আমাদের মুম্বাইতে আসছেন, আমি ভেবেছিলাম, এবারই নিয়ে যাবো"। বললেন নীতিন ভার্মা।
"তা হবেনা, ওনার কিছু কাজ বাকী আছে, দেখি যদি করতে পারি,  বাড়িটাকে রক্ষা করবার শেষ চেষ্টা একবার করি"। বললেন মুক্তি।
হঠাৎ চুপ করে গেলেন নীতিন, তারপর তাকালেন মুক্তি সেনের মুখের দিকে। "সেন সাহাবের জায়গা আমাদের কাছে , always special., একটা ঘটনা বলি, আপনি আমরা তখন কলেজে পড়ি, একবার আমাদের আমাদের চণ্ডীগড়ের property নিয়ে খুব problem শুরু হোলো,ওখানে যে lawyer,ছিলেন আমাদের, কিছু করতে পারলেন না,সেন সাহাবের সাথে তখন বেশিদিনের কাজের অভিজ্ঞতা নেই আমাদের, বাবা সব বললেন ওনাকে, সেই দেখলাম, কি সুন্দর ভাবে  উনি matter solve করলেন"।
হাসলেন মুক্তি, "জানি নীতিন জী উনি অনেক কে বাঁচিয়েছেন, কিন্তু আজ তার property নিয়েই
আমার দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে "।
"আমি কাল চলে যাচ্ছি দিদি, আর একটা কথা, সেন সাহাবের কিছু ফিস pending ছিল, আমি চেক নিয়ে এসেছি, আপনি বললে  ক্যাশও দিয়ে দিতে পারি"।
কাল চলে যাচ্ছেন?
হ্যা আপনার কথা শুনে বুঝলাম, কিছু problem আছে, আমি এলে যদি কিছু help হয়, তাই..
হাসলেন মুক্তি সেন, আসবেন আবার। ছেলেদের সাথে কি কথা বলবেন?
কথা হয়েছে, আপনার বড় ছেলের সাথে, আমি তখন বাড়িতে ঢুকছি, ওনারা কোথাও বের হচ্ছেন"
তাই নাকি, কথা কিছু হলো? মুক্তি জানতে চাইলেন।
"কেমন আছেন, কি ব্যাপার এই রকম দু একটা কথা, আমি বললাম, সেন সাহাব চলে যাবার পর
আমার তো, আসা হয়নি, তাই আপনার মায়ের সাথে meet করতে এলাম"।
কিছু বললো? মুক্তি বললেন
"না, আমাকে আপনাদের দোতলার বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে, আপনাদের ওই lady যিনি আছেন,
ওনাকে ডেকে বললেন, মায়ের কাছে এসেছেন, নিয়ে যাও"- নীতিন ভার্মা বললেন।
"ওরা দুই ছেলে আর বৌমা, নাতি নিয়ে এখানেই আছে এখন।  আমাকে আগরওয়ালের কথা,
ওরা,কিছু জানায়নি, আমি জেনেছি, পাশের বাড়ি থেকে"।  মুক্তি বললেন।
"তাই নাকি"?  নীতিন কিছুটা বিস্মিত।
হ্যা আমাদের প্রতিবেশী দীপক রায়  ও তাঁর পরিবার, আমাদের খুবই শ্রদ্ধা করেন,
"দীপকবাবুরা  তখন আমার খোঁজে এসেছিলেন বাড়িতে, আর সে সময়ে, রীতেশজি এসেছিলেন
ছেলেদের সাথে কথা বলতে ",মুক্তি সেনের গলায় হতাশার সুর।

দিদিজি ক্যাশ না চেকে ফিস টা দেবো, যদি বলেন। নীতিন জানতে চাইলেন।
আপনার যা ইচ্ছা, মুক্তি বলেন।
"তবে twenty five করে ক্যাশ আর চেকে দিয়ে দিচ্ছি দিদিজি। আপনার নামটার spelling কি লেখেন যদি বলেন", বললেন নীতিন।
মুক্তি তাঁর নামের বানানটা,জানিয়ে দিলেন।

নীতিন ভার্মার হাত থেকে পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাশ আর পঁচিশ হাজারের চেক নেবার সময় কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো মুক্তি সেনের চোখ থেকে।  আড়াল করবার চেষ্টা করলেন মুক্তি। পারলেন না।
"কয়েকদিনের ব্যবধানে মনে হচ্ছে, জীবনের সব  খুশি আমি হারিয়ে ফেললাম", মুক্তি সেনের স্বগতোক্তি ঝরে পড়লো। নীতিনের সেই মুহূর্তে হারানো দিদির কথা বড় বেশি করে মনে পড়ে গেলো।
"কষ্ট হচ্ছে জানি দিদিজি, সেন সাহাবের জায়গা পুরন হবার নয়, উনি যেমন কাজের জগতে  ছিলেন unparallel, মানুষ হিসাবেও ছিলেন অন্যরকম", "আমার কাছে উনি, next to my father,
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
"আমি আছি, দিদিজি, এটা ভাববেন না, সেন সাহাব আজ নেই  বলে আমি আপনাদের সাথে আর যোগাযোগ রাখবোনা, কারন আজ আমি যেখানে আছি অনেকটাই ওনার contribution।  একটা সময় যখন বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, সেন সাহাব নিজে হাতে করে আইনের খুটিনাটি আমাকে বুঝিয়েছিলেন, আজ যে business ঠিক ভাবে করতে পারছি, সেটা ওনার জন্য।  আমি সবসময় এটা মনে রাখি "। বললেন  নীতিন।
উনি তো সবাইকে নিজের কাছের একজন মনে করে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন, বললেন মুক্তি।
হ্যা দিদিজি, ওরকম মন ওরকম মানুষের জন্য ভাবা, নিজের মতো করে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, এরকম
আমি খুব কম মানুষকেই দেখেছি ", বললেন নীতিন।
আপনাদের এই কথা, আপনারা যে ভাবে ওনাকে মনে রেখে দিয়েছেন, এটাই আমাকে খুব আনন্দ দেয় নীতিনজি। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে মুক্তির।
সাবধানে থাকবেন, উঠি, কোন অসুবিধা হলেই আমাকে জানাবেন দিদিজি, কোন hesitation করবেন না।
নীতিন উঠে পড়েন। মুক্তি সেন এগিয়ে যান গেট পর্যন্ত, তাঁকে বিদায় জানাবার জন্য।


চতুর্থ পর্ব:

"মা, কাল দাদা- বৌদিরা কলকাতার ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, রিয়া দিদির কি প্রোগ্রাম আছে নাকি"!
মুক্তি সেনকে রাতের খাবার দিতে দিতে বললো মুনিয়া।  মুনিয়া এই  বাড়িতে আছে, আজ সাত বছর।
বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু বছর তিনেক পর স্বামীর সাথে কি এক কারনে ঝামেলা শুরু হোলো। মুনিয়া প্রথম
প্রথম চেয়েছিল মানিয়ে নিয়ে সংসার করতে, পরে একমাত্র ননদের সাথেও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল।
শ্বশুর ও শাশুড়ী বরাবরই মুনিয়াকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতেন, তাঁরা চেয়েছিলেন ওঁরা সমস্যা
মিটিয়ে সংসার করুক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা হলোনা।  মুনিয়াকে চলে আসতেই হলো। পরে ওদের ডিভোর্স হয়ে গেলো।স্বামী একটা কোম্পানির ড্রাইভার ছিল। লাখ তিনেক টাকা পেয়েছিল, মুনিয়া।বিয়ে আর করতে চায়নি মুনিয়া। একটা বিতৃষ্ণা এসেছিল মনে। সেটা কেন যে, তা মুনিয়া বুঝে উঠতে পারেনা। মুনিয়ার মা এই বাড়িতে আগে ছিল, অরুন আর মুক্তি সেনের সংসারে বছর দশেক  আগে। 
তারপর সাত বছর আগে একদিন তার হাত ধরেই মুনিয়ার মুক্তি ও অরুনের সংসারে প্রবেশ।
মুনিয়া এ বাড়ির তখনকার ছবিটা একবার ফিরে দেখে।  দুই দাদার বিয়ে হয়ে গেছে। বৌদি রাও বেশ মিলেমিশে সবাই আছে,একসাথে হাসি,গান  খাওয়া, হুল্লোড়, আনন্দ। সেটাই  কেমন যেন পাল্টাতে লাগলো আস্তে আস্তে। সেন সাহেব মারা যাবার বছর খানেক আগে থেকেই যেন সব আলাদা আলাদা। একসঙ্গে থেকেও  সংসার ভাঙার  শব্দ শুনতে পেতো মুনিয়া।  মাঝেমাঝেই দেখতো সে বড় মা মানে মুক্তি সেন আর বড়বাবু অরুন সেন কেমন মনমরা হয়ে আছেন।  মুক্তি সেনকে দু - একবার কাঁদতেও দেখেছে
মুনিয়া। সে কিইবা করতে পারে। তবে তার কষ্ট হতো দুটো ভাল মানুষের জন্য।
মুনিয়া যখন এ বাড়িতে এসেছিল, তখন তার বয়স ছাব্বিশ, সাতাশ আর এখন বত্রিশ তেত্রিশ।
তখন যে কার্য কারন গুলো বুঝতে পারতো না, এখন অভিজ্ঞতা বেড়েছে, মানুষকে চেনার শক্তি বেড়েছে,
মুনিয়া এখন অনেক কিছুই বুঝতে পারে।
মাঝেমাঝে, মুক্তি কে শাসনের সুরে বলে, মন খারাপ করবেনা ,বাবা তো এই বাড়ির সবজায়গায় আছে
তুমি দুঃখ পেলে, তিনিও কষ্ট পাবেন "
মাঝেমাঝে এসব কথা বেশ উপভোগ করেন মুক্তি।

মুক্তি খাওয়া শেষ করে বললেন, কেন তোকে কি, আমাকে বলবার জন্য বৌদিরা কিছু বলেছে?
না, তা নয়, তবে খাওয়ার টেবিলে কথা হচ্ছিল, তাই শুনলাম। মুনিয়া বললো।
ওহ, ঠিক আছে, শোন,  যে নারকেল নাড়ুটা করেছিলাম, সেটা তবে মনে করে যাবার সময় দুই বৌদির হাতে দুটো বয়ামে দিয়ে রাখিস। মুক্তি বললেন।
হ্যা মা, ভাগ করে দুটো জায়গায় রেখেছি। যাবার আগেই বৌদিদের হাতে দিয়ে দেবো।
সেদিন যে চিঠিটা দিয়েছিলাম, ফেলেছিলি তো ডাকবাক্সে? মুক্তি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন মুনিয়ার দিকে।
হ্যাঁ মা ফেলেছি, রবি দাদাবাবুর চিঠি তো, সে তো দিন পনেরো আগের কথ।  মুনিয়া মাথা নাড়লো।
জানিনা রবি চিঠি পেলো কিনা।স্বগতোক্তি করলেন মুক্তি।  তারপর বিছানার পাশে রাখা টেবিল থেকে
জলের গ্লাসটা নিয়ে ওষুধ খেয়ে,"রামকৃষ্ণ কথামৃতর  মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন।

বড় ছেলে অনির্বাণ  ও তাঁর  স্ত্রী মনীষা ,  দুদিন পরে কলকাতার ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। ছোট ছেলে অনিমেষ ও স্ত্রী রুম্পা দিন সাতেক পরে দিল্লি গেলো।  অনিমেষ এখন ওখানে অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকবে, সেটাই
যাবার সময় বলে গেলো। অনিমেষ জিজ্ঞেস করেছিলো, "মা তোমার যদি একা থাকতে  অসুবিধা হয়
তো বোলো, রুম্পার ভাইকে বলবো পাইকপাড়া থেকে তোমার কাছে এসে থাকতে, কয়েকটি দিন।
পাইকপাড়া থেকে নরেন্দ্রপুর, ইচ্ছে করলে সপ্তাহে দু একবার ঘুরে আসবে"। মুক্তি সেন হেসে বলেছিলেন,
না রে কোন অসুবিধা হবেনা, তোরা যা নিশ্চিন্তে"।

"মা, তোমাকে দাদা কিছু বলেছে, আমরা এই বাড়িটা আর রাখতে চাইনা। আমার দিল্লিতে একটা ফ্ল্যাট
কিনতেই হবে এরমধ্যে , দাদাও পুরানো ফ্ল্যাটটা ছেড়ে একটা বড় বাংলো নিতে চাইছে, ভবানীপুর বা গল্ফগ্রীন এলাকায়"। মুক্তি আজ সরাসরি  বাড়ির ব্যাপারে  কিছু কথা ছেলের মুখ থেকে শুনলেন, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "তোরা,যা ভাল বুঝবি করবি, তবে এই বাড়িটা তোদের বাবা অনেক কষ্ট করে তৈরি করেছিলেন,তো-,তাঁর স্মৃতি এই বাড়িতে ছড়িয়ে আছে", মুক্তির গলাটা ধরে আসে।

"মা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে, এই সব সেন্টিমেন্টাল কথা বোলোনা, এসবের মূল্য কি আছে!
আমরা বাবাকে অন্য ভাবে মনে রাখবো"। বললেন অনিমেষ।
"টেবিল, চেয়ার, আলমারি, খাট,  ইট, কাঠ --সবজায়গায় মানুষের গন্ধ লেপ্টে থাকে, লেগে থাকে, অতো সহজে কি মোছা যায়রে"? মুক্তি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।
"দেখো, তোমার বা তোমাদের মতো মানুষদের ধ্যানধারনার সাথে আমাদের মতো আধুনিক ছেলেমেয়েদের মত বা মন ঠিক মেলেনা", অনিমেষ কিছুটা উত্তেজিত।
"তোরা,আধুনিকতা বলতে কি বুঝিস, পুরানো সব কিছুকে উপড়ে ফেলে দেওয়া!  পুরনো কিছু কি
ফ্যাশানেবল হতে পারেনা"? মুক্তি বিতর্কের মধ্যে যুক্তির জাল বিস্তার করলেন।
হতে পারে!  কিন্তু এটাও তো দেখতে হবে, সেই পুরানো সবকিছুকে বজায় রাখতে হলে, আমাকে অনেক
বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে, লাভের জায়গায় অর্থকরী লোকসান হচ্ছে"। বললেন অনিমেষ।
"তা,হয়তো ঠিক বলেছিস, তবে তো তাজমহল বল, লালকেল্লা বল বা কলকাতার পুরানো বাড়িগুলো
যে বাড়ি গুলোর সাথে মনিষীরা জুড়ে আছেন, সেসব রাখাতো তবে  পয়সার অপচয়",  মুক্তি বলেন
দেখো, মনিষীদের ব্যাপার আলাদা, সেখানে সরকারি অর্থে রক্ষনাবেক্ষন হয় আর এখানে নিজেদের বাড়িতে নিজের পয়সায় সেটা করতে হয়"! অনিমেষ পাল্টা যুক্তি দেয়।
"দেখ, অনি একটা,কথা বলি সেখানে যেমন দেশের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে আছে, ভালো করে ভেবে দ্যাখ,
নরেন্দ্রপুরের এই বাড়িতে কি, আমাদের সবার সেন্টিমেন্ট, আবেগ জড়িয়ে  নেই!  তবে হ্যা আবেগ তো সবার সমান হয়না"।  মুক্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
"ঠিক আছে, তুমি এ ব্যাপারে, দাদার সাথে কথা বলে নিও", অনিমেষ বলেন।
"অনির্বাণের কি এই মত "?  প্রশ্ন রাখলেন মুক্তি।
"হ্যা একমত, দাদাই তার পরিচিত এক প্রমোটারের সাথে কথা বলে রেখেছে, সে আমাদের এই বাড়ি
দেখেও গ্যাছে।  টাকা দেবে অনেকটাই, তার সাথে তিনটে বড় ফ্ল্যাট, দুটো গ্যারেজ"। বললেন অনিমেষ।
কথা যখন হয়ে গেছে, আর তোর দাদারও যখন এটাই ইচ্ছে, আমি কি বলবো"!
অনিমেষ ও রুম্পা এরপর মাকে প্রণাম করে বেরিয়ে যায় ।


পঞ্চম পর্ব:

মুক্তি সেন আজকাল বেশিরভাগ সময় নিজেকে নানা বইপত্রর মধ্যে মেলে ধরেছেন। মনটা মাঝে কিছুদিন
খুবই চঞ্চল ছিল।এই দেড়মাসের মধ্যে বড় ছেলে ও তাঁর স্ত্রী একবার ফোন করেছিলেন।খোঁজ নিয়েছেন।
অনিমেষ ফোন করেছিল দিন দশেক আগে।  জানিয়েছিল,পুজোর আগে তারা আসছে"। 
বেশ কয়েকবার ফোন করে খবরাখবর নিয়েছেন নীতিন ভার্মা। বলেছেন বারবার করে, কোন অসুবিধা
হলে, সাথে সাথে তাঁকে জানাতে।
পুজোর সময় সবাই একসাথে থাকবে, এটা জেনেই মনটা খুশিতে ভরে গিয়েছিল, মুক্তির।
কাল একটা চিঠি এসেছে, মুক্তি সেনের নামে। টেবিলের উপর রাখা। সকালে পুজো করে , চা খেতে খেতে চিঠিটা খুললেন মুক্তি। রবি তাঁর মাসীর কাছে আসছে, আগামী শুক্রবার নাগাদ।  স্কুলে সাতদিনের ছুটি নিয়ে সে আসছে।
মুক্তির মুখে খুশির ঝিলিক। রবি তাঁর বড়দির ছেলে।  বরাবরই রবির উপর অপত্যস্নেহর ছায়াটা,দীর্ঘ  থেকে  দীর্ঘতর হতে থাকে।
মুক্তি অনুভব করেন তাঁর প্রতি একটা শ্রদ্ধা কাজ করে রবি বসুর মনে, রবি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে যে তাঁকে মায়ের একটা আসনে বসিয়েছে, তা উপলব্ধি করেন মুক্তি।
প্রায়ই ফোনে খোঁজ নেয়।  তাঁর বৃদ্ধ বাবাকে দেখাশোনা সেই করে। রবির দাদা দেবল একই বাড়িতে থাকলেও আলাদা সংসার। শুধু যখন রবি কোথাও যায়, সে সময়েই কয়েকটা দিন খাবার দাবার বড়ছেলের ঘর থেকেই আসে। টাকা পয়সা, ওষুধপত্র, বাজারঘাট সবই দিয়ে আসে রবি, যাতে বাবার কোন অসুবিধা না হয়।
মুক্তি মুনিয়াকে  ডাকেন।  দুপুরের খাওয়ার পরে, দুজনেই তখন ঘরে।
কাল তোকে লিস্ট করে দেবো, কয়েকটা  জিনিস নিয়ে আসবি। ছেলেটা আসছে অনেকদিন পর ও যাযা ভালবাসে করে খাওয়াবো।
মুনিয়া,শুনে বলেছিল, "তোমার কিছু করতে হবেনা, আমাকে বলে দিও আমি করে দেবো"
মুক্তি বলেছিলেন, ছেলে এতদিন পর মায়ের কাছে এলে,মাকি নিজের হাতে কিছু না করে দিলে শান্তি পাবে "! বলে হেসেছিলেন মুক্তি। 
মুনিয়া হেসে বলেছিল, যাক করো তাহলে, ভালোই হবে -
তোমার এই ছেলের সাথে আমরাও কিছু খেতে 
পাবো "!
সেদিন থেকে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মুক্তি।আচার, মিষ্টি, নাড়ু  কতরকম খাবার করে মুনিয়াকে বললেন," গুছিয়ে তুলে রাখিস, রবি এলে সকাল, বিকাল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাবার গুলো দিবি"
মুনিয়া হেসে বলেছিল, ওতো চিন্তা কোরোনা, সব গুছিয়ে দেবো, তোমার এই ছেলেকে "
মুক্তি বলেছিলেন,"কেন তুই দেখিসনি আমার রবি কে "
মুনিয়া বলেছিল হেসে, হ্যাঁ দেখেছি তো, আর বুঝেছি ছোট দাদাবাবু, বড় দাদাবাবুর সাথে তুমি কোন তফাৎ করোনা।
আজ শুক্রবার, দু দিন পরে রবি আসবে। শরীরটা দিন তিনেক ধরে ভাল লাগছেনা মুক্তির।
জানালেন মুনিয়াকে কথায় কথায়।
মুনিয়া বললো,ছোট দাদাবাবু আমাকে কয়েকটা যোগাযোগের নাম্বার দিয়ে বলেছিলেন দরকার হলে।
যোগাযোগ করতে।
মুনিয়া শনিবার বিকালে ফোন করলেন পাইকপাড়ায় আর দমদমের আত্মীয়র নাম্বারে।
কয়েকবার রিং হবার পর, ধরলেন অনির্বাণের স্ত্রী মনীষা। মুনিয়া জানাল মায়ের শরীরটা কয়েকদিন ভাল যাচ্ছেনা। বড়দাদাবাবুকে জিজ্ঞেস করো, কি করবো!
মনীষা যেন কিছটা উত্তেজিত, দাদাবাবুর এখন খুব কাজের চাপ, যাওয়া মুস্কিল।
তুমি বরং আমাদের পাশের বাড়ির লাল্টু দাকে বলে ডাক্তার দেখিয়ে নাও।
ফোন ছেড়ে দেয় মনীষা।
মুনিয়া এবার অরিত্র র ফোন নাম্বারে ফোন করে। অরিত্র রুম্পার মামাতো ভাই। বেহালায় থাকে।
অরিত্র সব শোনে।  জানায় সে এখন গানের ট্রুপ নিয়ে বাইরে আছে, পাড়ার কাউকে বলে যেন
মুনিয়া যেন ব্যবস্থা করে নেয়। মুনিয়া ফোন করে অনিমেষকে জানায়।
অনিমেষ ও রুম্পা বলে,
"তোমরা কোন  লোকাল ডাক্তারের সাথে কথা বলো, আমরা এত দুর থেকে কিই বা করবো! "
সেদিন রাতে শরীরটা আরও খারাপ হয়।  মুনিয়া দিশাহারা। সকালের অপেক্ষায়।
সকালেই ambulance এ ফোন করে আসতে বলে, মুনিয়া।
পাড়ার কয়েকজনের সাহায্যে দোতলা থেকে নামিয়ে মুক্তি সেন এ্যাম্বুলেন্সে তোলে মুনিয়া।
কি হয়েছে, মাসীর, রবির গলার আওয়াজে চমকে ওঠে মুনিয়া।
"দাদাবাবু দুদিন ধরে, মায়ের খুব শরীর খারাপ, হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি"। মুনিয়া কেঁদে ফেলে
"ঠিক আছে, আমি উঠছি এ্যাম্বুলেন্সে, তুমি শুধু আমার ব্যাগটা একটু বাড়ির ভেতর রেখে দাও"
রবি, উঠে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সে। 
সেন ভবন থেকে এ্যাম্বুলেন্স বেড়িয়ে যায় কলকাতার নামী হাসপাতালের দিকে,
দুর থেকে শোনা যায়  হুটারের তীব্র  শব্দ, যে শব্দ যেন আতঙ্কের বার্তা দিতে চায়।। 


ষষ্ট পর্ব:

রবি  এ্যাম্বুলেন্সে বসেই ফোন করে অনিমেষ ও অনির্বাণ কে জানালো মুক্তি সেনের শারিরীক অবস্থা।
শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ যখন আছে, তখন কাছাকাছি একটা ভাল হাসপাতালে নিয়ে
যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, একথাই জানালো রবি।
অনির্বান ও অনিমেষ বললো, তাদের পরিচিত ডাক্তারের ভবানীপুরের নার্সিংহোমই নিয়ে যেতে,
ওরা ফোন করে দিচ্ছে। ওখানেই যেনো ভর্তি করে দেয়।
রবি চেয়েছিল, বাইপাসের ধারে যে কোন হাসপাতালে নিয়ে যেতে। সে তার পূর্ব অভিজ্ঞতায় এটুকু বুঝেছে
একটা হাসপাতালে এক ছাদের নীচে নানারকমের চিকিৎসা ও ডাক্তার পাওয়া সম্ভব যেটা, কখনোই
নার্সিংহোমে সম্ভব নয়। মন সায় না দিলেও ছোটমাসীকে  আজ নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হচ্ছে।

নার্সিংহোম দেখে কেন জানিনা, রবির মনে ধরলো না। ঝা চকচকে কিন্তু কোথায় যেন একটা সেবা ও
আন্তরিকতার অভাব সেটা চার পাঁচদিন কাটতেই বুঝলো। যে ডাক্তারের কথা অনির্বাণ, অনিমেষ
বলেছিল, তিনি অন্য হাসপাতাল, নার্সিংহোম সেরে, এখানে আসেন রাত সাড়ে নটা, দশটায়।
জুনিয়র ডাক্তারদের উপর ভরসা করে থাকা সারাদিন। 
পাঁচ, ছদিন কাটলেও কোন শারিরীক উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা, সেটা বুঝতে পারছে, রবি।
অনির্বাণ কলকাতায় আছে, তাই তাকেই প্রতিদিনের খবর জানাচ্ছে রবি।
দুদিন আগে অনির্বাণ আর মনীষা দেখে গেছে মুক্তি সেনকে ।  তাঁরা ঘন্টাখানেক ছিলেন  নার্সিংহোমে।
সেই সিনিয়র ডাক্তারবাবুর দেখা পাননি।
অনির্বাণ সিস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন, "  Dr.Ghosh কখন আসবেন"?
"আসলে ওভাবে টাইম কি করে বলবো, তবে রাত নটার আগে আসেন না,মাঝেমধ্যে  তারপরেও হয়"। সিস্টার বলতে বলতে নাইট ডিউটির  ডিউটি  রোস্টার দেখতে লাগলো।
"দেখুন শ্বাসকষ্ট কমছে না, মা তো নানা কষ্টের কথা বললেন,অনির্বান দা, আমার একটা কথা ছিল,একটু এদিকে আসবে,
রবি একপাশে ডেকে নিয়ে যায় অনির্বাণকে,  "আমি বলছিলাম কি  অন্য কোথাও যদি transfer করা যায়,
ছোটমাসীকে "
অনির্বাণ তাকালো, রবির মুখের দিকে," আমার ভরসা আছে, Dr.Ghosh এর উপর"।
ঠিক আছে আমি কদিন আসতে পারবো না, তুই দেখে রাখিস, কিছু টাকা নিয়ে এসেছি,অনির্বাণ বলে
"টাকা পয়সার জন্য,চিন্তা কোরোনা অনির্বাণ দা, আমি ভাবছি অন্য কোথাও".. অনির্বাণ কথা,
শেষ করতে দেয়না, " আমার এখন এত ভাবার সময় নেই রবি , কাল  জার্মানির ডেলিগেশন টিম আসছে,
কলকাতায়, আমি এসব ভাবতে পারবোনা, তুই দেখে নিস।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায় অনির্বাণ।
মুক্তি সেনের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ডাক্তার বা নার্স কারো কাছ থেকেই রবি, পরিস্কার ছবিটা পায়নি
এই কদিনে।  ডাক্তার ঘোষের সাথেও কথা হয়নি
দিন চারেক ধরে বারকয়েক ফোন করে, অনির্বাণ বা মনীষা কাউকেই  পায়না রবি। সেদিনই অনিমেষকে জানিয়ে রবি হেলথ ভিশন নার্সিং হোম থেকে D.O.R.B. করে নিয়ে যায় দ্য কিউর হসপিটালে।
ডাঃ বিক্রম রায়, রবির পরিচিত।  বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বা রবির NGO.র অনুষ্ঠানে অনেকবার এসেছেন।
pulomonologist. ডাঃ রায় ভাল করে পরীক্ষা করে দ্বিতীয় দিন জানালেন, পেসেন্টের একটা মেন্টাল
ট্রমা কাজ করছে, যার ফলে তাঁর ফলে অনেকগুলো অর্গান disturbed আছে। আমি দেখছি, তবে
একটু সুস্থ হলেই, আমি ছেড়ে দিতে চাই, না হলে secondary infection হয়ে যেতে পারে।
রবি শুনলেন ডাঃ রায়ের কথা,আপনি যা ভাল বুঝবেন স্যার", বললো রবি।


সপ্তম পর্ব:

ফোন বাজছে, রবি একবার দেখে নিল মোবাইলটা।  মুনিয়া ফোন করেছে। মুনিয়া এই কদিনে চার- পাঁচবার
হাসপাতালে দেখতে এসেছে তার মাকে। কদিন ধরে খুব কান্নাকাটি করছে।  মুনিয়াকে নিয়ে
মুনিয়ার মা সেনবাড়িতেই থাকে, সেই হাসপাতালে ভর্তি হবার দিন থেকে।
মুনিয়ার ফোন টা ধরে রবি, " হ্যালো বলো মুনিয়া",  রবি কথা বলে চলে
"রবি দাদা, নীতিন ভার্মা সাহেব ফোন করেছিলেন, বাড়ির  ল্যাণ্ড ফোনে। উনি মায়ের অসুখের কথা শুনে খুব দুঃখ করলেন, পরশু উনি প্লেনে কলকাতায় আসছেন।  এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হাসপাতালে  আসবেন  তিনি। তাই আপনাকে জানালাম"।
"হ্যা, ভাল করেছো নীতিন জির কথা ছোটমাসী অনেকবার আমাকে বলেছেন, শুনেছি উনি মেসোমশাই আর মাসীকে ভীষন শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন,ছোটমাসীকে আমি বলবো।
হ্যা,রবি  দাদা, উনি মাকে,বাবুকে  খুবই শ্রদ্ধা করেন, মুনিয়া বললো।
"প্রথম কদিন বারবারই, ছোটমাসী আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, নীতিনজীর কথা। উনি ফোন করেছিলেন নাকি,কি বলেছেন!  এই সব  জানতে চেয়েছেন বারবার। আমি সবটা না জানলেও একজন রোগীর মানসিক অবস্থা বিচার করে বলেছি, হ্যা উনি ফোন করেছিলেন, সব খবরাখবর নিয়েছেন, দেখতাম এই সব কথায় ছোটমাসীর মুখটা হাসিতে ভরে যেতো।   বললেন রবি।
"আরেকটা কথা বলতেন, আমি ঠিক বুঝিনি, আমাদের বাড়ির কি হবে, থাকবে কিনা, কে কোথায় যাবে, একটা ঘোরের মধ্যে থেকে এসব বলেন মাঝেমাঝে"। বললেন রবি।

হ্যা ঠিক কথা দাদা,মা এখন কেমন আছেন?
"ওই আগের নার্সিংহোমে ঠিক ছিলেন না, তাই তো এখানে নিয়ে এলাম জোর করে"। বললো  রবি
"ভাল করেছো, যেখানে ভাল চিকিৎসা পাবে, সেখানেই যেতে হবে",  মুনিয়া  বলে। 
ঠিক আছে আমি রাখছি, কেউ ফোন করলে আমাকে জানিও ।  ফোনটা রেখে দেন রবি।
একদিন  পরে বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্সে ছোটমাসীকে দেখে," patient meet " এরিয়াতে ডাঃ ঘোষের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যায় রবি।
ডাক্তারবাবু, ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করেন  রবি,
" আজ কেমন দেখলেন "?
ওহ, হেসে কাছে ডাকেন ডাঃ ঘোষ, মুক্তি সেন, মুক্তি সেন,  "Yes, She is better"
আপনি কাল সকালে  দেখা করে কোন ভাল খবর শোনাতে পারবেন রবি বাবু?  বলেন ডাঃ ঘোষ।
নিশ্চয়ই স্যার, ভাল খবর নিয়ে এসেছি, যেটা শুনলে মন ভাল থাকবে।
আজ উলুবেড়িয়ার বাপের বাড়ি থেকে রবির স্ত্রী অনুরাধা এসেছে,মাসীশাশুড়ীকে দেখতে।
আগের দিন যেমন দেখেছিলাম, একটু ভাল লাগল আজ, অনুরাধা বললেন।
হ্যা আগের নার্সিংহোমে অবস্থা খারাপ করে দিয়েছিল, তাই নিয়ে আসা এখানে । "শোন,ছুটি হলে  মাসীকে যদি এখান থেকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাস, কেউ আপত্তি করবেনা",অনুরাধা বলেন। 
"আমিও ভেবেছি তেমনই, তবে জানিনা কি হবে" , বলেন রবি।
ফোন বাজছে, মোবাইল টা দেখল রবি, নামটা ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে, অনিমেষ ( দিল্লি) হ্যালো, বলো অনি দা,
"মা এখন কেমন আছে, আমরা কাল, পরশুর মধ্যে,যাচ্ছি ভাল আছে আগের থেকে,আচ্ছা রবি, তুই ওই নার্সিংহোম থেকে কেন অন্য হাসপাতালে  নিয়ে গেলি ,ওখানে দাদার পরিচিত ডাক্তার দাদার সাথে কথা বলে জানাতে পারতিস! অনিমেষ বেশ ঝাঁঝালো ভাবে বলে অনির্বাণ দাকে অনেকবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু contact হয়নি।
অনির্বাণ দা পরে রিং ব্যাকও করেনি, এদিকে মাসীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, ডাক্তার কোন
সদুত্তর দিচ্ছেনা, তাই বাধ্য হয়ে.. বললো রবি
খারাপ লাগছে দাদার, ডাক্তার, সম্পর্কে বৌদির মামাতো দাদা।
আমি patient এর কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার সই ছিল ভর্তির সময়, তাই DORB করেছি,সই করে।
ঠিক আছে আমি আর রুম্পা  যাচ্ছি, বাড়ি হয়ে হাসপাতালে যাবো পরশু।
ফোন ছেড়ে দেয় অনিমেষ।
ফোনটা ছেড়ে,অনুরাধার দিকে তাকিয়ে খুব হতাশ গলায় বলে রবি,
"মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠা বড় না, কে কি মনে করবে, অসন্তুষ্ট হবে, এটাই ভেবেই অবাক হয়ে যাচ্ছি অনু"
"তুমি যা করেছো, তোমার বিবেকের কথা শুনে করেছো, সেই বিবেচনায় করেছো, কে কি মনে করলো
না করলো সেটা,বড় কথা নয় " অনুরাধার গলায় দৃঢ়তা।
"লোকে দোষারোপ করবে, আড়ালে কথা বলবে, এসব কি  ভাল লাগে"!, হতাশ গলায় বলে রবি।
"তুমি ভাল করলেও বলবে, না করলে তো বলবে,  বিদ্যাসাগরের জীবনী পড়েছো, জানোতো নিশ্চয়ই"!
অনুরাধা, স্বামীর হতাশা কাটাতে যায়।
পরের দিন সকালে ছোটমাসী খবরটা দিল রবি।
"ছোটমাসী, নিতীন জি ফোন করেছিলেন, আজ আসছেন কলকাতায়  তোমাকে দেখতে"
কথাটা যেন অনেকদুর থেকে ভেসে এসে অনুভূতির গোড়ায় ধাক্কা দিল।
চোখ খুলে তাকালেন। তারপর অনেকক্ষন চেয়ে রইলেন রবির মুখের দিকে।  মুখে উজ্জ্বল হাসি।
"রবি আমার, তুই ঠিক বলছিস, আসবেন উনি"?
রবি ঘাড় নেড়ে বলল,"হ্যা কথা হয়েছে, আজ তোমাকে দেখতে আসছেন,  তারপর সুস্থ হলে কদিন পর বাড়ি নিয়ে যাবেন"।
"কোন বাড়িতে যাবো আমি,  আমাদের পুরানো বাড়িতে আমি আর যাবনা, ও বাড়ি তো অন্য লোকের।
আমাকে তোর বাড়িতে নিয়ে যাবি রবি"? 
"হ্যা,কেন নয়, তুমি আমাদের পানিহাটির বাড়িতে যাবে, গঙ্গার ধারে, খুব ভাল লাগবে তোমার",
মুখে হাসি এনে বলে রবি।


অষ্টম পর্ব 

যাবরে যাব, চোখটা ঘুমে জড়িয়ে যায়  মুক্তি দেবীর।

বিকেল পাঁচটা দশ নাগাদ লিফটে করে উঠে, রবি ও মুনিয়ার সাথে, মুক্তি দেবীর বেডের সামনে দাঁড়ান
নীতিন ভার্মা। তাঁর সঙ্গে স্যূট পরিহিত বছর পয়তাল্লিশ / ছেচল্লিশের এক ভদ্রলোক।
রবি আস্তে আস্তে ডাকলেন,  "ছোটমাসী ওঠো, দেখো কে এসেছে"
কয়েকবার ডাকার পর, চোখ খুলে তাকালেন মুক্তি দেবী।
রবি আবার বললো, "দেখো কারা এসেছে "
মুক্তি বুঝতে চেষ্টা করলেন, আস্তে আস্তে মনে পড়তে লাগল সবকিছু।
ডাঃ ঘোষের কথায় , "ওনার ব্রেন  খুব ভাল ফাংশন করছে"।

"দিদি জি কেমন আছেন, আমাকে চিনতে পারছেন তো"?   নীতিন আরেকটু এগিয়ে যান বেডের কাছে।
নীতিন জি, ক্ষীন কণ্ঠে বলেন মুক্তি সেন
হেসে ফেলেন নীতিন, "এই তো চিনেছেন ভাই কে " তারপর স্যুট পরিহিত ভদ্রলোককে হাতটা ধরে সামনে
নিয়ে আসেন, "এই দেখুন দিদি জি, ইনি মিস্টার রীতেশ আগরওয়াল,  উনিও এসে গেছেন আপনার কাছে,
ভাল খবর নিয়ে " হাসলেন নীতিন।
দিদি আপনার বাড়ী এখন আমার হাতে, মানে আপনার হাতে,
মুক্তি দেবী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন -
নীতিন জি আরো বলেন, "সে বার বাড়িতে আপনাকে রীতেশের কথা বলছিলাম না,
মুম্বাই গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, তারপর আপনার কথাটা মনে হল, সেই রীতেশ যে আমার বন্ধু
এই রীতেশ কে তাতো জানতাম না, খোঁজ খবর নিলাম, তারপর একদিন রীতেশ কে ফোনে ধরলাম",
রবি উৎসুক হয়ে উঠলো, "তারপর "?
" তারপর আর কি, রীতেশ কে আপনাদের বাড়ির description  দিয়ে বললাম সবকিছু,
রীতেশের দু সপ্তাহ পরে, মুম্বাই আসবার কথা ছিল, সেখানেই সব বললাম, রীতেশ আমার proposal-এ
রাজী হওয়াতে সুবিধা হলো, আপনার দুই ছেলের সাথেও ফোনে কথা বলে, deal final করলাম।
আমার বাড়ি কি থাকবে নীতিন জি, না অন্য কেউ নিয়ে নিলো
"আপনার বাড়ি, আপনারই থাকল, ট্রাস্ট করে নিয়েছি। ছেলেদের আজ সকালেই পেমেন্ট করে দিয়েছি।  সব কিছু করবেন আপনি।
মুক্তি সেন হাসছেন। আর "অরুন সেন লিগাল ইন্সটিটিউট", সেটা হবে তো "?
 ডাঃ ঘোষ ঢুকে হাসিমুখে বেডের পাশে দাঁড়ালেন।  " সব রিপোর্ট খুব ভাল, ভাবছি কাল বা পরশু ডিসচার্জ করে দেবো"। সবাই হাসছেন।  ডাঃ ঘোষ আবার বলছেন, এখানে আসবার আগে আপনার দুই ছেলের
সাথে কথা বলে, জানিয়ে  দিয়েছি, ডিসচার্জের কথা, এবং  বলেছি এখন কয়েকটা দিন যেখানে উনি
থাকতে চান সেখানেই থাকবেন, তাতে, তাড়াতাড়ি সুস্থ হবেন "
রবি,মুনিয়া হাসলো। নীতিন এবার প্রানখোলা হেসে বললেন, দিদিজিএবার কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দিলে হবেনা, মুম্বাই যেতে হবে আপনাকে,ওখানেই, Arun Sen Legal Institute -এর সূচনা হবে।।
পর্দা সরিয়ে একপাশে এসে দাঁড়ালেন, অনির্বান ও অনিমেষ।
ওদের দিকে  তাকিয়ে নীতিন ভার্মা বললেন, আপনাদের payment clear "?
মাথা নেড়ে সায় দিলেন মুক্তি ও অরুন সেনের দুই ছেলে।
"সেন বাড়ির নেমপ্লেট যে পাল্টাবে না এতেই আমি খুশি, মিস্টার ভার্মা, মিস্টার আগরওয়াল"
রবির হাসিমুখের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সবার মুখটাকে আলোকিত করে তুলল।

------------------সমাপ্ত-----------------

              ডা: নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

৯,বিবেকানন্দ অ্যাভেনিউ, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 







































0 Comments