শুভ্রাশ্রী মাইতির মুক্তগদ্য




মা ও শিউলিসই

আজ আবার আশ্বিনের সেই দিন। একটা ছায়ামাখা অন্ধকার মেঘ সেদিন হঠাৎ এসে ঢেকে দিয়েছিল আমাদের ক্ষুদ্র আলোর আকাশ অপরিসীম বেদনার ক্ষতজলে। তারপর গড়িয়ে গেছে  সময়ের গতিশীল চাকা,পেরিয়ে গেছে একটা গোটা ঋতুচক্র।ক্ষত কিছুটা শুকালেও এখনও শরীরে, মনে ক্ষতজলের চিহ্নটা বেশ স্পষ্ট।আজ মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। অনেকটা পথ ঘুরে আজ আবার এসে দাঁড়িয়েছি সেই পুরাতনী ঘর-দুয়ারের সামনে। জীবনের জলছবির হাজার রঙ বদলেও যে দুয়ার তার সনাতনী রঙ,রূপে চির অমলিন আমার মনে। তবে প্রতিবারের মতো আজ আর দুয়ারে অপেক্ষায় নেই আমার সেই চির আকাঙ্ক্ষিত হলুদমাখা আশ্রয় আঁচল।ভগ্ন স্তূপের মতো স্মৃতির শব পাহারায় প্রহরীর ন্যায় জেগে আছেন শুধু আমার বৃদ্ধ বাবা।আমার হাতে তুলে দেবেন জমে থাকা সব স্মৃতি শৈশবের অমলিন আলোকময়তায়।মনের মণিকোঠায় গুপ্তধন করে সঞ্চিত রাখব বলে আজ আবার এসে দাঁড়িয়েছি স্নেহের চৌকাঠে।
           
সেদিনের মতো আজও এসে দাঁড়িয়েছি শিউলি গাছটার গা ঘেঁষে।ভোরের নরম আলোর মায়া সাদা ফুলের চাদর হয়ে বিছিয়ে আছে গাছের নীচে ঠিক যেভাবে ছিল সেদিন  নার্সিংহোম ফেরত মায়ের শীতল,   জমাট শরীরটার ওপরে ভালবেসে। এই শিউলিতলাতেই পাতা হয়েছিল মা'র শেষ শয্যা,মার ইচ্ছেমতোই। বাবা বসে ছিলেন বজ্রাহত বৃক্ষের মতো স্হির দহনে। যে লাজুক,ভীরু, সদ্যযৌবনা নববধূর হাত ধরে বেঁধেছিলেন সংসারের গাঁটছড়া ,আজ চল্লিশটা বসন্ত পার করে সেই গাঁটছড়া খুলে সে যেন কোন মহাযাত্রার প্রস্তুতিতে মগ্ন। 
            
শিউলিগাছটা মা'র নিজের হাতে লাগানো।স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে চুল এলো করে গাছের গোড়ায় জল ঢালতো মা রোজ। স্নান না করে গাছে হাত দিত না মা কখনো।বলতো,গাছ ছুঁতে গেলে আগে পবিত্র হতে হয়।মার ভেজা শাড়ী আর চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ত মুক্তোদানার মতো জল।ঠিক যেন নরম স্নেহবিন্দু।শিউলিগাছটাও পাতার অঞ্জলিতে রোজ পান করত সেই স্নেহসুধাধারা আমারই মতো। শিউলিগাছের সাথে ছিল মা'র গভীর সখ্যতা। আদর করে মা তার নাম দিয়েছিল শিউলিসই।সংসারের হাজার কাজের অবসরে মা ঠিক এসে দুদন্ড বসত পাশের বাঁধানো বেদীটায়। শিউলিসই তখন পাতার ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে দিতে চাইত মা'র সমস্ত শ্রান্তি।দুপুরে মা এসে বসতো তার শিউলিসই-এর ছায়ায় ---হাতে রবীন্দ্র রচনাবলী বা শরৎ সমগ্র।আবার গরমের সন্ধ্যায় কখনো গুনগুনিয়ে গান ধরত মা। শিউলিসই-এর পাতায় পাতায় তখন অন্ধকারেও আনন্দের জোনাক হিল্লোল।আশ্বিনে মা শিউলিফুলের মালা গাঁথত বেদীতে বসে।একবার রান্না করতে গিয়ে মা'র হাতে গরম ফ্যান পড়ে বিরাট ফোস্কা।আমি দেখেছিলাম মা'র পেতে রাখা যন্ত্রণাকাতর হাতের পাতায় টপটপ করে ভোরের শিশির ঢেলে দিচ্ছে তার শিউলিসই পাতার গা বেয়ে।মা হাসতে হাসতে বলতো, “আমি না থাকলে তোর শিউলিমাসীর কাছে আসিস আদর খেতে।" খুব হাসতাম আমি কথাটা শুনে। তখন বুঝিনি মা'র থাকা আর না থাকার মাঝে কতটা পার্থক্য,কতটা শূন্যতা। সেদিন আমাদের সাথে মার শিউলিসইও কেঁদেছিল খুব । একরাশ সাদা ফুলের নীরব কান্নায় ঢেকে গিয়েছিল মার নিথর শরীরটা সেদিন।
             
আজও সে ফুল ঝরিয়েছে খুব। সে ও কি রাখে দিন-মাস-বছরের হিসেব? কে জানে!শিউলিসইকে বড় আপন মনে হয় আজ আমার। ঠিক যেন মা।মা'র বড় ছবিটায় শিউলিফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছে হারুকাকা।সইয়ের কন্ঠলগ্না হয়ে হাসছে ফুলগুলো,হাসছে মাও। হাত রাখি গাছের পাতায়,কোঁচড়ে ভরে নিই ঝরে পড়া ফুল।ফুল স্পর্শ করতেই শরীর কাঁপিয়ে নেমে আসে অকাল শ্রাবণ। গাছের পাতাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার ভেজা মুখ।পাতার ছলছল ডগা থেকে ঝরে পড়ছে দু-এক বিন্দু শিশিরফোঁটা বেদনার অশ্রুবিন্দুর মতো।শিউলির হালকা মিষ্টি গন্ধে মিশে যাচ্ছে মা'র নিজস্ব শরীর ঘ্রাণ।গন্ধের ভেতর ডুবে যেতে যেতে দেখি গুচ্ছ গুচ্ছ সবুজ পাতার মাঝে ধবধবে সাদা শিউলিফুল হয়ে মা দুলে চলেছেন মৃদুমন্দ বাতাসে... পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন...
         ওঁ মধুবাতা ঋতায়তে
           মধুক্ষরন্তি সিন্ধব...

লেখিকা শুভ্রাশ্রী মাইতি
মহিষাদল, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ






0 Comments