
সৌমিত্র চৌধুরীর ছোটগল্প
রাম কিলা
[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি। বেলজিয়াম দখল করে সেখানকার ঐতিহাসিক ব্রিনডঙ্ক দুর্গকে (Fort Breendonk) জেলখানা বানিয়েছিল নাৎসি বাহিনী (১৯৪০)। আদতে ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। ওরা বলত ‘প্রিসন ক্যাম্প।]
‘নবাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
কোন রকমে কথাটা ছুঁড়ে দিল আফজাল। তারপর দাঁত বের করে আবার হাঁপাতে লাগল। গলা দিয়ে কথা বেরচ্ছে না। প্রবল উৎকণ্ঠা। কাঁপছে শরীর। দু’পা এগিয়ে এসে ওর ঘাড়ে হালকা চাপর মারল সানি। ভারিক্কি কায়দায় বলল, ‘পাওয়া যাচ্ছে না মানে! কোথায় যাবে’?
দামোদর সিং ওদের কথা শুনছিল এতক্ষণ। স্বভাব সিদ্ধ শান্ত ভঙ্গি। মুখ নিচু করে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বলল, ‘খুব খারাপ সময় কিন্তু এখন...’।
-খারাপ সময় তো কী হ’ল? একটা ছেলেকে পাওয়া যাবে না?
-বাওয়াল ছাড়’। কথাটা বলেই সানির মুখের দিকে তাকাল দামোদর। একটু পরে আফজালের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খুবই খারাপ সময় রে! চুরি ডাকাতি রাহাজানি রেপ ... তার সঙ্গে রোজ অ্যাকসিডেন্ট’।
-থানায় খবর নিয়েছিস? সব খারাপ খবর ওখানেই আসে আগে।
সানির প্রশ্নে ওর দিকে মুখ তুলে তাকাল আফজাল। একটা ঢোঁক গিলে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে বলল, ‘থানায় গেছিলাম। আমি আর নিত্যানন্দ। মেসের দোতলার নতুন বোর্ডার।’
-থানা কী বলল?
-এখানে কোন খবর আসে নি। আসপাশে খোঁজ নিন।’ সেকেন্ড অফিসার একটা ফাইল দেখতে দেখতে মুখ না তুলেই বলে দিল।
-তুই আর কোথায় খুঁজলি?
-দু’এক জায়গায় ফোন করে তোদের হোস্টেলে খবর দিতে এলাম।
-নিত্যানন্দ কোথায়, তোর ঐ বন্ধু?
আফজালের স্বরে ক্লান্তি। সানির প্রশ্নে ধীরে ধীরে বলল, ‘ওর আজ পরীক্ষা। সেকেন্ড সেমিস্টার। সকাল থেকে একটুও পড়তে পারে নি। তাই...’
-হুম’, মাথা নাড়ল সানি। ততক্ষণে হস্টেলের লম্বা করিডরে জড়ো হয়েছে অনেকে। জটলা বাড়ছে ক্রমশ। হস্টেলের সবাই মিলে আফজালকে একটা টুলের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ওর মুখ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনতে চাইছে।
নিরীহ ছেলে আফজাল। একটু গবেট টাইপের। কথায় এখনও গ্রামের টান। পড়াশোনায় মনযোগী, খাটেও খুব। কিন্তু নম্বর পায় না। সায়েন্স ছেড়ে দিয়ে সোসালজিতে ভর্তি হয়েছে। এত গুলো ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে নাগারে অনেকক্ষণ কথা বলে হাঁপাচ্ছিল আফজাল।
ওর দিকে জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে লিকলিকে এক ছাত্র নেতা বলল, ‘কাল কী হয়েছিল বল তো! মানে মেসে রাতে খাওয়ার পর থেকে ঠিক কী কী ঘটেছিল।’
অনেকটা জল ঢেলে গলা ভিজিয়ে আফজাল একটু থামল। অল্পক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘মেসে তো খায়নি ও। টিউশনি পড়িয়ে একটা ধাবায় ঢুকেছিল। ওখান থেকে রুটি মাংস খেয়ে মেসে ফিরেছিল’।
-তারপর?
-আমি তখন ছবি আঁকছিলাম। ছবি না, পোস্টার। আঁকতে আঁকতে একবার ঘাড় ঘুরালাম। দেখি খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে নবকুমার। পেটে হাত বোলাচ্ছে। আমি বললাম, শরীর খারাপ নাকি রে’?
-তেমন নয়, একটু অ্যাসিড হয়ে গেছে।’ নবা পাশ ফিরে বলেছিল।
-তারপর?
-ও হয় তো ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পর বিছানা থেকে উঠে বলল, একটু হেঁটে আসি। তারপর পায়ে চপ্পল গলিয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল নবকুমার।
নবকুমারকে নিউম্যান বলে ডাকে অনেকে। ওর সোসিওলজির অধ্যাপক ডক্টর অভিজিত পাঠকের দেওয়া নাম। ডক্টর পাঠকের বিদেশী বন্ধু নিউম্যান, তাঁর মতই নাকি দেখতে নবকুমার। পেটানো শরীর। হাসি মুখ। মাথায় ঘন কোঁকড়ানো চুল। নবকুমার, নবা, নিউম্যান। ছাত্র হিসাবে টায়ে টায়ে পাস নম্বর পাওয়া। কিন্তু বন্ধু মহলে জনপ্রিয়। অনেকেই ওকে আদর করে মাথামোটা বলে ডাকে।
মাথামোটা নবকুমার গড়িবের ছেলে না-হলেও তেমন এক্সট্রা কারিকুলার কিছু শেখেনি। গান বাজনা খেলাধুলা কিছুই না। তবে গলাটা ভালো। পল্লিগীতি গায়। ওর গ্রামের গান। আর হাতের লেখা দারুন। কলেজের কোন আন্দোলন হোক বা ছাত্র সংসদের ভোটের ব্যানার-পোস্টার আঁকা। নবকুমারের ডাক পড়বেই। ইউনিয়ন রুমে সকাল সন্ধ্যা ঘাড় গুঁজে কাজ করতে হয় ওকে। সেই নবকুমারকে পাওয়া যাচ্ছে না।
তিন দিন হ’ল নবা নিখোঁজ। ফেসবুক টিভি খবরের কাগজে ভর করে সংবাদটা পৌঁছে গেছে গোটা দেশে। বিদেশেও। তবু রাজধানীর বুকে এক নামী কলেজ-ছাত্র বেপাত্তা। চেষ্টা করেও হদিশ মিলছে না। হাঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল নামী কলেজের ছাত্র। তাগড়াই এক যুবক বেমালুম বেপাত্তা!
ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তেজনা বাড়ছে। উত্তেজনা থেকে হতাশা। সেখান হেকে একটু একটু করে জন্ম নিচ্ছে ক্রোধ। ছাত্র সংসদের ডাকে ছাত্রদের জমায়েত শুরু হয়েছে। কলেজ অধ্যক্ষের ঘরের বাইরে ধর্না চলছে। শ’খানেক ছাত্র-ছাত্রীর সম্মিলিত গলায় আকাশ ফাটানো চিৎকার, ‘নবকুমারের খবর চাই। খবর চাই’।
তিন দিন আগেই অধ্যক্ষের কাছে খবরটা পৌঁছে গেছিল। টাটকা খবর। নব কুমার নিখোঁজ। থানা হাসপাতালে বার দুয়েক খোঁজ নিয়ে সেদিনই নবার বাড়িতে ফোন করেছিলেন অধ্যক্ষ স্যামুয়েল মুর্মু। দু’একটা মামুলি কথা। তারপর সংবাদটা দুম করে বলেই দিয়েছিলেন, ‘নবকুমারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’।
নবার বাড়িতে খবরের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল, জানতে পারেননি অধ্যক্ষ। তবে পরের দিনই তিনশো কিলোমিটার দূর থেকে বাসে চেপে শহরে ছুটে এসেছিলেন সনাতন কুমার। নব কুমারের বৃদ্ধ বাবা। উনিও অধ্যক্ষের ঘরের বাইরে ছাত্রদের সাথে ধর্নায় বসে আছেন।
অধ্যক্ষের ঘর থেকে ডাক এল। কয়েক জন ছাত্র নেতার। সাথে অধ্যক্ষের ঘরে ঢুকলেন বৃদ্ধ সনাতন কুমার।
স্থানীয় থানায় আরেকবার ফোন করলেন অধ্যক্ষ। কিছুক্ষণ ফোনালাপের পরই মুখটা থমথমে হয়ে গেল প্রন্সিপাল মুয়েলের।
ছাত্র নেতা সানি চক্রবর্তির উদ্বিগ্ন মুখ। অনেকক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল সানি, ‘কোন খোঁজ পেলেন স্যার’?
দু’পাশে মাথা নাড়ালেন অধ্যক্ষ। একটু পরে বড় একটা শ্বাস ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘খোঁজ পাই কোথায় বল তো! নিজের বাড়িতে যায় নি। মেস কলেজ হাস্পাতাল মর্গ, কোথাও নেই। মোবাইল ফোন সুইচ অফ। জলজ্যান্ত একটা যুবক যাবে কোথায়?’
কলেজ অধ্যক্ষের নিস্তব্ধ ঘর। বাইরে জমায়েত। ছাত্রদের সংখ্যা বেড়ে চলেচে ক্রমশ। বহু সময়ই এক দলের সাথে আরেক দলের সামান্য কারণে লড়াই লেগে যায়। জমায়েতে উত্তেজনা চিৎকার হাতাহাতি ছাত্র রাজনীতির নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু আজ ঝগড়া বিবাদ নেই। সবাই এক জোট ।
সনাতন বাবুর দিকে তাকিয়ে অধ্যক্ষ প্রথমে মুখ খুললেন। গম্ভীর স্বর। বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমারা দেখছি। কোথায় আর যাবে নবকুমার?’
একটু পরে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে অধ্যক্ষ বললেন, ‘কী করা যায় বল তো’!
নিস্তব্ধ ঘর। স্তব্ধতা ভেঙে আবার কথা বললেন অধ্যক্ষ, ‘স্থানীয় এক উকিলের পরামর্শ নিচ্ছি আমি। রাইট টু ইনফরমেশন, মানে আর টি আই বলে তো একটা ব্যাপার আছে! উকিল বাবু আসবেন একটু পরে। তোমাদের সামনেই কথা হবে।’
উকিল রামহরি রামের সাথে আগেও কথা হয়েছে স্যামুয়েল স্যারের। আজ আরেক বার ছাত্রদের সামনেই কথা বলবেন। নিজের ঘরে কয়েক জন ছাত্র নেতাকে ডেকে পাঠালেন অধ্যক্ষ। ওদের সামনেই উকিলবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলেটিকে ট্রেস করি কী ভাবে বলুন তো’?
ছাত্র নেতাদের মুখ গুলোর দিকে তাকালেন রামহরি উকিল। একবার কেশে নিয়ে অধ্যক্ষের দিকে মুখ ফেরালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘ছেলেটাকে কোথায় খুঁজবেন আপনি? এদিকওদিক তো দেখলেন অনেক...।’
-তাহলে কী করবো এখন?
-দেখুন মিস্টার স্যামুয়েল, মরে গেলে লাশ পাওয়া যেত। তার মানে, আমার সেন্স যা বলে, নির্ঘাত বেঁচে আছে ছেলেটা।’
-যাক নিশ্চিন্ত হলাম।’ কথাটা বলে চেয়ারে হেলান দিলেন অধ্যক্ষ।
ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উকিলবাবু বললেন, ‘স্মার্ট ইয়ং বুদ্ধিমান একটা ছেলে। ও-তো চেষ্টা করছে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারছে না। তার মানে...’।
কথা শেষ করবার আগেই প্রশ্ন করলেন অধ্যক্ষ, ‘তার মানে..., আপনি বলছেন কোন গুন্ডা মস্তান ধরে নিয়ে আঁটকে রেখেছে?’
-রাখতেই পারে। তবে চান্স কম। গুন্ডা মস্তান সব কমে গেছে।
-কমে গেছে? মানে?
-মানে আর কি! কমে তো গেছেই। দেখছেন না সবাই পার্টিতে ভিড়ে গেছে। পুলিশ গুন্ডা মস্তান ধান্দাবাজ...। দলের ছাতার তলায় থেকে গুন্ডা-গার্দি...। এর মাজাই আলাদা।’
-কী বলতে চাইছেন উকিল বাবু?
-শুনুন প্রিন্সিপাল সাহেব,’ গলাটা গম্ভীর করলেন রামহরি রাম। এতক্ষণের হালকা চালে বলা কথার জায়গায় এবার ভারী শব্দের হাতুড়ি ঠুকলেন। ‘ছেলেটাকে পুলিশ ধরে যদি ‘রাম কিলাতে’ ঢুকিয়ে দেয়’?
-মানে? কী বলতে চাইছেন?
-রাম কিলা। মানে শহরের ঐতিহাসিক ওল্ড অ্যান্ড স্ট্রং রাম ফোর্ট। এখন ওটাই প্রিসন ক্যাম্প। আর্মির নিয়ম চলে ওখানে। আমাদেরও ঢুকতে দেয় না।’
-বলেন কি!’ হঠাৎ কেমন একটা স্তব্ধতা অধ্যক্ষের বড় ঘরটাকে জাপ্টে ধরল। অনেক গুলো নির্বাক মুখ পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করছে। ভাষাহীন মুখ গুলোর দিকে একবার তাকিয়ে একটু থামলেন উকিল বাবু। তারপর স্বগতোক্তির মত বললেন, ‘ওরা বলে ‘প্রিসন ক্যাম্প’।
একটু থেমে আবার বিড়বিড় করলেন উকিল বাবু, ‘প্রিসন ক্যাম্প বন্দী শিবির ডিটেনসন ক্যাম্প... অ্যারেস্ট করে আর্মি যদি ছেলেটাকে ওখানে রেখে দেয়?’
-কোন কারণ না দেখিয়ে অ্যারেস্ট করে রেখে দেবে? কোর্টে তুলতে হবে না?
-হা হা হা, প্রিনসিপাল সাহেব, পুরানো আইন ভুলে যান। গ্রেফতার করলে পরের দিন কোর্টে তুলবে, এই আইন এখন হিমঘরে। মানে বাতিল অবসোলেট তামাদি।
-স্যার আমরা প্রতিবাদ করবো। এই আইন চলতে পারে না।’ এক ছাত্র নেতা সাপের মত ফোঁস করে উঠল।
-তোমরা ইয়ং ম্যান। প্রতিবাদ তো নিশ্চয় করবে।’ শহরের নামজাদা প্রবীণ উকিল ছাত্রদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে একটু থামলেন। তারপর স্বর নরম করে নিচু গলায় বললেন, ‘এবার একটু আলাদা কথা বলবো অধ্যক্ষের সাথে।’
তিনজন ছাত্র নেতা এবং নবকুমারের বাবা ঘরের বাইরে যেতেই চেয়ারে একটু নড়ে চরে বসলেন উকিল রামহরি রাম। স্বর এক প্রস্থ উঁচুতে তুলে বললেন, ‘নতুন আইনে আরও কী আছে জানেন?’
অধ্যক্ষ নীরব। ওঁর চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন উকিল বাবু। তারপর স্বরে গাম্ভীর্য মাখিয়ে বললেন, ‘নতুন আইনে পুলিশ যাকে খুশী ধরতে পারে। কোন কারণ-টারন লাগে না, জানেন! টানা এক বছর, কি আরও বেশী বন্দী করে রাখতে পারে।’
-তাই নাকি? কাগজে তো পড়লাম না।
-রাখুন আপনার কাগজ। মুখ খুলবার সাহস আছে কোন মিডিয়া হাউসের?
অধ্যক্ষের মুখা কথা নেই। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উকিল রামহরি রাম বলে চলেছেন, ‘শুনুন প্রিন্সিপ্যাল সাব। ধরপাকড় শুরু হয়ে গেছে। বিদেশী আর দেশ বিরোধীদের ঢোকাতে হবে তো! ...তাই প্রিসন ক্যাম্প।’
একটু থেমে এক ঢোঁক জল খেলেন উকিল রামহরি। সাদা রুমালে ঠোঁটের দু’পাশ মুছে নিয়ে বললেন, ‘একবার ধরলে ছাড় পাওয়া..., কী আর বলবো। প্রায় অ অসম্ভব...।’
-ওখানে কী ভাবে রাখে? ছাত্ররা পড়াশুনা করতে পারবে তো?’
-হা হা হা। হাসালেন মশায়। শুনুন, আমার কাছে যা খবর। ওখানে খুবই আরামে রাখে।’
একটু থেমে আবার, ‘মুখ খোলা বারণ, তবু দু’এক জন ছাড়া পাওয়া বন্দী আমাদের কাছে, মানে উকিল বারে এসে মুখ খুলেছিল।’
- বন্দীদের কী ভাবে রাখে’? আগের প্রশ্নটাই আবার করলেন অধ্যক্ষ।
-বড় একটা শ্বাস ফেললেন প্রবীণ উকিল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর নিচু বলায় বললেন, ‘দশ বাই দশ ঘরে ত্রিশ জন বন্দী। চারশ বন্দীর বরাদ্দ একটা পায়খানা। মানে চল্লিশ জন পিছু একটা। আর...।’
-থামবেন না, বলুন উকিল বাবু।
-সূর্যের আলো ফুটবার আগেই শুরু হয়ে যায় কর্মকাণ্ড। সকাল পাঁচটা বাজতেই কর্কশ চিৎকার। শক্ত পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খায় বুক ফাটানো আওয়াজটা – ‘গেট আপ। উঠ্ যাও, উঠ্ যাও’। একটু পরেই হুঙ্কার – ‘তৈয়ার্ তৈয়ার্’। তৈরি হতে একটা পায়খানায় দশ মিনিটে কাজ সারবে একশ জন! ভাবুন তো কী দেশ!’
-তারপর কী করতে হয়?
-আবার আদেশ, কাম শুরু কর্। স্টার্ট স্টার্ট।
-কী কাজ?
-পাথর ভাঙ্গা। পিচ গলানো, লোহা পেটানো। ছাদ ঢালাই, দেওয়াল গাঁথা। কবর খোঁড়া...।
-খেতে দেয় তো?
-দেয়। সকালে একবার পাতলা খিচুড়ি। আর রাতে ডাল-সব্জি। আর...’
-আর কি?
-মার খেতে হয়, মার। বুট লাথি ডাণ্ডা বন্দুকের বাঁট। এমনকি গুলি। ...ফাঁসিও হয় বলে শুনেছি।
-বলেন কি?
-ওখানে, ওরা বলে প্রিসন ক্যাম্প। বছর খানেক টিকে থাকা মুশকিল। লাঠি বন্দুকে না মরলেও মরবে খিদের জ্বালায়। খিদে মেটে না তো! গাছের পাতা খায় অনেকে। জেল কোডে ওদের নাম ‘ঘাস খাউকা’, মানে গ্রাস ইটার।
-ভয়ঙ্কর। এসব কথা ছাত্রদের সামনে বলি কী করে?
-সেটাই তো কথা! কোন রিপোর্টার বলে না। জজ উকিল ব্যারিস্টার কেউ মুখ খোলে না। আপনিই বা বলতে যাবেন কেন? ছাত্ররা যেমন বন্ধুকে খুঁজছে, খুঁজুক। বাপ-মা যেমন কাঁদছে, কাঁদতে থাকুক...।’
-ছাত্রদের কী বলবো এখন?’ অধ্যক্ষের স্বরে বিপন্নতা।
-বলবেন, তোমরা আন্দোলন চালিয়ে যাও। লাঠি, বন্দুকের গুলি...কুছ পরোয়া নেই। লড়তে থাকো।’
সম্মতিতে ঘাড় নেড়ে উকিল বাবুর দিকে তাকালেন অধ্যক্ষ। উকিল বাবুর গম্ভীর মুখ। কোটের বোতাম লাগিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। একবার কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে বললেন, ‘কী করা যায় আমি দেখছি।’
একটু থেমে অধ্যক্ষের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন উকিল বাবু। নরম গলায় বললেন, ‘আমার আজকের ফিস টা...!’



0 Comments