হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


অন্তরে প্রিয় রবীন্দ্রনাথ 

সত্যি কি কোন শিক্ষক প্রিয় হয়ে ওঠে কোন ছাত্রের  কাছে? আমি একথা বললাম এই জন্য যে ছাত্র  অবস্থায় কোন শিক্ষকের কাছে ভালোবাসা পাই নি। পড়াশনায় খুব ভালো ছিলাম না। তার জন্য প্রহার কি একমাএ পথ? কিছু কিছু শিক্ষক এতো নিষটুর প্রহার করতেন যে মনে হতো এরা শিক্ষক না হয়ে কশাই হলে ভালো হতো। কিংবা মনে হতো ওদের ঘরে বুঝি আমাদের মতো সন্তান নেই? এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে এ, এম স্যারের কথা। লম্বা দোহারা চেহারা। ফর্সা মুখ।
ইংরেজিতে আমি দূর্বল ছিলাম। তার কাছে পড়ে বুঝে ছিলাম ইংরেজি ভাষা শেখা কত সহজ।
ছোট ছোট বাক্যে কি সহজে ইংরেজি লিখতে শিখিয়ে ছিলেন। এরপর যখন কোন ছাত্র পড়া না করে আসতো, তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করতো তোমার কি আমার পড়া বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে?
দেখ, কারো হয়তো আমার পড়ানোর কৌশল বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে, তা হলে তারা আমার বাড়ি গিয়ে বুঝে নিতে পারো। কোন টাকা পয়সা লাগবে না। এই রকম কথা আমি আজ পর্যন্ত শুনি নি। পড়া না করলে তিনি বলতেন---একটু মন দিয়ে  পড়ো। দেখবে পড়ার মধ্যে কত আনন্দ। আজ তুমি ফাঁকি দিচ্ছ, কিন্তু এটা বুঝঝো না, পড়ার আনন্দ থেকে চিরতরে তুমি বঞিত হচ্ছ । জানবে জীবন এক সংগীত, তার তান লয় রয়েছে এই পড়াশুনার মধ্যে। সারা বিশ্বকে তুমি হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। 
       এ, এম, তো  আমার দেখা টিচার। কিন্তু যাকে দেখেনি। যিনি জীবনের সব স্তরে আমাদের পথ নির্দেশ দিয়েছেন।   
   শোকে দু :খে বেদনায় আনন্দ সৃষ্টিতে কিভাবে জীবনকে সংগীত করে তুলতে হয়, তা তার  কাছ থেকে আমি পেয়েছি।সে আর কেউ নয়, তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

 সাহিত্যিক দেবদাস কুণ্ডু 
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 















পাই স্যার 

রাজু ও আমি  স্কুলবেলায়  বিজ্ঞানের স্যারকে খুব ভালবাসতাম। রাজুর অন্য বন্ধুরা বলত পাগলা স্যার। রাজুর খুব রাগ হত। আমি বলতাম, এইরকম পাগল হাজার হাজার প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার জন্য।
বিজ্ঞান স্যারের আমরা নাম রেখেছিলাম পাই স্যার। মার্চ মাসে বিজ্ঞানী আইন স্টাইনের জন্ম। এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে খুব মজা করে বিজ্ঞান বোঝাতেন স্যার। তিনি একবার বলেছিলেন, ছোটবেলায় আমরা সৌরজগতের গ্রহগুলো কে সূর্যের থেকে কত দূরে শিখেছিলাম। পৃথিবীর থেকে সূর্য পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মুশকিল হল এই‘পনেরো  কোটি কিলোমিটার’–টা কতদূর তার ধারণা আছে নাকি আমাদের? তোমার স্কুল আর  মামার বাড়ির দূরত্ব কত, বলতো রাজু।রাজু বলল, স্যার তিন’কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। একশো কিলোমিটার দূরে মামার বাড়ি যেতে বাসে ঘন্টাখানেক লেগে যায়। 
সমর বলল, আমার মামা দিল্লিতে থাকেন। কলকাতা থেকে দিল্লীর দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটার – প্লেনে যেতে লাগে ঘন্টা দেড়েক কি দুয়েক। স্যার বললেন,তাহলে দেখ,  এই একশো কিলোমিটার বা দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বের সাথে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা সম্পর্ক তৈরি হল। কিন্তু পনের কোটি?সেটা কত বড় সংখ্যা তা বুঝি নাকি? সুতরাং, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আমাদের কাছে একটা মুখস্থ করার সংখ্যা হিসেবেই রয়েগেল, অনুভূতি বা‘ইনটুইশন’–এর সাথে যুক্ত হল না।যেমন, একটা উড়োজাহাজ যার কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে এক-দেড় ঘন্টা লাগে, তার কতক্ষণ লাগবে একই বেগে পৃথিবী থেকে সূর্য যেতে? উত্তরটা সহজেই দূরত্বকে গতিবেগ দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যাবে – প্রায় সতের বছর!  আবার ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও ভাবা যায়। ধরা যাক, পৃথিবীর সাইজ একখানা পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাসের রাজভোগ কি রসগোল্লার মত। তাহলে এই স্কেলে সূর্য কত বড় আর কত দূরে হবে?সমর বলল,অঙ্কটা চট করে কষতে পারব ঐকিক নিয়ম লাগিয়ে।স্যার বললেন দূরত্বগুলো ছোট সংখ্যা নিয়ে হিসেব করলে সহজ হয় অঙ্কটা। এবার  কিন্তু সৌরজগত সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা তৈরি হবে। মনে মনে একটা ছবি বানিয়ে নিলাম যে আমার টেবিলের উপরের রসগোল্লাটা পৃথিবী, আর মিনিট পাঁচ–ছয় হেঁটে গেলে সূর্যকে পাব। কিন্তু সূর্য তো বিন্দু নয়! তার ব্যাস প্রায় চোদ্দ লাখ কিলোমিটার। তাহলে আবার ঐকিক নিয়মে দেখে নেব যে আমাদের উদাহরণে সূর্য হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটার মানে মোটামুটি একখানা বড়সড় ঘরের মত। ঘরের মত চৌকো নয় অবশ্য, মোটামুটি গোলাকার।এইভাবে তিনি বিজ্ঞান বোঝাতেন সহজ করে। তারপর যখন বারো ক্লাসে পড়ি তখন স্যার একবার স্কুল ল্যাবরেটরিতে ক্লাস নিলেন। স্যার সিরিয়াস হয়ে পড়াচ্ছেন। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ক্লাসে সকলেই হাসতে শুরু করেছে। রাজু ও তার বন্ধুরা তো হাসছেই। তার সঙ্গে হাসছেন, লাফিং স্যার।আমরা অবাক হয়ে হাসছি।হাসির কলরব  পৌঁছে গেল হেড মাষ্টারমশাইয়ের ঘরে। তিনি একটি শক্ত লাঠি নিয়ে এলেন মারার জন্য।তিনি চিৎকার করছেন আর বলছেন, বাঁদরামি হচ্ছে। এটা স্কুল। স্কুলে হাসি। ঘরে ঢুকে পড়ে হেড মাষ্টার মশাই ও হাসতে লাগলেন। রাজুরা অবাক। কি ব্যাপার হলো।এদিকে  স্যার হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছেন একটা মোটা কাঁচের বোতলের দিকে। তিনি দেখলেন বোতলের মুখ খোলা। লেখা আছে বোতলের গায়ে নাইট্রাস অক্সাইড। স্যার বন্ধ করলেন ঢাকনা।তারপর দশমিনিট পরে হেডস্যারকে বললেন, স্যার লাফিং গ্যাসের বোতল খুলে ফেলেছে কেউ। তার ফলে এই হাসি।সমর বললো,স্যার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে।আমার প্রিয় শিক্ষক পাই স্যারের তখনও হাসি মুখ।
কে যে বোতলটা খুলেছিলেন তা আজ পর্যন্ত জানা যায় নি...
 সাহিত্যিক সুদীপ ঘোষাল 
নন্দনপাড়া, খাজুরডিহি, পূর্ব বর্ধমান















না আঁচড়, হ‍্যাঁ আঁচড়

ঠাকুর বলতো এসেছিস যখন একটা আঁচড় কেটে যা! প্রিয় শিক্ষক‌ও তাই বলতো। কিন্তু আঁচড় কাটতে গেলে কে যেন পালটা আঁচড়ে দিতো। এই আঁচড়া-আঁচড়ির মধ‍্যে পড়ে মানুষ হ‌ওয়া হলো না। কী হতে চাস? একে-একে হাত উঠলে শোনা যায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট ইত‍্যাদি। প্রিয় শিক্ষকের মুখে তখন হতাশার ছাপ। যেন মিঠাইওয়ালার উজ্জ্বল রঙিন গোলাপি হাওয়াই মিঠে মুহূর্তে হাওয়ার ক্রোধে মিইয়ে ফ‍্যাকাশে হয়ে গেল। চোখ ছলছল। চোখের কোণে চিকমিক করা জল। ক‌ই, কেউ তো প্রকৃত মানুষ হ‌ওয়ার কথা বললো না। কী কারণ? মানুষ হ‌ওয়া বুঝি অন‍্য প্রফেশনের থেকে শক্ত! প্রিয় শিক্ষক উদাস ভাবে ব্ল‍্যাকবোর্ডের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন এমন ভাবে যেন বলতে চাইতেন ডোন্ট রিকোয়েস্ট মি ফর অ্যান ইউটার্ন। চলার পথ বেঁকে যাবে। রাজপথ ছেড়ে যে যার মতো কানা অলিগলি ধরে খুঁজবে প্রত‍্যাশার টুকরোটাকরা যার মূল‍্য অমূল‍্য হতে পারলো না, শুধু ঘুনসির কানাকড়ির কাছে আজীবন নতজানু হয়ে থাকলো। রাজপথ মানে সহজ সরল মানুষ! তাই তো চেয়েছিলেন তিনি। এখন‌ও অমৃতলোকে বসে অনেকের মধ‍্যে সেটাই দেখতে চান। হোয়ার দেয়ার ইজ অ্য উইল, দেয়ার ইজ অ্য হোপ অর ওয়ে। এই প্রবাদের গলিত তরল সিসার মতো মনের যত ফাঁকফোকরে ঢেলে দিয়েছিলেন। ওরে পারবি, ওরে হবে, ওরে হয়! চটের আসন ছেড়ে হাইবেঞ্চ, দস্তার বাক্স ছেড়ে পুমার লোগো লাগানো ব‍্যাগ পিঠে, হাফ প‍্যান্ট ছেড়ে ফুল প‍্যান্ট, মাকুন্দ থেকে গোঁফের ব‍্যক্তিত্ব, সব হলো প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে। জীবনটাকে ছড়ার মতো সহজ করতে চেয়েছিলেন। আন্তরিক ছন্দ থাকবে পরতে-পরতে। মাথা দোলাতে-দোলাতে সবাই পড়ে নিতে পারবে। তিনি খুশি হবেন। যেভাবে হাতির মাথা সম্মতিসূচক ভাবনায় দুললে মাহুত খুশি হয়।
     তিনি পরিচালক। এই ছোট্ট জীবন টেলিফিল্‌ম। দেখার জন‍্য হয়ত অনেকে ইন্টারেস্ট পাবে না। প্রচার হবে না কিন্তু প্রসার থাকবে। যেমন জলের নিচে তিরতির করে যে শীতল কিংবা উষ্ণ প্রস্রবণ বয়ে যায়, যার খবর সমুদ্রের উপর প্রবল ঢেউ রাখে না, রাখতে চায়‌ও না। ভীষণ সুনামি হয়ে জনপদে আছড়ে পড়ে সব কিছু ভাসিয়ে প্রমাণ করতে চায় আমি‌ই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কতক্ষণ? একটা সময় সব শান্ত। তিনি প্রচার বিমুখ হতে বলতেন। বলতেন সংযম রাখতে। মনের পরিধির ভিতর তৈরি করতে বলতেন পিন ড্রপ সাইলেন্স জোন যার উদ্দেশ‍্য ক্লিননিনেস ইজ নেক্সট টু গডলিনেস। পথের উপর জোর দিতে বলতেন। গন্তব‍্য আপন গতিতে এগিয়ে আসবে। মাইলস্টোন দেখতে বারণ করতেন। কিন্তু কী ভাবে বলি, সেই কানাভাঙা মাইলস্টোন হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তা হতে পারিনি। দেখি লোকের ধেয়ে যাওয়া, ধুলোর ওড়াউড়ি, শুনি মিছিলের স্লোগান, ভুল ব‍্যাকরণের কথাবার্তা, মানুষের দৈন‍্যতা, ঠকানোর প্রবণতা ইত‍্যাদি। স্ট‍্যাচু অব লিবার্টি হতে পারিনি। বদলে স্ট‍্যাচু অব এনভি হয়ে আছি। পরিস্থিতি চারিপাশে চাপ দেয়। বেলুন হয়ে গেছি। এদিকে চাপ দিলে ওদিকে বাড়ি অ্যান্ড ভাইস ভার্সা।
     প্রণাম নিতে চাইতেন না কিন্তু প্রণামের ব‍্যাখ‍্যা করতেন। পাছে মাথা নিচু হয়। শিরদাঁড়া সোজা রাখতে বলতেন। কী বলি হে প্রিয় শিক্ষক! মুণ্ডু থাকবে কোথায়? শিরদাঁড়াই তো আর নেই! অমেরুদণ্ডী প্রাণী হয়ে গেছি। সেই হিসাবে কেঁচোর দাম অনেক বেশি। সে জমিতে মাটি উগলে কৃষকে সাহায‍্য করে। আর সেই কৃষক সভ‍্যতার কাছে ঠকে যায়। এখন নিজের অজান্তে তাদের প্রতিনিধি হয়ে গেছি যাদের কাছে "আমার প্রিয় শিক্ষক" কুড়ি নম্বরের রচনা মাত্র। নম্বর পাওয়ার জন‍্য ঢালাও প্রশংসাসূচক বাক‍্যের ছড়াছড়ি। ডায়েরিয়া হলে‌ও লোকে এত ছড়ায় না! তারপর আপনি মৃদু হেসে কানমলা দেবেন। বলবেন এঁচড়ে-পাকা হয়েছিস। কী করবো বলুন, পাকা কাঁঠাল হয়ে গন্ধ ছড়াতে পারলাম না। গানে নামমাত্র পিরিতির কাঁঠালের আঠা হয়ে থাকলাম। তাও সরষের তেল দিয়ে ঘষলে উঠে যাবে। ক্ষমা করবেন স‍্যার, নিয়তি সিলি পয়েন্টে দাঁড় করিয়েছে আর আপনাকে বানিয়েছে আম্পায়ার, কোন দিকে যাবো, যাবেন...

 গদ্যকার সোমনাথ বেনিয়া
            নিমতা, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ                               




















ছয়  নম্বর ছড়ি

তখন  গৌরব সবেমাত্র নাইন থেকে টেনের ক্লাসেরোলকলের খাতায় নাম লিখিয়েছে।ভূবনপাড়া বয়েজ হাইস্কুল।নাইনটেনের অঙ্ক ক্লাস নেওয়া অম্লান বাবুর নামে ছাত্রমহল থরহরিকম্প। তাঁর বিখ্যাত সরু লিকলিকে ৬ নম্বর লেখা ছড়ির চপেটাঘাতের অলংকরণের কুখ্যাতিতে সকলে সজাগ। অন্য কোন ক্লাসের পড়ায় আগ্রহের গতিতে কিছুটা রাশ টানলেও অম্লান বাবুর ক্লাসে তার নিজের স্বরধ্বনি ছাড়া অন্য কারোর ব্যঞ্জনধ্বনি তো দূরের কথা স্বরধ্বনির আলপিন ও খুঁজে পাওয়া যেত না। শুধু মাঝে মাঝে সপাট সপাট শব্দ, অম্লান বাবুর বজ্রনিনাদ কণ্ঠস্বর ,আর আনুনাসিক ধ্বনির মৃদু আওয়াজ এর সমস্বর। বলার অপেক্ষা রাখে না এগুলোর সব কৃতিত্ব সেই বিখ্যাত ছয় নম্বরের ছড়ির।

বেলা বারোটা দশ ক্লাস শুরু হতে আরো পাঁচ মিনিট। পেটের ভেতর গুড়গুড় ঢাক বাজছে সঙ্গে ভয়ের চোরাস্রোত। সকাল থেকে পেটে জল মুড়ি ছাড়া আর কিছু পড়েনি। পেটের ভিতর খিদের মাঠে ভয়ের ঝড় আরো তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছিল গৌরবকে। অংকের বই টার দিকে তাকিয়ে দুবার ঢোঁক গিলল গৌরব। সামনে বিকাশবাবু পলাশীর যুদ্ধ পড়াচ্ছেন। নিজেকে সিরাজদৌলা ভাববার চেষ্টা করলো একবার। মনে সাহস নিয়ে ভাবল অংকর পাতাগুলো ইংরেজ। যুদ্ধে প্রাঙ্গণে জিততে তাকে হবেই। ঢং ঢং করে ঘন্টা পড়ল তিনবার। গৌরব জিভটা টেনে ঢোঁক গিলল আরো একবার। এই নিয়ে দশবার ঢোঁক গেলার পরেই মনে হল জিভটা ক্রমশ শুকিয়ে আসছে আর চেষ্টা করলেও কিছু ই গলাধঃকরণ করতে পারবে না। আজ ছ নম্বর ছড়ির আঁকিবুকি তার পিঠেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। দোষটাতো তার নয়। বাবার হার্টের অসুখ ধরা পড়ার জন্য মাসে মাসে কর্পোরেশনের জল খরচের মত টাকা-পয়সা বেরিয়ে যাচ্ছে। গতকাল একশো টাকা নিয়ে বাজারে গেল। বাবার ওষুধেই বেরিয়ে গেল ষাট টাকা ।বাকি চল্লিশ টাকা ডিম আলু নিয়ে হাতে পড়ে থাকল সাত টাকা। সাত টাকায়  তো খাতা কেনা যায় না ।তাই অম্লান স্যারের দেওয়া হোম ওয়ার্ক এর অংক গুলো বইয়ের শেষের পাতাতেই করে ফেলেছে। পল্টু দার দোকানে তখন অনেক ভিড় সবার সামনে ধারে জিনিস নিয়ে আসতে ভয় লাগে ,লজ্জা লাগে। আজ সম্ভব হলে দুপুরের দিকে দোকান ফাঁকা থাকলে দুটো খাতা নিয়ে আসবে দোকান থেকে ধারে ।মাস শেষ হতে আর দুদিন। নতুন  মাস পড়লেই মায়ের কাছে হাত পাততে কিছুটা হলেও অস্বস্তি কম হবে ।দারিদ্রতা এমন জিনিস গৌরব টের পেয়েছে অংকের হিসাব শেখায় সবার আগে ।অভাব শেখায় মাসের প্রত্যেকদিন কিভাবে চলতে হয়  দশমিক বসিয়ে আর কিভাবে বিয়োগ করে অংক সমাধান করতে হয়।

বাঁ দিকে সরু শাখানদী যাবার মত সোজা শিঁথি কাটা পরিপাটি করে বিছানো চুল। ছোট কপাল অসম্ভব পাওয়ারের চশমা বয়স পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই। চোখ দুটো অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত এবং দৃঢ়,— কঠোর বললেও কম বলা হয়। ক্লাসে ঢুকেই অম্লান বাবু হাঁক ছাড়লেন," পিন ড্রপ সাইলেন্ট একটা আওয়াজ পেলেই গোটা ক্লাস কে নিল ডাউন দেবো!"
গৌরব মাথা নিচু করে ভাবল স্যারের কি জন্মানোর সময় ডাবর মধু আবিষ্কার হয়নি নাকি নিম ডাল মুখে গুঁজে দিয়েছিল কেউ ভুল করে। বয়সটা কম হলেও স‍্যার যেন নিজেই আর্য ভট্টর নব সংস্করণ।রোলকল শেষ হতেই অম্লান স্যার বললেন," ক্লাসের হোম ওয়ার্ক বের  করে জমা দে সবাই ।প্রথম  বেঞ্চের ডান দিক থেকে শুরু কর।
গৌরব দেখল ভগবান তার প্রতি আজ সত্যিই বিরূপ।আর্যভট্ট এর ছ নম্বর ছড়ি কপালে নাচছে। কারণ প্রথম বেঞ্চের ডান দিক থেকে তিন নম্বরে ও বসে আছে। আচ্ছা ছয় নম্বর কে তিন নম্বর দিয়ে ভাগ করলে থাকে দুই,  যোগ করলে নয়, বিয়োগ করলে তিন আর গুন করলে আঠেরো ।ওরে বাবা কোনটা বেছে নেবে কে জানে! রাজীব ঋষিকেশ এর পর এলো গৌরবের পালা। অংক বইটা নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো সে।
অম্লান বাবু হুংকার দিলেন," কিরে অমন ভেজা বিড়ালের মত দাঁড়িয়ে আছিস যে বড়! বাংলা ভাষা ভুলে গেছিস নাকি ?খাতা টা বের কর!"
" নেই স্যার' গোটা ক্লাসে যেন ভূমিকম্প হল
" নেই মানে ?ইয়ার্কি নাকি !বাতাসে করে ছিলিস হোম ওয়ার্ক?"
" মানে স্যার বইয়ের শেষের পাতায় করেছি খাতায় পাতা ছিলনা।"
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন অম্লান বাবু," নিজেকে আর্য ভট্ট ভাবছিস না পিথাগরাস! বইয়ে লিখে সূত্র আবিষ্কার করতে চাইছিস নাকি! হতচ্ছাড়া! নিয়ে আয় বলছি! বইয়ে লিখেছে গুণধর!"
গৌরব মনে মনে ভাবল একবার বলে ফেলে,'স্যার আপনাকেই তো আর্যভট্ট এর মত মনে হয়!" কিন্তু জ্বল জ্বল করা ছড়ি দেখে সেই দুঃসাহস আপাতত সংবরণ করে  সামনে এগিয়ে এলো। অম্লান বাবু বইয়ের পাতা খুলে অগ্নি শর্মা হয়ে ছয় নম্বর ছড়ির সদ্ব্যবহার করতে শুরু করলেন। গৌরব অধোবদনে মুখ লাল করে হজম করা ছাড়া অন্য কোন উপায় সামনে দেখলোনা। তিনবার মারার পর বললেন,' বল কেন বই নষ্ট করছিস !উত্তর দিবি চুপ করে থাকবি না!"
গৌরব তখন নিশ্চুপ হয়ে ভাবছিল স্যার তাহলে বিয়োগ টাই করলেন। কোন উত্তর না পেয়ে উত্তেজনা আর রাগের পারদ চলতে থাকে অম্লান বাবুর। অবশেষে অম্লান বাবু সরু লিকলিকে কঞ্চির যথোপযুক্ত সদ্ব্যবহার করে ক্লাস থেকে গৌরবকে বের করে দিলেন। গৌরব তখন আবিষ্কার করল যোগ বিয়োগ ভাগ নয় অন্তত গুণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন স‍্যার।

(২)

ঘটনার পর দু দিন কেটে গেলেও গৌরবকে দেখতে পেলেন না অম্লান বাবু। সেদিন ছেলেটাকে একটু বেশি শাস্তি দেওয়া হয়ে গেছে ভেবে ক্লাস নেওয়ার পর রাজীবকে ধরলেন অম্লান বাবু," ওইযে ফর্সা মতো রোগা করে ছেলেটি ক্লাসে আসছে না কেন রে!"
রাজিব উত্তরে গলায় জোর এনে বলল,"গৌরব স্যার?ওর বাবা মারা গেছে তো গত পরশু!"
অম্লান বাবু হজম করতে একটু সময় লাগালেন," মানে! কি হয়েছিল?"
" স্যার ওর বাবা অনেকদিন ধরে হার্টের অসুখে ভুগছিল। খুব গরীব তো হসপিটালে দিতে পারেনি বলে পরশু  রাতে মারা গেছে!"
অম্লান বাবুর বুকের ভেতরের শক্ত পাহাড়টায় যেন কেউ সজোরে আঘাত করলো। অজস্র অশ্রুবিন্দু ঝর্নার রূপ ধরে বেরিয়ে তিরস্কার করতে চাইল যেন। অম্লান বাবু ক্লাসে পড়িয়ে গেলেন যন্ত্রের মতো। আজ আর কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। টেবিলের উপর রাখা ছয় নম্বর ছড়ির উপর পড়ন্ত রোদে আলোকপাত যেন পরিহাস করছে প্রতিমুহূর্তে।
ক্লাস শেষ করেই শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে গৌরবের ঠিকানা খুঁজে চলে এলেন টিনের চালা দেওয়া ছিটে বেড়ার  ঘরে। গৌরব তখন মায়ের কাছে বসে ক্লান্ত চোখে উঠানের একপাশে রাখা বাবার ফেলে যাওয়া নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধানো বহু জর্জরিত খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টিতে।
'গৌরব!'
রাশভারী গলা ভাবনায় ছন্দপতন ঘটালো। গৌরব চোখ তুলে তাকালো ।সামনে আর্য ভট্ট! মুখ তুলে বললো," স্যার আপনি?'
অম্লান বাবুকে দেখে গৌরবের মা কিছুটা হতভম্ব। একটা মোড়া এগিয়ে দিলেন। অম্লান বাবু কিন্তু বসলেন না ।গৌরব মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো ।অম্লান বাবু এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে বললেন ,"শ্রাদ্ধশান্তি মিটলে আমার কাছে একবার দেখা করো গৌরব!"
'আচ্ছা স্যার'
অম্লান বাবু পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে গৌরবের হাতে ধরালেন। গৌরব কিছু বুঝতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
" এটা রাখো আর কিছু দরকার হলে অবশ্যই জানাবে আজ আসি।'
গৌরব নিচু হয়ে অম্লান বাবুর পায়ের ধুলো নিল। অম্লান বাবু অনুভব করলেন বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা গলার কাছে ধাক্কা মারছে।
" স্যার একটা কথা!"
অম্লান বাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন,' বলো!'
" স্যার সেদিন আমার খাতা কেনার জন্য টাকা ছিল না বলে বইয়ের শেষে অঙ্ক করে ফেলেছি আর কখনো এমন হবে না স্যার!"
অম্লান বাবু গৌরবকে অবাক করে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। "দেখা করিস সব মিটে গেলে, সেই ছয় নম্বর ছড়িটা আজই ভেঙে ফেলব দেখিস। শ্রাদ্ধের পরের দিন থেকে সকালে আমার কাছে গিয়ে অংক করবি। তারপর ওখান থেকে দু'জন দুমুঠো খেয়ে স্কুলে যাব,শুধু বইটা নিয়ে যাস বুঝলি?"
"কিন্তু স্যার আমি তো..."
মাইনে দিতে না পারার অক্ষমতার কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলোনা গৌরব।
" আবার আমার মুখে মুখে কথা!  ছয় নম্বর ছড়িটা রেখে দিতে হবে মনে হচ্ছে ।তোর পিঠেই ভাঙবো" অম্লান  বাবু বেশ কঠিন স্বরে বলে একবারও আর না পিছন ফিরে তাকিয়ে প্রস্থান করলেন।

(৩)

বাইরে প্রচন্ড গরম হলেও হসপিটালের ভিতরে মৃদুঠাণ্ডা। নির্মাল্য বসে আছে কলকাতার বিখ্যাত কার্ডিয়োলজিস্ট বিভাগের হসপিটালের রিসেপশনে। পাশে তার বৃদ্ধ জেঠু ।হার্টের অসুখ বাইপাস সার্জারি করতে হবে। অনেক কষ্ট করে এই ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেছে। একপ্রকার জোর করেই জেঠুকে নিয়ে এসেছে সে। আগে থেকে কিছু জানায়নি ।জানালে জেঠু কখনো আসতো না এত বড় হসপিটালে। গতবছর জেঠিমা মারণব্যাধি ক্যান্সারে বহুদিন ভুগে, যুদ্ধ করে গত হয়েছেন। জেঠুর নির্মাল্য ছাড়া আর কেউ নেই। নিঃসন্তান জেঠু নির্মাল্যকে সন্তানের মতোই ভরসা করে। তাই নির্মাল্য নিজের কাছেই নিয়ে এসে রেখেছে জেঠুকে যাদবপুরের ফ্ল্যাটে।
' জেঠু মনি জল খাবে?'
বৃদ্ধ তাকিয়ে বললেন ,'খাব? দে একটু ।'তারপর থেমে বললেন' হ্যাঁরে বাইপাস সার্জারি করতে অনেক খরচ? এখানে ফিজ ও তো অনেক বেশি বলছিলি  '
" আগে ডাক্তার তো দেখায় কি বলে দেখো!"
" কি যেন নাম বললি ডাক্তারের!"
ঠিক সেই সময়ে রিসেপশনে বসা মেয়েটি বলে,' আট নম্বর পেশেন্ট কে আছেন চলে আসুন!"
নির্মাল্য জেঠুকে ধরে নিয়ে আসে চেম্বারের ভেতর। তারপর ডাক্তারের উল্টো দিকে বসে জেঠুকে নিয়ে। বিখ্যাত কার্ডিয়লজিস্ট তখন প্রেসক্রিপশনের কাগজে মুখ নামিয়ে বললেন,' কি নাম পেশেন্ট এর"
" অম্লান মুখার্জি স্যার।"
উল্টো দিকে বসে থাকা ডাক্তারটি মুখ খুললেন এতক্ষণে। বহুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন চেনা মানুষটি কে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন তারপর এবং অম্লান মুখার্জির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন," স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?"
নির্মাল্য এতক্ষণ প্রত্যেকটা ঘটনার চমকে বিস্মিত হয়ে যাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে  বলল ,"জেঠুর ডিমনেশিয়া আছে ,আপনি চেনেন জেঠুকে ?হয়তো জেঠুর মনে নেই!"
" স্যারের ডিমনেশিয়া' হয়েছে? স্যার আমি গৌরব! চিনতে পেরেছেন? গৌরব রায়?" ঝুঁকে বসলেন কার্ডিয়লজিস্ট
আবার বলতে শুরু করলেন ডাক্তার ,"সেই যে  আপনি আমায় অংক শিখিয়েছিলেন, আপনার বাড়ি যেতাম একসাথে খেয়ে স্কুলে যেতাম? ভূবনপাড়া বয়েজ স্কুল! মাধ্যমিকের পর যখন মামার বাড়ি চলে গেলাম বাড়িটা বিক্রি করে আপনি বলেছিলেন জীবনের অংকে যেন কখনো হেরে না যাই। স্যার আমি গৌরব রায়! আপনার তৈরি করা ছাত্র! স্যার কখনো হারিনি  আমি !চিনতে পেরেছেন এবার? গতবছর বিলেতফেরত নামকরা ডাক্তার আমি!"
হাতদুটো ধরলেন অম্লান বাবুর গৌরব।
চোখ দুটো কি একটু চক চক করলো অম্লান বাবুর? বাইরে গোধূলি সন্ধ্যার আকাশে তারাদের স্টেশনে চেনা নক্ষত্রের  কাছে চলন্ত ট্রেন কি খুঁজে পেল গন্তব্যস্থল?
মাথাটা মৃদু নাড়ালেন অম্লান বাবু। তারপর বললেন," বাইপাস সার্জারি তে কী অনেক খরচ? সেরে যাবে তো? রাতে ঘুমোতে যে বড় কষ্ট!"
গৌরব স‍্যারের মাথাটা নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বলল," না সারলে আপনার ছয় নম্বর ছড়িটা এখনো আমার কাছে যত্নে রাখা আছে, মনে নেই স্যার? আমি ভাঙতে দিইনি আপনাকে ।ওটা না হয় আমার পিঠে তখন দু'টুকরো করবেন!"
তারপর নির্মাল্য বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন," ফিজটা আপনার কাছে রাখুন !কাল অপারেশনের জন্য এডমিট করিয়ে দিন, রিসেপশনে বলবেন আমার সাথে কথা বলে নিতে! আমি আজ যাওয়ার সময় কথা বলে নেব। "
অম্লান বাবু তখন বাইরে আঁধারী আকাশে তারাদের পাশে চলা এরোপ্লেনের দিকে ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আর গৌরব ভাবছে এতদিনে ছয় নম্বর ছড়ির  উদ্দেশ্য সাফল‍্যমন্ডিত করার সময় এসেছে। এক বাবাকে হারিয়ে আরেক পিতৃতুল্য মাস্টার মশাই কে ফিরিয়ে আনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার সময় আগত। এই কঠিন পরীক্ষায় যেন সফল হয় সে!।।

সাহিত্যিক সৌমী গুপ্ত
১৬২, রাইফেল ক্লাব রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ























বেস্ট টিচার

"বাবা, তোমার কোন সাবজেক্টটা সবচেয়ে ভালো লাগতো? " মেয়ে পদ্মার প্রশ্নে অঞ্জন একটু হেসে বললেন জীবন বিজ্ঞান। পদ্মা একটা কে.জি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবার কাছে পড়তে বসে তার হাজারো প্রশ্ন। অঞ্জন হাসি মুখে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। "বাবা, তুমি কখনো বকা খেয়েছ? কখনো হেড-ডাউন হয়েছ? জানোতো সেদিন আমি পায়েলের সঙ্গে চুপি চুপি গল্প করছিলাম, আর ম্যাথ স্যার আমাকে হেড-ডাউন করে দিয়েছে। " মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায় পদ্মার। অঞ্জন হেসে বলেন, " তাই নাকি, তবে আর কখনো ক্লাসে গল্প করো না। "হঠাৎ অঞ্জনের চোখে ভেসে ওঠে ছোট বেলার সেই দিনটার কথা। 
ছোট্ট অঞ্জন তখন ক্লাস এইটে পড়ে। পড়াশুনো একেবারেই করে না। রোজ মায়ের পিটুনি আর বাবার বকাবকিই সার। যদিও ফেল করেনি কখনো। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে শ্যাম দাস আর টাকির সঙ্গে গল্প করেই কেটে যেত, পড়া শোনা আর হত না। কিন্তু সেদিন হঠাৎ করেই জীবন বিজ্ঞান ক্লাসে পার্থ স্যারের বদলে এলেন মাইতি স্যার। ভাজক কলা পড়ানো শুরু করলেন। ব্লাকবোর্ডে ছবি আঁকছিলেন। অঞ্জন যথারীতি গল্পে মশগুল হয়ে পড়লো। হঠাৎ স্যার পিছন ফিরে তাকেই ডাকলেন, " এদিকে উঠে এস তো তুমি। নাম কি তোমার? "                                  বোর্ডের কাছে এল অঞ্জন। ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছিল সেদিন। কিন্তু অবাক হয়ে গেল, যখন স্যার তাকে কিছু না বলে, একটা জীবন বিজ্ঞান বই তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "তুমি একটু ভাজক কলাটা শুরু থেকে রিডিং পড়ে যাও তো।"                            পা কাঁপছিল তখন অঞ্জনের। এরকম শাস্তি সে কোনদিন পায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেশ ভালো করেই রিডিং পড়লো। তার পড়া হয়ে গেলে স্যার তাকে বোর্ডের ছবিটাতে ছড়ি দিয়ে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিলেন। আর এর পরেই অপেক্ষা করছিল সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা। স্যার এবার সমস্ত ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমরা তো খুব ভালো স্টুডেন্ট! এতক্ষণ খুব সুন্দর মনোযোগ দিয়ে শুনলে সব কিছু। কিন্তু দেখ, আমি এত ভালো বোঝাতে পারতাম না, যদি না অঞ্জন এত ভালো করে রিডিংটা পড়তো। তোমাদের আজকের ক্লাসের ক্রেডিট আমি অঞ্জনকে দিলাম। ওর জন্য একবার সবাই হাততালি দাও তো, তবে একটু আস্তে। "স্যারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্লাস সেদিন ফেটে পড়েছিল হাততালিতে। আর অঞ্জন। তার দুচোখ  থেকে গড়িয়ে নেমেছিল আনন্দ। তারপর আমূল বদলে গেল অঞ্জন। পাড়ার মাঠে নিখোঁজ হয়ে পড়ার টেবিলেই কেটে গেল বাকি সময়। আর স্কুলে বি সেকশন থেকে মাঝে মাঝেই চলে যেত এ সেকশনে মাইতি স্যারের ক্লাস করতে। 

"বাবা, তোমার বেস্ট টিচার কে ছিল? বলনা, চুপ করে আছ কেন? বলনা? "পদ্মা বায়না জুড়েছে, অঞ্জন খেয়াল করেননি, স্মৃতিতে ডুবে ছিলেন। একটু হেসে বললেন, "আমার বেস্ট টিচার! তাকে তুমি চিনবে না মা। " পদ্মা নাছোড়, "বলো না, বলো না, বাবা। 
"অঞ্জন মেয়ের মাথায় একটা হাত রেখে বললেন, " আমার বেস্ট টিচার ছিলেন শ্রী নিতাই মাইতি, আমরা ওনাকে ডাকতাম মাইতি স্যার বলে। " 
---কি গো বেরোবে না আজ?  
চম্পা ঘরে ঢুকতেই পদ্মা লাফিয়ে মার কোলে, "জানোতো মা বাবার ও বেস্ট টিচার ছিল!মাইতি স্যার।"
মেয়েকে একটু আদর করে চম্পা বলে, " ন'টা বাজে তো, স্কুলের দেরি হয়ে যাবে যে!" নাহ, আজ আর স্কুলে যাবো না। আজ আমরা সবাই একটা মন্দিরে যাবো। 
--মন্দিরে? সে কি, কোন মন্দিরে? কই আগে তো বলোনি! চম্পা অবাক হয়। 
অঞ্জন একটু হেসে বলে, "এই তো এখুনি পদ্মা আমাকে  মনে করালো, সেই ঠাকুরের কথা, চল আজ আমার ঈশ্বর কে দেখে আসি।"
অঞ্জন মনে মনে একবার মাইতি স্যার কে প্রণাম করে নেয়। 

     সাহিত্যিক অনিন্দ্য পাল               জাফরপুর, চম্পাহাটি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা 





















সাপলুডো 

সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে একানব্বই,---
একানব্বই থেকে দু দুটো সাপের মুখ এড়িয়ে কিছুতেই যাওয়া হয় না একশ'র দরজায়---
দরজার ওপারে উন্মুক্ত নীল আকাশ,
জীবনের নৈসর্গিক চিত্র।---
হঠাৎ মনে হয়---
বিরানব্বইয়ের সাপটা শীতঘুমে আচ্ছন্ন,
তাই টের পায়নি।
কিন্তু, তিন পা এগোতেই চোখে পড়ে তক্ষক---
তক্ষক জানে--
আমি পরীক্ষিত---
ছিয়ানব্বই থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে সাত এ।

এভাবেই সারা জীবন উত্থান পতনের এই সাপলুডোয়,
কিছুতেই একশ'র দরজা পেরিয়ে বুক ভ'রে শ্বাস নিতে পারি না,পরম নিশ্চিন্তে...

  কবি সমাজ বসু 
 মিলন পার্ক, গড়িয়া, কলকাতা






















ফিনিক্স পাখির গল্প

কোলকাতার সকালগুলো অন্য বেলার তুলনায় কেমন যেন আলাদা। রাত্রির নিয়ন আলো গুলো নিভে যেতেই ভোরের আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে  পড়ে ট্রাম লাইন এর উপর। ল্যাম্পপোস্টের কালো তারে দোল খেতে খেতে দোয়েল রানীর চোখে শহর জেগে ওঠে। ট্রাম লাইন এর পাশে হলুদ স্কুল বাস গুলো খাঁচাবন্দী ভবিষ্যতকে নিয়ে এগিয়ে চলে। সাফসুতরো হয় ঝাড়ু আর ঝাড়ুদার পাখির দৌলতে কালো পিচের রাস্তা। গনগনে রোদ্দুর আর থমথমে আকাশ নিজেকে উপুড় করে দেয় উঁচু প্রাসাদ থেকে চিলেকোঠার উপর। মাথার উপর অনেক উঁচুতে উড়ে যায় ধূসর চিল— অনেকটা ফিনিক্স পাখির মত। ফিনিক্স —ধূসরতার সাথে দগ্ধ হয়ে যাওয়া  পুনর্জন্ম নাকি আরো কিছু! সম্পর্কের সমীকরণ এর মৃত্যু নাকি পুনর্জন্ম শহর ঠিক করতে পারেনা দুটোর মধ্যে অমিল কোথায়?

(১)

লাল লেদারের ব্যাগটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে নীহারিকার। গড়িয়াহাটের চার মাথার মোড়ে ঠিক ট্রেডার্স  অ্যাসেম্বলির নিচে বসা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দরদাম নিয়ে টানাটানি করতে করতে বারবার বাঁ হাতের কব্জি উল্টে সময়টা কতটা তাড়া লাগাল দেখে নিচ্ছিল নীহারিকা। যমে মানুষে টানাটানি পর নীহারিকা শেষে আড়াইশো দামে জিতে গেল। লাল কুর্তির সাথে  লাল লেদারের মত ফোমের ব্যাগ খারাপ লাগবে না নিজেকে। মনে মনে একবার নিজেকে ঝালিয়ে নিল। কাঁধে ঝোলানো কালো স্লিঙে কেউ সমানে পিং করে যাচ্ছে। সময় নেই বাবা,  তিন্নির ছুটি ঠিক এগারোটায়। সকাল থেকে ঘোড়দৌড়ের মত দম না ফেলে ছুটে এসেছে টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া হাট। মাঝে মাঝে ভাবে কেন এত দূরের স্কুলের দিয়েছে তিন্নিকে নীহারিকা। অনুভব অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে দিন গড়িয়ে রাত পর্যন্ত। নিজেকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার ফুরসত কবেই বা পেয়েছে সে। এই টুকটাক বন্ধুবান্ধব গড়িয়াহাট মোড় উইকেন্ড শেষে বরের সাথে কোন শপিংমলে ঢুঁ মারা এর বাইরে যে কোন এক সময় নিজের জগৎ ছিল তা যেন জোরালো ইরেজার দিয়ে কেউ মুছে দিয়েছে।
একটা কালো প্লাস্টিক এ লাল ব্যাগটা ঢুকিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে হন হন করে হাঁটা লাগাল নীহারিকা। বাতাসে প্রচন্ড আর্দ্রতা, ঘামে সপসপ করছে তার সালোয়ারের পিছনটা। রুমাল দিয়ে কপাল থেকে নাকে গড়িয়ে আসা ঘামটা মুছে নিলো নীহারিকা। হাঁটতে হাঁটতে একবার আকাশের দিকে তাকালো সে। আজ কি বৃষ্টি হতে পারে? বৃষ্টি পড়লে অনেক অসুবিধা ছাতাটা সঙ্গে করে আনে নি সে। সুবিধা অবশ্য একটা আছে —বৃষ্টিতে ভিজলে কান্না লুকানো যায় কোন কষ্ট না করেই, শেষ যেন কবে বৃষ্টিতে ভিজে কেঁদেছিল নীহারিকা!
"এইযে নীহারিকা কতক্ষণ ধরে ফোন করছি  তোকে, হনহন করে হাঁটছিস" সুমিতা দৌড়ে এসে ধরে ফেলে তিন্নিদের স্কুল ক্যাম্পাসে
"তাই নাকি টের পাইনি তো?"
"কোন জগতে থাকিস রে!"
"আরে এগারোটা বেজে গেছে তাড়ায় ছিলাম তাই হয়তো খেয়াল করিনি।"
"চল চল ওদিকে আবার ছাড়তে শুরু করলে দুটোতে আমাদের দেখতে না পেলে কাঁদতে শুরু করবে ,বাই দ্যা ওয়ে তোরা পরশু বেরোচ্ছিস তো?"
"হ্যাঁ"
"গোছগাছ কমপ্লিট?"
"নারে সব গোছানো হয়নি এখনো"
"তোরা শুধু ডুয়ার্সে ঘুরবি?"
"হ্যাঁ ছুটি নেই তো অনুভব এর ,মাঝে মাত্র তিনটে দিন, তিন্নি তো খুব বায়না করছে বলছে আরো দুদিন থাকবো!"
"সেই তোরা তো তাও বেরোচ্ছিস, আমি যে কতদিন থেকে কুমড়োর ঘ্যাঁট আর মাছের ঝোলে হাবুডুবু খাচ্ছি সেখান থেকে বেরোনোর কোন স্কোপ নেই।"
"হাহাহা ভাল বলেছিস!"
পাঁচ বছরের  তিন্নিকে নিয়ে যখন নীহারিকা মেইন রাস্তায় এসে দাড়ালো তখন আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, নীহারিকা মহা মুশকিলে পড়লো,ওলা বা উবার বুক করতেই হবে। মাঝরাস্তায় অটোতে বৃষ্টিতে ভিজলে দুদিন পর ঘুরতে যাওয়া পুরো বানচাল হয়ে যাবে। তিন্নিটার বড় ঠান্ডা লাগার ধাত। ওলা বুক করার জন্য ফোনটা হাতে নিল নীহারিকা। ফোনের পাসওয়ার্ড দিতে অতীতের চেপে রাখা ভুলে যাওয়া পাসওয়ার্ড চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো। রুপায়ন পরপর মেসেজ করেছে বেশ কয়েকটা। নীহারিকা ঢোক গেলে দু-একবার। হৃদপিন্ডের রক্ত যেন খরস্রোতা নদী। অলিন্দ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। নীহারিকার হাত দুটো ঘামতে শুরু করলো ভীষণ। রুপায়ন নামটা তো ভুলেই গেছিল এতদিন ,কেন এতদিন পর চোখের সামনে যত্ন করে মোছা অতীত এসে দাঁড়ালো সামনে। তিন্নি পাশ থেকে তাড়া লাগায় ,"মা বৃষ্টি পড়ছে তো!"
নীহারিকা নির্বাক হয়ে নিজের মধ্যে হারিয়ে গেছে যেন ।কালো রাস্তার ধারে ছাতিম গাছের তলায় কালো মেঘের যন্ত্রণা উপুড় করে দিল মুষলধারা। নীহারিকার চোখ বাষ্পীভূত হয়ে উঠলো, শেষ‌ যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেদিন ওএমনি করে   কান্না লুকিয়ে ছিল নীহারিকা।

(২)

ঠাম্মার ঘরে ঢুকলেই মিষ্টি জর্দা পানের গন্ধ পেতো নীহারিকা। উত্তর কলকাতার বানতলা লেন ,৭৯/৬। পুরনো সুড়কি  দেওয়া জানালা ছাদ দেওয়াল। ঘেঁষাঘেঁষি ইতিহাসকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা কালচে দেওয়ালের বাড়ি। ছাদ থেকে নিচে সরু রাস্তার ওপর সিমেন্টের ফাটল আর গর্ত গুলো স্পষ্ট বোঝা যেত। দুদিনের বেশি বৃষ্টি পড়লে শ্যাওলা পড়া রাস্তায় পা টিপে টিপে চলতে গিয়ে ছাদের কার্নিশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নীহারিকার কাঁধে এসে পড়ে শিহরন জাগাতো। উপর দিকে তাকালেই দেখা যেত ছোট্ট বারান্দায় ঠাম্মা বদ্রি পাখি দুটোকে খাবার দিচ্ছে। পুরোপুরি টা অবশ্য দেখা যেত না শুধু পাকা কাঁচা  এলোচুলের ডগা আর সাদা সরু পাড় দেওয়া আঁচলের কিয়দংশ। বাবাকে হারানোর পর নীহারিকা ছিল ঠাম্মার বড় কোলঘেঁষা। কলেজ থেকে ফিরে ক্লান্ত মাথায় ঠাম্মা বিলি কেটে দিত আর পাশের বাড়ির চিনি এসে গল্প জুড়তো আধো আধো গলায়। নীহারিকার চোখ জুড়িয়ে আসত।কত রকমের গল্প বলতো ঠাম্মা। একটা বাঁধানো নীল মলাটের খাতা থেকে পড়ে পড়ে গল্প শোনাত ঠাম্মা। রাজপুত্র রাজকন্যা পুরান সব রকমের। আর একা থাকলে কল্লোল সেন নামক লেখক এর উপন্যাস পড়তো। নীহারিকা একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল," ঠাম্মু এত ভাল লেখক এর লেখা থাকতে তুমি কল্লোল সেনের লেখা কেন পড়ো?"
ঠাম্মা জর্দা মাখানো গন্ধে নিবিড় করে হেসে বলতো "নিজেকে খুঁজে পাই রে"
"সেতো রবি ঠাকুর শরৎবাবু কতজন আছেন নিজেকে খোঁজার জন্য কল্লোল সেন দরকার পড়ল কেন?"
সবুজ জানালার দরজা ফাঁক করে পানের  পিক ফেলে ঠাম্মা আবার উত্তর দিত ,"সবাই কি মনের ভাষা খুঁজতে পারে সবকিছুর মধ্যে?"
নীহারিকা বুঝতো না শুধু ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলতো ,"রূপায়ন ও তাই বলে জানো, রুপায়ন নাকি কি সব হাবিজাবি লেখে আর লেখার সময় আমাকে খুঁজে পায়।"
"তাই বুঝি, তোরা কিন্তু কখনো গল্প হোসনা, জীবন ই ভাল জানিস দিদি ভাই!"
"সে আবার কি রকম সবার জীবনেই তো গল্প থাকে, তোমার আমার সবার জীবন ।তাহলে গল্প হবো না কেন?"
"ফিনিক্স পাখির গল্প জানিস দিদি ভাই !গল্প হতে গেলে পুড়তে হয় ,ক্ষয় হতে হয় ,আবার নতুন জন্ম নিতে হয় ।নতুন করে গল্প শেষে পুনর্জন্ম হলে তুই আর তুই থাকবি না দিদিভাই তুই তখন অন্য মানুষ।"
"কি যে বলো তুমি ঠাম্মু কিচ্ছু বুঝিনা!"
সুরো বালা দেবী তখন চশমা খুলে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ এর কোন মুছে বলত," ঘুমিয়ে পড় দিদিভাই ,ক্লান্ত বেলা যখন আসবে তখন বুঝবি আমরা সবাই ফিনিক্স পাখি।"
নীহারিকা জানালার ফাঁক থেকে দেখে তিন-চারটে সাদা কালো লাল ঘুড়ির পাশে একটা বড় চিল উড়ে  যায়— ফিনিক্স পাখি কি ওইরকম দেখতে? আচ্ছা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেলে কি করে আবার জন্ম নেয়া যায় ?চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসে নীহারিকার।

(৩)

কলেজ পড়াকালীন রূপায়ন নীহারিকার খুব কাছের ও প্রানের বন্ধু ওই যেমন জলের উপর জল ছবি ঠিক তেমন। নীহারিকা অবশ্য ভালোবাসতো প্রথম থেকে। তাই যেদিন তিন্নিকে নিয়ে যখন বৃষ্টি তে আর কান্নায় ভিজে ছিল তখন কলেজে পড়া রূপায়ণ কে প্রথম মনে পড়েছিল নীহারিকার। ছোট ছোট তিনটে মেসেজ উলটপালট করে দিয়েছিল সামনে চলার বাঁকগুলো। সম্বিৎ ফিরে ছিল সুমিতার ঝাঁকুনিতে। ততক্ষণে কাক ভেজা হয়ে গেছিল নীহারিকা। সুমিতা হাত টেনে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে নিয়েছিল নীহারীকা আর তিন্নিকে। বাড়ি ফিরে কোন কাজে মন লাগছিল না তার ।শুধু মানুষকে অভিনয় তো করতে হয়। দুপুরে তিন্নি ঘুমিয়ে যাবার পর মেসেঞ্জার খুলে বারবার পড়েছিল তিনটে মেসেজ—'কেমন আছো মেঘ? চিনতে পারছো? ভুলে যাও নি তো?'
স্ত্রীর গালের কাছে গাল ঠেকানো রূপায়নের প্রোফাইল পিকচার টা ছোট হয়ে গিয়েছিল নীহারিকার চোখে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন পোড়া ঘায়ের উপর তাড়িয়ে তাড়িয়ে  সময় নিয়ে চাবুক মারছে অবিরত। টাইপিং অপশনটা খুলেও অনেক না বলা কথার মধ্যে কথা হারিয়ে যায় তার। শুধু ডিলিট অপশন টা সায় দেয় আপাদমস্তক সমস্ত কনভারসেশন মুছে ফেলতে। তারপর মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়েছিল রূপায়নের সাথে কাটানো মুহূর্ত, খুনসুটি, পড়ন্ত বিকেল,  রোদের গন্ধ ,চেনা পুরুষের ঘ্রান। তবুও  তো অস্বীকার করেছিল রূপায়ণ। যখন মরিয়া হয়ে নীহারিকা বলেছিল," যাস না রূপায়ণ তুই চলে গেলে আমি মরে যাব"
রুপায়ন অত্যন্ত কঠিন স্বরে উত্তর দিয়েছিল ,"বাঁধতে যাস না আমায়, আমি সংসার করার মানুষ নই রে ,কিছু কিছু মানুষ প্রেম করার জন্য জন্মায় ।তুই বাড়ির সম্বন্ধের সাথে বিয়ে করে ফেল ।আমার জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না।"
অবুঝ বালিকার মতো নীহারিকা খামচে ধরে ছিল কাঁধের সাদা শার্ট,"তুই তবে অভিনয় করে ছিলি? তুই নিজের পরিচিতি পেলি তখন অস্বীকার করছিস আমায়?"
"তোকে স্বীকার করব এমন ক্ষমতা আমার নেই, আর তোকে অস্বীকার করবো এমন সাহস আমার নেই। শুধু জানি আমার ভবঘুরে জীবনের সাথে তোকে জড়ালে তোর বিপদ বাড়বে, তোকে শান্তি দিতে পারব না।"
"আর এখন কি আমি শান্তি পাবো ?তোর সৃষ্টি নিয়ে তোর এত অহংকার?"
"কিসের সৃষ্টি দু'চারটে কবিতা গল্প লিখি তাই ?ধুস তুই অমন করে অনুভব এর যোগান না দিলে কেমন করে লিখতাম?"
"নাটক করছিস ?আসলে তুই আমাকে কোনদিন ভালোবাসিস নি!"
"না পাওয়াতেই ভালোবাসা থাকে রে, আমাকে আর জোর করিস না মেঘ!"
হিস হিস করে কাঁদতে কাঁদতে নীহারিকা উত্তর দিয়েছিল ,"ডাকিস না ওই নামে আর ,তুই তো কখনো শেষ অব্দি ডাকতে পারবি না আমাকে। চোখের সামনে অন্যের হয়ে যেতে দেখেও তোর সুখ।"
"সুখ নয়রে দুঃখ, দুঃখ থেকে সৃষ্টি হয় অনেক সৃষ্ট জানিস তো?বিনাশ থেকে যেমন করে শুরু হয়।"
ক্রুদ্ধ বিড়াল যেমন নরম মাটি আঁচড়ায় ঠিক তেমনি নীহারিকার ভেতরটা যেন কেউ আঁচড়ে দিয়েছিল ।কলেজ বিল্ডিং থেকে ক্যাম্পাসের রাস্তাটা শূন্য একাকী লেগেছিল নীহারিকার। বাবার জন্য ভীষণ কষ্ট হয়েছিল তখন আরো বুঝতে পেরেছিল মানুষের যখন কষ্ট হয় তখন ভালোবাসার গন্ধ খোঁজে মানুষ ,সুখে আনন্দে তো নিরাপত্তার প্রয়োজন হয় না যতটা প্রয়োজন হয় দুঃখে।
ঠিক যেমন নীহারিকার এখন কাঁদতে ইচ্ছে হলে যতক্ষণ খুশি ।নয় নয় করে অনুভব কে একটা ফোন করল,"কি করছো?"
ও প্রান্ত থেকে অনুভব একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ,'ঘুমাওনি?'
'না'
'কেন?'
"এমনি ভালো লাগছে না!'
"কেন কি হয়েছে?"
মানুষের যখন মনের মধ্যে বারুদ জমা হয় তখন একটা স্ফুলিঙ্গের প্রয়োজন হয় ঠিক যেমন অনুভব এর কি হয়েছে এইটুকু শব্দ কাজ করলো। নীহারিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। অনুভব ও প্রান্ত থেকে বোঝার চেষ্টা করল কি হয়েছে !সকাল থেকে তো ওয়েদার ঠিকই ছিল তাহলে অবশ্য তেমন পরিবর্তনের কারণ কি। তবু অনুভব কাঁদতে দিয়েছিল নীহারিকাকে মাঝে শুধু একবার জিজ্ঞাসা করেছিল," তিন্নির স্কুলে কিছু হয়েছে?"কারণ অনুভব জোর করতে পারেনা। নীহারিকা আর্দ্র গলায় বলেছিল ,"মাঝে মাঝে কেন এত কষ্ট হয় কিছু ভালো লাগে না!"
অনুভবের ক্লায়েন্ট তখন উল্টো দিকে বসে ফ্যালফ্যাল করে  তাকিয়ে ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে। অনুভব বোকার মত হেসে ও প্রান্তে থাকা নীহারিকাকে বুঝিয়েছিল," পরশুই তো বেরোচ্ছি ঘুরতে ,এখন বরং রেস্ট নাও ফিরে কথা বলছি।"
ফোনটা রেখে নীহারিকা তখন চোখ বুজেছিল অনিচ্ছাসত্ত্বেও। তিন্নির গায়ে পাতলা চাদরটা টেনে দিয়ে ভাবছিল আচ্ছা ভালোবাসা কি কাউকে দেওয়া যায় —একজনের ভালোবাসা অপরজনকে? ঠাম্মা বলতো সবাই নাকি ফিনিক্স পাখি সত্যি কি ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম হয়েছে রূপায়ণ কে ছেড়ে এসে !দমকা হাওয়ায় জানালার পাল্লা গুলো বন্ধ হয়ে যায় আওয়াজ করে!!

(৪)

মাঝের তিনটে দিন কেটেছে স্বপ্নের মত। পাহাড়ি বাঁক, রঙ্গীত নদী ,উপত্যকা, মেঘের স্পর্শ জঙ্গলের সোঁদা গন্ধ। তার মাঝে রুপায়ন কে যে মনে পড়েনি তা নয়। তবে মনে পড়লেও নীহারিকা মেনে নিয়েছে যা কোনদিন তার ছিল না তার জন্য আর পিছন ফিরে তাকাবে না সে। এক পুরুষের ভালোবাসা অন্য পুরুষকে দেওয়া যায় কিনা তার পরীক্ষা তুলনায় নামবে না ও। শুধু ঠাম্মাকে ফোন করে যখন কথা বলেছিল তখন মনটা অনেক হালকা হয়ে গেছিল। আজকাল কানে ভালো করে শুনতে পায় না বলে বেশিক্ষণ কথা বলা যায়না। তবুও এটা ওটা কথা বলে ঠাম্মা ঠিক বুঝেছিল নীহারিকার মন খারাপ। তাই ফোন রাখার আগে ঠাম্মা বলেছিল ,"ঘুরে এলে একবার বানতলা লেনে দেখা দিয়ে যাস অনেকদিন কড়ি বর্গার সংখ্যাগুলো আড়াআড়িভাবে গুনিস নি আঙ্গুল দিয়ে।"
ট্রেন ছাড়লো নটায়। এসি  থ্রি কামরার আপার বার্থ ও মিডল বার্থে জায়গা হয়েছে নীহারিকা অনুভবের। নীহারিকা তিন্নিকে নিয়ে শুয়ে পড়ল ওপরে। অনুভব এর উদ্দেশ্যে বলে," উল্টোদিকের আপার টা খালি আছে তুমি দেখো যদি ম্যানেজ করা যায়।"
"না না মালদা থেকে উঠবে মাঝরাতে ঝামেলা করলে মুশকিল!"
দুজন রাত্রের খাবার শেষ করে বিছানা করে শুয়ে পড়ে লাগেজগুলো চেইন দিয়ে বেঁধে  দেয় অনুভব।
ঘুমটা ঠিক আসে নি তখনো ,দোল দোল দুলুনি কামরায় নীহারিকার দু'চোখের পাতা এক হয় না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে  কিছুক্ষণ। রাত্রি গড়ায়। ট্রেন থামে কোন অজানা স্টেশনে। আবার বার্থ থেকে দেখতে পায়না নীহারিকা। কোন স্টেশন যাত্রী ওঠে। একজন সুঠাম লম্বা চাপ দাড়ি মোবাইলে খুঁজে টিকিট মিলিয়ে আবছা অন্ধকারে এগিয়ে আসে উল্টোদিকের  আপার বার্থে। নীহারিকার গোটা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়— রূপায়ণ!! বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে ঘুম উড়ে যায়! উল্টো দিকের মানুষটি ব্যাকপ্যাক রাখে মাথার কাছে। একটা লাইট জ্বালায়। ঘুরে তাকায় চোখাচোখি হয় নীহারিকার। শুধু চোখ বন্ধ করে নীহারিকা ,কোন কথা খুঁজে পায় না। চেনা গন্ধ পারফিউমের গন্ধের তলায় চাপা পড়ে ,তবুও মনে করায় সমস্ত অতীত। হাজার ওয়াটের আলোর ঘরে ঝাঁকে ঝাঁকে  ফিনিক্স  পাখি উড়ছে ,আলোর ঝলকানিতে পড়ছে আবার সৃষ্টি হচ্ছে ছাই পোড়া আগুনের ভেতর থেকে ।ছোট ছোট রংবেরঙের চিলের  মত ডানা, ঠোঁট সূচালো, দৃষ্টি প্রখর।
উল্টো দিকে শুয়ে পড়ে রূপায়ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে ওপারের দুটি চোখে। বহু যুগ পরে যেন মুক্ত খোঁজার চেষ্টা। পলক পড়ে না জীবন যেন থমকে যায়। তাকিয়ে থাকাও দুষ্কর না তাকালেও মনে পোড়ে দাবানলের আগুনে। নীহারিকা কান্না চাপতে পিছন ফিরে ঘুমায়। ফোঁপাতে থাকে ভ্যাপসা গন্ধের কম্বলে মুখ ডুবিয়ে। নিজের মনে বলে হা  ঈশ্বর তুমি কেন এত নিষ্ঠুর তুমি কেন এত অন্তর্যামী।
রুপায়ন আস্তে আস্তে নেমে আসে, নীহারিকার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলে," কাঁদিস  না মেঘ আমি আছি তোর সাথে!"
তড়িত্গতিতে তিন্নির পাশ থেকে উঠে বসে নীহারিকা। রাগে-ক্ষোভে আগুন চোখে তাকায় রূপায়নের দিকে," সিন করিস না প্লিজ লিভ"
রূপায়ণ নীরবে আবার শুয়ে পড়ে তাকিয়ে থাকে উল্টোদিকে সারারাত না ঘুমিয়েই।অথচ ডানপাশে একহাতে শুয়ে ঘুমনোর ভান করে পড়ে থাকে নীহারিকা।
সকালে শিয়ালদা স্টেশন ঢোকার আধঘন্টা আগে অনুভব তাড়া লাগায়। নীহারিকা বাথরুমের কাছে এসে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেয়। সারারাত না ঘুমিয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের মনি গুলো অসম্ভব ব্যথা করছে। পিছন ফিরতেই মুখোমুখি হয় রূপায়নের,"কখনো ঘুম থেকে উঠে দেখি নি তো তোকে আজ দেখলাম!'
নীহারিকা পাশ কাটাতে চায়।
"যোগাযোগ বন্ধ করতে চাস বরাবরের মত!'
নীহারিকা থামে সেটা তুই বন্ধ করে ছিলি বহুদিন আগে। দূরত্ব থেকে বন্ধ যোগাযোগ তার জন্য দায়ী কে?"
"যত খুশি আঘাত কর আমায়, শুধু প্লিজ যোগাযোগ রাখ তোকে আজ ও আমি...."
কথাটা শেষ করতে দেয় না নীহারিকা," বিয়ে করেছিস দেখলাম!"
রুপায়ন আমতা আমতা করে ",মা মারা গেল শেষ পর্যন্ত বিয়েটা করতেই হলো রে ,তুই তোর ফোন নম্বর দে ডিটেইলস কথা বলব।"
নীহারিকা হাসে অল্প ,"নতুন কোন খেলা না লেখা?'
রুপায়ন মরিয়া হয় ,"বিশ্বাস কর আমি আজও নিজেকে ক্ষমা করিনি ,অনুশোচনার চোরকাঁটা আমাকে যন্ত্রণা দেয় ,প্লিজ আচ্ছা তুই মেসেঞ্জারে যোগাযোগ রাখিস।"
নীহারিকা বিদ্রুপ করে বলে," সাহিত্য জগতের শ্রেষ্ঠ লেখক রুপায়ন সেন সে কিনা প্রাক্তন প্রেমিকার জন্য নিজেকে ক্ষমা করেনি, এসব নাটক আমাকে দেখাতে আসিস না।"
নীহারিকা ভারী কাঁচের দরজা টেনে চলে আসে তিনটে সারি পেরিয়ে অনুভব এর কাছে। শরীরের ভেতর কফিন দেওয়া মন দাফন নিয়ে পুড়তে  থাকে, পুড়ে ছাই ছাই হতে থাকে।

(৫)

মাঝে দুটো দিন জামাকাপড় কাচাকাচি, পরিষ্কার আলমারিতে তোলা এসব করতেই সময় পেরোয়। গরমের ছুটি পড়েছে। রুপায়ন এর উপর জমাট বাঁধা রাগটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয় ফেলে রাখা তপ্ত লোহার বেড়ীর মত। দু একটা কথা এগোয় মেসেন্জারে। ছোঁড়া ছোঁড়া, ভাসা ভাসা  কোনটা, কোনটা প্রত্যুত্তর'' না দিয়ে কোনটার উত্তর দিয়ে।
আজও দুপুরবেলা গনগনে রোদে ঘামতে ঘামতে রান্না ঘরের সমস্ত কাজ সামলে নীহারিকা এসি অন করে তিন্নিকে নিয়ে শুয়ে পড়েছিল। তিন্নি ঘুমিয়ে যায়। নীহারিকা অপেক্ষা করতে থাকে। পুরনো নীহারিকাকে নতুন নীহারিকা বাঁচিয়ে তুলতে চায়। রূপায়নের প্রোফাইল ঘাঁটে ।অপেক্ষার অবসান হয়।
'ঘুমোচ্ছিস?'
'না জেগে'
'কি ভাবছিলি?'
'কিছু না ভাবলেও অনেক কিছু ভাবা যায়!"
"যেমন কিছু না বলে অনেক কিছু বলা যায়!"
'না বলা কথা শোনা যায়!"
'থাক রুপায়ন পুরনো খেলায় মাতিস না ,কথায় কথা মিলিয়ে পরের কথা বুঝে নেওয়া ,না বলা কথা বলে দেওয়া এসব আর এগিয়ে নিয়ে গিয়ে লাভ কি।"
'ক্ষমা করিস নি আমায়?'
'না করিনি আমার জায়গায় তুই থাকলে ক্ষমা করতিস?"
'ভুলেও তো যাসনি?"
"ভুলে গেলে বেঁচে যেতাম ,বেঁচে আছি মরে গিয়েও!"
'এমন করে তুই বলতে পারিস, জানিস আমি লিখি পাঠকের জন্য আর তুই বলিস আমার জন্য তোর লেখা যেদিন লিখব সেদিন হবে সার্থক কলম!"
'তার জন্যই কি ফিরে আসা?'
"ফিরে এসেছি আদৌ?"
"না ফিরে আসিস নি মনে করাতে এসেছিস যে তুই চিরকাল আমাকে কষ্ট দিয়েছিস!"
'কষ্ট সহ্য করিস বলেই তো কষ্ট দিই মেঘ!"
"এতদিন পর আমায় এভাবে ডাকিস না তুই!"
"ডাকলেই কি আসতে পারা যায় তুই পেরেছিস কখনো?"
'তাহলে ডাকলি কেন?"
"অভ্যাসটা আবার পোক্ত করতে!"
"সেই ,অভ‍্যেসে কাউকে আমরা  ভালোবাসি আর কাউকে না বুঝে!"
নীহারিকা যেন সেই কলেজে পড়ার সদ‍্য প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া তরুণী হয়ে যায় মনে মনে। সংসারী পত্নী মাতা নীহারিকা ঘুমিয়ে পড়ে অবচেতনে। মনে-মনে আবিষ্কার করে পরিবর্তনটা নিজের জন্য করলে সুখ নেই অন্যের জন্য নিজের বিবর্তনে অনেক আনন্দ।
এলোচুলে আয়নার সামনে দাঁড়ায় নীহারিকা। উল্টোদিকে নিজের অবয়বকে রুপায়ন ভাবতে ইচ্ছে করে। অনুভব এর কথা মনে হয়। কি করছে ও !অন্যায় করছে না তো? অনুভব এর কাছে মৃত হয়ে রূপায়নের কাছে  জীবন্ত হয়ে ওঠা এ কোন সর্বনাশী খেলায় মেতেছে নীহারিকা।ঠাম্মার কথা মনে হয়। খয়ের জর্দা পানের গন্ধে মাখানো ঠাম্মার মুখের কখনো রাজপুত্রকে রাজকন্যার না পাওয়ার গল্পের কথা মনে হয়। আরো একবার বৃষ্টিতে ভিজতে   ইচ্ছে হয় নীহারিকার। মানুষ যখন মনের খোরাক চায় তখন পাপ-পুণ্যের বিচার করে না বহ্নিশিখার পরোয়া করো না। মনের খিদে মেটাতে সশরীরে আগুনে ঝাঁপ দিতেও পিছপা হয় না। নীহারিকা তেমনি সর্বনাশী খেলায় মেতে উঠল। সারাদিন অপেক্ষা করে একটা ফোনে র। সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা পেরিয়ে যায় ‌। দুদিকে দুটো সংসার দুজন মানুষ কাফনে ঢাকা দিয়ে নিজেরা চলতে থাকে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যহীনভাবে।
প্রতিমুহূর্তে নীহারিকার এটা ভেবে শান্তি হয় যে এই পৃথিবীতে কেউ আছে যে ওকে ওর মতো করে বোঝে। শরীর ছাড়িয়ে মনের খিদে মেটানোর কেউ আছে ভাবলে আজও শিহরণ জাগে তা র। আজ উত্তর কলকাতার এঁদো গলিতে পা টিপে টিপে রূপায়নের হাত ধরে কার্নিশের টুপ করে খসে পড়া জলে ঠোঁট ভেজাতে ইচ্ছে হয়। ঠোঁটের ভেতর চেনা ঠোঁটের বাসস্থান তৈরি করতে ইচ্ছে হয়। রুপায়ন এর উপর যতটা রাগ ছিল সবটা উগরে দিয়ে শান্তি হয়েছে ওর।
তাই যখন রুপায়ন বলেছিল ,"যত খুশি গাল দে আমায় আঘাত কর এগুলো আমার প্রাপ্য!"
নীহারিকা আরো অভিমানী সুরে বলেছিল," তুই তো বিয়েও করলি ,আমি কি দোষ করেছিলাম?"
'কখনো ভাবি নি রে বিয়ে করবো পরিস্থিতি মানুষকে শিকার বানায়!'খানিকটা থেমে গিয়ে রূপায়ণ ভীষণ আদুরে গলায় নীহারিকাকে শুধিয়েছিল ,"কখনো ছুঁতে ইচ্ছে করেনা আর ?"
নীহারিকা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল," নারে আসলে যেদিন অনুভব এর কাছে পুরোপুরিভাবে মেঘের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন শুধু আমি তোকে খুঁজে ছিলাম।"
'সেটাও সম্ভব?'
"তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালবাসিস কোনদিন তো এমনই হবার কথা, আসলে আদরের একটা গন্ধ থাকে, যেমনটা ভালোবাসার গন্ধ চেনায় নিজের মানুষকে, গন্ধ তো উবে যায় না শুধু মানুষটার পরিবর্তন হয়, এক গন্ধ দিয়ে আর একজন মানুষকে সারাজীবন অপরের মধ্যে খুঁজে বেড়ানো।  একজনের ভালোবাসা অপরজনকে দিয়ে নিজেকে মেরে ফেলা নিজের জন্ম দেওয়া। "
""নিজেকে জন্ম দেওয়া যায় কখনো?"
"আমাদের ভালোবাসা হলো ফিনিক্স পাখির মতো ফিনিক্স পাখির ইতিহাস জানিস তো আগুনে পুড়ে পুড়ে নতুন ভালোবাসার জন্ম হয়!"
"আরো বল মেঘ আরো বল আজ তুই বল আমি শুনি তোর কথায় আমার লেখা খুঁজে পাই,তুই তো একই আছিস মেঘ।"
"সবকিছুর পরিবর্তন হয় !নাকি পরিবর্তন করলে নিজেকে ফিরে পাওয়া যায়! তুই যেদিন ছেড়ে চলে গেলি আমায় সেদিন আমি বৃষ্টিতে আর কান্নায় একসাথে ভিজে ছিলাম অথচ দেখ বৃষ্টিতে ভেজার কোন পরিবর্তন হয়? শুধু বৃষ্টির মধ্যে নিজের অশ্রুকে মেশানো যায়, পরিবর্তনে আছে সুবিধাও আছে ,ক্ষয় ও আছে,সে তুই যেমন করে খুশি বৃষ্টি মাখ, ভেজাটা আল্টিমেট রেজাল্ট,এর কোন পরিবর্তন নেই।"
"এত যন্ত্রণা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলি তুই কি বেঁচেছিলি পাষাণ হয়ে!'
"নিজের অনুভব এর কষ্টগুলো ঝর্ণার মত পাহাড়ের চূড়ায় আটকে থাকে, প্রকাশ করলে অপরপক্ষের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয় কে জানে কিন্তু নিজের ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী!"
"অনুভবকে ভালোবাসিস না তুই?"
"বাসিতো একসাথে দুজনকে ভালোবাসা বারণ কোথাও? অভ্যাসের ভালোবাসা আর অভাবের ভালোবাসা! থাকতেই তো পারে কেন তুই ভালবাসিস না কুহেলি কে?"
"বাসি মেঘ খুব ভালোবাসি প্রতিনিয়ত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি ওকে ঠকাচ্ছি, আমি তোকে ঠকাচ্ছি অকারনে!"
"তাহলে কেন আসিস বারবার কষ্ট দিতে তোর চিরকাল ভালো লাগে!"
"তোকে কষ্ট দিতে গেলে মনে হয় এটা আমার অধিকার ,আর কুহেলিকে কষ্ট দিতে গেলে ভেতরটা ছারখার হয়ে যায়। ওকে আমার ওর মতো করেই আদর করতে ইচ্ছে করে বিশ্বাস কর। আমি কিন্তু দুজনকে কখনো গুলিয়ে ফেলি না প্রতিযোগী হিসেবে ও দেখিনা।'
প্রচণ্ড ঈর্ষার আগুন নীহারিকাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিল অনুভবকে আমি ভালোবাসি রুপায়ন, কখনো ওর জায়গায় তুই নিজেকে নিয়ে যাস না ভালোবাসার থেকেও ভরসাটা অনেক দরকার, সেটা তোর কোনো দিন নেই।"
রুপায়ন নীহারিকার কঠিন কণ্ঠস্বরের চমকে উঠলো ,"কি হলোরে হঠাৎ আমিতো তোকে বাস্তবটা মেনে নিতে বলছি।"
"তাই বুঝি আর দিনের পর দিন এই যে প্রেম প্রেম খেলা খেলছিস সেটা বুঝি তোর গল্পের কোন প্লট?""
নীহারিকা ফোনটা কেটে দেয়। ব্লক করে দেয় মেসেঞ্জারে হোয়াটসঅ্যাপে। ফোন নম্বর মুখস্থ আছে কিনা মনে ঝালিয়ে নিয়ে ইচ্ছে করেই ডিলিট করে দেয় কন্টাক্ট থেকে।
সারাটাদিন মাথাটা ঝিমঝিম করে। মাঝে দুটো সপ্তাহ নীহারিকার নিজেকে জড় ভরত মনে হয়। তিন্নির খেলনার পুতুলগুলো ওকে যেন পরিহাস করছে অনবরত। প্রতিমুহূর্তে বলছে তুমি পুতুল তুমি বঞ্চিত তুমি মিথ্যার জালে আবার প্রতারিত।

(৬)

আরো দুটো সপ্তাহ কেটে যায় ঘড়ির কাঁটা কে সঙ্গে করে। নীহারিকা আবার বেঁচে ফিরে আসে অনুভবের হয়ে। অনুভব টেরও পায় না পাশাপাশি থাকা মানুষটি কত শত যোজন দূরত্বে বাস করছে। উল্টো দিকের মানুষের মনে কি দুর্বিষহ কালবৈশাখী বয়ে গেছে, ‌ সাংসারিক কার্যাবলী গুলো যন্ত্রের মতো কাজ করে চলে নীহারিকা। জীবন্ত পরিণত নীহারিকা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে যন্ত্র হয়ে।
আজ একবার কলেজস্ট্রিট যাওয়া খুব দরকার। তিন্নির কতগুলো বই নিজের কতগুলো গল্প বই খুঁজতে খুঁজতে চোখে পড়ল প্রায় সমস্ত দোকানে রূপায়নের লেখা' ফিনিক্স পাখির খোঁজে'।
দোকানদার উৎসাহ দ্বিগুণ করে বলে," দারুন চলছে দিদি বেস্ট সেল হয়েছে মাসে!"
নীহারিকা কিনে নেয় বইটা ,বাড়িতে ফিরে দুপুরবেলা বইটা খোলে। প্রথম পাতায় লেখা 'মেঘ'কে উদ্দেশ্য করে লেখা ফিনিক্স পাখির খোঁজে।
নীহারিকা চোখ বোজে ভাবে এও কি সম্ভব। গোগ্রাসে গিলতে থাকে ২৭০ পাতার গল্প। প্রথম থেকে শেষ অব্দি শুধু তার রূপায়নের অতীত জীবন এমনকি গত কয়েক দিন আগেকার ঘটনা ছত্রে ছত্রে বসানো। তার মুখের ভাষা পাঠকের মন কাঁদিয়েছে। আর নীহারিকা নিজে! নীহারিকার ভেতর হু হু করে! কষ্টে ভীষণ ছটফট করে সে। কেন? রূপায়ণ কেন তাদের একান্ত ভালোবাসাকে এমন করে সবার মাঝে বিলিয়ে দিলো। তার কাছ থেকে সবটুকু নিয়ে নিজের খ্যাতিতে স্থান দিল। চিরকাল কি ঠকবার জন্যে জন্মেছে নীহারিকা। ফোনটা তুলে নেয় সে দু'বার রিং হওয়ার পর রুপায়ন ধরে বলে,"হঠাৎ কি মনে করে?"
নীহারিকা কটাক্ষের হাসি হেসে বলে," তোর ফিনিক্স পাখির খোঁজে পড়লাম!"
রুপায়ন নীরব থাকে ।নীহারিকা আবার যোগ করে "নতুন গল্প লিখতে বুঝি তুই আজকাল পুরনো সমাধি ঘাঁটিস?"
'গল্পের রসদ দরকার মেঘ রসদ দরকার, তার জন্য দুঃখ পেতে হবে ।সবাই তো দুঃখ দিতে পারেনা নতুন দুঃখ না এলে পুরনো দুঃখের ঝালাই দরকার সর্ষে দানার মত নিংড়ানো দরকার যতটা নিংড়ে দেওয়া যায়।"
"শুধু কি খ্যাতির জন্য এত নিষ্ঠুর তুই? এত স্বার্থপর? ছি!"
"শুধুই কি খ‍্যাতি? না তুই আমাকে বুঝিসনি ,মরে আমিও গেছি বারবার। আমরা সবাই ফিনিক্স পাখি জানিস তুই বলেছিলি না? খ্যাতি নয় দিনের শেষে আপন জায়গায় নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজেকে খুঁজে পেতে গেলে নিজের ভালোবাসাকে হাতিয়ার বানাতে হয় বৈকি ,প্রয়োজনে পোড়াতে হয় চোখের সামনে,তবেই সোনা তৈরি হয় মেঘ!"
নীহারিকার হাত থেকে ফোন পড়ে যায় , কাঁদতে থাকে আয়নার উপর দুটো হাত রেখে। মুঠো শক্ত হয়। শব্দহীন কান্নার মাধ্যমে লাল ঠোঁট দিয়ে গড়িয়ে পড়ে পিপাসার লালা।

অনেকদিন পর নীহারিকা আজ বানতলা লেনে এসেছে। না বৃষ্টি পড়েনি আজ, তবে দোতলার ঘরে ঠাম্মার ঘরটা এক আছে। চশমার কাঁচটা ঘষা ঝাপসা হয়ে গেছে বড্ড। শুধু মেঘলা। তিন্নিকে নিচের ঘরে রেখে এসে ঠাম্মার মুখোমুখি বসে নীহারিকা।
"হ্যাঁরে রাজপুত্র বুঝি জিয়নকাঠি চুরি করেছে?" ঠাম্মা ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করে
নীহারিকা নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে সব টা খুলে বলে ঠাম্মাকে। তারপর বলে," বলতে পারো ঠাম্মি কেন রুপায়ন এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন করল?"
সুরবালা দেবী মন্থর গতিতে আলমারির দিকে এগিয়ে যায় তারপর একটা ডায়েরী ও একটা বই তুলে দেয় ,"এগুলো কাল পড়িস, পরশু কথা বলব আমরা এই নিয়ে।
 "এগুলো কি?"
"মন দিয়ে পড়িস তাহলে সব উত্তর পাবি!"
নীহারিকা পড়তে থাকে রাত জেগে বহুদিন আগের লেখা ডায়েরীর পাতা যেনো কল্লোল সেনের বইয়ের পাতার অক্ষর। এ কী করে সম্ভব,এ তো  ঠাম্মির লেখা।বহুকাল আগের। ঠাম্মার দেওয়ার তারিখ অনুযায়ী ঠাম্মার বিয়েরও আগে। কিন্তু কল্লোল সেন তারপরের লেখক, জট পাকিয়ে যায় মাথায় ‌।পরের দিনই নীহারিকা ঠাম্মার কাছে এসে বসে।"এবার বুঝলি কেন আমি কল্লোল সেন এর লেখা পড়ি?"
"তোমার সব লেখাই  এইভাবে উনি নিয়ে নিয়েছেন তুমি কিছু বলনি?"
"নেয় নিরে বোকা আমি দিয়েছি যেমন টা তুই দিয়েছিস রুপায়ন কে।"
ঠাম্মি!
"হ্যাঁরে দিদিভাই, আমি তোকে ফিনিক্স পাখির গল্প বলেছিলাম না ?আমরা আসলে সবাই ফিনিক্স পাখি। আমরা বাঁচি মরি মরি-বাঁচি। এই বাঁচাতে সুখ না থাকলেও বাঁচাতো যায়। কোন কোন সময় বেঁচে থেকে নিজের মৃত্যু দেখাটাও জীবনের লড়াইয়ের একটা অংশ। কখনো এটা ভেবে এগোতে নেই যে আমি কি পেলাম। এটা ভেবে বাঁচো তুমি কতটা দিতে পারলে সে কতটা ঋণী হলো তোমার কাছ থেকে। নিজেকে তো তার থেকে আলাদা ভাবার কোন দরকার নেই ।যখন তুমি দেখবে তোমার দেওয়া সম্পত্তিতে কেউ ঐশ্বর্যময় হয়ে উঠেছে ,তোমার তখন তার চেয়েও নিজেকে বড় ধনী মনে হবে। সে তখন নিঃস্ব তোমার কাছে।"
"তুমি তো কম কষ্ট পাও নি এসব দিতে ঠাম্মি?"
"মনের সম্পদ সবার কাছে থাকে না দিদিভাই, থাকলেও দেওয়ার ক্ষমতা কজনের আছে আর নিয়ে যত্ন করে রাখার লোকটা কেও তোযোগ্য হতে হবে বৈকি।"
"কিন্তু অনুভব কে আমি আগের মত ভালবাসতে পারব ঠাম্মি?"
বদ্রি পাখির ফাঁকা খাঁচার দিকে তাকিয়ে ঠাম্মি বলে,"কত বছর হল পাখিগুলো আর নেই কাউকে উড়িয়ে দিয়েছি কেউ এমনি মরে গেছে, তাই বলে কি ওদেরকে ভালোবাসিনি ?কষ্ট হয় না ওদের জন্য দিদিভাই ?কষ্ট হয় ,অনুভবকে ছাড়তে পারবে না বলেই রুপায়নকে ছেড়েছ আবার রূপায়ণ কে বাঁধতে  পারবে না জেনেই তুমি নিজেকে ছেড়ে এসেছো,এ  তো আমাদের সবার গল্প দিদিভাই।"
নীহারিকা সবুজ জানালার দরজা ফাঁক করে দেখে ফিনিক্স পাখির মতো চিল  টা আজও উড়ে যাচ্ছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।।

সাহিত্যিক সৌমী গুপ্ত
১৬২, রাইফেল ক্লাব রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 


*অলংকরন: অরিজিৎ ঘোষ 













































নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা
  • ফিরে ফিরে আসা ~ অন্তরা দাঁ এর মুক্তগদ্য

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

๑ জন্মদিন ๑

๑ জন্মদিন ๑

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates