রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ: এক বঞ্চনার ইতিহাস ~ বারিদ বরন গুপ্ত'র নিবন্ধ

বারিদ বরন গুপ্ত'র নিবন্ধ
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ: এক বঞ্চনার ইতিহাস
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের মত আর কোন কবি গ্রামবাংলা কে চেনেন নাই, বলতে গেলে গোটা গ্রাম বাংলা যেন তাঁর কাব্যের অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল, তিনি সর্বত্রই গ্রাম বাংলার প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন- কখনো গাছ গাছালি, নদ-নদী, পশুপাখির মধ্যে, আবার কখনো কিশোরের দলা মুথো ঘাস বা কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের মধ্যে। এ থেকে একটা কথা পরিস্কার যে গ্রামবাংলা কে কবি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন।
কবি শুধু নৈসর্গিক প্রকৃতির ছবি একেই ক্ষান্ত হননি, সমকালীন সমাজ জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণার ছবিও ফুটিয়ে তুলেছেন, সমাজের টানাপোড়েন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জীবনবোধ তাকে ভীষণভাবে বিচলিত করেছিল, তাই আমরা দেখি শেষের দিকে লেখনীতে বাস্তব জীবনের চাওয়া-পাওয়া হতাশার ছবিও তিনি নিপুন তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
রূপসী বাংলার কবি গ্রাম বাংলকে এতই ভালোবেসেছেন যে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য তার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হয়েছে, তিনি গ্রামবাংলার মধ্যেই পৃথিবীর রূপ -রস, গন্ধ ,ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন, এককথায় গোটা পৃথিবীর রূপ তিনি অন্তর্দর্শন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন গ্রাম বাংলার মধ্যে, তাই তাঁর অন্তরচ্ছেদ করে বেরিয়ে এসেছে-
"বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর",
তাছাড়াও কবি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন-
"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পরে রয়ে যাব, দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে"
আসলে কবি গ্রাম বাংলার রূপে এতই মুগ্ধ হয়েছেন যে তা দুহাত দিয়ে কুড়িয়ে নিজের ঝুলি ভরেছেন, আর অকাতরে বাংলা ও বাঙালি কে দুই হাত দিয়ে বিতরণ করেছেন, নিজেকে নিঃস্ব করেছেন, কিন্তু একটা প্রশ্ন অবশ্যই উঠে আসা উচিত, কবি তাঁর জীবদ্দশায় এর বিনিময়ে বাংলা বা বাঙালির কাছে কি পেলেন? অনাদর উপেক্ষা আর বঞ্চনা!
একথা অবশ্যই অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই যে, রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের কবিদের মধ্যে তিনিই সেরা, কারণ কবি হঠাৎ জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেন বিংশ শতাব্দীর প্রায় শেষ পর্যায়ে। আজকের পাঠকসমাজে খটকা লাগে, তার এই অমূল্য সম্পদ সৃষ্টি গুলি কেন তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি? এর উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো উপেক্ষা, অনাদর আর বঞ্চনার ইতিহাসের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করতে হবে, শুনলে অনেকেই অবাক হবেন যে তৎকালীন সময়ে অনেক পত্রপত্রিকা ও কবির লেখা ফিরিয়ে দিয়েছেন, অনেক প্রকাশক ও তাঁর পান্ডুলিপি চোখ খুলে দেখেন নি, অথচ কবি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তাঁর মৃত্যুর পরে, একে একে প্রকাশিত হলো তার যুগান্তকারী সৃষ্টি -রূপসী বাংলা (১৯৫৭), বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১), সুদর্শন (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), অপ্রকাশিত একান্ন(১৯৯৯) প্রভৃতি।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন তৎকালীন কলকাতার সাহিত্য সমাজের কাছে কবি দুয়োরানী হয়ে থাকলেন? এটা কি উপেক্ষা, বঞ্চনা না ঈর্ষা? কবি দেখেছেন তার চেয়ে নিম্নমানের লেখা পত্র-পত্রিকা আলো করছে, অথচ তার অমর সৃষ্টি গুলি অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছে, যার ফলে মাঝে মাঝে খুবই হতাশ হয়ে পড়েতেন, এই হতাশা কবিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতো, কবি ঘনিষ্ঠ মহলে ও তাঁর এই হতাশার কথা চেপে রাখেন নি, প্রচারবিমুখ এই কবি অন্তরে জ্বলেছেন, আর এই জ্বালা যন্ত্রণা তার ব্যক্তিগত জীবনকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করেছিল। কর্মজীবনেও কবি কোথায় স্থিত হতে পারেননি, হয়তো বঞ্চনা হতাশা তাকে তাড়া করে বেরিয়েছিল। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে দিল্লির রামযশ কলেজ সর্বত্র সমালোচনা তাকে পিছু ছাড়েনি, একসময় সিটি কলেজ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয় অশ্লীলতার দায়ে! ঘটনাটা এরকম, ১৯৩২ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় পত্রিকার তাঁর 'ক্যাম্পে' শীর্ষক কবিতা প্রকাশের সাথে সাথে তীব্র সমালোচনার ঢেউ আছড়ে পড়ে, কবিতার বিষয়বস্তু ছিল কিন্তু জোছনা রাতে হরিণ শিকার, তবুও তার পঙতি-
"সুন্দরী গাছের নিচে জ্যোৎস্নায়, মানুষ যেমন করে ঘ্রান পেয়ে আসে, তার নোনা মেয়ের মানুষের কাছে," 'নোনা মেয়ে' এই পদ হলো অশ্লীলতার অন্যতম কারণ, এই নিয়ে তীব্র বিতর্ক এবং সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
তার কবিতার অন্যতম সমালোচক সজনীকান্ত দাস, এই পত্রিকা প্রকাশের সাথে সাথে, কবির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, কাটাছেঁড়া করতে থাকেন, নানা বিদ্রুপ বাণী বর্ষিত হয়, কবিকে অশ্লীলতার দায়ে জড়িয়ে ফেলা হয়।
এই বিতর্কে জেরে, তাকে সিটি কলেজ থেকে বহিস্কার করলেও অনেকেই এর পিছনে অন্য কারণ খুঁজে পান, হয়তো তৎকালীন সময়ে ছাত্র সংখ্যা কমে যাওয়ার অজুহাত বলে অনেকে মনে করেন। কারণ যাই হোক কবি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সমালোচনা ও বঞ্চনার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়েছেন, তা তাঁর কর্মজীবনকে যেমন বিচলিত করেছিল, তেমনি তাঁর সাহিত্য জীবন কেও একটা প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
প্রচারবমুখ এই কবি নজরুল ইসলামের সমসাময়িক হয়েও তার মত ছিটেফোটাও জনপ্রিয়তা পাননি, সমসাময়িক সাহিত্য সমাজের অধিকাংশই তাঁর বিরুদ্ধচারন করেছেন, মাঝে কবি প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে কবির জীবনের অমর সৃষ্টি প্রায় ২৬০ টি, কবিতা, কবির মৃত্যুর আগে বা পরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়, কবির লেখা প্রথম কবিতা "বর্ষা আহ্বান' প্রকাশিত হয় ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় ১৯১৮ সালে, তার লেখা কবিতা 'মৃত্যুর আগে' প্রকাশিত হয় কবিতা পত্রিকায়, যা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উচ্ছ্বসিত হয়ে 'চিত্ররূপময়' বলে বর্ণনা করেন, তার সর্বকালের সেরা কবিতা বনলতা সেন প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে এই 'কবিতা' পত্রিকায়-
"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য----
কবির এই কবিতাটি সর্বকালের সেরা কবিতার অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৭), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪), এগুলো সবই কবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল।
রূপসী বাংলার এই কবি একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন ১৯৫৪ সালে কলকাতায় ট্রামের চাকায় পিষ্ট হয়ে, কিন্তু ট্রামের চাকার গতি তার গতিপথ কে থামাতে পারেনি, কবির মৃত্যুর পর একে একে প্রকাশিত হয় তার অমর সৃষ্টি তার জ্বালাময়ী লেখনি, "রূপসী বাংলা" থেকে "অপ্রকাশিত একান্ন", এইসব কালজয়ী কাব্য গ্রন্থ কবিকে হঠাৎ জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলে দেয়, তাঁর সমালোচকরা তখন মুখ লুকিয়েছে, কবি হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রোত্তর যুগের শ্রেষ্ঠ কবি!



0 Comments