বাউলবাদ -- দর্শন ও মুক্তি ~ সৌম্য ঘোষের প্রবন্ধ


সৌম্য ঘোষের প্রবন্ধ 
বাউলবাদ -- দর্শন ও মুক্তি

ভারতবর্ষ আধ্যাত্ম ও ধর্মসাধনার পীঠস্থান। বিবিধ সাধনতত্ত্ব ও সাধনজীবনে ভারতবর্ষ সমৃদ্ধ। বাউলবাদ একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত।
এই মত সৃষ্টি হয়েছে বাংলার মাটিতে। "বাংলার লোকসম্প্রদায়ের যে সাধন ভজন গোষ্ঠী সাদামাটা কৃচ্ছসাধনার জীবন আর একতারা বাজিয়ে গ্রামে-গঞ্জে গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায় তাদেরকে সাধারণত বাউল নামে আখ্যায়িত করা হয়"(নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত "বিশ্বকোষ")। সতের-আঠারো শতকে বাংলায় বাউল সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হয়। বাউল সাধনায় জ্ঞান, যোগ ও বামাচার ---- সব কয়টি ধারার মিশ্রণ আছে। বাউল যেমন দেহবাদী ধর্ম, তেমনি গুরুবাদীও। তাই গুরুকে আশ্রয় করে বাউল আধ্যাত্মসাধনা, পরমাত্মার অন্বেষণ করে। এই সাধনায় সহজিয়া ও সুফি সাধনার সম্মেলন ঘটেছে; মূর্তি পূজা, বর্ণ বৈষম্য বা জাতিভেদে তারা বিশ্বাসী নয়। তারা মানবতাবাদী। জন্মগতভাবে কেউ বাউল হয় না; গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে তবেই বাউল হতে হয়। এই সাধনা মূলত নারী-পুরুষের যুগল সাধনা।  লালন সাঁই গেয়েছেন ---

"এসেছি হেথায় তোমারি আজ্ঞায়
আদেশ করিয়া মাত্র যাবো চলিয়া
পরমে পরম জানিয়া।"

      "বাউল" শব্দের উৎপত্তি পণ্ডিতগণ বলেন,
'বাউল' শব্দটি প্রাকৃত 'বাউর' অর্থাৎ এলোমেলো, ক্ষ্যাপা, পাগল অর্থে ব্যবহৃত। কবীর, নানক উত্তর ভারতের অন্যান্য মরমী সাধক এলোমেলো পাগল অর্থ  'বাউর' ছিলেন। প্রাকৃত 'বাউর' থেকে অপভ্রংশ হয়ে 'বাউল' শব্দের উদ্ভব বলে মনে করা হয়। কিছু চিন্তাবিদ বলেন, সংস্কৃত 'বাতুল' ( উন্মাদ) বা হিন্দি শব্দ 'বাউরা' ( ক্ষ্যাপা বা পাগল) থেকে 'বাউল' শব্দের উৎপত্তি। আবার এও দেখা যায়, অন্যমতে, সংস্কৃত 'বাতুল' এবং 'ব্যাকুল' শব্দদ্বয় থেকে 'বাউল' শব্দ 
( নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত 'বিশ্বকোষ',১২তম খন্ড)। পারস্যের 'আল' বা আরবের 'আউলিয়া' রা তাদের প্রেমাষ্পদের উদ্দেশ্যে মরুভূমিতে পাগল বা ক্ষ্যাপার মতো গান গেয়ে বেড়ায়। তারা সংসার ত্যাগী এবং সকল বাধা বন্ধনহীন। এরা সুফী 'দিওয়ানা'র  সঙ্গে তুলনীয়। 
সুফী সাধনায় যিনি সাধকের পরমারাধ্য বা পরমার্থ, তিনিই বাউলের "মনের মানুষ" এবং বাউলদের মতে তাঁর অবস্থান মানবদেহে।  বাউলরা তাই তাঁকে "সাঁই" (স্বামী),  মুর্শিদ (পথনির্দেশক), গুরু (বিধানদাতা) ইত্যাদি ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন এবং তাঁরই সান্নিধ্যলাভে পাগল হয়ে ওঠে।

         বাউল ধর্মের প্রকৃত উৎস বা উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে কোন ঐক্যমত পাওয়া না গেলেও বাংলার মাটিতে এর অনন্য প্রকাশধারা, প্রসার ও সাধনার উৎকর্ষতায় যে আবেদন সৃষ্টি করেছে তা একে স্বীয় নির্যাস-সমৃদ্ধ আধ্যাত্বসাধনা মতবাদ হিসেবে স্বীকৃত। অনার্য-অধ্যুষিত বাংলার জনগণ চিরকাল ভাবপ্রবণ। এই ভাবপ্রবণ বাঙালির হৃদয়ে স্রষ্টা, সৃষ্টি ও রহস্যময় মানব জীবন সম্বন্ধে তৈরি হয় জিজ্ঞাসা। সেই জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে গিয়ে বাঙালি হয়েছে বাউল। সুফিবাদের আদলে জগৎ ও জীবনের রহস্য-সন্ধানী বাউল স্বাধীনভাবে, নিজের মনমতো এক সাধন পথ তৈরি করে নিয়েছে।  বাংলায় প্রচলিত সর্বধর্মতত্ত্ব, সাধন পথ ও দর্শনের সমন্বয় সাধন করে তারা এক সার্বজনীন পথ তৈরি করে সর্বধর্ম দর্শনের বৈশিষ্ট্য বাউল গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। পণ্ডিতেরা বলেন,
"বাউল গান একাধারে ধর্মশাস্ত্র ও দর্শন, সাধন সংগীত ও ভজন, গান ও গীতিকবিতার সমন্বয়।"
ড: শশীভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর  "Obscure Religious
Cults" গ্রন্থে বাউল সাধনার মধ্যে এমন বৈচিত্র্য আশ্রয়ী ধর্মটির সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন।

             বাউল হলো সহজ ধর্ম ও সহজ সাধনার পথ। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাউলগণই এই সহজসাধনায় বিশ্বাসী। তাই তাদের হৃদয়ে বৃন্দাবন-কাশী, মক্কা-মদিনা সমান। আত্মারূপে ঈশ্বর বা আল্লাহ বাউলের কাছে 'সহজ মানুষ' বা 'মনের মানুষ'। 

"আমি কোথায় গেলে পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যে রে।"

আবার,

"সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নগরে"

        বাংলা ভাষার সর্ব প্রাচীন পুথি (দশম শতক)
চর্যাপদগুলি সান্ধ্যভাষায় বৌদ্ধ ও শৈব তান্ত্রিক ভাবধারার ইঙ্গিত দেয়। যা থেকে বাউল চিন্তাধারার উৎপত্তি হয়েছে। প্রধানত বৈষ্ণব ও সুফিধারা থেকে
সাংস্কৃতিক অংশ এবং আনুষাঙ্গিক অনুশাসন গুলিকে বর্জন করে তৈরী বাউলিয়া। বাউলদের মধ্যে দুটি শ্রেণী আছে ----- গৃহত্যাগী বাউল এবং সংসারী বাউল। যারা গুরুর নিকট খিলাফত এর মাধ্যমে দীক্ষা গ্রহণ করে, তাদের ত্যাগী বাউল বলা হয়। এরা সংসার ও সমাজ ত্যাগী। ভিক্ষাই তাদের একমাত্র পেশা। ‌ পুরুষরা সাদা লুঙ্গি ও সাদা আলখাল্লা পড়েন এবং মহিলারা সাদা শাড়ী পরিধান করে। মহিলাদের বলা হয় সেবাদাসী। ‌ পুরুষ বাউল এক বা একাধিক সেবাদাসী রাখতে পারে। ‌ তবে তারা সন্তান ধারণ বা প্রতিপালন করতে পারেনা। ‌ বর্তমানে সমগ্র দেশে ত্যাগী বাউলের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি।
             সংসারী বাউলরা স্ত্রী-পুত্র পরিজনসহ লোকালয় একটি স্বতন্ত্র পাড়ায় বাস করে। ‌সমাজের অন্যদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা, বিবাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ। ত্যাগী বাউলদের মতো তাদের কঠোর সাধনা করতে হয় না। 'কলমা' বা 'বীজমন্ত্র' পাঠ এবং কিছু নির্দিষ্ট সাধন ভজন প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই হয়। ত্যাগী বাউলরা সংসারী বাউলদের দীক্ষা দিয়ে থাকে। উভয়ের সম্পর্ক অনেকটা পীর-মুরীদের মতো। ত্যাগী বাউলদের সেবাদাসী 'কন্ঠিবদল' করে একজনকে ছেড়ে অন্য জনের সঙ্গে চলে যেতে পারে।
                 বাউল দর্শনে মানবদেহে সব তত্ত্ব ও সত্যের ভিত্তি। দেহই হলো সকল জ্ঞান ও কর্মের উৎস। দেহেই কৈলাস-বৃন্দাবন, দেহেই মক্কা-মদিনা। মানবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মা ( সাঁই) বা মনের মানুষের অধিষ্ঠান। ঐকান্তিক সাধনার মাধ্যমে বাউলরা বেরিয়ে যান জগতের সকল তাপ থেকে এবং উপনীত হন এমন এক তন্ময়াবস্থায় যেখানে তিনি পরমসত্তার স্বরূপ উপলব্ধি করেন। রূপ থেকে অরূপে উত্তরণ। বাউল লালন শাহ'র (১৭৭৪--১৮৯০) সেই বিখ্যাত গান:

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
তারে ধরতে পারলে মন-বেড়ি দিতাম তাহার পায়।
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
আয়না মহল তায়।

লালন সাঁইয়ের এই মতের সঙ্গে দার্শনিক প্লেটোর মিল পাওয়া যায়। প্লেটোর মতে জড় দেহ হলো আত্মার পিঞ্জর। দেহ বিনাশের সাথে আত্মা দেহ মুক্ত হয়। এই একই কথা বলে গেছেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। কবিগুরুর সুরে বলা যায়:

"সীমার মাঝে, অসীম তুমি
বাজাও আপন সুর
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাইতো এত মধুর।"

        সহজিয়াসাধকরা মনে করেন মানুষের জন্ম লব্ধ সহজাত বৃত্তি গুলি প্রকৃত সত্য দর্শনের সহায়ক। সেই সহজাত বৃত্তিগুলিকে বিসর্জন দিয়ে নয়, বরং বৃত্তিগুলিকে আশ্রয় করেই আপনার মধ্যে 'আপনার' উপলব্ধি--- এই হল সহজিয়ার সাধনার সারকথা। আত্মতত্ত্বের সিঁড়ি বেয়ে পরমতত্ত্বের জ্ঞান লাভ করা। সহজিয়া সাধক চন্ডীদাস 'দেবী তত্ত্বের' উপরে স্থান দিয়েছিলেন মানুষকে---
  "শুনরে মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।"

বর্ণ শিক্ষায় যেমন ব্যঞ্জনবর্ণের আগে স্বরবর্ণ শিখতে হয়। কারণ ব্যঞ্জনবর্ণ স্বরবর্ণের সহায়তায় উচ্চারিত হয়। ঠিক তেমনি আগে আত্মতত্ত্ব জানতে হয়, পরে পরমতত্ত্ব লাভ হয়। আত্মতত্ত্ব জানলে তখন আর পরম তত্ত্বের সঙ্গে এর কোনো ভেদ থাকেনা ----- জীবাত্মা পরমাত্মার রূপ লাভ করে। 'মনের মানুষ' বাস করে মনে। তাকে বাইরে অন্বেষণ বৃথা।

"এই মানুষে সেই মানুষ আছে।" (লালন সাঁই)

"যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাই আছে দেহভান্ডে" ----
বাউল দর্শন এমন "পিণ্ড ব্রহ্মাণ্ড তত্ত্বে" (Microcosm) বিশ্বাসী। সহজিয়া বৌদ্ধ ধর্মে, সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মে, ভারতীয় সুফী সাধনায় এই একই দর্শন স্বীকৃত। বাউল দর্শনের মতে, দেহের মধ্যেই  ব্রহ্মাণ্ডের সকল তত্ত্ব ও সহজরূপ পরমতত্ত্ব রয়েছে। মানুষ তীর্থে তীর্থে মন্দিরে মসজিদে মিথ্যা অনুসন্ধান করে বেড়ায়। বাউল গানে দেহ মন্দিরের হৃদয়পদ্মে 'ভাবের মানুষের' মিলনের জন্য অবিশ্রান্ত গুঞ্জরণ ধ্বনি ধ্বনিত হয়।( ড: শশীভূষণ দাশগুপ্ত "বাংলা সাহিত্যে গুহ্যসাধনা ধারা", পৃ:৭১)

"তন্ত্ ন জানু মন্ত্ ন জানু,জানু সুন্দর কায়া" ( কবীর)

"জো ঘট চিন্ হে আপনে, মুক্তি মুক্তি হোই জায়"
( বাবা তুলসী সাহেব)
অর্থাৎ যে নিজের শরীরকে চেনে, তার মুক্তি অবশ্যম্ভাবী। লালন শাহ গেয়েছেন----

"আমি একদিনও না দেখিলাম তারে,
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর এক পড়শী বসত করে।" 
কুবির গোঁসাই'র গানে-----

"খোঁজ খোঁজ খোঁজ হৃদয় মাঝে দেখতে পাবি বৃন্দাবন।"

বস্তুতঃ দেহকে আশ্রয় করে দেহাতীতের সাধনা। 
এই সাধনার পরে "উল্টোপথ"।‌ বাউল সাধনায় একে বলা হয় "উজান বাওয়া"। অর্থাৎ বাইরে থেকে ভিতর প্রত্যাবর্তন। ‌ রূপ থেকেই স্বরূপে স্থিতি। ড: শশীভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর "ভারতীয় সাধনার ঐক্য" - গ্রন্থে এই উল্টো সাধনার ব্যাখ্যা অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে করেছেন।
রূপে স্বরূপের উপলব্ধি না ঘটলে সাধনা বৃথা। ‌ মৃন্ময়ী চিন্ময়ী আবাহন করতে পারলে তবেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ সম্ভব। তাই যতক্ষণ না এই রূপ এর স্বরূপ জন্মে ততক্ষণ 'আরোপ সাধনা'কে উপায় করে এগিয়ে যেতে হয়। আরোপ সাধনায় সাধক সাধিকা আপনাকে পূর্ণজ্ঞানে‌ কৃষ্ণ এবং রাধা এই উপলব্ধিতে উপনীত হয়। স্বামী পরমানন্দ তাঁর "বাউলের মর্মকথা"  গ্রন্থে  "আরোপ তত্ব" সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ----- "প্রকৃত প্রেমিক প্রেমিকা পরস্পর পরস্পরে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার ভাগ আরোপ করে থাকেন, কারণ স্বরূপে তারা শ্রীরাধা-কৃষ্ণ। সাধনায় সিদ্ধ হলে বোধের পূর্ণতায় তারা উভয়ে কৃষ্ণত্ব ও রাধাত্ব প্রাপ্ত হবেন। আপন স্বরূপেই তারা পরমানন্দ আস্বাদন করবেন আর এটাই হল সহজপুরের স্থিতি। চন্ডীদাসের লেখায়----

 " ছাড়ি জপতপ, সাধহ আরোপ
   করতা করিয়া মনে।"

মানবিক আদর্শের পরাকাষ্ঠা এই আরোপ-তত্ত্ব। 
মানুষকে দেবত্বের আসনে বসিয়ে তার মধ্যে দেবত্বের অনুসন্ধান ---- এ এক মহৎ মানব সাধনা।
ড: শশীভূষণ দাশগুপ্ত বলেছেন ----
"...… এটি মানুষের মধ্যে দৈহিক- জৈবিক-- মনস্তাত্ত্বিক সর্বতত্ত্বের মধ্যেই পরমতত্ত্বের সন্ধান প্রচেষ্টা।"

          বাউল সাধনা একান্তভাবেই গুরুবাদী সাধনা। তবে এ কথা ঠিক যে,  যে কোন ধর্ম সাধনায় গুরুর আবশ্যিকতা চিরন্তন মহিমান্বিত।
হিন্দু শাস্ত্রে গুরুকে প্রণাম জানিয়ে গুরু মহত্ত্বের কথা উচ্চারিত হয়েছে এইভাবে -----

" অজ্ঞান তিমিরন্ধাস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।
চুক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।"
(গুরু প্রণাম মন্ত্র)

অর্থাৎ, তিনিই গুরু যিনি অজ্ঞান তিমির প্রভাবে
অন্ধ শিষ্যর চক্ষুদ্বয়কে জ্ঞানরূপ অঞ্জন শলাকা দ্বারা উন্মোচিত করে দেন। সহজ কথায় "তমাস মা জ্যোতির্গময়"

"লুইস ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।" ----- (চর্যা নং ১)

 "বাহতু কামলি সদগুরু পুচ্ছি।" ----- ( চর্যা নং ৮)


              বৌদ্ধ ধর্মের মূল তত্ত্ব হচ্ছে 'ক্ষণিকবাদ'। 
অর্থাৎ পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। স্থায়ী সত্তা বলে কিছু নেই। এই সতত পরিবর্তনশীল সংসারে মানুষ রোগ-জ্বালা-মৃত্যু ইত্যাদি কারণে চরম দুঃখের সম্মুখীন হয়। গৌতমবুদ্ধ মানুষকে এই দুঃখ থেকে নিবৃত্তি পথের সন্ধান দিতে চাইলেন।
বৌদ্ধধর্ম পল্লবীত হয়েছে বুদ্ধ কথিত চারটি সত্যকে আশ্রয় করে। দুঃখ আছে দুঃখের কারণ আছে; দুঃখের নিবৃত্তি সম্ভব তার জন্য সঠিক পথ জানা চাই। দুঃখের নিবৃত্তির জন্য বুদ্ধ জীবন চর্চার ক্ষেত্রে 'মধ্যপন্থা' (মজঝিম পটিপদা) এবং 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' অনুসরণের কথা বলেছেন। এই 'মধ্যপন্থা' বলতে বুদ্ধ বলেছেন চরম সুখ ভোগ নয় বা চরম কৃচ্ছসাধন নয়। 'নির্বাণ' লাভ করতে এই মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। 
গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধগণ দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ হয়। মহাযান ও হীনযান। হীনযানীরা ভববন্ধন থেকে আপনার নির্মাণ আদর্শকে গ্রহণ করতে চাইলেন। মহাযানীরা জগতের প্রতিটি মানবের নির্বাণ চাইলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে সকল মানুষের মধ্যে বুদ্ধ বিরাজমান। সাধনার দ্বারা সেই বুদ্ধত্বের উদ্বোধন সম্ভব। এই নিবার্ণেই 'সহজ সুখ'। কালের প্রভাবে এই মহাযানীরা বিভক্ত হলেন --- সহজযান, বজ্রযান, কালচক্রযান ইত্যাদিতে। 
সহজিয়া বৌদ্ধদের লক্ষ্য ছিল কায়ার মধ্যে  বোধিচিত্তের উদ্বোধন। সাধকের বোধিচিত্ত দেহস্থিত বিভিন্ন চক্র ভেদ করে মস্তকে অবস্থিত "মহাসুখচক্রে" গমন‌ করে। পরমবুদ্ধের  সঙ্গে বোধিচিত্তের মিলনই বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকের পরম লক্ষ্য। আর এখানেই বাউলদের সঙ্গে আদর্শগত মিল।

বিভিন্ন গ্রন্থ পড়ে যে তথ্যে উপনীত হতে হয় ---
বাংলার বাউল সাধনায় সহজিয়া বৈষ্ণব সাধনার প্রভাব সবথেকে বেশি। বৈষ্ণব সহজিয়াগণেরও
মূল সুর --- "বস্তু আছে দেহ বর্তমানে। সব বস্তু বা
তত্ত্বই আছে দেহের মধ্যে। ভারতবর্ষের সুফী-সাধকগণও এই সত্যটি গভীরভাবে গ্রহণ করিয়াছে। বাংলার বাউল দেহকেই দেউল করিয়া লইয়াছে।" (ড: শশীভূষণ দাশগুপ্ত-- "শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ -- দর্শনে ও সাহিত্যে") বৌদ্ধ সহজিয়াগণ যেখানে সহজজ্ঞান লাভের জন্য মৈথুন সাধনা প্রণালীকে গ্রহণ করেছে; বৈষ্ণব সাধকগণ সেখানে প্রাকৃত প্রেমকে অপ্রাকৃত প্রেমের স্বর্গীয় মহিমা দান করেছেন। এই অপ্রাকৃত প্রেমের সৌন্দর্য পরিনাম বাউল সাধকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। বাউলদের 'মনের মানুষ' এমন অপার্থিব প্রেম সৌন্দর্যের সারাৎসার নিয়েই নির্মিত।  অনেক বাউলেরা বিশ্বাস করেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজে বাউল ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সিদ্ধসাধক। আবার অনেকেই বলে থাকেন, বৈষ্ণব এর সঙ্গে বাউলের কোন যোগ নেই। 

"বাউল বৈষ্ণব ধর্ম এক নহে তো ভাই
 বাউল ধর্মের সঙ্গে বৈষ্ণবের যোগ নাই।" ( দুদ্দু শাহ)

             তবে বাউলদের রসসাধনা যে সহজিয়া বৈষ্ণবের রসতত্ত্বের অনুসারী সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সহজিয়া বৈষ্ণব সাধনায় শ্রীকৃষ্ণ হলেন 'রসস্বরূপ'। আর শ্রীরাধিকা হলেন 'রতি স্বরূপা'। 
বাউলধর্মও বিশ্বাস করেন প্রাকৃত নর নারীর মধ্য দিয়েই রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা প্রবাহিত। তাদের কাছে কাম অপ্রাকৃত প্রেমস্বরূপ। স্বামী পরমানন্দ বলেছেন ---- "প্রকৃতি আশ্রয় বাউলের সস্তা ইন্দ্রিয় ভোগের জন্য নয়---প্রকৃত প্রেমকে অতিক্রম করে অপ্রাকৃত কামে অর্থাৎ প্রেমে  উত্তরণ। এই কারণে বাউলদের কাছে নারী হ্লাদিনী স্বরূপিনী মহাশক্তি
রসময়ী প্রকৃতি।" ( স্বামী পরমানন্দ -- 'বাউলের মর্মকথা' ২য় সংস্করণ পৃ: ৩৭-৩৮)। বাউল গানেই আছে সেকথা ----

"রসিক তো  রমন ছাড়া থাকে না
 কেবল স্ত্রী-পুরুষের রমন করা নয়
  আত্মায় আত্মায় রমন হলে রসিক তারে কয়।"
                   -- ( বাউল মনোহর দাস)

প্রবন্ধকার সৌম্য ঘোষ 
চুঁচুড়া, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ






0 Comments