সৌমী আচার্য্য'র গল্প


সুখ

গত দুদিন ধরে টানা অশান্তিতে ছোট্ট সাজাগোছানো বাড়িটাও যেন ক্লান্ত।চারমাস মুখোশের আড়ালে ক্ষয়ে গেছে অনেক কিছু।মিহিরকে কিছুতেই বোঝাতে পারছে না সঞ্চারী।আর যাই হোক বনেদী বাড়ির ছেলে হয়ে ঝালাই মিস্ত্রীর কাজ করা যায়না।গালে হাত দিয়ে খানিক চুপ করে থেকে মিহির বলে

-সমস‍্যা বনেদী বাড়ির?না তোমার সম্মানে লাগবে সত‍্যি করে বলোতো?

-হ‍্যাঁ, আমারো লাগাবে।সবাই চেনে আমাকে।কি বলবে লোকে?স্কুল টিচারের বর ঝালাই মিস্ত্রী?গলায় দড়ি দিতে হবে আমার।

-কি এতো বড়ো কথা বললে?আর লোকে যে দিনরাত আমায় আওয়াজ দিচ্ছে।আমার নাকি কারখানা বন্ধ তাতে কিছুই যায় আসে না ঘরে চাকরী করা বৌ আছে তাই।সেইবেলা!আমার কি ইচ্ছা করে শুনি?

-তুমি কেন এমন উল্টোপাল্টা কথায় কান দাও?শোনো আমার মাইনে যেদিন বন্ধ হবে সেদিন তুমি যা খুশি করো।এখুনি নয় লক্ষ্মীটি।প্লিজ।

মাস্ক পরে,স‍্যানিটাইজার নিয়ে সাইকেলে করে বেরিয়ে যায় মিহির।সঞ্চারীর চোখ ভিজে ওঠে।লোকটা কি পাগল হয়ে গেলো?চুন্নি গাঘেঁষে দাঁড়ায়।

-পাপা কোথায় গেলো মাম্মা?

-কোথাও না সোনা।এখনি আসবে।

মেয়েকে দুধ,কর্ণফ্লেকস্ দিয়ে রাতের এঁটো বাসনগুলো বাগানের কলপাড়ে নামিয়ে রাখে সঞ্চারী।রান্নাঘর পরিস্কার করে রান্নার কাজে লেগে পড়ে।এখনো ঘরে ঢোকায়নি ঝিলিকের মাকে।বাইরে বাসন মেজে,উঠোনটা ঝাড় দিয়ে চলে যায়।পুরো টাকাটাই দেয় ওকে।বেচারার তিনবাড়ি কাজের টাকায় সাত আটটা পেট চালাতে হয়।মেয়ের চুলে বিলিকেটে পড়তে বসায় ডাইনিং টেবিলে,ওখানে বসেই তরকারি কাটে ছুরি দিয়ে।মনটা মোচড়াতে থাকে।কোথায় যে বেরোলো।সব কাজে দক্ষ মিহিরের ছোট্ট কারখানাটা পুরো বন্ধ।সাতটা মেশিনে এমব্রডারি হয়,তিনটে টেবিলে ব্লকের কাজ সব বন্ধ।দিব্ব‍্যি লেখালেখি নিয়ে ব‍্যস্ত ছিলো কি যে হলো ঝালাই মিস্ত্রীর কাজ করবে বলে পাগল হয়ে উঠেছে।সঞ্চারীর চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে ওঠে ঝিলিকের মার গলার আওয়াজে।বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই কলকল করে ওঠে সে।

-তাইতো বলি বৌদি,তুমারে দেখে শেখা লাগে।বর বেকার হলিও কি করি ভালোবাসতে হয়।

-কি হচ্ছে এসব ঝিলিকের মা।তোমায় কে বলেছে উনি বেকার?আর কেন এসব বলছো তুমি?

-রাগ করো না বৌদি।আমরা ছোটলোক তবু বুঝি।দাদার কারখানায় কাজ করতো বিশে,ও এখন সব্জির দুকান করছে।ঐ তো বলে কারখানার পাশ দি গেলে বুকটা হাহা করে।

-তবু তুমি এসব কথা বলোনা।আমি পছন্দ করি না।

-বৌদি গো আসলে মনটা খুব খারাপ।তাই তুমার অপচন্দ জেনেও বলে ফেললাম।আট নম্বর ফেলাটের মিত্তিরদা আজ সকালে মারা গেচে গো।

-এমা,কি বলছো এসব।পরশু দেখা হলো যে হনুমান মন্দিরে।আমাকে দেখে মাস্ক খুলে হাসলেন কথা বললেন।কি হয়েছিলো ওনার?কিছু তো বুঝিনি সেদিন।

গলা নামিয়ে ঝিলিকের মা বলে,

-গলায় দড়ি দিচে।

-কি বলছো?

গ্রিলটা চেপে ধরে সঞ্চারী।মিহিরের বয়সীই হবে ভদ্রলোক।খুব হাসিখুশি কর্তাগিন্নী।একটা বছর সাত আটের ছেলেও তো আছে।কি হলো এমন সঞ্চারী বুঝে পায় না।

-সারাদিন বাড়িতি অশান্তি।কোন ব‍্যাটাছেলে সহ‍্য করতি পারে বলো?বৌদিটারে বাইরে থেকে বুজা যায় না।জম্মের হারামি।

-আহ্ ঝিলিকের মা।তুমি এমন গাল দিলে আমি তোমায় রাখবো না।বাড়িতে ছোট মেয়ে আমার।

-গাল সাদে দিইনি গো।ওর বাড়িতি আমার ননদ পুষ্প কাজ করে।ফেলাটে তো ঘরের মধ‍্যিই যাতি হয়।তুমার মতো শুধু বাসান মাজায় কে ছাড়ে বলো?জানো বৌদি ,ঐ মিত্তিরদা কে বৌদিটা উঠতি বসতি কথা শুনায়ে শুনায়ে ঝালাপালা করি দিতো।দাদাটা কি কোম্পানি তে য‍্যান কাজ করতো।তা তারা এই লকডাউনে কাজ ছাড়ায় দিছে।ব‍্যাস্ উঠতি বসতি কথা।দাদার মা বাবারেও গালগাল করতো।চোকের জল ফেলে বুড়োবুড়ি।এদিকে বাড়িত লোক এলে তাদের কাছে নিজের দুকখের কতা কেঁদে কেঁদে কতো বৌদিটা।য‍্যান ওরেই সবাই অত‍্যাচার করে।বাড়ির কাজের লোকের সামনেই এসব চলে।কত সহ‍্যি করতি পারে একটা ব‍্যাটালোক?

-থাক তুমি কাজ করো।আমার আর ভালো লাগছে না।

-জানো বৌদি দাদাটা নাকি কাল কেঁদে ফেলিছিলো।বলিছিলো ভিক্ষি করতি তো পারবো না,কারো বাগানে মাটি কুপিয়ে হোক,বাসন মেজে হোক টাকা নিয়ে আসবো।আহাগো তাই কি পারে।বাপরে বাপ কেমুন রাকখুশি বৌ।নিজি ব‍্যাঙ্কি চাকরি করে তবু দাদাডারে উঠতি বসতি নোংরা কতা শুনাতো।ক‍্যাঁতায় আগুণ এমুন শিকখিতো মানুষের।

সঞ্চারী ফোন করে মিহিরের ফোনে।রিং হয় বাথরুমে।দৌড়ে গিয়ে দেখে বাথরুমে ফোন রেখেই লোকটা বেরিয়ে গেছে।অস্থির অস্থির লাগে ওর।রান্না যেন হাতে ওঠে না।মেয়েকে নিয়ে এসময় বাইরে বেরোনোও বিপদ।দিশাহারা লাগে সঞ্চারীর।ওদিকে ঝিলিকের মা শাপশাপান্ত করে চলেছে মিসেস মিত্তিরকে।কেন যে মেয়েদেরই দোষ হয়।আচ্ছা সেও কি খুব খারাপ ভাবে কথা বলে ফেললো মিহিরের সাথে?কিন্তু সত‍্যি যদি ঝালাই মিস্ত্রির কাজ করতে যেতো তাহলে কি সম্মান যেতো না।আচ্ছা সম্মান বড়ো না মানুষটা।বুকের কাছটায় কেমন করতে থাকে।মেয়ে একমনে পুতুল খেলছে।ওকে জড়িয়ে ধরে।বাইরে থেকে ঝিলিকের মা ডাকে।

-ও বৌদি,গেলাম গো।তিনটে নাগাদ এসে দুপুরের বাসনগুলো মেজি দুবো।দাদা কুতায় গো?সাড়া নেই।

বলতে বলতে গেট দিয়ে বেরিয়েও যায়।রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে সঞ্চারী।সময় এগোতে থাকে,এগোতেই থাকে।রান্নাঘরে সব্জিপাতি ছড়ানো।মেয়েটা খেলতে খেলতে খাটের উপর ঘুমিয়ে যায়।দুচোখ বেয়ে অনুশোচনার জল গড়াতে থাকে সঞ্চারীর।সকাল আটটায় বেরিয়ে গেছে মানুষটা শুধু চা বিস্কুট খেয়ে।বেলা দুটো বাজতে চললো,তবু ফিরলো না।উঠে দাঁড়ালো।চুড়িদার পরে নিলো।ঘুমন্ত মেয়েকে নিয়েই বেরোবে ঠিক করেছে।কাউকে কিছু জানায়নি ফোনে।আগে তো নিজে খুঁজবে মানুষটাকে।কোনদিন এমন করে না।কোথায় গেলো লোকটা?গেটের আওয়াজ পেয়ে ছুটে যেতেই দেখে সাইকেলের পিছনে একগাদা টুকরো টাকরা কাঠ নিয়ে ঘেমো শরীরে লোকটা ঢুকছে।গ্রিল খুলে দৌড়ে চলে যায় সঞ্চারী।কলার চেপে ধরে ঝাঁকাতে থাকে।

-কোথায় গিয়েছিলে,কোথায় গিয়েছিলে তুমি?ফোন নাওনি কেন বলো ফোন নাওনি কেন?আমায় শাস্তি দেবে বলে?

কান্নায় ভেঙে পড়তেই অপ্রস্তুত হয়ে মিহির বলে,আরে ঘরে চলো রাস্তার লোক দেখবে।আর আমি বাইরে থেকে এসেছি।হাত পা সাবান দিইনি তুমি আমায় ধরছো কেন?যাও বাথরুমে গিয়ে আগে ড্রেস চেঞ্জ করে হাত পায়ে সাবান দাও।কি যে করো না পাগলামি।

সঞ্চারী নিজেকে সামলায়।বাথরুম থেকে বেরিয়ে মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে থাকে।থরথর করে কাঁপতে থাকে।মিহির ধোয়াধুয়ি সেরে পোশাক পাল্টাতে পাল্টাতে বলে,বুঝলে,কারখানা পরিস্কার করে এই কাঠগুলো পেলাম।ভাবছি কাটুমকুটুম বানাবো।ভালো হবে না?আর তুমি যখন বসিয়ে বসিয়ে আমায় রোজ ভালমন্দ খাওয়াচ্ছো তখন বেকার থাকি আর কদিন।সাথে এসব বানাই।

সঞ্চারী ঝাঁপিয়ে পড়ে মিহিরের বুকে।মুখ ঘষতে ঘষতে বলে,তোমার যা করতে ভালো লাগে করো,আমি কিচ্ছু মনে করবো না।সম্মান এতো ঠুনকো নয় তুমি যা খুশি করো।চুরি তো করছো না।আমার কোনো সম্মান যাবে না।আমার শুধু তোমাকে চাই।

জোরে জড়িয়ে ধরে মিহিরকে।মিহির বোঝে কিছু তো হয়েছে।জড়িয়ে রাখে সঞ্চারীকে বুকে।মাথায় হাত বোলাতে থাকে।হঠাৎ একটা কচি গলা ভেসে আসে।

-পাপ্পা,আমাকেও আদর করো।

দুজনেই ঘুম ভেঙে ওঠা মেয়েকে কাছে টেনে নেয়।

-জানো পাপ্পা,মাম্মা কাঁদছিলো শুধু।আর আমাকে এখনো রাইস দেয়নি।ছোটা ভীম দেখতেও দেয়নি।

মিহির সঞ্চারীর দিকে তাকায়।

-আসলে ভাত আর ডালসেদ্ধ ছাড়া কিছুই করিনি।ও ঘুমাচ্ছিলো।ভাবলাম ওকে নিয়েই তোমায় খুঁজতে যাবো।

-বেশতো ডিমের অমলেট করো।আমি পেঁয়াজ কেটে দিচ্ছি।চলো পুচুমুচো আমরা এখনি ভাত খাবো।

তিনজনে মিলে খেতে বসে টেবিলে।ডাল ভাতে এতো স্বাদ কোনোদিন পায়নি সঞ্চারী।

লেখিকা সৌমী আচার্য্য
বি-১৩/১১০,কল‍্যানী, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ









0 Comments