
ছবি : Karnan (2021)
পরিচালক : Mari Selvaraj,
সঙ্গীত : Santhosh Narayanan,
সিনেমাটোগ্রাফি : Theni Eswar,
সম্পাদনা : Selva R. K.
ভাষা : তামিল।
মধ্য নব্বইয়ের তামিলনাড়ু,ক্ষমতায় তখন জয়ললিতা-র সরকার। করুনানিধি-সরকারের তখনকার মতো অপসারণ পর্ব পেরিয়ে,শুরু হয় ১88 দিনের রাষ্ট্রপতি শাসন !তারপর ১৯৯১ -তে ক্ষমতায় আসেন জয়ললিতা। দলিত সমাজ সেসময় বারংবার পুলিশি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। তেমনই একটি ঘটনা 'কর্ণন' ছবির মূল প্লটের অনুপ্রেরণা।একটা বাসে মারপিট ও অশান্তি-কে কেন্দ্র করে সত্যিই একটা হত্যাকান্ড ঘটে। তিনটে মার্ডার কেসের তল্লাশি করতে, অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি স্বনির্ভর,দলিত অধ্যুষিত,তিরুনেলভেলি জেলার কোডিয়ানকুলম্ গ্রামে (সিনেমায় নাম পরিবর্তিত হয়ে পোডিয়ানকুলম্), ১৯৯৫ সালের ৩১ আগস্ট একসাথে তিনশোর বেশি পুলিশ ঢুকেছিল। তারা আসলে চেয়েছিল ওই তথাকথিত নিচু জাতের মানুষগুলিকে শিক্ষা দিতে। হ্যাঁ, চরম শিক্ষাই দিতে পেরেছিল তারা,অসহায় মহিলা,এমনকি গর্ভবতী মহিলাদের গায়েও পুলিশের বুট আর লাঠির গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল।গ্রামের প্রত্যেকটি ঘর শিকার হয়েছিল চরম নির্যাতন আর লুঠতরাজের। কিন্তু সিনেমার মতো গ্রামের মানুষেরা লড়াকু প্রতিবাদ করতে পারে নি।প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল ও ব্যর্থ হয়েছিল!ওই বছরেই সেপ্টেম্বরের শুরুতে,অর্থাৎ ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পরপর সাংবাদিকরা ডিউটিতে গিয়ে দেখিছিলেন,বাস সার্ভিস বন্ধ।চার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গ্রামে পৌঁছে দেখেছিলেন,বসতি প্রায় পরিত্যক্ত,মানুষজনের দেখা নেই।শুধু ভয়াবহ অত্যাচারের চিহ্ন বহন করছে নিষ্প্রাণ গ্রামটাই।পরিচালক মেরি সেলভারাজ নিকট ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক অধ্যায়কেই নানা আঞ্চলিক কিংবদন্তি ও প্রতীকের মিশেলে নবরূপ দান করেছেন।সিনেমার কাহিনিতে প্রবেশের পূর্বে তাই বাস্তবটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
ওই ঘটনার প্রভাব এতটাই ছিল যে, তামিলনাড়ুর দক্ষিণের জেলাগুলিতে দলিত সমাজের মানুষ গণ-ধর্মান্তরীকরণ ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পথ বেছে নেওয়ার হুমকিও দেয় প্রশাসনকে। AIADMK (All India Anna Dravida Munnetra Kazhagam) সরকারের ছিয়ানব্বইয়ের বিধানসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পিছনেও ওই ঘটনার অনেকখানি প্রভাব ছিল। 'Bodi riots', 'Devendrakula Vellalars', রাজনীতিবিদ ও সমাজ-কর্মী কে. কৃষ্ণস্বামী ইত্যাদি নানা অনুষঙ্গ থেকে পরিচালক সেলভারাজ তাঁর সিনেমার কর্ণন-কে গড়ে নিয়েছেন। রাষ্ট্র-পরিচালিত হিংসা ও বর্ণবিদ্বেষমূলক নিপীড়নের বিবরণকে প্রেক্ষিতে রেখে,একটি বালিকার অকালমৃত্যু ও সিনেমা জুড়ে তার মুখোশ পরে,প্রতীকী উপস্থিতি, মুন্ডহীন দেবতার গ্রামীন সমাজে প্রতিবাদী নায়কের উত্থান প্রভৃতি দৃশ্যকল্প 'কর্ণন' সিনেমাতে এনে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।একটা গনগনে রাগের আঁচ সর্বক্ষণ সিনেমাতে ধরে রাখতে যে আবহ সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়েছে সিনেমাতে,তা এক কথায় আন্তর্জাতিক, কোনো প্রশংসাই যার জন্য যথেষ্ট নয়।পরিচালক সেলভারাজ-এর আগের ছবি 'Pariyerum Perumal' (২০১৮) যেন ছিল বর্ণভেদ প্রথায় উচ্চ বর্ণ ও নিম্ন বর্ণের মধ্যে এক কথোপকথন,যেখানে প্রেম ছিল প্রেক্ষাপটে।কিন্তু তার মধ্যেও উচ্চবর্ণের মানুষদের, নিম্নবর্ণের প্রতি রাগ ও নৃশংসতা অনবদ্য ভাবে উঠে এসেছিল।প্রেম আছে 'কর্ণন'-ছবিতেও, কর্ণন ও দ্রৌপদীর মধ্যে,কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড়ো হয়ে উঠেছে একটা প্রচন্ড রাগ আর প্রতিবাদের স্পর্ধা, যার পরিস্ফুটনে ধনুষ অনবদ্য।সামনের দু-পা বাঁধা একটা গাধা গোটা গ্রামে ঘুরছে.. তার দু-পায়ের দড়ি কেটে দিলেই মুক্ত হবে একটা প্রচন্ড জরুরী রাগ... একটা অনেক দিনের চাপা ক্রোধ..এই ছবির নায়ক যেন সেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশে বোতলে বন্দি একটা রোগা দৈত্য।
হ্যাঁ। এইভাবেই শুরু করতে হল রিভিউটা। ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ের একটা উপত্যকায় দরিদ্র একটা পল্লি -দ্রাবিড় ভূমিতে একপ্রকার ভিন্ন সংস্কৃতি।ক'জনই বা লোক সেখানে?তাদের যৎসামান্য একটা দাবি... গ্রামের নিজস্ব একটা বাস স্টপেজ।কারণ পাশের গ্রাম বহুকাল ধরে তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে,তাও নিজেদের গ্রামের পাশের রাস্তায় কোনোমতেই বাস থামে না বলে তাদের বাধ্য হয়ে সেই পড়শী গ্রামেই যেতে হয়, মাথা নিচু করে।প্রথম প্রতিবাদ করে একটা বাচ্চা ছেলে,যার সন্তান-সম্ভবা মা-কে কোনো বাসই তুলছিল না দুপুর রোদে। সেই ছেলেটাই চলন্ত বাসে রাগে একটা ঢিল ছোঁড়ে, কাঁচ ভাঙে একখানা জানালার। কর্ণন সেখানেই ছিল,মা-ছাড়া গাধাটার পায়ের বাঁধন খুলছিল।সেই সঙ্গে তারও ক্ষোভের গিঁট খুলে যায়।সে আর তার দলবল একটা বাস ভাঙচুর করে রাগে।পেটায় কন্ডাকটর আর ড্রাইভার-কে। তারপর পুলিশ আসে।তলে তলে এসব ব্যাপারে পড়শী গ্রামের রাজনীতি ছিলই।কিন্তু সব ছাপিয়ে যায় একটা অমানুষ পুলিশ অফিসারের গোঁয়ার জেদ আর অন্ধ অহং।
একটা হতদরিদ্র গ্রামের আল-বাল লোকেদের নাম কেন পৌরাণিক চরিত্রদের নামে?কেনই বা,তারা পুজো করে এক স্কন্ধকাটা দেবতার? কোন্ সাহসে তারা পুলিশের চোখে চোখ রেখে বলতে পারে, বাস ভাঙচুরের অপরাধে অপরাধীদের কেউ থানায় যাবে না ?কোন্ স্পর্ধায় কতকগুলো বুড়ো কয়েকজন যুবককে বাঁচাতে এগিয়ে আসে ?এইসবের মীমাংসা করতেই সেই অফিসার মারতে মারতে আধমরা করে দেয় গ্রামের বুড়ো মানুষগুলোকে।তাদের সঙ্গী হয়ে এসে মার খায় গ্রামে কর্ণনের সব সময়ের বিরুদ্ধাচরণকারী তরুণটিও (এই ঘটনাই তাকে সচেতন করবে)। সারাদিন ছাদে, প্রচন্ড রোদের মধ্যে গ্রাম-প্রবীণদের ফেলে রেখে দেয় সেই হৃদয়হীন অফিসার। 'রাগ' তখন আর কর্ণনের (এই কি 'পথের পাঁচালী'র সেই 'মহাবীর কিন্তু ভাগ্যহত' কর্ণ ?)একার থাকে না।গোটা গ্রামের সমস্ত নিপীড়িত, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের হয়ে যায়।তারা দলবদ্ধ হয়।কিন্তু কর্ণনের যে চাকুরির আহ্বান এসে গিয়েছে!গ্রামে প্রথম কেউ এমন চাকরি পেল!সে কি তবে এই কঠিন সময়ে গ্রামবাসীদের চরম বিপদে ফেলে চলে যাবে,সরকারি চাকরির ইন্টারভ্যিউ দিতে?এর জবাব সিনেমাতেই খোঁজা ভালো - বলে দেওয়া উচিত হবে না।
দুর্ভাগ্য এই যে,আমরা তামিল ভাষাটা জানি না।তাই ইংরেজি সাবটাইটেলেই পড়ে নিতে হয়,কর্ণনের মুখে,এস.পি.কান্নাবিরন-কে বলা,ছবির সেরা সংলাপগুলি,"My needs don't matter to you.My troubles don't matter to you. All that matters to you is how I stand before you and how I address you, is that it ? Didn't you hit us just for standing tall?" কর্ণনের সঙ্গে তার দাদুর সম্পর্ক চিত্রণে বা, নৈশ স্বপ্নে কর্ণনের মৃত বোনের পরামর্শে তার বাবার নৃত্যরত অবস্থায় ঘরের মাঝখানে মাটি খোঁড়ার নোছোড় জেদের দৃশ্যগুলি অনবদ্য।ভারতীয় ছবিতে এত সারল্য বিরল হয়ে পড়ছে আজকাল।
এভাবে গল্পটা বলা কঠিন ছিল।কিন্তু যেভাবে গোটা সিনেমা জুড়ে গ্রাম-জীবনের জৌলুসহীন ছবি, অতুলনীয় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তুলে ধরে এই ছবি,যে অনির্বচনীয় কারুণ্যে পুলিশি-নির্যাতনের চিত্র দেখানো হয়,দেখানো হয় জনরোষ, ছবির শুরুতেই বাস না পেয়ে,কলেরায় মারা যাওয়া একটি মেয়ের অকালমৃত্যু-কে 'মোটিফ' হিসেবে দেখায়, সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ একটি বিবেকী-প্রতীক হিসেবে,সেই মেয়েটিকে সারাক্ষণ তুলে ধরে এ ছবি,আর সন্তোষ নারায়ণনের আবহ সঙ্গীত যেভাবে একটা শ্বাসরোধী, উত্তেজনায় টানটান,প্রচন্ড এক গনগনে রাগ-কে জীবন্ত করে তোলে পর্দায়, তা ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবির ভুবনে এক চমকপ্রদ ঘটনা।এই অভিজ্ঞতা পরিবেশনে থেনি ঈশ্বরের সিনেমাটোগ্রাফি আর Mari Selvaraj -এর অসামান্য পরিচালনার প্রশংসা করতেই হয়। প্রতিবাদ অনেক সময়েই ধ্বংসাত্বক হয়,হয় রক্তাক্ত, তা নির্দ্বিধায় দেখিয়েছেন সেলভারাজ।যাকে 'unapologetic' বলাই শ্রেয়।
ছবিতে অসামান্য কর্ণনের চরিত্রাভিনেতা, ধনুষের শেষ দৃশ্যের নাচের সময়,তার দুই চোখের বিহ্বল ভাষা বুঝিয়ে দেয়,সে অনুতাপে এখনও (ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর) কতটা দগ্ধ হচ্ছে।নেতা হওয়া সহজ কথা নয় - কর্ণনের চোখে মুখে তখনও তার ছাপ স্পষ্ট।গ্রামের নিমস্তক দেবতার ছবিতে কর্ণনের বলিপ্রদত্ত দাদুর মাথা উঠতে দেখা,আমার কাছে ছবির সেরা মুহূর্ত।কর্ণনের দাদু যিনি হয়েছেন,তিনি অভিমানে,অপমানে, বোকামিতে, ধরা-পড়া চালাকিতে গোটা সিনেমা জুড়েই অনবদ্য। হায়!বাংলায় আমরা কবে এমন সিনেমা বানাবো? আর তখনই মনে পড়ে যায়, আরে ধুর! আমাদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রামই নেই মোটে! লোক-সংস্কৃতি বলেও তো কিছুই নেই,তাই না? আমাদের তো আছে শুধু নাগরিক কবিদের গুটিকতক কবিতা,সেই সত্তরের দশকের একটা আন্দোলন,রাজ্যে একটাই শহর, রবীন্দ্রনাথ, ভিক্টোরিয়া,ড্রয়িংরুম,মিষ্টি দই আর রসগোল্লা! আমাদের বাংলার নামী পরিচালকেরা চেনেনই না গ্রাম! তাই গ্রাম-জীবনকেন্দ্রিক এমন অনিন্দ্য-সুন্দর অথচ টগবগে ছবি তাঁরা বানাবেন কী করে ?



0 Comments