হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature



অথিক গুরু পথিক গুরু গুরু অগণন 

আমার মামার বাড়ি একান্নবর্তী।উৎসব-অনুষ্ঠানে তার ভার টের পাওয়া যেত। হৈ-হল্লার মধ্য দিয়ে নয়, সে সাহস ছিল না কারোর। সবাই কেমন চাপাস্বরে কথা বলত।কারণ, মাতামহ বাড়িতে আছেন। তবে রান্নাঘরের দাওয়ায় তরি- তরকারির বহর জানান দিত পাত পাড়বে কতজন। সাত টিন মুড়ি নামানো থাকত ঢারিতে।বড় এক কড়া কুমড়োর ছক্কা। চায়ের জল ফুটেই যেত পেল্লাই এক কেটলিতে। তখন গ্যাস ছিল না। পাটকাঠির ধিকিধিকি অঙ্গারে। বুকের মধ্যে সেই পাটকাঠির আগুন এখনও জ্বলে।পুড়ছে না কেউ , নিজেই পুড়ছি এ বেলা ও বেলা। 

কারও  কারও পুড়তে ভালো লাগে , কারও উড়তে , কারও আবার শীতলপাটি বিছিয়ে গা এলিয়ে দিতে। আমার পছন্দ চলনবিলের নৈর্ঋত কোণে বসে থাকতে। জমির আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে , ঘাসের শরীরের বিনম্র পুলক ধারণ করতে করতে , গরুর গাড়ির চাকার কৌণিক  লিক ধরে , পদচারণার শব্দ- নৈঃশব্দ্যের অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোতে ভেসে কখন যে চলনবিলে পৌঁছে যেতাম , ঠাহর পেতাম না। 
দেখতাম , মাতামহ বসে আছেন। মাছ ধরা চলছে। দিগঙ্গনাদের ছুঁয়ে জালের চলন। জেলেদের গলদঘর্ম অবস্থা। মাতামহ বলতেন , এরাই পৃথিবীর প্রাণশক্তি। অথচঅবহেলিত-শোষিত--- সর্বঅর্থে বঞ্চিত। জল ও মাছের যেমন সখ্য তেমনই উপরতলার মানুষের সঙ্গে এই নীচের তলার মানুষের হৃদয়-সম্পর্ক গড়ে না উঠলে মুক্তি নেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন  : "পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমায় পশ্চাতে টানিছে।" 


উৎসব বাড়িতে মাছের প্রয়োজন হত প্রচুর। মাছও উঠত জাল ভরে। বড় বড় হাঁড়িতে রাখা হত। তার আগে লাফ দিতে দিতে মাছগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ত। যাদের একটু বেশি প্রাণশক্তি , সেই মাছেরা হাঁড়িবন্দি হয়েও লাফ মারত জোরে। আমি সেগুলো ধরতে যেতাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতাম। দু'একটা ছিটকে আবার জলে গিয়ে পড়ত। মুক্তির শ্বাস নিত জোরে জোরে। আমার বীরত্বে আঘাত লাগত খুব। কেমন যেন মনমরা হয়ে যেতাম। দাদু বলতেন, "তুমি জেলেকাকুদের সবচেয়ে বড় মাছ একটা করে দাও।" আমি দিতে চাইতাম না। কথাটা শুনতে পাইনি ভান করতাম। দাদু ওদেরকেই মাছ তুলে নিতে বলতেন। ওরা নিজে হাতে তুলে নিত। তবে বড় বড় মাছ নিত না।বলত , পন্ডিমশায়, আপনার কাজের বাড়ি , বড়গুলো কাজে লাগবে। দিতে হয়। দিলে কমে না। দিলেই সবাই নেবে তাও না। এই শিক্ষা মাতামহের কাছে পেয়েছি। 


উৎসব-বাড়িতে পর্যাপ্ত আলোর প্রয়োজন। তখন মামার বাড়িতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। আট-দশটা হ্যাচাক জ্বালা হত। আমাদের সঙ্গে নিয়ে দাদু হ্যাচাক জ্বালতেন। লখাই মামা থাকত সঙ্গে। শতকরা নিরানব্বই শতাংশ কাজ মামাই করত। কিন্তু আমাদের গোল করে বসতে হত হ্যাচাকগুলি ঘিরে। দাদু বলতেন, ভালো করে দেখো, কীভাবে জ্বালাতে হয়। তেল ভরো। হাওয়া ভরো। এসব তোমরা পারবে। তেল ভরতে গিয়ে বাইরে পড়ে যেত অনেকখানি। উৎকট গন্ধ উঠত। দাদু কোনদিন বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বরং বলতেন, তেল পড়া ও তেল পোড়ার গন্ধ ভালো লাগে। হাওয়া দেওয়ায় আমার উৎসাহ ছিল একটু বেশি। আগ বাড়িয়ে সেটাই করতাম। নজেলটার হাতল ধরে ভেতরে ঢোকানো ও বের করা। শেষ দিকে খুব কষ্ট হত। শক্তি লাগত বেশি। বাহাদুরি করে জোরসে ঢোকাতে গেলে বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ছিটকে পড়তাম।। দাদু হো হো করে হেসে উঠতেন। একটু বড় হলে হ্যাচাকের কাচ মোছার অনুমতি পাই। খুবই শক্ত কাজ। আঙুলের মসৃণ চলনে তার সিদ্ধি। শুকনো ন্যাকড়া নিয়ে এ পাশ ও পাশ বুলিয়ে যাওয়া। মাঝেমাঝে ঘুঁটের ছাইয়ের পরশ। হাত কাটার সম্ভাবনা অবশ্য কম। প্লাস্টিকের বলয় তার কারণ। হ্যাচাক জ্বালানো সকলের কম্মো নয়। তার জন্য দক্ষতার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে লখাইমামা সিদ্ধহস্ত। হ্যাচাকের মাথায় তেল উঠিয়ে , মুখে আগুন দেওয়া। তেল বেশি উঠে গেলে বিপদ। দপ করে আগুনের লেলিহান শিখা তখন গগনচুম্বী। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা। লখাইমামার মাত্রাজ্ঞান দেখে অবাক হতাম। দাদু বলতেন , মনে রেখো , যতটুকু দরকার ততটুকু তেল।

গদ্যকার সুজিত রেজ
                         চুঁচুড়া, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ 















প্রিয় শিক্ষক 

শিক্ষকতা করতে গিয়ে জীবনে বহু শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।চিনেছি অনেককে-সরল,জটিল,ধূর্ত,কুটিল,উদার,কৃপণ,ভালো শিক্ষক ...আদর্শবান,দায়িত্বশীল,ফাঁকির গবেষক...ইত্যাদি ইত্যাদি।তবে বহু ভালো শিক্ষককে দেখেছি, নিবেদিতপ্রাণ জাত শিক্ষক।
আজ এমন একজনের কথাই বলবো।তাঁর নাম বিবেক রায় - ছাত্রদের কাছে বিবেক স্যার।তিনি ছাত্রছাত্রী অন্ত প্রাণ অথচ পড়া আদায় এবং শ্রেণি-শৃঙখলা রক্ষায় তিনি এতই কড়া যে তাঁকে এক ছাত্র-বিরোধী হিংস্র মানুষ বলে দেগে দিতে স্বঘোষিত দরদিদের লাইন পড়ে যাবে মনোবিজ্ঞানের অলীক পাণ্ডিত্য দিয়ে সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষককে লক-আপে পাঠাতে তাঁদের কয়েক মিনিট  মাত্র লাগবে।
আজও আমি স্বপ্নে সেই শিক্ষককে দেখি তিনি রাত্রে হোস্টেলের ঘরে ঘরে দরজা ঠেলে দেখছেন ছাত্ররা পড়ছে কি না।পড়লে মুখে আলোর উদ্ভাস আবার ঘুমোলে মুখের অন্ধকার অচিরে সরিয়ে কৃত্রিম রাগে ও ব্যঙ্গে ফাঁকিবাজ ছাত্রটিকে তুলে দিচ্ছেন।তারা চোখেমুখে জল দিয়ে ঘুম কাটিয়ে পড়ায় ফেরার পর তিনি বিছানায় যাচ্ছেন।অথবা ছাত্রদের ভয় জাগিয়ে বলছেন, রাত্রে দরজা খোলা রাখবি। মাধ্যমিক শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি সারারাত ঘুমুবো না।রাত বারোটা থেকে চারটে তোরা ঘুমুবি,আমিও ঘুমুবো।তারপর ভোর চারটে থেকে ছটা টানা পড়া।একসময় এমন অভ্যাস তৈরি হয় স্যার বাথরুম উঠে কাশি দিলেও ছাত্ররা সচকিত হয়ে ওঠে,কিছু বলতেই হয় না।
সেই মাধ্যমিকের রেজাল্টে ছাত্রদের কঠোর পরিশ্রমের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা গেল।যার প্রকৃত কারণ সেই বিবেক স্যার।দেখা গেল প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সেই স্কুলের ফলাফল অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।চারিদিকে জয়জয়কার পড়ে যায়।স্যারের অবদানের কথা ছাত্রছাত্রীদের মনে গেঁথে যায়,ইতিহাস হয়তো মনে রাখে না।
মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করে এবার দূরের উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়তে যাবে ছেলেমেয়েরা।বিবেক স্যার সেই মাসের বেতন পেয়ে,তাদের নিয়ে ছুটির দিনে নদীর ধারে পিকনিকের আয়োজন করেছেন। কয়েকঘন্টা খুশি, আনন্দ, গল্প, কথায়, কবিতায়, গানে, রস-রসিকতায় কেটে যায়। ছাত্র-শিক্ষকের পবিত্র বন্ধন চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। তা দেখার মানুষ এখন দেখি না।আমি সেই বিবেক স্যারকে ভুলতে পারিনি।অনেকদিন কাছাকাছি ছিলাম।
সেই পিকনিকে একটি ছাত্র প্রশ্ন করে বসে,অবশ্য ভয়ে ভয়ে,স্যার,একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
-- নির্ভয়ে বল।এবার তোরা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়তে যাবি,তোদের সব কথা বলা যাবে।তোরা বড়ো হয়ে গেছিস।আর কোনো শাসন নয়,বকাবকিও নয়।
ছেলেটি বলে,স্যার আপনি এত বকেন,শাসন করেন, আপনার ছড়ির ঘা আর অপমানের ভয়ে সবার আগে আপনার পড়াটাই করতাম।মার খেলে আপনার উপর খুব রাগ হতো,কিন্তু পরে সেই রাগ কোথায় যেন উড়ে যেত।আপনি ভালোবেসে ডেকে হাসিমুখে যখন বলতেন,মার খেলি তো!একটু মনোযোগী হলেই তো হয়।
তখন মনে হতো আপনি আমাদের বাড়িরই একজন মানুষ। দাদা বা বাবার চেয়েও আমাদের ভালোবাসেন। এটা কেন হয় বলুন তো?
স্যার উত্তর দেন,ওরে বোকা ভালোবাসার জন্য।শাসনটা সাময়িক একটা ছলও বলতে পারিস।
তোদের মঙ্গলের জন্য আমাকে কড়া হতেই হয়েছে।সেটা সাময়িক।
অন্য একজন ছাত্র বলে,স্যার আমরা পরীক্ষার আগে রাত বারোটা পর্যন্ত আবার ভোর চারটে থেকে পড়তাম।আপনি দেখতে আসতেন,কখনো দূর থেকে কাশতেন।আমরা বলতাম,কাশিটা আপনার অ্যালার্ম। আপনি কি আমাদের জন্য সারারাত জেগেই থাকতেন স্যার?
স্যার থমকে যান,ভাবেন,তারপর তাঁর মুখে রসিকের হাসি ফুটে ওঠে।উত্তর দেন,আজ তোদের কাছে সত্যকে আড়াল করবো না।তবে একটা শর্ত মানতে হবে,তোরা ছাড়া আর কেউ একথা যেন না জানে।রানিং ছাত্ররা জানলে ওরা ফাঁকি দেবে।আসলে আমি রাত্রের খাওয়া সেরে একবার রাউন্ড দিতাম,তারপর শোবার আগে আর একবার।রাত্রে বাথরুম উঠলে একটা চক্কর দিতাম,আর বাকিটা কাশির অ্যালার্মেই কেল্লা ফতে হয়ে যেত।
ছেলেমেয়েরা হেসে ওঠে।বলে,স্যার আপনার জন্যই এত ভালো রেজাল্ট হয়েছে।হোস্টেল থেকে দশ-দশটা ফার্স্ট ডিভিশন,ছটা স্টার মার্কস,ব্লকে ফার্স্ট বয় আমাদের স্কুলের।সে তল্লাটের সেরা রেজাল্ট,রেকর্ড রেজাল্ট।বিবেক স্যার বলেছিলেন সেই দিনটা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা দিন।
বিবেক স্যারকে আমি চিনতাম।অতীত কাল বলে চিন্তা নেই এখনো রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখা হয়।বাজার থেকে ফিরছেন।
এখনো তিনি বিশ্বের সব ছাত্রছাত্রীর মঙ্গল কামনা করেন।
প্রণাম বিবেক স্যার।স্বপ্নের শিক্ষক।

   গদ্যকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
গোপেশ্বরপল্লি, বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া



 
































আমার প্রিয় শিক্ষক

আপনি যদি আমায় ঘুমের মধ্যেও জিজ্ঞাসা করেন, বোধহয় উত্তর পাবেন, সিনেমা । সত্যি বলতে, আমি আমার সংক্ষিপ্ত জীবনে খুব কম শিক্ষকই পেয়েছি, মনে রাখার মতো । আমি পড়েছিলাম কোথায়, আর এখনও বিশ্বাস করি, প্রকৃত শিক্ষক তাঁর ছাত্র বা ছাত্রীদের শেখান না, বোঝান না । বরং অনুপ্রাণিত করেন । প্রশ্ন হল, কী দিয়ে ?

এর উত্তর দিতে গেলে ফিরে যেতে হবে, আমার ছেলেবেলায় । অতীত সবসময় সুখের নয় । তাই আমরা অনেক কিছুই  ভুলে যাই — চাই বা না-চাই । কিন্তু আজ এমন একজন মানুষের কথা বলব, যাঁকে ভুলে গেলে পাপ হবে । আমি তাঁকে কোনোখানে কোনো দিন সাজগোজ করতে দেখি নি । উৎসবে অনুষ্ঠানেও ধুতি-পাঞ্জাবির সাথে বড়োজোর একটা শাল জড়াতে দেখতাম । তিনি একটা বাগানে আমাদের পড়াতেন । একচালা একটা ঘর ছিল সেই বাগানে । স্যারের দাদা সেই বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন সারাটা দিন । আমরা শৈশবের অত্যধিক উৎসাহে আবিষ্কার করেছিলাম, কোনো কোনো গাছে নাম লেখা আছে । আমরাও নাম লিখতাম — কাজটা সহজ হত কলাগাছের ক্ষেত্রে ।কারণ তার কাণ্ড নরম।  কিন্তু কয়েক দিন পরেই দেখতাম, আমাদের নামের আদ্যক্ষর মলিন হয়েছে, এক মাস পরে প্রকৃতির নিয়মেই তা হারিয়ে যেত । শিখেছিলাম, কাজ করে যেতে হয় । কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয় । সেই বাগান-ঘরের শিক্ষামন্দির ছিল আমার শৈশবের শান্তিনিকেতন । 

স্যার আমাদের নানা গল্প শোনাতেন । তাঁর বাড়ির অদূরেই ছিল সাধারণ পাঠাগার । তিনি আমাদের ক্লাস ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত প্রায় সব বিষয় পড়াতেন । বাবার তখন এত সাধ্য ছিল না যে, প্রতি বিষয়ের আলাদা শিক্ষক রাখবেন । আর আমরাও এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত  খুশি ছিলাম । কারণটা সহজেই অনুমেয় — একাধিক শিক্ষক মানে খেলার সময় উধাত্ত । সেই বেশ ভালো ছিল । কিন্তু লেখাপড়ার থেকেও স্যারের কাছে যে জিনিসগুলো মূলত শিখেছিলাম, জীবনে ন্যূনতম চাহিদা রাখতে , বড়োদের শ্রদ্ধা করতে, নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, সমালোচনা হজম করতে, জীবনটা উপভোগ করতে আর সবচেয়ে বড়ো কথা, পড়ার বইয়ের বাইরেও বই পড়তে । সেই ক্লাস ফোর থেকে দু বেলা লাইব্রেরি যেতাম । এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট আমাদের দুনিয়াটা বদ্ধ জলায় পরিণত করেছে । আমরা এখন শ্যাওলার মতো বাঁচি !

আজ ফিরে চাইলে ভাবি, তিরিশ-চল্লিশ টাকায় কী করে কেউ পড়াতে পারে ! চাহিদা এত কমতে পারে ! আসলে তিনি টাকার জন্য পড়াতেন না, পড়াতেন ভালোবেসে । তিনি যতবার বকেছেন, প্রতিবার অনুভব করেছি ভিতরে ভিতরে তিনিই কোথাও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছেন । তারপর বড়ো হলাম । মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স, এম-এ, ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা প্রকাশ, প্রথম চাকরি, প্রতিবার দেরিতে হলেও, তাঁর কাছে মিষ্টি হাতে গিয়েছি । তিনি আমার নিয়ে যাওয়া মিষ্টি আমাকেই জোর করে খাইয়ে দিয়েছেন, প্রায় প্রতিবার । আজও যখনই তাঁর কথা মনে করি, একটা গন্ধ মনে পড়ে যায় । তাঁর বাড়িতে গেলেই গন্ধটা পেতাম — ভালো-মানুষের গন্ধ । এই যে চোখের কোণে প্রাপ্তির আনন্দাশ্রু চিকচিক করছে, স্যার সুবল দত্ত মশাইয়ের কাছে এই আমার পরম পাওয়া । তিনি সম্পর্কে আমার জ্যেঠু ও হন — কিন্তু স্যার বলতেই ভালো লাগে । ভালো থাকবেন স্যার । 

গদ্যকার অভিষেক ঘোষ
কসবা, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 
















 
কিরীটি স্যার ও প্রেমালাপ

সত্যি কথা বলতে গেলে শিখেছি প্রতি নিয়ত নানান ভাবে নানান জনের কাছে । শিখছি আজও, তবুও কথাটা যখন উঠল তখন বলতেই হবে প্রিয় জনের কথা । 
তখন পড়ি স্কুলে, সালটা ১৯৮৩.;  কিরীটিবাবু পড়াতেন বাংলা , ইতিহাস এসব। ক্লাস সেভেনে এ উনি ছিলেন ক্লাস টিচার ,পড়াতেন বাংলা গদ্য আর পদ্য। কত সুন্দর সহজ করে করতেন উপস্থাপনা । তবে কঠোর হলেও মন খুলে গল্প করতেন । ওনার ক্লাসে  আমাদের মনে একদিকে ভয় অন্য দিকে উৎসাহ ছিল দেখার মত।একদিন এক বন্ধুর লুকিয়ে রাখা প্রেম পত্র চলে গেল ওনার হাতে । ভয়ে বুক কেঁপে উঠল সবার , এই রে এবার শুভজিত  আরংধোলাই খাবে । ওর বাবাকে আবার স্যার  না বলে দেন হেড স্যারের মাধ্যমে । সবাই উত্তেজনায় টানটান। স্যার কিন্তু পড়াতে শুরু করলেন গম্ভীর মুখে। উদাত্ত কন্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল কবিতার এক একটি শব্দ ।সবাই গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছে।  
হঠাৎ স্যার  ডাকলেন শুভকে । বেচারির মুখখানা তখন শুকিয়ে কাঠ। কোনমতে উঠে গেল । ধমকে উঠলেন স্যার, চুরি করেছিস ? 
না,মানে আমি তো,তোতলাতে থাকল শুভ ।
-- হতচ্ছাড়া,তোতলাতে কে বললো । বলছি তুই কি চুরি করেছিস,করিস নি তো।তবে ভয় পাচ্ছিস কেন!!
-- স্যার,  ভুল হয়ে গেছে আর করব না ।
আবার ধমকে উঠলেন কিরীটিবাবু, করবি না মানে ? কি করেছিস ? 
-- স্যার, ঐ চিঠিটা ,মানে আর লিখব না । ছেড়ে দিন স্যার এবারের মতন।
ও এই ব্যাপার তাহলে । এটা তোর লেখা । কিন্তু আমি যে বুঝলাম না কিছু । এটা বোর্ডে লিখে দে চটপট, 
বললেন স্যার ।
শুভ পারলে স্যারের পায়ে গড়িয়ে পরে । এবারের মতন ছেরে দিন স্যার ।
এবার কিরীটিবাবুর সেই বাজখাঁই গলা ,তাহলে তোর বাবাকে ডাকি  কি বলিস । নে নে চট করে বোর্ডে লিখে ফেল । আর হ্যাঁ, ভুল লিখলে কিন্তু সোজা হেডমাস্টারের ঘরে নিয়ে যাব। 
বোর্ডে  শুভর কাঁপানো হাতে লেখা প্রেম পত্র  ।
শুরু করলেন কিরীটি বাবু পড়া, না নিজে নন । অন্য  এক বন্ধু  মানসকে দিয়ে ।
মানসের পড়া শেষ হলে আবার উদাত্ত কন্ঠ কিরীটি বাবুর । প্রেম কয় প্রকার ও কি কি । রাগ , অনুরাগ,  বিরাগ, ব্যাভিচারী রাগ , সঞ্চারী রাগ , পূর্ব রাগ, ইত্যাদি ইত্যাদি বিশ্লেষন করলেন । সব শেষে  লেখাটির ভুল কোথায়,  কেন এটি প্রেম পত্র হয়েও সঠিক নয়, কি দোষ ত্রুটি রয়েছে,  আরও  ভালো লেখা করতে কি ভাবে লেখা উচিত ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি জানালেন । মজার  বিষয়,  গোটা ক্লাসের  ইনভলভমেন্ট করে দিলেন । বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে কে সঠিক লাইন লিখতে পারবে , তাদের বোর্ডে  ডাকতে শুরু করলেন । 
অবাক সবাই । কেটে গেল পুরো পিরিয়ড। হাসি মুখে নিলেন বিদায় । শুধু যাবার আগে শুভর চিঠিটা ওকে দিয়ে করলেন জিঙ্গাসা,  বল , এটা কি ঠিক লেখা না ভুল । দশে কত নম্বর পাবে এই চিঠি । 
 গোটা ক্লাস চিৎকার করে উঠল, স্যার  জিরো।
-- তাহলে , এটা কি করবি ? 
শুভ কাঁদো কাঁদো হয়ে জানালো, স্যার  ছিঁড়ে দেবো। 
ঠিক , তা তো দিবি , কিন্তু আরও  ভালো লেখা চাই ।
পরের দিন দেখব , কে কত ভাল লিখতে পারে প্রেমের চিঠি । 
আমাদের অজান্তেই স্যার, মনে পুঁতে দিলেন ভালোবাসার বীজ, আর জানিয়ে দিলেন, ওরে প্রেম করতে শুধু  প্রেমিকা লাগে না । প্রেম হল নিখাদ ভালোবাসা । মা , বাবা,  ভাই , বোন , দিদি , বন্ধু সবাই কে ভালোবাসা যায় । ভালবাসতে জানতে হয়। 
আর আমার মত কয়েক জনের মনে বপন করলেন লেখার মন্ত্র । স্যার,  আপনাকে প্রণাম । আজ আপনার অবদানে কলম দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রেমের কবিতা ও নানান লেখনী।

গদ্যকার আশিস মুখার্জ্জী 
নিউ আপার চেলিডাঙ্গা, আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান 




























এক ধ্রুব পদের জন্য তপস্যা

তিনি ঘুমের কথা বলতেন । ঘুম থেকে উঠলেই আবার পরক্ষনেই ঘুমিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন । অংক তার মনের গভীরতায় অতন্ত্র প্রহরীর মতো জেগেছিল হিমালয়ে । ক্লাস সিক্স অথবা সেভেন পর্যন্ত অংক গুলো আমার থেকে ব্যস্ত অনুপাতের সম্পর্ক স্থাপন করেছিল বারবার। অনুভব করতাম অংক মানেই একটা শূন্য গোলক । অংক কি একটি ত্রিভুজাকার নাকি বহুভুজাকার ? অংক একটি জলরঙের মতো কোনো-এক অবয়বহীন একটা নারী শরীর । তিনি বলতেন অঙ্ককে একটা নারীর মতো ভাবতে ।চোখের আড়াল করতে নেই পরক্ষণে মনের আড়াল হয়ে যায়। গভীর রাতে তাকে নিয়ে ধ্যান করতে হয় । ধ্যান করেছি বাল্মীকির মত । মহাভারত অথবা রামায়ণ অথবা এনসাইক্লোপিডিয়ার গভীর রসে উদ্ভূত করেছি অসংখ্য ঘাম বিন্দু । কখনো হাফ ইয়ারলি বা অ্যানুয়াল পরীক্ষার খাতায় নম্বরের ভগ্নাংশ অনেকটা দূরত্ব রেখেই চলে গেছে মেঘের মতো , কুয়াশার মত । আমার মেধা তালিকায় অসংখ্য কুয়াশার বিন্দু এসে জমাট করে গেছে আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণা । আমার মনের ভেতর আর ঘুম আসছে না কতগুলো সমীকরণের জন্য । আমি ছবি হতে দেখেছি সন্দীপ স্যারকে । প্রতিটি নক্ষত্রের বিন্দু হয়ে ছুটে যেতেন আমার দুই চোখে, আসলে তিনি তো আবৃত্ত দশমিক ভগ্নাংশ । আমার অভাবের দিনেও কখনো সামন্তরিক অথবা বৃত্তের ক্ষেত্রফলের ভেতর ফুটিয়ে তুলছেন মহেশ্বরীর জ্বলজ্বলে চোখ । তৃপ্ত হয়ে যাচ্ছেন তিনি । ক্রমশ রামায়ণের সত্য পালনের পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন ইতিহাস অথবা ভূগোল , জৈবিক বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব পাঠের লিরিক । প্রতিটি ছন্দের বিন্যাস ও সমবায় শিখিয়ে যাচ্ছেন অকপটে । আমি তার মহানুভবতার কথা দেখেছি রাতের জোছনায়। আমি তার অবয়ব দেখেছি ঘুমের ঘোরে । ঘুমের ঘোরে দেখেছি একটি সাদা খাতা জমা দিয়ে যাচ্ছি পরীক্ষা না দিয়েই । সব ভুলে যাচ্ছি কঠিন অংক গুলো । ভুলে যাচ্ছি তার সরল সমাধান । আমার পাশে তিনি বসে বসে আমার হাতের আঙুলের গাঁটে অংক ধরিয়ে দিচ্ছেন । ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনে নীল রঙের ছত্রাক ফুটে উঠেছে । আমি ছবি বলেই ভাবতেই,  তিনি লিখে দিচ্ছেন অনেক বিকেলের মসলা মুড়ি । এভাবেই লাঠি হাতে অকপটে শিখিয়ে যাচ্ছেন বিকেলের হলুদ আলো । এখনো তার আলো পেতে চাই । আলো নিয়ে ছুটছি আর এক আলোর দিকে । আমার সব বিন্দু দিয়ে মহা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে আছি । শুকতারা হয়ে গেছেন তিনি । ওই আলোছায়া আকাশগঙ্গা দেখতে দেখতে আমি কখন তানপুরা ভেঙে ফেলছি ‌ আমি কখন পেন্সিলের শক্ত কাঠে দাঁত কামড়ে নুন স্বাদ নিতে নিতে  আনমনা হয়ে এঁকে যাচ্ছি কোন একটা আবছা গোল চশমার ফ্রেম । ছায়াছবি রঙের অসংখ্য বিন্দু আমার কপালে বসিয়ে দিয়ে শিখিয়ে যাচ্ছেন ধ্রুবপদ এর সঙ্গে কেমন করে অসংখ্য বিন্দু কপালে নিলে রামচন্দ্র হওয়া যায় । আমি এক দীর্ঘ বাল্মীকির তপস্যায় বসলাম ।।

গদ্যকার নিমাই জানা
রুইনান, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর













অন্তরে প্রিয় রবীন্দ্রনাথ 

সত্যি কি কোন শিক্ষক প্রিয় হয়ে ওঠে কোন ছাত্রের  কাছে? আমি একথা বললাম এই জন্য যে ছাত্র  অবস্থায় কোন শিক্ষকের কাছে ভালোবাসা পাই নি। পড়াশনায় খুব ভালো ছিলাম না। তার জন্য প্রহার কি একমাএ পথ? কিছু কিছু শিক্ষক এতো নিষটুর প্রহার করতেন যে মনে হতো এরা শিক্ষক না হয়ে কশাই হলে ভালো হতো। কিংবা মনে হতো ওদের ঘরে বুঝি আমাদের মতো সন্তান নেই? এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে এ, এম স্যারের কথা। লম্বা দোহারা চেহারা। ফর্সা মুখ।
ইংরেজিতে আমি দূর্বল ছিলাম। তার কাছে পড়ে বুঝে ছিলাম ইংরেজি ভাষা শেখা কত সহজ।
ছোট ছোট বাক্যে কি সহজে ইংরেজি লিখতে শিখিয়ে ছিলেন। এরপর যখন কোন ছাত্র পড়া না করে আসতো, তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করতো তোমার কি আমার পড়া বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে?
দেখ, কারো হয়তো আমার পড়ানোর কৌশল বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে, তা হলে তারা আমার বাড়ি গিয়ে বুঝে নিতে পারো। কোন টাকা পয়সা লাগবে না। এই রকম কথা আমি আজ পর্যন্ত শুনি নি। পড়া না করলে তিনি বলতেন---একটু মন দিয়ে  পড়ো। দেখবে পড়ার মধ্যে কত আনন্দ। আজ তুমি ফাঁকি দিচ্ছ, কিন্তু এটা বুঝঝো না, পড়ার আনন্দ থেকে চিরতরে তুমি বঞিত হচ্ছ । জানবে জীবন এক সংগীত, তার তান লয় রয়েছে এই পড়াশুনার মধ্যে। সারা বিশ্বকে তুমি হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। 
       এ, এম, তো  আমার দেখা টিচার। কিন্তু যাকে দেখেনি। যিনি জীবনের সব স্তরে আমাদের পথ নির্দেশ দিয়েছেন।   
   শোকে দু :খে বেদনায় আনন্দ সৃষ্টিতে কিভাবে জীবনকে সংগীত করে তুলতে হয়, তা তার  কাছ থেকে আমি পেয়েছি।সে আর কেউ নয়, তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

 সাহিত্যিক দেবদাস কুণ্ডু 
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 















পাই স্যার 

রাজু ও আমি  স্কুলবেলায়  বিজ্ঞানের স্যারকে খুব ভালবাসতাম। রাজুর অন্য বন্ধুরা বলত পাগলা স্যার। রাজুর খুব রাগ হত। আমি বলতাম, এইরকম পাগল হাজার হাজার প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার জন্য।
বিজ্ঞান স্যারের আমরা নাম রেখেছিলাম পাই স্যার। মার্চ মাসে বিজ্ঞানী আইন স্টাইনের জন্ম। এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে খুব মজা করে বিজ্ঞান বোঝাতেন স্যার। তিনি একবার বলেছিলেন, ছোটবেলায় আমরা সৌরজগতের গ্রহগুলো কে সূর্যের থেকে কত দূরে শিখেছিলাম। পৃথিবীর থেকে সূর্য পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মুশকিল হল এই‘পনেরো  কোটি কিলোমিটার’–টা কতদূর তার ধারণা আছে নাকি আমাদের? তোমার স্কুল আর  মামার বাড়ির দূরত্ব কত, বলতো রাজু।রাজু বলল, স্যার তিন’কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। একশো কিলোমিটার দূরে মামার বাড়ি যেতে বাসে ঘন্টাখানেক লেগে যায়। 
সমর বলল, আমার মামা দিল্লিতে থাকেন। কলকাতা থেকে দিল্লীর দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটার – প্লেনে যেতে লাগে ঘন্টা দেড়েক কি দুয়েক। স্যার বললেন,তাহলে দেখ,  এই একশো কিলোমিটার বা দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বের সাথে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা সম্পর্ক তৈরি হল। কিন্তু পনের কোটি?সেটা কত বড় সংখ্যা তা বুঝি নাকি? সুতরাং, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আমাদের কাছে একটা মুখস্থ করার সংখ্যা হিসেবেই রয়েগেল, অনুভূতি বা‘ইনটুইশন’–এর সাথে যুক্ত হল না।যেমন, একটা উড়োজাহাজ যার কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে এক-দেড় ঘন্টা লাগে, তার কতক্ষণ লাগবে একই বেগে পৃথিবী থেকে সূর্য যেতে? উত্তরটা সহজেই দূরত্বকে গতিবেগ দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যাবে – প্রায় সতের বছর!  আবার ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও ভাবা যায়। ধরা যাক, পৃথিবীর সাইজ একখানা পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাসের রাজভোগ কি রসগোল্লার মত। তাহলে এই স্কেলে সূর্য কত বড় আর কত দূরে হবে?সমর বলল,অঙ্কটা চট করে কষতে পারব ঐকিক নিয়ম লাগিয়ে।স্যার বললেন দূরত্বগুলো ছোট সংখ্যা নিয়ে হিসেব করলে সহজ হয় অঙ্কটা। এবার  কিন্তু সৌরজগত সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা তৈরি হবে। মনে মনে একটা ছবি বানিয়ে নিলাম যে আমার টেবিলের উপরের রসগোল্লাটা পৃথিবী, আর মিনিট পাঁচ–ছয় হেঁটে গেলে সূর্যকে পাব। কিন্তু সূর্য তো বিন্দু নয়! তার ব্যাস প্রায় চোদ্দ লাখ কিলোমিটার। তাহলে আবার ঐকিক নিয়মে দেখে নেব যে আমাদের উদাহরণে সূর্য হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটার মানে মোটামুটি একখানা বড়সড় ঘরের মত। ঘরের মত চৌকো নয় অবশ্য, মোটামুটি গোলাকার।এইভাবে তিনি বিজ্ঞান বোঝাতেন সহজ করে। তারপর যখন বারো ক্লাসে পড়ি তখন স্যার একবার স্কুল ল্যাবরেটরিতে ক্লাস নিলেন। স্যার সিরিয়াস হয়ে পড়াচ্ছেন। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ক্লাসে সকলেই হাসতে শুরু করেছে। রাজু ও তার বন্ধুরা তো হাসছেই। তার সঙ্গে হাসছেন, লাফিং স্যার।আমরা অবাক হয়ে হাসছি।হাসির কলরব  পৌঁছে গেল হেড মাষ্টারমশাইয়ের ঘরে। তিনি একটি শক্ত লাঠি নিয়ে এলেন মারার জন্য।তিনি চিৎকার করছেন আর বলছেন, বাঁদরামি হচ্ছে। এটা স্কুল। স্কুলে হাসি। ঘরে ঢুকে পড়ে হেড মাষ্টার মশাই ও হাসতে লাগলেন। রাজুরা অবাক। কি ব্যাপার হলো।এদিকে  স্যার হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছেন একটা মোটা কাঁচের বোতলের দিকে। তিনি দেখলেন বোতলের মুখ খোলা। লেখা আছে বোতলের গায়ে নাইট্রাস অক্সাইড। স্যার বন্ধ করলেন ঢাকনা।তারপর দশমিনিট পরে হেডস্যারকে বললেন, স্যার লাফিং গ্যাসের বোতল খুলে ফেলেছে কেউ। তার ফলে এই হাসি।সমর বললো,স্যার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে।আমার প্রিয় শিক্ষক পাই স্যারের তখনও হাসি মুখ।
কে যে বোতলটা খুলেছিলেন তা আজ পর্যন্ত জানা যায় নি...
 সাহিত্যিক সুদীপ ঘোষাল 
নন্দনপাড়া, খাজুরডিহি, পূর্ব বর্ধমান















না আঁচড়, হ‍্যাঁ আঁচড়

ঠাকুর বলতো এসেছিস যখন একটা আঁচড় কেটে যা! প্রিয় শিক্ষক‌ও তাই বলতো। কিন্তু আঁচড় কাটতে গেলে কে যেন পালটা আঁচড়ে দিতো। এই আঁচড়া-আঁচড়ির মধ‍্যে পড়ে মানুষ হ‌ওয়া হলো না। কী হতে চাস? একে-একে হাত উঠলে শোনা যায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট ইত‍্যাদি। প্রিয় শিক্ষকের মুখে তখন হতাশার ছাপ। যেন মিঠাইওয়ালার উজ্জ্বল রঙিন গোলাপি হাওয়াই মিঠে মুহূর্তে হাওয়ার ক্রোধে মিইয়ে ফ‍্যাকাশে হয়ে গেল। চোখ ছলছল। চোখের কোণে চিকমিক করা জল। ক‌ই, কেউ তো প্রকৃত মানুষ হ‌ওয়ার কথা বললো না। কী কারণ? মানুষ হ‌ওয়া বুঝি অন‍্য প্রফেশনের থেকে শক্ত! প্রিয় শিক্ষক উদাস ভাবে ব্ল‍্যাকবোর্ডের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন এমন ভাবে যেন বলতে চাইতেন ডোন্ট রিকোয়েস্ট মি ফর অ্যান ইউটার্ন। চলার পথ বেঁকে যাবে। রাজপথ ছেড়ে যে যার মতো কানা অলিগলি ধরে খুঁজবে প্রত‍্যাশার টুকরোটাকরা যার মূল‍্য অমূল‍্য হতে পারলো না, শুধু ঘুনসির কানাকড়ির কাছে আজীবন নতজানু হয়ে থাকলো। রাজপথ মানে সহজ সরল মানুষ! তাই তো চেয়েছিলেন তিনি। এখন‌ও অমৃতলোকে বসে অনেকের মধ‍্যে সেটাই দেখতে চান। হোয়ার দেয়ার ইজ অ্য উইল, দেয়ার ইজ অ্য হোপ অর ওয়ে। এই প্রবাদের গলিত তরল সিসার মতো মনের যত ফাঁকফোকরে ঢেলে দিয়েছিলেন। ওরে পারবি, ওরে হবে, ওরে হয়! চটের আসন ছেড়ে হাইবেঞ্চ, দস্তার বাক্স ছেড়ে পুমার লোগো লাগানো ব‍্যাগ পিঠে, হাফ প‍্যান্ট ছেড়ে ফুল প‍্যান্ট, মাকুন্দ থেকে গোঁফের ব‍্যক্তিত্ব, সব হলো প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে। জীবনটাকে ছড়ার মতো সহজ করতে চেয়েছিলেন। আন্তরিক ছন্দ থাকবে পরতে-পরতে। মাথা দোলাতে-দোলাতে সবাই পড়ে নিতে পারবে। তিনি খুশি হবেন। যেভাবে হাতির মাথা সম্মতিসূচক ভাবনায় দুললে মাহুত খুশি হয়।
     তিনি পরিচালক। এই ছোট্ট জীবন টেলিফিল্‌ম। দেখার জন‍্য হয়ত অনেকে ইন্টারেস্ট পাবে না। প্রচার হবে না কিন্তু প্রসার থাকবে। যেমন জলের নিচে তিরতির করে যে শীতল কিংবা উষ্ণ প্রস্রবণ বয়ে যায়, যার খবর সমুদ্রের উপর প্রবল ঢেউ রাখে না, রাখতে চায়‌ও না। ভীষণ সুনামি হয়ে জনপদে আছড়ে পড়ে সব কিছু ভাসিয়ে প্রমাণ করতে চায় আমি‌ই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কতক্ষণ? একটা সময় সব শান্ত। তিনি প্রচার বিমুখ হতে বলতেন। বলতেন সংযম রাখতে। মনের পরিধির ভিতর তৈরি করতে বলতেন পিন ড্রপ সাইলেন্স জোন যার উদ্দেশ‍্য ক্লিননিনেস ইজ নেক্সট টু গডলিনেস। পথের উপর জোর দিতে বলতেন। গন্তব‍্য আপন গতিতে এগিয়ে আসবে। মাইলস্টোন দেখতে বারণ করতেন। কিন্তু কী ভাবে বলি, সেই কানাভাঙা মাইলস্টোন হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তা হতে পারিনি। দেখি লোকের ধেয়ে যাওয়া, ধুলোর ওড়াউড়ি, শুনি মিছিলের স্লোগান, ভুল ব‍্যাকরণের কথাবার্তা, মানুষের দৈন‍্যতা, ঠকানোর প্রবণতা ইত‍্যাদি। স্ট‍্যাচু অব লিবার্টি হতে পারিনি। বদলে স্ট‍্যাচু অব এনভি হয়ে আছি। পরিস্থিতি চারিপাশে চাপ দেয়। বেলুন হয়ে গেছি। এদিকে চাপ দিলে ওদিকে বাড়ি অ্যান্ড ভাইস ভার্সা।
     প্রণাম নিতে চাইতেন না কিন্তু প্রণামের ব‍্যাখ‍্যা করতেন। পাছে মাথা নিচু হয়। শিরদাঁড়া সোজা রাখতে বলতেন। কী বলি হে প্রিয় শিক্ষক! মুণ্ডু থাকবে কোথায়? শিরদাঁড়াই তো আর নেই! অমেরুদণ্ডী প্রাণী হয়ে গেছি। সেই হিসাবে কেঁচোর দাম অনেক বেশি। সে জমিতে মাটি উগলে কৃষকে সাহায‍্য করে। আর সেই কৃষক সভ‍্যতার কাছে ঠকে যায়। এখন নিজের অজান্তে তাদের প্রতিনিধি হয়ে গেছি যাদের কাছে "আমার প্রিয় শিক্ষক" কুড়ি নম্বরের রচনা মাত্র। নম্বর পাওয়ার জন‍্য ঢালাও প্রশংসাসূচক বাক‍্যের ছড়াছড়ি। ডায়েরিয়া হলে‌ও লোকে এত ছড়ায় না! তারপর আপনি মৃদু হেসে কানমলা দেবেন। বলবেন এঁচড়ে-পাকা হয়েছিস। কী করবো বলুন, পাকা কাঁঠাল হয়ে গন্ধ ছড়াতে পারলাম না। গানে নামমাত্র পিরিতির কাঁঠালের আঠা হয়ে থাকলাম। তাও সরষের তেল দিয়ে ঘষলে উঠে যাবে। ক্ষমা করবেন স‍্যার, নিয়তি সিলি পয়েন্টে দাঁড় করিয়েছে আর আপনাকে বানিয়েছে আম্পায়ার, কোন দিকে যাবো, যাবেন...

 গদ্যকার সোমনাথ বেনিয়া
            নিমতা, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ                               




















ছয়  নম্বর ছড়ি

তখন  গৌরব সবেমাত্র নাইন থেকে টেনের ক্লাসেরোলকলের খাতায় নাম লিখিয়েছে।ভূবনপাড়া বয়েজ হাইস্কুল।নাইনটেনের অঙ্ক ক্লাস নেওয়া অম্লান বাবুর নামে ছাত্রমহল থরহরিকম্প। তাঁর বিখ্যাত সরু লিকলিকে ৬ নম্বর লেখা ছড়ির চপেটাঘাতের অলংকরণের কুখ্যাতিতে সকলে সজাগ। অন্য কোন ক্লাসের পড়ায় আগ্রহের গতিতে কিছুটা রাশ টানলেও অম্লান বাবুর ক্লাসে তার নিজের স্বরধ্বনি ছাড়া অন্য কারোর ব্যঞ্জনধ্বনি তো দূরের কথা স্বরধ্বনির আলপিন ও খুঁজে পাওয়া যেত না। শুধু মাঝে মাঝে সপাট সপাট শব্দ, অম্লান বাবুর বজ্রনিনাদ কণ্ঠস্বর ,আর আনুনাসিক ধ্বনির মৃদু আওয়াজ এর সমস্বর। বলার অপেক্ষা রাখে না এগুলোর সব কৃতিত্ব সেই বিখ্যাত ছয় নম্বরের ছড়ির।

বেলা বারোটা দশ ক্লাস শুরু হতে আরো পাঁচ মিনিট। পেটের ভেতর গুড়গুড় ঢাক বাজছে সঙ্গে ভয়ের চোরাস্রোত। সকাল থেকে পেটে জল মুড়ি ছাড়া আর কিছু পড়েনি। পেটের ভিতর খিদের মাঠে ভয়ের ঝড় আরো তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছিল গৌরবকে। অংকের বই টার দিকে তাকিয়ে দুবার ঢোঁক গিলল গৌরব। সামনে বিকাশবাবু পলাশীর যুদ্ধ পড়াচ্ছেন। নিজেকে সিরাজদৌলা ভাববার চেষ্টা করলো একবার। মনে সাহস নিয়ে ভাবল অংকর পাতাগুলো ইংরেজ। যুদ্ধে প্রাঙ্গণে জিততে তাকে হবেই। ঢং ঢং করে ঘন্টা পড়ল তিনবার। গৌরব জিভটা টেনে ঢোঁক গিলল আরো একবার। এই নিয়ে দশবার ঢোঁক গেলার পরেই মনে হল জিভটা ক্রমশ শুকিয়ে আসছে আর চেষ্টা করলেও কিছু ই গলাধঃকরণ করতে পারবে না। আজ ছ নম্বর ছড়ির আঁকিবুকি তার পিঠেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। দোষটাতো তার নয়। বাবার হার্টের অসুখ ধরা পড়ার জন্য মাসে মাসে কর্পোরেশনের জল খরচের মত টাকা-পয়সা বেরিয়ে যাচ্ছে। গতকাল একশো টাকা নিয়ে বাজারে গেল। বাবার ওষুধেই বেরিয়ে গেল ষাট টাকা ।বাকি চল্লিশ টাকা ডিম আলু নিয়ে হাতে পড়ে থাকল সাত টাকা। সাত টাকায়  তো খাতা কেনা যায় না ।তাই অম্লান স্যারের দেওয়া হোম ওয়ার্ক এর অংক গুলো বইয়ের শেষের পাতাতেই করে ফেলেছে। পল্টু দার দোকানে তখন অনেক ভিড় সবার সামনে ধারে জিনিস নিয়ে আসতে ভয় লাগে ,লজ্জা লাগে। আজ সম্ভব হলে দুপুরের দিকে দোকান ফাঁকা থাকলে দুটো খাতা নিয়ে আসবে দোকান থেকে ধারে ।মাস শেষ হতে আর দুদিন। নতুন  মাস পড়লেই মায়ের কাছে হাত পাততে কিছুটা হলেও অস্বস্তি কম হবে ।দারিদ্রতা এমন জিনিস গৌরব টের পেয়েছে অংকের হিসাব শেখায় সবার আগে ।অভাব শেখায় মাসের প্রত্যেকদিন কিভাবে চলতে হয়  দশমিক বসিয়ে আর কিভাবে বিয়োগ করে অংক সমাধান করতে হয়।

বাঁ দিকে সরু শাখানদী যাবার মত সোজা শিঁথি কাটা পরিপাটি করে বিছানো চুল। ছোট কপাল অসম্ভব পাওয়ারের চশমা বয়স পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই। চোখ দুটো অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত এবং দৃঢ়,— কঠোর বললেও কম বলা হয়। ক্লাসে ঢুকেই অম্লান বাবু হাঁক ছাড়লেন," পিন ড্রপ সাইলেন্ট একটা আওয়াজ পেলেই গোটা ক্লাস কে নিল ডাউন দেবো!"
গৌরব মাথা নিচু করে ভাবল স্যারের কি জন্মানোর সময় ডাবর মধু আবিষ্কার হয়নি নাকি নিম ডাল মুখে গুঁজে দিয়েছিল কেউ ভুল করে। বয়সটা কম হলেও স‍্যার যেন নিজেই আর্য ভট্টর নব সংস্করণ।রোলকল শেষ হতেই অম্লান স্যার বললেন," ক্লাসের হোম ওয়ার্ক বের  করে জমা দে সবাই ।প্রথম  বেঞ্চের ডান দিক থেকে শুরু কর।
গৌরব দেখল ভগবান তার প্রতি আজ সত্যিই বিরূপ।আর্যভট্ট এর ছ নম্বর ছড়ি কপালে নাচছে। কারণ প্রথম বেঞ্চের ডান দিক থেকে তিন নম্বরে ও বসে আছে। আচ্ছা ছয় নম্বর কে তিন নম্বর দিয়ে ভাগ করলে থাকে দুই,  যোগ করলে নয়, বিয়োগ করলে তিন আর গুন করলে আঠেরো ।ওরে বাবা কোনটা বেছে নেবে কে জানে! রাজীব ঋষিকেশ এর পর এলো গৌরবের পালা। অংক বইটা নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো সে।
অম্লান বাবু হুংকার দিলেন," কিরে অমন ভেজা বিড়ালের মত দাঁড়িয়ে আছিস যে বড়! বাংলা ভাষা ভুলে গেছিস নাকি ?খাতা টা বের কর!"
" নেই স্যার' গোটা ক্লাসে যেন ভূমিকম্প হল
" নেই মানে ?ইয়ার্কি নাকি !বাতাসে করে ছিলিস হোম ওয়ার্ক?"
" মানে স্যার বইয়ের শেষের পাতায় করেছি খাতায় পাতা ছিলনা।"
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন অম্লান বাবু," নিজেকে আর্য ভট্ট ভাবছিস না পিথাগরাস! বইয়ে লিখে সূত্র আবিষ্কার করতে চাইছিস নাকি! হতচ্ছাড়া! নিয়ে আয় বলছি! বইয়ে লিখেছে গুণধর!"
গৌরব মনে মনে ভাবল একবার বলে ফেলে,'স্যার আপনাকেই তো আর্যভট্ট এর মত মনে হয়!" কিন্তু জ্বল জ্বল করা ছড়ি দেখে সেই দুঃসাহস আপাতত সংবরণ করে  সামনে এগিয়ে এলো। অম্লান বাবু বইয়ের পাতা খুলে অগ্নি শর্মা হয়ে ছয় নম্বর ছড়ির সদ্ব্যবহার করতে শুরু করলেন। গৌরব অধোবদনে মুখ লাল করে হজম করা ছাড়া অন্য কোন উপায় সামনে দেখলোনা। তিনবার মারার পর বললেন,' বল কেন বই নষ্ট করছিস !উত্তর দিবি চুপ করে থাকবি না!"
গৌরব তখন নিশ্চুপ হয়ে ভাবছিল স্যার তাহলে বিয়োগ টাই করলেন। কোন উত্তর না পেয়ে উত্তেজনা আর রাগের পারদ চলতে থাকে অম্লান বাবুর। অবশেষে অম্লান বাবু সরু লিকলিকে কঞ্চির যথোপযুক্ত সদ্ব্যবহার করে ক্লাস থেকে গৌরবকে বের করে দিলেন। গৌরব তখন আবিষ্কার করল যোগ বিয়োগ ভাগ নয় অন্তত গুণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন স‍্যার।

(২)

ঘটনার পর দু দিন কেটে গেলেও গৌরবকে দেখতে পেলেন না অম্লান বাবু। সেদিন ছেলেটাকে একটু বেশি শাস্তি দেওয়া হয়ে গেছে ভেবে ক্লাস নেওয়ার পর রাজীবকে ধরলেন অম্লান বাবু," ওইযে ফর্সা মতো রোগা করে ছেলেটি ক্লাসে আসছে না কেন রে!"
রাজিব উত্তরে গলায় জোর এনে বলল,"গৌরব স্যার?ওর বাবা মারা গেছে তো গত পরশু!"
অম্লান বাবু হজম করতে একটু সময় লাগালেন," মানে! কি হয়েছিল?"
" স্যার ওর বাবা অনেকদিন ধরে হার্টের অসুখে ভুগছিল। খুব গরীব তো হসপিটালে দিতে পারেনি বলে পরশু  রাতে মারা গেছে!"
অম্লান বাবুর বুকের ভেতরের শক্ত পাহাড়টায় যেন কেউ সজোরে আঘাত করলো। অজস্র অশ্রুবিন্দু ঝর্নার রূপ ধরে বেরিয়ে তিরস্কার করতে চাইল যেন। অম্লান বাবু ক্লাসে পড়িয়ে গেলেন যন্ত্রের মতো। আজ আর কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। টেবিলের উপর রাখা ছয় নম্বর ছড়ির উপর পড়ন্ত রোদে আলোকপাত যেন পরিহাস করছে প্রতিমুহূর্তে।
ক্লাস শেষ করেই শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে গৌরবের ঠিকানা খুঁজে চলে এলেন টিনের চালা দেওয়া ছিটে বেড়ার  ঘরে। গৌরব তখন মায়ের কাছে বসে ক্লান্ত চোখে উঠানের একপাশে রাখা বাবার ফেলে যাওয়া নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধানো বহু জর্জরিত খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টিতে।
'গৌরব!'
রাশভারী গলা ভাবনায় ছন্দপতন ঘটালো। গৌরব চোখ তুলে তাকালো ।সামনে আর্য ভট্ট! মুখ তুলে বললো," স্যার আপনি?'
অম্লান বাবুকে দেখে গৌরবের মা কিছুটা হতভম্ব। একটা মোড়া এগিয়ে দিলেন। অম্লান বাবু কিন্তু বসলেন না ।গৌরব মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো ।অম্লান বাবু এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে বললেন ,"শ্রাদ্ধশান্তি মিটলে আমার কাছে একবার দেখা করো গৌরব!"
'আচ্ছা স্যার'
অম্লান বাবু পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে গৌরবের হাতে ধরালেন। গৌরব কিছু বুঝতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
" এটা রাখো আর কিছু দরকার হলে অবশ্যই জানাবে আজ আসি।'
গৌরব নিচু হয়ে অম্লান বাবুর পায়ের ধুলো নিল। অম্লান বাবু অনুভব করলেন বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা গলার কাছে ধাক্কা মারছে।
" স্যার একটা কথা!"
অম্লান বাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন,' বলো!'
" স্যার সেদিন আমার খাতা কেনার জন্য টাকা ছিল না বলে বইয়ের শেষে অঙ্ক করে ফেলেছি আর কখনো এমন হবে না স্যার!"
অম্লান বাবু গৌরবকে অবাক করে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। "দেখা করিস সব মিটে গেলে, সেই ছয় নম্বর ছড়িটা আজই ভেঙে ফেলব দেখিস। শ্রাদ্ধের পরের দিন থেকে সকালে আমার কাছে গিয়ে অংক করবি। তারপর ওখান থেকে দু'জন দুমুঠো খেয়ে স্কুলে যাব,শুধু বইটা নিয়ে যাস বুঝলি?"
"কিন্তু স্যার আমি তো..."
মাইনে দিতে না পারার অক্ষমতার কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলোনা গৌরব।
" আবার আমার মুখে মুখে কথা!  ছয় নম্বর ছড়িটা রেখে দিতে হবে মনে হচ্ছে ।তোর পিঠেই ভাঙবো" অম্লান  বাবু বেশ কঠিন স্বরে বলে একবারও আর না পিছন ফিরে তাকিয়ে প্রস্থান করলেন।

(৩)

বাইরে প্রচন্ড গরম হলেও হসপিটালের ভিতরে মৃদুঠাণ্ডা। নির্মাল্য বসে আছে কলকাতার বিখ্যাত কার্ডিয়োলজিস্ট বিভাগের হসপিটালের রিসেপশনে। পাশে তার বৃদ্ধ জেঠু ।হার্টের অসুখ বাইপাস সার্জারি করতে হবে। অনেক কষ্ট করে এই ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেছে। একপ্রকার জোর করেই জেঠুকে নিয়ে এসেছে সে। আগে থেকে কিছু জানায়নি ।জানালে জেঠু কখনো আসতো না এত বড় হসপিটালে। গতবছর জেঠিমা মারণব্যাধি ক্যান্সারে বহুদিন ভুগে, যুদ্ধ করে গত হয়েছেন। জেঠুর নির্মাল্য ছাড়া আর কেউ নেই। নিঃসন্তান জেঠু নির্মাল্যকে সন্তানের মতোই ভরসা করে। তাই নির্মাল্য নিজের কাছেই নিয়ে এসে রেখেছে জেঠুকে যাদবপুরের ফ্ল্যাটে।
' জেঠু মনি জল খাবে?'
বৃদ্ধ তাকিয়ে বললেন ,'খাব? দে একটু ।'তারপর থেমে বললেন' হ্যাঁরে বাইপাস সার্জারি করতে অনেক খরচ? এখানে ফিজ ও তো অনেক বেশি বলছিলি  '
" আগে ডাক্তার তো দেখায় কি বলে দেখো!"
" কি যেন নাম বললি ডাক্তারের!"
ঠিক সেই সময়ে রিসেপশনে বসা মেয়েটি বলে,' আট নম্বর পেশেন্ট কে আছেন চলে আসুন!"
নির্মাল্য জেঠুকে ধরে নিয়ে আসে চেম্বারের ভেতর। তারপর ডাক্তারের উল্টো দিকে বসে জেঠুকে নিয়ে। বিখ্যাত কার্ডিয়লজিস্ট তখন প্রেসক্রিপশনের কাগজে মুখ নামিয়ে বললেন,' কি নাম পেশেন্ট এর"
" অম্লান মুখার্জি স্যার।"
উল্টো দিকে বসে থাকা ডাক্তারটি মুখ খুললেন এতক্ষণে। বহুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন চেনা মানুষটি কে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন তারপর এবং অম্লান মুখার্জির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন," স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?"
নির্মাল্য এতক্ষণ প্রত্যেকটা ঘটনার চমকে বিস্মিত হয়ে যাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে  বলল ,"জেঠুর ডিমনেশিয়া আছে ,আপনি চেনেন জেঠুকে ?হয়তো জেঠুর মনে নেই!"
" স্যারের ডিমনেশিয়া' হয়েছে? স্যার আমি গৌরব! চিনতে পেরেছেন? গৌরব রায়?" ঝুঁকে বসলেন কার্ডিয়লজিস্ট
আবার বলতে শুরু করলেন ডাক্তার ,"সেই যে  আপনি আমায় অংক শিখিয়েছিলেন, আপনার বাড়ি যেতাম একসাথে খেয়ে স্কুলে যেতাম? ভূবনপাড়া বয়েজ স্কুল! মাধ্যমিকের পর যখন মামার বাড়ি চলে গেলাম বাড়িটা বিক্রি করে আপনি বলেছিলেন জীবনের অংকে যেন কখনো হেরে না যাই। স্যার আমি গৌরব রায়! আপনার তৈরি করা ছাত্র! স্যার কখনো হারিনি  আমি !চিনতে পেরেছেন এবার? গতবছর বিলেতফেরত নামকরা ডাক্তার আমি!"
হাতদুটো ধরলেন অম্লান বাবুর গৌরব।
চোখ দুটো কি একটু চক চক করলো অম্লান বাবুর? বাইরে গোধূলি সন্ধ্যার আকাশে তারাদের স্টেশনে চেনা নক্ষত্রের  কাছে চলন্ত ট্রেন কি খুঁজে পেল গন্তব্যস্থল?
মাথাটা মৃদু নাড়ালেন অম্লান বাবু। তারপর বললেন," বাইপাস সার্জারি তে কী অনেক খরচ? সেরে যাবে তো? রাতে ঘুমোতে যে বড় কষ্ট!"
গৌরব স‍্যারের মাথাটা নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বলল," না সারলে আপনার ছয় নম্বর ছড়িটা এখনো আমার কাছে যত্নে রাখা আছে, মনে নেই স্যার? আমি ভাঙতে দিইনি আপনাকে ।ওটা না হয় আমার পিঠে তখন দু'টুকরো করবেন!"
তারপর নির্মাল্য বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন," ফিজটা আপনার কাছে রাখুন !কাল অপারেশনের জন্য এডমিট করিয়ে দিন, রিসেপশনে বলবেন আমার সাথে কথা বলে নিতে! আমি আজ যাওয়ার সময় কথা বলে নেব। "
অম্লান বাবু তখন বাইরে আঁধারী আকাশে তারাদের পাশে চলা এরোপ্লেনের দিকে ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আর গৌরব ভাবছে এতদিনে ছয় নম্বর ছড়ির  উদ্দেশ্য সাফল‍্যমন্ডিত করার সময় এসেছে। এক বাবাকে হারিয়ে আরেক পিতৃতুল্য মাস্টার মশাই কে ফিরিয়ে আনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার সময় আগত। এই কঠিন পরীক্ষায় যেন সফল হয় সে!।।

সাহিত্যিক সৌমী গুপ্ত
১৬২, রাইফেল ক্লাব রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ























বেস্ট টিচার

"বাবা, তোমার কোন সাবজেক্টটা সবচেয়ে ভালো লাগতো? " মেয়ে পদ্মার প্রশ্নে অঞ্জন একটু হেসে বললেন জীবন বিজ্ঞান। পদ্মা একটা কে.জি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবার কাছে পড়তে বসে তার হাজারো প্রশ্ন। অঞ্জন হাসি মুখে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। "বাবা, তুমি কখনো বকা খেয়েছ? কখনো হেড-ডাউন হয়েছ? জানোতো সেদিন আমি পায়েলের সঙ্গে চুপি চুপি গল্প করছিলাম, আর ম্যাথ স্যার আমাকে হেড-ডাউন করে দিয়েছে। " মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায় পদ্মার। অঞ্জন হেসে বলেন, " তাই নাকি, তবে আর কখনো ক্লাসে গল্প করো না। "হঠাৎ অঞ্জনের চোখে ভেসে ওঠে ছোট বেলার সেই দিনটার কথা। 
ছোট্ট অঞ্জন তখন ক্লাস এইটে পড়ে। পড়াশুনো একেবারেই করে না। রোজ মায়ের পিটুনি আর বাবার বকাবকিই সার। যদিও ফেল করেনি কখনো। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে শ্যাম দাস আর টাকির সঙ্গে গল্প করেই কেটে যেত, পড়া শোনা আর হত না। কিন্তু সেদিন হঠাৎ করেই জীবন বিজ্ঞান ক্লাসে পার্থ স্যারের বদলে এলেন মাইতি স্যার। ভাজক কলা পড়ানো শুরু করলেন। ব্লাকবোর্ডে ছবি আঁকছিলেন। অঞ্জন যথারীতি গল্পে মশগুল হয়ে পড়লো। হঠাৎ স্যার পিছন ফিরে তাকেই ডাকলেন, " এদিকে উঠে এস তো তুমি। নাম কি তোমার? "                                  বোর্ডের কাছে এল অঞ্জন। ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছিল সেদিন। কিন্তু অবাক হয়ে গেল, যখন স্যার তাকে কিছু না বলে, একটা জীবন বিজ্ঞান বই তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "তুমি একটু ভাজক কলাটা শুরু থেকে রিডিং পড়ে যাও তো।"                            পা কাঁপছিল তখন অঞ্জনের। এরকম শাস্তি সে কোনদিন পায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেশ ভালো করেই রিডিং পড়লো। তার পড়া হয়ে গেলে স্যার তাকে বোর্ডের ছবিটাতে ছড়ি দিয়ে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিলেন। আর এর পরেই অপেক্ষা করছিল সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা। স্যার এবার সমস্ত ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমরা তো খুব ভালো স্টুডেন্ট! এতক্ষণ খুব সুন্দর মনোযোগ দিয়ে শুনলে সব কিছু। কিন্তু দেখ, আমি এত ভালো বোঝাতে পারতাম না, যদি না অঞ্জন এত ভালো করে রিডিংটা পড়তো। তোমাদের আজকের ক্লাসের ক্রেডিট আমি অঞ্জনকে দিলাম। ওর জন্য একবার সবাই হাততালি দাও তো, তবে একটু আস্তে। "স্যারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্লাস সেদিন ফেটে পড়েছিল হাততালিতে। আর অঞ্জন। তার দুচোখ  থেকে গড়িয়ে নেমেছিল আনন্দ। তারপর আমূল বদলে গেল অঞ্জন। পাড়ার মাঠে নিখোঁজ হয়ে পড়ার টেবিলেই কেটে গেল বাকি সময়। আর স্কুলে বি সেকশন থেকে মাঝে মাঝেই চলে যেত এ সেকশনে মাইতি স্যারের ক্লাস করতে। 

"বাবা, তোমার বেস্ট টিচার কে ছিল? বলনা, চুপ করে আছ কেন? বলনা? "পদ্মা বায়না জুড়েছে, অঞ্জন খেয়াল করেননি, স্মৃতিতে ডুবে ছিলেন। একটু হেসে বললেন, "আমার বেস্ট টিচার! তাকে তুমি চিনবে না মা। " পদ্মা নাছোড়, "বলো না, বলো না, বাবা। 
"অঞ্জন মেয়ের মাথায় একটা হাত রেখে বললেন, " আমার বেস্ট টিচার ছিলেন শ্রী নিতাই মাইতি, আমরা ওনাকে ডাকতাম মাইতি স্যার বলে। " 
---কি গো বেরোবে না আজ?  
চম্পা ঘরে ঢুকতেই পদ্মা লাফিয়ে মার কোলে, "জানোতো মা বাবার ও বেস্ট টিচার ছিল!মাইতি স্যার।"
মেয়েকে একটু আদর করে চম্পা বলে, " ন'টা বাজে তো, স্কুলের দেরি হয়ে যাবে যে!" নাহ, আজ আর স্কুলে যাবো না। আজ আমরা সবাই একটা মন্দিরে যাবো। 
--মন্দিরে? সে কি, কোন মন্দিরে? কই আগে তো বলোনি! চম্পা অবাক হয়। 
অঞ্জন একটু হেসে বলে, "এই তো এখুনি পদ্মা আমাকে  মনে করালো, সেই ঠাকুরের কথা, চল আজ আমার ঈশ্বর কে দেখে আসি।"
অঞ্জন মনে মনে একবার মাইতি স্যার কে প্রণাম করে নেয়। 

     সাহিত্যিক অনিন্দ্য পাল               জাফরপুর, চম্পাহাটি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা 





















সাপলুডো 

সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে একানব্বই,---
একানব্বই থেকে দু দুটো সাপের মুখ এড়িয়ে কিছুতেই যাওয়া হয় না একশ'র দরজায়---
দরজার ওপারে উন্মুক্ত নীল আকাশ,
জীবনের নৈসর্গিক চিত্র।---
হঠাৎ মনে হয়---
বিরানব্বইয়ের সাপটা শীতঘুমে আচ্ছন্ন,
তাই টের পায়নি।
কিন্তু, তিন পা এগোতেই চোখে পড়ে তক্ষক---
তক্ষক জানে--
আমি পরীক্ষিত---
ছিয়ানব্বই থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে সাত এ।

এভাবেই সারা জীবন উত্থান পতনের এই সাপলুডোয়,
কিছুতেই একশ'র দরজা পেরিয়ে বুক ভ'রে শ্বাস নিতে পারি না,পরম নিশ্চিন্তে...

  কবি সমাজ বসু 
 মিলন পার্ক, গড়িয়া, কলকাতা





















নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা
  • ফিরে ফিরে আসা ~ অন্তরা দাঁ এর মুক্তগদ্য

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

๑ জন্মদিন ๑

๑ জন্মদিন ๑

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates