
হৃদয়পুরের চটকপুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তেনজিং নোরগে,সত্যজিৎ রায়,
অঞ্জনদত্ত। সেই নাইনটিন এর অস্টিন থেকে হালফিলের ঘিসিং,গুরুংদের মুষ্টি আন্দোলন/উত্তোলনের সময় ধরে সম্পূর্ণ টাইমলাইনে এই চার জনের নামই উঠে আসছে"দার্জিলিং ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব শিরোনামে"।

দার্জিলিং এক ধ্রুপদী ইতিহাসের শহর ।দার্জিলিং মানে শুধু গোর্খা সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়;এক ঔপনিবেশিক ইতিহাস।ব্রিটিশ দের খুঁজে বের করা শৈলশহর। এই সত্যকে উপেক্ষা করে এগোনো সম্ভব কী? যবে থেকে এই সত্যকে অবজ্ঞা করা শুরু হয়েছে তবে থেকেই দার্জিলিং এর প্রকৃত ইতিহাস ফিকে হতে শুরু করেছে। সস্তার টুরিস্ট স্পট এর পেছনে ক্ষয় হয়েছে দার্জিলিং এর বনেদিয়ানা। কোথায় ভেসে গেল রবীন্দ্রনাথ,রাহুল সংকৃত্যায়নের সঙ্গে দার্জিলিং এর যোগাযোগের কাহিনি। এতো কিছুর পরেও গাঢ় কুয়াশায় রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগের পাশে পাহাড়ি বাঁশির পিছুটান ভীষণ ভাবে জড়িয়ে ধরে যে।
হিমালয় কে ভালোবাসি মানচিত্রের যে কোনো কোণা থেকেই।তা আপামোরের প্রিয় দার্জিলিং এর খাদের ধারের রেলিংটা রাজনৈতিক টানা পোড়েনে এত খানি বিপজ্জনক না হয়ে উঠলে আজ আমরা অন্য ছবি দেখতাম। প্রত্যেক বছর বৃষ্টিতে,ধসে,বঞ্চনায় ক্ষত বিক্ষত ,এবং শোষনের প্রতিবাদের আগুণে জর্জরিত এই দার্জিলিং। কষ্ট হয় প্রচীন শহরের প্রাচীনত্ব নষ্ট হওয়া দেখলে।সুনামির চেয়েও লক্ষগুণ বেশি জলভার আন্দোলন করেছিল বহু শতাব্দী আগে।সমতলভূমি শিউরে উঠেছিল। তার কুঁচকে ওঠা কপালের আপস এ্যান্ড ডাউনস-ই নাকি হিমালয়।এ সবই পড়েছি ময়লাটে পাতার জিওগ্রাফি বই তে। তাই সি লেভেলে বসে বহু প্ল্যান করে এই বার ঠিক করেছিলাম মার্চ মাসের ভরা বসন্তে গুরাস
( রডোড্রেনড্রন)ম্যাগনোলিয়া শোভিত বাঙালির অতি প্রিয় দার্জিলিং ডিসট্রিক্ট এর আনাচ কানাচ -ই হবে আমার উত্তরমুখী পরিযান।
নিউ জলপাইগুড়িস্টেশনের শ্রীহীন চত্বর বেশ তকতকে দেখাল। ফোনে সংযোগ লাগাতেই মিনিট কয়েকের মধ্যেই চলে এলো টাটাসুমো পাহাড়ে এক নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত চলার সাথী। চলতি ফ্যাশনের ট্রেন্ড বজায় রেখে চুলে আন্ডারকাট মারা ড্রাইভার ডায়মন্ড কে দেখেই মনটা খুশি হয়ে গেল,।মাথার ওপর সানগ্লাস তোলা,ভালো হিন্দি,ইংলিশ আর ভাঙ্গা বাংলা বলিয়ে এই ড্রাইভার চমকদার তো বটেই। মোস্ট ইন্টারেস্টিং হি ইস আ বার্ড ওয়াচার,এন্ড অলসো আ গুড ট্রেকার। এই মিশেল ক্যারেক্টার টি আমাদের পাঁচ দিনের সফর সঙ্গী কাম গাইড।বেশ রোমাঞ্চকর উত্তেজনা নিয়ে টাটাসুমোর সামনের সিটে নিজেকে ম্যানেজ করে ফেললাম।কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের ঘিরে ঐ চেনা শালবনী পথ, ছোট রেললাইন, মাচার ঘরের চেনা পাহাড়ি হাসি মুখ উঁকি দিতে লাগল।গাড়ি গোঁত্তা মেরে পাঙ্খাবাড়ির শর্টকাট ধরতেই চা গাছের ঢেউ গড়িয়ে গেল দিগন্তে | গালে হাত রেখে দেখি ওপরে সজল মেঘ,ডাইনে ব্রোঞ্জ রঙা পাহাড় কাছে আসছে। বিকট প্যাঁচালো রাস্তা দিয়ে পাঙ্খাবাড়ি পৌঁছতেই এক রাশ ভারী কুয়াশা যেন আমাদের গাড়িটাকে অলীক শূন্যতায় ভাসিয়ে নিল। এরই মধ্যে কার্শিয়াং আসলো এবং পেরিয়েও গেল সঙ্গে গাড়ির সিস্টেমে গান "মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা"সেই গানের সাথে সাথেই সুর মিলিয়ে ডায়মন্ড জির অসাধারণ শিস্ বাজানো, মন টাকে ভিজিয়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে দিল..। ভাবনা ভিড় করলো এই পাঁচ দিনে পাহাড়ের বিস্তৃত মন গুটিয়ে আবার রোজনামচায় ফিরব কী করে?? এই আমার এক মহা দোষ যেতে যেতেই আমি নেক্সট বেড়ানোর প্ল্যানটা ছকে ফেলি।
দুপুরের মধ্যেই মার্গারিটা হোপ চা বাগান ডিঙি মেরে কিছুটা কুয়াশা আর মেঘ মেখে ঘুম স্টেশনে নিয়ে এলো। টুং ছাড়িয়ে সোনাদা থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে, সিনচল ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্যে ৮,৮০০ ফিট উচ্চতায় হিমালয়ের খাঁজে প্রায় ঘুমিয়ে থাকা ইকো ভিলেজ হল এই চটকপুর।দার্জিলিং এর হাইয়েস্ট পয়েন্ট। খাড়া পাহাড়ি ধুপিগাছের অটলগাম্ভীর্য ,গুরাস আর পাইনের ব্যাকড্রপে মাত্র ১০০ জন লোকের রোজনামচায় চটকপুর বড় বেশী শান্ত একান্ত মূর্ছনা ময়। চুপিসারে চোখের পাতা নামিয়ে সামনে একটা কবিতার মতো দাঁড়িয়ে হঠাৎ ই আলিঙ্গন করে বসল চটকপুর"।
চটকপুরের সর্বজন বিদিত নাম বিনোদন ভাই। মোটামুটি তিনিই সরকারি গেস্ট হাউস টি দেখাশোনা করেন। যদিও তার নিজস্ব হোমস্টে ও রয়েছে কিন্তু আমাদের থাকার ব্যাবস্থা ছিল সরকারের ইকো ভিলেজে রির্সটে। সকাল থেকে দুপুর পার করে বিকেলের রঙে চটকপুর কে ছানবিনের চেষ্টায় বেরিয়েছি। সারাদিনই ঘুরে বেড়াচ্ছি, অসম্ভব ভালো লাগছে গ্ৰামের প্রতিটি কোণা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্থানীয় মানুষের ছবির স্পীড সাটার। আকাশ কিন্তু পরিষ্কার নয় মোটেই। সপার্ষদের উঁকি ঝুঁকি দেখাটুক ও পাই নি এখনও। কিন্তু মেঘ যেন নীচে নামতে শুরু করেছে। হঠাৎ-ই প্রথম বৃষ্টির দুই ফোঁটা, অব্যর্থ নিশানায় ভিজিয়ে দিল আমার চশমার দুই কাচ।আমি দাঁড়িয়ে আছি গ্ৰামের ওপরের দিকের রাস্তার অবতলে। আমার ঠিক সামনেই উপচোনো সুখে ভরা এক ম্যাগনোলিয়া গাছ পুরো সাদা ফুলে থৈ থৈ॥যেন এক হাতের পাতায় ভরা স্পর্শ গন্ধের সাদরে আমন্ত্রণ।
এই ভরা বসন্তেও বৃষ্টি কেন এলি রে তুই? মনে বিষন্নতার খোঁচা। আমাদের কে এই হঠাৎ বৃষ্টির কবল থেকে বাঁচতে বিনোদনজি তার ভাই এর ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন। পাহাড়ি কোন নির্জন গাঁয়ে বসে আ্যসফল্টের ওপর খই ফোটা বৃষ্টির তাল গুনতে গুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। "চা খাবেন বহিন জি?" "হমম খাবো", অতি সুন্দর মেকি মুখোশ বিহীন আন্তরিক আতিথেয়তা। যে চেয়ারে বসে আছি তার উল্টো দিকের শোকেস থেকে কাঁসার থালা বাসন সরিয়ে অতি সাবধানে যত্নের সাথে বের করা হল বাহারি পেয়ালা পিরিচ, যা কিনা বিশেষ অতিথি দের জন্যই রাখা।একটু বাদেই এল বেশি মিষ্টি দেওয়া বিনা দুধের ধূমায়িত চায়ের সাথে পাপড় ভাজা খেলাম তৃপ্তি সহকারে। কিন্তু বৃষ্টি যে নাছোড়বান্দা,যতিচিহ্নের কোনও ব্যবহারেই সে অজ্ঞ;অকালে ও বয়ে চলেছে বেশরম!! আমার প্রায় কান্না পাওয়া অবস্থা,,," এবারও প্রতারণা কাঞ্চনজঙ্ঘা" তুমি ধরা দিলে না? কেন?" বিনোদন জির ভাই এবং ভাবি জি বললেন "বহিনজি, কাল সুবেমে একদম ঝকাস্ দেখেঙ্গে আপ।"মনে মনে বলি তোমরা কী বুঝবে এই কষ্টের? কত কাঠ খড় পুড়িয়ে আসা, দু দন্ড এলোঝেলো সুখে তাকে চাক্ষুষ করবো বলে!!বিধি বাম হলে কার ই বা কী করার থাকে!! ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত নটা ছুঁলে শেষে ওদের ই ছাতা দিয়ে আমাদের রিসর্টে পৌঁছে দিয়ে গেল।স্মৃতি তে ঘুমের টান,মেঘ মল্লারের স্বরলিপি,চুলে জলপ্রপাত, ঠোঁটে আঙুল রেখে সব কথা থামিয়ে বৃষ্টিই কেবল ঝাঁপতালে কথা শুনিয়ে গেল সারা রাত।
পর দিন খুব ভোরে ইকো ভিলেজ রির্সট থেকে পেছনের দিকে গ্রামের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ক্যানভাস টপকে কিছুটা হেঁটে চলে গেলাম পূর্ব দিকের ভিউপয়েন্টে।সবুজের সাথে আভরণ হীন প্রেমের সোহাগে প্রভাতী সূর্যের আগুনে রঙের মাঝে তার সেই বিশাল পৌরুষের ইমেজারি দর্শন।
কপালগুণে পেলাম কিছু ছিটেফোঁটা, রিখটার স্কেলে চোখে আবেগের বাষ্প, সাথে ছোট্ট প্রণাম।
দুপুরের পর ডান দিকের পাইন সম্ভারের পথে কিছুটা হেঁটে গেলেই দেখা যাবে প্রাকৃতিক জলাশয়,স্থানীয় ভাষায় পোখরি বলে। বিলুপ্ত প্রা়য় হিমালয়ান নিউট যাকে আমরা স্যালাম্যন্ডার বলি। ভাগ্য সহায় থাকলে তার ও দেখা মিলতে পারে। আমাদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছিল,কিন্তু।পা়খিদের স্বর্গরাজ্য বলা যে়তে পারে এই চটকপুর কে।বলা প্রয়োজন কাঞ্চনজঙ্ঘা এখানে ভীষণ মুডি,,,,বরাদ্দ দুটি দিনের মধ্যে আমারা কৃষ্ণনাম জপের মতো করে চাওয়ার পরেও সে একটা হাল্কা ইমেজের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়।তাই সেই রাজার দেখা না পেলেও অশিক্ষিত পাহাড়িয়া দের আতিথেয়তা,প্রকৃতির নিশ্চুপ আলিঙ্গন মনের অন্ধকার গলি,তস্য গলি পথে ও আলোর ছটায় ভরিয়ে দিয়েছে। সেই আলো চটকপুর।









1 Comments
আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো....
উত্তরমুছুন