গুচ্ছ কবিতায় ~ সৌমেন দেবনাথ


সৌমেন দেবনাথের গুচ্ছ কবিতা 

এক পৃষ্ঠা ছেঁড়া উপন্যাস 

গুপ্তগুহার রত্ন-ভাণ্ডার অনায়াসে লুটে ভাগে
কতগুলি ডোরাকাটা বাঘ-চিতা অশরীরী 
সাবধানী পথ হাটতে বাঁধা পেলেও, তারা না
বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী মিথ্যার মোড়ক উন্মোচন করতে গেলে রঞ্জিত হয় নৈঃশব্দ্যে খরস্রোতা নদী।
ধান্দাবাজ পাতিকাকে অলিগলি দূষিত
নানা দুরভিসন্ধিতে করে কুটুম্বিতা 
উজানিবেলাতেও ঋতুলগ্না অবলাশ্রী বিষাক্ত সর্পের 
দুরন্ত ছোবলে হারায় বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছা
রাজনীতিগন্ধী মাস্তান সন্ত্রাসী
যথেচ্ছা ক্রিয়াকর্মে মূর্তিমান আতঙ্ক
কার অনুকম্পায় বনের শুকর লোকালয়ে আসে?
হাঙ্গামা-লিপ্ত ফুল বাগানের ফুলে ঝুলে থাকে দেঁতো পতঙ্গ।
কুৎসিত রটনায় রজনীগন্ধা 
মিডিয়ার বদৌলতে হারায় তার কাঞ্চনপ্রভা
এক মগজ হাজার বার বিক্রি করেও হই না শান্ত
এক মস্তক হাজার বার নিচু করেও নীচুর স্বাদ পাই না
মন কাচের পাত্র নয় অথচ ভেঙে যায় হারিয়ে যায়। 
ঈশ্বরেচ্ছা?

আহত পৃথিবী

খোঁড়া পৃথিবীর বটে যাওয়া অবয়বে
স্বপ্নবাজ দু চার জন আঁকে অরণ্যের ছবি

হিংস্র রোদের ঠোঁটে থেকে
তোমার আমার ভূমি ও ভূমি-দেহ তামাটে
জীবনের শেষ পৃষ্ঠা পড়ি উল্টেপাল্টে 
বিহ্বল পথ মাড়িয়ে পঁচন তীরে
দেখি বিদগ্ধ নদী, নদীর বুকে ফ্লাটবাড়ি
তাতে আবাস দেহবিলাসী আর দেহভোগীর

বিক্রি যাওয়া মগজে এখন মল-মূত্র

আজ দুপুরে ধূলোর ভাষায় নজর ফেলে 
পড়ে নিয়েছি-
চুরি গেছে শীতলতার নূপুরধ্বনি 
নেশা ও লোভাতুর চোখের রাত্রির কালো ডানায়
হারিয়ে গেছে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম
প্রজাপতি উড়ে পড়ে রাত্রির চুলোয় 
রাত্রিরাও হারায় পায়ের অক্ষর ও অবলম্বন
রৌদ্ররাও হারায় পথের খাঁচায়।

আমরা আসলেই পৃথিবী মায়ের বালাই।

উদাসীনতা

অবুঝ পৃথিবী, নির্বোধ বালকের মতো কেনো চেয়ে? 
ঠোঁটে কেনো দুর্ঘটনার ঝোল?
শীতে আর্দ্রতাহীন অনাদরের
সেই শিশুটির ন্যায় কেনো ত্বকে খড়ি?
তোমার চোখের জলাশয়ে আর্দ্রদৃষ্টির 
পরিবর্তে কেনো মরুদৃষ্টি?
প্রশ্নগুলি নিজের বিবেককে করতেই
ধরা খেয়ে গেলাম।
মনের পঁচা ডোবা জেগে উঠলো,
গন্ধ এলো নাকে।

তবুও উৎকণ্ঠার তলানি নেই।

বিলুপ্তির উপন্যাস

আজ নেই নদীধারে কাশফুলের সাদা শাড়ি,
নেই অড়হর ক্ষেত, মৌমাছির চাক, টাকির ঝাঁক,
নেই নীল পায়ের প্রজাপতিরা,
হারিয়ে গেছে মফস্বলের আলপথ, 
মারফতি, বিচ্ছেদী গান।
চিঠি আর খাম একটু চাঁদের আলোয় হিমঘরে কাঁপছে,
নকশী কাঁথা আর শাল-চাদর শুশ্রূষারত,
ওরা যেন ব্লু কালিতে দুঃখ লিখে পালাবে।
বিষাদে মুখ ঢেকেছে কুমড়ো ফুল,
অভিমানী পুকুর ঘাটের চোখে আঙুল দেয় ঝর্ণা,
ঘাস ফড়িং আরাম পায় না টাইলসের উপর লাফিয়ে,
আজো আছে বুনো শুকর দুটো-
ব্রেক কষে থাকবে কত দিন?

মাধবীকুঞ্জ বেদখলে

মনোকুঠি মন্দিরে আগ্নেয়লাভা
হৃদপিণ্ড গলে যাচ্ছে দহনে,
বিশুদ্ধ স্বর্গ অসুরদের দখলে
চুমিছে শস্য নগ্ন উল্লাসে।
অবশিষ্ট যারা প্রেমের প্রদীপ জ্বালাতো
বিক্রি হয়ে যাচ্ছে নষ্টের বাজারে-
মাধবীকুঞ্জে চাঁদও বিষণ্ন 
চোখ বুঝে থাকে সারাক্ষণ,
মাঝে মাঝে নাক ঝেড়ে দেয়...

নিরাপদে দুর্বৃত্ত

দুর্বল মাছ কিছু মাটির সাথে থাকে, 
আর বোকাগুলো ভাসে,
মন অতি সরল কিনা
তাই জটিল কিছু সহজে বোঝে না।

আর ঐ শিংওয়ালা মাছ!
শক্তিতে যেন আথলেটিক,
সুযোগ পেলেই বিরুদ্ধ শক্তিকে
ঘাই মেরে মাটির তলে গিয়ে লুকায়,
না খেয়েও পারে থাকতে...
এবার নদীতে ঢেউ বেড়ে গেলো,
অনুকূল ঢেউ নয়, প্রতিকূল-
অবিবেচকের খানাতল্লাশিতে
চুনো-চানা, মায়া-ঝায়া-পুঁটি
জালে হয় বন্দী।
বোকাগুলো নতুন 
নিশ্চিন্তে মৃত্যুগুহার দিকে হাটে,
কিন্তু অভয় আশ্রয়ে লেজ নাড়ে কে?
কে ইরানী পানে ঠোঁট রাঙায়?
কে সিগারেট ফোঁকে আর
সিংহের মতো নাক মোটা করে?
কে মূলাদাঁতে নিরাপদ দূরত্বে মিচকি হাসে?
ওরা তারাই যাদের জয় অনিবার্য।

আজ গোবরে পোকাদের দিন

শকুনেরা মৃত গরুর প্রতিক্ষায় থাকে না
কাকেরাও ময়লা ডাস্টবিন ঘাটে না,
ওদের শক্তি বেড়েছে তাই এত প্রমোশন,
আমরাই দিচ্ছি বাহবা, ফাস্ট ডিভিশন মার্কস।
জঘন্যের বাদশা ওরা জাতির রক্ত চোষে,
গুটি কয়েকের অভিশাপে প্রেরণা পায়,
বন্ধ করে দেয় তাদের বায়ু গ্রহণ পথ।
কামের আগুন ভর করলে নিষ্প্রয়োজন
যৌবন হারা নারীর বিছানায় স্থান করা,
মায়ের বুক থেকেও কেড়ে খায়-
মায়ের বুকে লুকিয়ে লাভ নেই,
আজ সব গোবরে পোকাদের করায়ত্বে।

সুশীলের স্থান নেই

শান্তি নেই কোথাও একদণ্ড, 
চৌদিকে অশুভ আত্মার অগ্নিশ্বাস,
বাইরে মেরুদণ্ডহীন কেঁচো,
ভেতরে তেলাপোকার পঙ্গপাল।
কেউ নেই সবুজ বৃক্ষের সন্ধানে,
সকলে খোঁজে সখ্যতার মধ্য দিয়ে স্বার্থ,
কুলাঙ্গারে ভরে গেছে বৃন্দাবন,
স্নায়ুহীন ভৌতিক বীভৎস কাণ্ড।
মাকড়োশার দৌরাত্ম্যে দৃষ্টি যায় না দূর,
বাতিজ্বালে যারা- প্রভাতে ঝাড়ুর 
নির্মম আচরণে আবর্জনা হয়ে যায় ভাগাড়ে,
হয়ে যায় ভস্ম সুশীল।

কম্বিং অপারেশন 

টনক নড়লো একটু হলেও পরে...
একটি জাল কিনে আনলাম বাজার থেকে,
এই নদীটাই মাছের চেয়ে কীটপতঙ্গ বেড়ে গেছে, 
সম্পূরক খাদ্যে ভাগ বসাচ্ছে, 
রাক্ষুসে মাছগুলোর অত্যাচার সহ্যাতীত,
আর কাঁকড়া প্রতিটি অঙ্গ কাজে লাগাচ্ছে। 

জাল টানতেই জাল আর আসে না,
সহয়তা নিলাম অগোল আর ভূগোলের,
চুনোপুঁটি বেঁধেছে, গ্লাসকার্প, কাঁকড়া সবই,
রাঘব বোয়ালটা কই?
ওটা জাল ছিঁড়ে পালিয়েছে... 
সেচন প্রয়োজন, আনা হলো স্যালোমেশিন,
ধরা পড়লো রাঘব বোয়াল,
ভূঁড়িটা তার, আহ...
অন্যের ধন বসে খেলে ভূঁড়িতো হবেই,
কিন্তু ওর পাশ থেকে রুই কাতলা সরছে না কেন?
কি ভালোবাসা বাবা! একেই বলে সাগরেদ!
এই ভূগোল, সবগুলোকে সাথে নে,
ঝোল হবে, ঝোল...

বড়ই বোকা ওরা

দূরের আকাশে জেগে আছে তারা,
তারাদের চোখে ঘুম নেই-
চোখ তবুও আঙুররঙা রক্তজবা নয়,
ঝরে কেবল পবিত্র উষ্ণ ঘামবিন্দু।

ওরা ঘূণে ধরা মেরুদণ্ডে জোগান দেয় রসদ,
নিহারিকার মতো নিঃসঙ্গ, একা চলার স্বভাব নেই ওদের...
এক বুক তৃষ্ণায় এক বিন্দু জল পেলে তুষ্ট,
করে না বিষবমি।

ধূমকেতুর মতো দীর্ঘকাল লুকিয়ে থাকে না,
মায়াঞ্জণ বিলায়, জ্যোৎস্নার ফুল ছড়ায়,
আকাশের তারা তারা সমাজের তারা, তাদের ঔজ্জল্য কম কিন্তু বিশুদ্ধ, 
উত্তপ্ত অগ্নিময় লোহা হয় না কালে ভদ্রে,
অথচ বদলে দেয়া আগ্নেয়গিরি, 
বড়ই বোকা ওরা।

কবি সৌমেন দেবনাথ 
সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ












0 Comments