হৃদস্পন্দন

  • Home


  • Download

  • Social

  • Feature


বিরহ-মানুষ 

সাত-তলার ল্যাণ্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা দেখি
অভিমান পেরিয়ে ধাপে ধাপে সরে যায়
পোশাকি মেঘ
রাত পেরিয়ে ভোর নামে
হাজার স্কোয়্যারফিটের কার্পেট এরিয়াতে
আলো ফোটার আগে
স্মৃতির কোলাহলে মুখ ডুবিয়ে 
বিরহ-মানুষ জেগে ওঠে

কবি প্রাণকৃষ্ণ ঘোষ 
আলিশা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ





সবুজ রংয়ের হিংসে আর অষ্টমীর অঞ্জলি

পুজো আসছে মানেই কাশফুল, আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ, বীরেন্দ্র ভদ্রের স্তোস্ত্রপাঠ,গড়িয়াহাটের মার্কেট আর খবরের কাগজে পাতা জোড়া জুতোর বিজ্ঞাপন। ছোটোবেলায় যদিও পুজো আসার এই গন্ধটা উপভোগ করার মতো সুযোগ আমাদের খুব একটা ছিল না। মিড ডে মিল, পাশ-ফেল প্রথার অবলুপ্তি, ইউনিট টেস্টের যুগের অনেক আগে ঠিক পুজোর আগে আগেই হতো হাফ-ইয়ারলি পরিক্ষা। শেষ হতো ঠিক ষষ্ঠির দিন। নব্বই দশকের শেষ দিকে তখন পরিক্ষায় পাশ করার লক্ষ্যে অন্ধ আমাদের কাছে পুজোর গন্ধ বলতে ছিল বাড়ি ফেরার পথে প্যান্ডেলের বাঁশ ধরে দোল খাওয়া (তখনও পুল-কার শুরু হয়নি)। ষষ্ঠীর দিন হতো মৌখিক পরিক্ষা। আর মহালয়ার পরেরদিন অবশ্যম্ভাবী সবচেয়ে শক্ত—অঙ্ক পরিক্ষা। পরিক্ষার পড়া মুখস্থ করতে করতে পুজোর গন্ধ বলতে ছিল শুধুই একদিন—পুজোর বাজার। সেটা হওয়ার পর থেকেই বাড়ির কাজের মাসি থেকে প্রাইভেট টিউটর সবার একই প্রশ্ন—ক’টা হলো? হাফ প্যান্ট থেকে ভাঙা গলার নায়ক হয়ে ওঠা সেই সময়টা আমাকে ঘিরে থাকতো একটা সবুজ রংয়ের হিংসে। হিংসে, সোমনাথকে নিয়ে। সোমনাথ আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট  বয়। ফার্স্ট বেঞ্চে পাশাপাশি বসলেও, টিফিনে স্কুলের গেটের ফাঁক দিয়ে এক টাকার ঘুঘনি ভাগ করে খেলেও, পরিক্ষার সময় আমার সবুজ হিংসেটা ঠিক বের হয়ে আসতো। সারাবছর ক্লাবে আড্ডা দিয়ে, চুটিয়ে ক্রিকেট খেলে, গল্পের বই পড়ে কীভাবে ও ফার্স্ট হয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না। ও ব্যাটার জন্যই স্কুলে আমার কোনোদিন ফার্স্ট হওয়া হলো না।
সে সময় আমার কাছে পুজো ধরা দিত আনন্দমেলা পুজোবার্ষিকী’তে। হাফ-ইয়ারলি পরিক্ষা শেষ। পড়াশুনোর চাপ নেই। সারা পুজোর ছুটি টিনটিন-অরণ্যদেবের কমিক্স। কাকাবাবু- মিতিনমাসি’তে বুঁদ হয়ে থাকতাম। দুর্গাপুজোর চারটে দিন অদ্ভুত এক আনন্দ। হঠাৎ করে বড়ো হয়ে যাওয়া। সারা বছর বড়োদের হাত ধরে রাস্তা পাড় হওয়া আমরা,বন্ধুরা দিব্যি ঘুরে দেখতাম বাগবাজার, একডালিয়া, বাবুবাগান বা গড়িয়ার নবদূর্গা। রাস্তার ধারে হঠাৎ গজানো দোকান থেকে কুমড়োর সসে ভেজা চাউমিনে দিব্যি হয়ে যেত লাঞ্চ বা ডিনার। আরও একটু ছোটো বয়সে পকেটে তখন রিভলবার, ক্যাপ ভরা। 
কম বয়সীরা তরতর করে উঁচুতে ওঠে পড়ে। অনেক সময় দু-তিন ধাপ টপকে। আমরাও ছোটোবেলায় বড়ো তাড়াতাড়ি বড়ো হয়েছি, মানে হতে চেয়েছি। সারা বছর পরে থাকা হাফ প্যান্ট যখন পুজোর সময় ফুল প্যান্ট হয়ে যেত, তখন সত্যি বড়ো হয়ে যেতাম। বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখা—বড়ো হয়ে যাওয়া। দুম করে বড়ো হয়ে গেলাম মাধ্যমিক দেওয়ার পরই। ভালো রেজাল্ট করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম বিজ্ঞান নিয়ে। সব ভালো ছেলেরাই তাই করে। এ এক অলিখিত নিয়ম। পড়াশুনোয় ভালো হলে বিজ্ঞান, মাঝারি কমার্সে আর ঝড়তি পড়তিরা আর্টসে। এই আমার প্রথম ‘সোমনাথ’ ফাঁড়া কাটলো। ইমামবাড়ার সামনে চায়ের দোকানের মালিক সোমনাথের বাবার ছেলেকে সায়েন্স পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না। তাই সোমনাথের অবশ্যম্ভাবী কমার্সে ভর্তি। তবু কিন্তু সবুজ রংয়ের হিংসেগুলো রয়েই গেল। ও কেন কমার্সে গেল! আমার ফার্স্ট হওয়াটা কেমন তেতো হয়ে গেল। ততদিনে সোমনাথ ওদের পাড়ার বড়ো পুজোটার কেউকেটা কর্মকর্তা। গলায় রীতিমত ব্যাজ ঝুলিয়ে ভিড়ের সামনে দড়ি ধরে। lমাইকে অ্যানাউন্সমেন্ট করে--‘...নিজে প্রতিমা দর্শন করুন ও অন্যকে দর্শনের সুযোগ করে দিন’। ক্রমশ ক্যালকুলাস বুঝে ওঠা আমরা সোমনাথের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছি সপ্তমী টু দশমী, ফুচকা খেয়েছি, ঝিঙ্কু মামনি দেখেছি। শূন্য দশকের একেবারে গোড়ায় পুজো আমাদের বড়ো করে দিয়েছে তিন চারটে সিঁড়ি টপকে। এই পুজোতেই প্যান্ডেলের পিছনে প্রথম সিগারেটে টান। দশমীর দিন ঢাকের সাথে উদ্দাম নাচ। ‘বলো দূর্গা মাঈ কী...’।
আমাদের বড়ো হয়ে ওঠা পুজোর সাথেই। অষ্টমীর অঞ্জলিতেই চোখে চোখ। কোমরে গামছা বেঁধে ভোগ পরিবেশন—আর একটু দিই। পুজো মানেই আমার কাছে ছিলো নাটকে অভিনয়। মনোজ মিত্রের ‘চোখে আঙুল দাদা’, ‘সত্যি ভূতের গল্প’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভাড়াটে চাই’ বা ‘ভীমবধ’ —এক এক বার পুজোয় একে একটা নাটক। স্টেজ কভার করতে হয় কীভাবে, মাইক্রোফোনের ব্যবহার—একে একে শিখিয়ে দিয়েছে পুজোগুলো। গ্রীনরুমের সেই টেনশন বা প্রম্পটারের কথা শুনতে না পারা, দর্শকের সিটি—এই সব উত্তেজনাগুলো আজও ভিড় করে আছে স্মৃতিতে। 
আরো একটু যখন বড়ো হয়েছি, জড়িয়ে পড়েছি নিজের পাড়ার পুজোর সাথে। বিল বই হাতে চাঁদা কাটা, ঠাকুর আনা, বোধন, সন্ধিপুজো। পুজোর প্রতিটা ক্ষণ যেন বারে বারে ধরা দিত তখন। আমাদের পাড়ার পুজোয় ঢাকি আসতো বর্ধমানের কেতুগ্রাম থেকে। প্রতি বছর পুজোর আগে পুরোহিত থেকে ডেকরেটার্স, লাইটম্যান থেকে কুমোর—সবাইকে বায়না করতে হয়। করতে হয়না শুধু আমাদের এই ঢাকিকে। কোনো যোগাযোগ নেই, ফোন কল নেই; কিন্তু এখনো প্রতিবছর পঞ্চমীর দুপুরে ঠিক শুনতে পাবো—ড্যাম কুড়া কুড় ড্যাম। অষ্টমীর সকালে মেয়েদের শাড়ি পড়াটা মাষ্ট। মাইকে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ আর এদিকে ফুল-বেলপাতা হাতে বুঝতে না পারা মন্ত্র বিড়বিড় করে যাওয়া। শেষলগ্নে শুধু কমন পাওয়া প্রশ্নের মতো গলা চড়িয়ে—নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমঃ নমঃ। দুপুরে পাড়া জুড়ে একসঙ্গে খাওয়া। পিকনিকটা বিদেশী-বিদেশী আর বনভোজনটা বড্ড বুনো। অষ্টমীর ভোগ নিয়ে কোনো কথা হবে না বস্‌। সারা পাড়ার গেট-টুগেদার। খাওয়া শেষে খালি চেয়ার দখল করে দেদার অন্ত্যাক্ষরী। 
আস্তে আস্তে বদলে গেছে অনেক কিছুই। সাবেকীয়ানা বদলে গেছে থিমের পুজোয়। পুজোর আগের এই সময়টা এখন সারা কলকাতা জুড়ে দুগ্‌গা পুজোর বিজ্ঞাপন। মা দুর্গাও এখন বিজ্ঞাপন দিয়ে ভক্ত চাইছে। পুজো এখন বাড়তে বাড়তে মহালয়া টু লক্ষ্মীপুজো। দুর্গাপুজোর জগতে বিপ্লব এসেছে বারবার। একডালিয়ার বিশাল ঝাড় দেখে জনগণ ঢুকে গেছে বোসপুকুরের বিস্কুটের প্যান্ডেলে। নাকতলা উদয়নের কাঠের দুর্গা টু সুরুচি’র ‘চলুন বেড়িয়ে আসি’। পুজো এলেই এখন খোঁজ পড়ে স্পেশাল পাসের। বড়ো পুজোর ভিআইপি পাস দেখিয়েই এ পাড়ার ঝন্টি’কে পটিয়ে নিলো ও পাড়ার পাপাই। 
এখন আমার পুজো আসে বোনাসের খবর নিয়ে। গড়িয়াহাট-হাতিবাগান-প্যান্টালুন্স-বিগবাজার ঘুরে পুজোর শপিং। মহালয়া যেতে না যেতেই বাড়ির লোককে নিয়ে ভিড় হওয়ার আগেই দেখি ফেলি পুজো। গর্ব ভরে বন্ধুকে হোয়াটস্‌য়্যাপে পাঠাই পিছনে বড়ো দুর্গাকে নিয়ে দেশপ্রিয়’র মাঠে আমার সেলফি। হুহু বাওয়া, পর্দা দেওয়ার আগেই। বাকি দিনগুলো একটু মাটন-ভাত খেয়ে বিশ্রাম। অফিসে বড্ড চাপ যাচ্ছে আজকাল। অষ্টমীর দিন সকালে আমার বউ-মেয়ে নতুন শাড়ি পড়ে অঞ্জলি দিতে যায়। আমি অঞ্জলি দিই না। ঘরে চুপটি করে নিজেকে লুকিয়ে রাখি। অষ্টমীর দিন সোমনাথের কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
সোমনাথ, আমার বন্ধু সোমনাথ ওদের পাড়ার বড়ো পুজোটায় স্বেচ্ছাসেবক ছিল। অষ্টমীর অঞ্জলীর ভিড় সামলাতে ওস্তাদ সোমনাথ, তেরো বছর আগে এক অষ্টমীর সকালে ভিড়ের ধাক্কায় প্যাডেস্টাল ফ্যানের উপর গিয়ে পড়ে। তড়িদাহত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। আমার জীবনের প্রথম বন্ধু-বিয়োগ। ত্রিবেণী শ্মশানে ইলেকট্রিক চুল্লির আগুন যখন সোমনাথকে জড়িয়ে ধরছে তখন আমাদের চোখ শুষ্ক হয়ে গেছে। কান্নার জল বোধ হয় সেদিন দুঃখকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেনি। ইলেকট্রিক চুল্লির চিমনি দিয়ে সাদা ধোঁয়া বের হয়। কাঠে পোড়ালে হয়ত ধোঁয়ার রংটা সবুজ হতো, আমার হিংসার রং’য়ে।
এখন প্রতি বছর অষ্টমীতে সোমনাথের পাড়ার পুজোটায় যাই। এখনও প্যান্ডেলের এককোণে সোমনাথের বাঁধানো ছবি থাকে। রজনীগন্ধার মালা দেওয়া। মৃত্যুস্থল বলেই হয়তো ওকে ভুলে যেতে পারে না ক্লাবের লোকগুলো। আমি কী করবো আজও বুঝি না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। বন্ধুকে প্রণাম করতে হয় নাকি! মারা গেলে মানুষতো ভগবান হয়ে যায়। ভগবানকে তো প্রণাম করাই যায়। আমি কিছুই না করে পুরোনো কথাগুলো মনে করি। একসময় ভলেন্টিয়ার তাড়া দেয়। চমকে পিছনে ফিরে দেখি—সোমনাথ। নাহ্‌, অবিকল সোমনাথের মতো একটা ছেলে। ওরই মতো রোগা। সোমনাথ তখন কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো কাঁচের ওপাশে। মালা পরে হাসছে। আমি অষ্টমীতে মা দুর্গার সামনে অঞ্জলি দিই না। আমি অষ্টমীতে অঞ্জলি দিই সোমনাথের সামনে। ভালোবাসার অঞ্জলি। মানুষ মারা গেলে ভগবান হয়ে যায় যে। 

লেখক চমক মজুমদার
১০৫ সার্ভে ভিউ পার্ক, ব্যান্ডেল, হুগলি


















শৃগাল

আর কোনো ইচ্ছে নেই                                      বাঁশপাতায় আগুন জ্বেলে                                          কিছুটা উল্লাস কুড়াই                                            আধপোড়া বিবেক তবুও জেগে আছে 
পিরামিডের নিচে মমির হৃদয়ে 

সব ভুলে যাওয়া বৃষ্টি 
একা একা বহুদূর অনির্দিষ্ট পথ                                    চিত্ত ভয় শূন্য হলে বেড়ে যায় রাত                                কেউ নেই ক্রিয়াগুলি শেয়ালের ডাক                            নদীতে নামে ধবল মেঘ                                                স্রোতে সর্বনামের ঢেউ                                                  বিলকুল চলে যায় 

বুক ভেঙে দিগন্তের পাখি                                            ডানা খুলে পড়ে থাকে রামধনু বন                                কেবল মহিমা দেখায়                                                  মহিমা কষ্টপ্রদ তবুও শৃগাল 


বিধাতা

শপথ বিকোচ্ছে                                                          অঙ্গীকার বাংলা শব্দ পাশেই পড়ে আছে                      রাজধানী শহরে নীল কলেবর                                      তদ্ভব তৎসম সব ঘর বেঁধে বাস করে 

হাঁটতে হাঁটতে কসাইয়ের ক্ষেত                                    মাংসবাজারে শান দেয় ছুরি                                        কী সুন্দর ছুরি,জবাই ওরই স্ত্রী                            চাকরি নেই ব্যবসা করে রাতদিন 

পান খাওয়া মুখের ভাষায়                                      বের হয়ে আসে লাল দাঁত                                    হাসির ঝিলিক মারে বিদ্যুৎ পড়শি                            মদন ভস্মের পরও পরকীয়া মেখে নেয় রং 

চলো দেখে আসি বিধাতা এসেছে                                সংসদ চালাবে আর আপেল খাবে                                কী সুন্দর স্বর্গে বসবাস                                                নাচবে আপেল সব,ডানে বামে,লম্বা গলা হাঁস 

কবি তৈমুর খান রামরামপুর (শান্তিপাড়া), বীরভূম




















উর্বরতার অঙ্ক

নদীর মতো করে যারা চেয়ে আছে
পৃথিবীর পথে পথে
তাদের সংখ্যা খুবই কম বলে
এক বৃষ্টিতে পৃথিবীর চাষ হয় না

শেষ বর্ষায় সব বৃষ্টি কুড়িয়ে নিয়ে গেছে যারা
তাদের আয়ু রোদ্দুর দিনের চৌকাঠ পর্যন্ত
খড়ির দাগ এখনও চিনিয়ে দিচ্ছে 
পৃথিবীর যাবতীয় গলিপথ

তবে আর কয়েকটা মাত্র আর্দ্র দিন
আর কিছু নিথর গাছপালা
বৃষ্টি নামলেই মুছে যাবে সমস্ত অপেক্ষার রঙ
চোখ চিরে অস্থির পায়ে কে চেনাবে গলিপথ ?

জল পেরিয়ে পেরিয়ে উঠে আসবে
বেশ কিছু পরিশ্রমী পা
রাজপথে এসে শুধু দাঁড়ানোর অপেক্ষা
জেনে যাবে হৈ পথে কোনো চাষ নয়
জাগাতেই শুধু জেগে জেগে হেঁটে যায়

নারকোলের জলের মতো কিছু গোপন পা
মাটিতে মাটিতে শুধু উর্বরতার অঙ্ক কষে ।

কবি হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ময়নাডাঙা ( আশ্রয় অ্যাপার্টমেন্ট ), চুঁচুড়া, হুগলী






















 একটি কবরখানার  সাক্ষাৎকার

এমন অদ্ভুত রাত্রি আগে কেউ কখনো দেখিনি
একটি কবর খানার সাক্ষাৎকার চলছে
আর কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ করতে হবে পৃথিবীর 
যত কাজ

আকাশে বাতি জ্বলছে একটি গাছের গোড়ায়
সেই আলো এসে পড়ছে মুখে
আর শরীরের বাদ্যযন্ত্র গুলো বেজে উঠছে

মধ্যযুগের হাওয়া
তাদের উত্তরাধিকারীদের খুঁজছে
টেবিলে মেঘের সরঞ্জাম
আর সারা কবরখানা মেঘে ঢাকা

ফিরে যাচ্ছে দিন সপ্তাহ বছর
এখন শরৎকাল  একটি ভবঘুরে আস্তানার মতো

বৃষ্টি হয়ে গেছে
রাস্তায় জমা জলে ভেসে রয়েছে দু একটি প্রতিষ্ঠান

কালো অন্ধকারে তালা দেওয়া

আমি দেখছিলাম উদ্দেশ্যহীন কারা গান গাইছে
আর হাততালিতে উড়িয়ে দিচ্ছে পালক

কবি গোলাম রসুল
৫৬/১৫, সেখপাড়ি লেন, সাঁতড়াগাছি, হাওড়া  






















লাল রঙের পুরুষেরা

একটি কঙ্কাল আবিষ্কার করেছি নীল পাঞ্জাবীর ওপর

মৃত শ্মশান আমার দুটি হাতে বিস্তর সবুজ ঘাস 
ফুটিয়ে তুলেছে
কাক এসে বসে নীল রুমালে
ভিজে যাওয়া কামুক গন্ধ লেগে আছে রুমালটির উপর
স্তব্ধ হয়ে আছে আকাশের চাঁদ
সরে যাচ্ছে শুধু নিষ্পাপ ভেপার ল্যাম্প
সকলেই লাল রক্তের ডেনসিটি মেপে নিতে চায় 
নাইট বাল্ব ঘুম সেরে নেয় লোনাজিপাম চোখের 
তলায় রেখে
আমার শরীরের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষকণা জমে উঠেছে বিদ্রোহের, সারি সারি লাল পিঁপড়ে
আগুন জ্বলছে শুক্রাশয়ের ভেতর
নিরীহ সপ্তম শ্রেণি পুড়ে যাচ্ছে একা স্টেফি সিকিউর, ভেন্ডিং মেশিনের দগদগে ঘা এত বড় রাষ্ট্রের !
একটি পিঁপড়ে এর জন্য আমাদের আত্মহত্যা 
উচিত ছিল
একটি মহাভারতের জন্য একটি চাকা স্থির  দাঁড়িয়ে আছে অনাদিকাল থেকে

অবশেষে অর্জুন গাছের তলায় সারি সারি পুরুষ সকলেই শবাসনে ,চিন্তামগ্ন, হরিদ্রাভ রঙের। 

কবি নিমাই জানা
রুইনান, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর




















পুলক সর্বনাম

প্রলম্বিত অন্ধকার তাপ বা শৈত্য বাতাস

যাবতীয় রসদ পুষ্টির গল্প সব ঝঞ্ঝাহত
তোমার শীত বসন্ত গ্রীষ্ম কাঁটাতারহীন
জলের আকার গলে গ্যাছে ঋতুধর্ম

বসন্তপুর্ণিমা গর্ভাধানের গল্প লেখেনি বেলফুল
বিকেলের রুক্ষ ঝোপ লেবুবনসুগন্ধরঙিন
কাল গুনে কাটে সৌন্দর্যবিরোধী অনুযোগ
মাফিয়াবেষ্টন থিমে অস্তিত্বহীন হয়ে গ্যাছো

...সর্বনামের উৎকৃষ্ট পুলক


গোপীজন কথা ৩

নিবাত অন্ধকার।চারপাশ শব্দহীন অথবা
ক্ষীণ ডেসিবেল।হাত বাড়াতে পারো সখা
ভরসা নাম।আজকাল বাঁশি বাজে না।
একঘেঁয়ে গোচারণ প্রবল দগ্ধতা।তুমি কি
একাকী ছেড়েছো ভার প্রিয় সংস্কার মুদ্রা
ও বিভঙ্গ নীল রং শিখা ও বুনন হাসিমুখ?
বরাভয় জলের কৌশল স্ফুলিঙ্গপাত
দাহ্যতায় সব বুঝি ভুলে গ্যাছো!
লীলায় লীলায় অঙ্ক কুটিল হিসাব
অস্ত্রসজ্জা সৈন্যমুখ...তোমাকে অচেনা।
এ বেশ চেনে না ব্রজ।দুরন্ত কিশোর ভাঙো                  লজ্জা ও ক্লেদ মাখনে লালিত দেহ ব্রজরজ মেখে দামাল ষণ্ড হও।লজ্জাবস্ত্র উড়ে যাক কামনার বনে...

তুমি রক্ত আর অস্ত্রহীন দুরন্ত রাখাল হাসিমুখ      বাঁশির প্লাবনে আমাদের নিশ্ছিদ্র কালো মুছে দাও।

           কবি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
গোপেশ্বরপল্লি, বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া







অকাল শ্রাবণ

রোদ কাতুরে সংসার —অকাল‌ শ্রাবণ সাথে
জ্যোৎস্না পোয়াবো সারারাত ।
নক্ষত্রের অভিসার —
পায়ে পায়ে চলি পাশ ফিরি —
উপসর্গ ঝেঁপে আসে — খুনসুটি,
কখনো শ্বেতকরবী হাসনুহানা বাহারি পাতা ও 
কখনো বা...
পোয়া পোয়া বুনো শূন্যতা।
ফন্দিবাজ স্ক্রিপ্ট — ভেঙে তছনছ গৃহস্থালি সজ্জা।
পাড়াতুতো কাক শালিক ঘুঘু—
প্রিয় কলম আর জল রং — ছাইচাপা গুপ্ত বিদ্যা
খুব ভালবাসবো ঝুঁকে পড়া কবিতা
আধখাওয়া চাঁদ লগন — আমার জল নৌকা- জনম।
ছাড়তে পারি না মরণের অভ্যাস।
নৈঃশব্দ্যের আলিঙ্গন—ছুঁয়ে অকাল শ্রাবণ।

কবি সোমা ঘোষ
১/১৬ রূপচাঁদ মুখার্জী লেন, ভবানীপুর, কলকাতা 




















 


 ফিরে দেখা শারদীয়া

কাঁধে কোদাল আর হাতে ঝুড়ি নিয়ে কৃষ্ণদাকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেই মনের মধ্যে কি সে  চঞ্চলতা…! হ্যাঁ ,তবে তো আর বেশী দেরী নেই, দুর্গাপুজার দিন আগত প্রায়। প্রতিবারই,বিশ্বকর্মা পুজার দু-এক দিন পরেই কৃষ্ণদা আসতো... আমাদের বাড়ির চারিপাশের সব আগাছা পরিস্কার করতে।দুদিন ধরে কৃষ্ণদা কাজ করত, আর আমি কোন না কোন অজুহাতে স্কুলে না গিয়ে কাজ দেখতাম...আর মনে মনে পরিকল্পনা করতাম...পুজোতে কি কি করব। 

নিম্নমধ্যবর্তী,একান্নবর্তী আমাদের পরিবারে শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে তখন সকলের মনে অনাবিল এক আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হত। পরিবারের যে সকল সদস্যরা জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে অন্য কোথাও থাকত,এ সময়টাতে তাঁদের বাড়িতে আসতেই হত। এটা একটা রীতি ছিল বলা যায়। রীতি বলতে কি...আমার বাবা চাইতেন...অন্তত শারদীয়ার সময় একসাথে সবাই মিলে ক’টা দিন কাটাই –এই আর কি।ষষ্ঠীর আশপাশ সবাই আসতেন ...আর লক্ষ্মীপুজার পরে যে যার কর্মস্থলে ফিরে যেতেন। তখন আবার আমরা,পরবর্তী শারদোৎসবের প্রতীক্ষায় দিন গুনতাম ।

আগে থেকে বলে নেওয়া ভাল,শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে আমাদের বাড়ির এই মিলন মেলায় চারিদিকে সাজ সাজ রব পরলেও,আমাদের  নিজেদের বাড়িতে কিন্তু দুর্গাপূজা হত না কোনকালেই..লক্ষ্মী পুজার আয়োজন হত জাঁকজমক করে। তবে পাড়ায়,ক্লাবের পুজোতে আমাদের পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহন থাকতো। আর ব্যক্তিগত ভাবে পুজা আয়োজন না করতে পারলেও মনে খেদ ছিল না,সমস্ত কিছু আয়োজনে আমাদের মুখ্য ভূমিকা থাকতো।সার্বজনীন পুজা প্রকৃত অর্থেই সার্বজনীন ছিল—এখনকার মত অমুক প্রভাবশালীর ’সার্বজনীন দুর্গাপূজা’ ছিল না।  

আমার বাবা আর তাঁর ভাইয়েদের সংসার মিলেমিশে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার।দাদু,ঠাকুমা গত হয়েছেন অনেক আগেই। একই হাঁড়িতে খাওয়া–দাওয়া...একই বাড়িতে প্রত্যেকের নিজস্ব ঘর...জীবিকার প্রয়োজনে যারা বাইরে থাকতেন,  তাদেরও ঘর নির্দিষ্ট ছিল।শারদীয়ায় বাড়িতে না এসে  অন্যত্র বেড়াতে গেছেন তারা কখনও,এমন ঘটনা মনে করতে পারছি না।আসলে অলিখিত একটা সার্কুলার ছিল- সারা বছর যে যেখানেই বেড়াতে যাও,কোন বাঁধা নেই,কিন্তু পুজোর কটা দিন সবাই একসাথে কাটাতে হবে। এই নিয়মের পরিবর্তনের ইচ্ছে কখনও কারও মধ্যে জাগ্রত হলেও একান্নবর্তী পরিবারের নির্মল সত্বাকে অটুট রাখার প্রত্যয় ছিল সবার মধ্যে। বস্তুত একান্নবর্তী পরিবারের ভিত্তি যে বিষয়গুলির উপর দাঁড়িয়ে অর্থাৎ অনুশাসন,আত্মত্যাগ, সহযোগিতা,নির্মল আন্তঃসম্পর্ক সংরক্ষণের প্রচেষ্টা এবং সমন্বয়সাধন...সেগুলি আমাদের পরিবারে ছিল। এছাড়া আরও একটি বিষয় ছিল,সেটি হল -‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা।'গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধ সমালোচনা থাকলেও,আমার মনে হয় একান্নবর্তী পরিবারের অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ কিন্তু এই নীতি দ্বারা যথেষ্টই সুরক্ষিত।আমাদের বাড়িতে সকলের মত নেওয়া হলেও বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিতেন।তবে,প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন সাধনে তাঁদেরকে নমনীয় হতে দেখেছি। হয়ত শৃঙ্খলার পাশাপাশি এই নমনীয়তার জন্যই পরিবারে শান্তি বিরাজ করত।

মহালয়ার দু –এক দিন আগে বাড়ির নারকেল গাছগুলি থেকে সব নারকেল পেড়ে ফেলা হত। আমার কাজ ছিল,সেই নারকেলগুলো বস্তায় ভরে সিঁড়ি ঘরের নিচে রেখে দেওয়া। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই প্রাতঃরাশে আইটেম হিসেবে ও দুপুরের রান্নায় ঐ নারকেলের প্রয়োগ ছিল অব্যাহত। আর তাছাড়া ,লক্ষ্মী পুজার অনেক আগে থেকেই মা,কাকিমাদের এক বেলা উপোষ করে  নারকেলের নাড়ু ,সন্দেশ প্রভৃতি তৈরি করতে দেখতাম লক্ষ্মীপূজার আয়োজনের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে ।।আমার মায়ের নেতৃত্বে অন্যান্য কাকিমারা এই মহাযজ্ঞে সামিল হতেন।এছাড়া কোন রান্নার লোক না নিয়ে ,এতগুলো লোকের খাবার তৈরির দায়ভার তো এঁদের ছিলই। সকলকে খাইয়েই তৃপ্তি ,সকলে খেয়ে তৃপ্ত হলেই যেন ওঁদের আনন্দ। আগে থেকে বলে নেওয়া ভালো,আর্থিক সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং শারীরিক সংরক্ষণের জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রনের বিষয়টি মেনে নেওয়ার ইচ্ছে আমাদের পরিবারের কারও মধ্যেই ছিল না।তাই এই কয় দিন রসিয়ে বিভিন্ন খাওয়া-দাওয়া পর্বকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হত।

উৎসবকে উপলক্ষ করে এসময়  আমাদের বাড়ির  সদস্য ছাড়াও অনেক আত্মীয় –স্বজন এ সময় আমাদের বাড়িতে এসে থাকতো।যেমন,আমার পিসিরা, মা-কাকিমাদের বাপের বাড়ির লোকজন অর্থাৎ মামাবাড়ি হতে কেউ কেউ ...সবাই একসাথে মিলে মিশে ...মনে হত  যেন এ বাড়িতেই  সার্বজনীন দুর্গোৎসব। আর এত লোকসমাগমে যে বিপুল খরচ হত,তারজন্য বাবা,কাকারা মিলে যৌথ তহবিল গঠন করতেন।প্রত্যেকের আয়ের মধ্যে  বিশাল ফারাক তেমন কিছু ছিল না।তার জন্যেই  হয়ত  মনোমালিন্যের সম্ভাবনা কম ছিল। তবে সবচেয়ে মজার ছিল সপ্তমী থেকে একাদশী পর্যন্ত, দুপুরের খাওয়াদাওয়াটা।এটা হত ব্যক্তিগত স্পন্সরশিপের মাধ্যমে – কমন ফান্ড থেকে খরচ হত না। যেমন সপ্তমীতে হয়ত বাবা বাজার করলেন...অষ্টমীতে আর এক কাকা ...তারপরের দিন আরেকজন ...এভাবে হত। এবং এভাবে হওয়ার  ফলে খাওয়াদাওয়াটা হত জম্পেশ ...প্রতিযোগিতাও থাকতো তবে ভেতরে ভেতরে, প্রকাশিত হত না । আমি,দাদা আর আমার খুড়তোতো ভাইয়ের কাজ ছিল প্রতিদিন সকালে, ওঁদের সাথে বাজারে যাওয়া। হাতে-কলমে ভারী ব্যাগবহন শিক্ষালাভ,ক্রয়পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ এবংপরিবেশের সাথে অভিযোজনের শিক্ষাগ্রহণ প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই হয়ত আমাদেরকে নেওয়া হত।বোনেদেরকে অবশ্য এসব চাপ থেকে রেহাই দেওয়ার চল ছিল।

আমাদের বাড়ির তিনদিক ঘিরে আরও কয়েকটি বাড়ি,আমার বাবার কাকাদের বাড়ি। তাঁরাও আমাদের আত্মীয় যদিও তাঁদের খাওয়াদাওয়া বা অন্যান্য বিষয় তাঁরা নিজেদের মতই করতেন। কিন্তু ভাব আদান –প্রদানের পরিবেশ ছিল বলে সামগ্রিক ভাবে একাকীত্ব অনুভব করতাম না কখনও ।আর পুজোর সময়টাতে সবাই মিলে হইচই করেই কাটাতাম একসাথে। যাইহোক,বাজার থেকে ফিরে,সকালের খাবার খেয়েই আমার বাবার খুড়তোতো ভাই ( আমারই  বয়সী ছিল) এর সাথে বেরিয়ে পড়তাম ...গন্তব্যস্থল – ক্লাবের পূজামণ্ডপ।ক্লাবের পুজোয় তখন সকাল থেকেই সব বয়সীদের ভিড় লেগেই থাকতো। বিভিন্ন বয়সীদের আলাদা আলাদা বিভিন্ন ব্যাচ...প্রত্যেকেই শারদীয়ার অনাবিল আনন্দের স্বাদ গ্রহন করতাম। সেখানে আবার প্রত্যেক ব্যাচের, তাদের সিনিয়র ব্যাচের সদস্যদের প্রতি সম্মান দেখানোর চল ছিল।যেমন,আমাদের মতো উঠতি  বয়সীদের কারও যদি পুজোর আনন্দে আত্মহারা হয়ে,প্রথম সিগারেট খাওয়ার পরম ইচ্ছে জাগত ...তাহলে তাকে ওখান থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে লুকিয়ে খেয়ে আসতে হত ।আর ফিরে আসার আগে তারা লেবুপাতা,এলাচ আরও কত কিছু খেয়ে আসত,যদি কেউ গন্ধ পায়...। 

বড়রা পুজোর যে সমস্ত কাজ করতে বলতেন বেশ নিষ্ঠা সহকারে করতাম।আর এভাবে এই আনন্দে সামিল হওয়ার কোন এক ফাঁকে বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসতে  হত। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না;বাড়ির লোকেরাও নিশ্চিন্ত হতেন ...না ,ছেলে বেপথে যায় নি।মোবাইল ফোন ,ফেসবুক,ছিল না বলে তখন আমরা মুখোমুখি বসেই ভাবের আদান – প্রদান করতাম।খুব খারাপ ছিলাম,একথা বলব না। আর এত কিছুর মধ্যে,মোবাইল এ কন্টাক্ট করে নয় ,মনের টানেই নির্দিষ্ট সময় পৌঁছে যেতাম প্রেয়সীর কাছে। এর জন্য অবশ্য সময় নির্দিষ্ট করে রাখতে হত আগের থেকেই ,সবার অগোচরে বন্ধুদের সাথে অধিকাংশ সময় থাকি …এখন ওদের সঙ্গ বেশ কিছু সময়ের জন্য ত্যাগ করে প্রেয়সীর সাথে কাটাবো …একটু ইতস্তত লাগত …।ফিরে এসে বন্ধুদের কাছে ধরা পরে গেলে ,ঘুষ হিসেবে,পরে কিছু একটা খাওয়াবো এইরকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেতে হত।সব দিক সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতোই।

বাড়ীতে তখন এতগুলো লোক ,খাওয়াদাওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় বাসনপত্র দরকার তা আমাদের নিজেদের বাড়িতেই ছিল।মা,কাকিমারা মিলে সবকিছু নিজেরাই রান্না করতেন,ক্যাটারার ডাকার চল  ছিল না ।তবে মেনু ঠিক করতেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরাই,আমার মা শুধু ঐ আলোচনাতে অংশগ্রহণের অধিকার পেতেন।মশালাযুক্ত বিভিন্ন আমিষ সাবেকী পদগুলোই মেনুতে প্রাধান্য পেত। আজকাল অবশ্য  বাঙালি ঘরের খাবারের মেনুতে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। তবে তখন সবার মধ্যে শরীর সচেতনতা কম ছিল বলে কিনা জানি না ,হাই ফ্যাটযুক্ত,হাই প্রোটিনযুক্ত এবং মণ্ডা-মিঠাই  চর্ব্যচোষ্য করে খাওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিধা দেখতাম না।যাইহোক ,আনন্দের এই দিনগুলিতে খাওয়াদাওয়ার বিষয়টা যে অধিক প্রাধান্য পেত,একথা বলাই বাহুল্য।

এখন তো শপিং মলের যুগ,পুজোর কেনাকাটা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় আজকাল।আর এখন তো সবার একাধিক জামাকাপড় কেনাকাটার চল,পুজোর সময়। আমাদের বাড়িতে তখন কিন্তু অন্য নিয়ম ছিল। প্রত্যেকের জন্য একটাই সেট,আর তা কিনতে কিনতে ষষ্ঠীর দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত। আমার কাকা এবং আমার মা বাড়ির ছোটোদের নিয়ে ষষ্ঠীর বিকেলে একটি নির্দিষ্ট দোকানে নিয়ে যেতেন । নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে ঐ দোকানেরই মজুত জামাকাপড়ের মধ্যে থেকে আমাদের পছন্দ করতে হত। কেন্দ্রীভূত ভাবে এই কেনাকাটায় কারও কারও মধ্যে আক্ষেপ থাকলেও ,কেউ প্রকাশ করতেন না। কারও মনে হয়ত  ভাবনা আসত ...আমি টাকা দিচ্ছি অথচ আমার ছেলে বা মেয়ের জন্য জামাকাপড় নিজের পছন্দ অনুযায়ী কেনার সুযোগই  পেলাম না ...।কিন্তু,সকলেই শুধু পরিবারের শান্তির জন্য হয়ত এই ব্যবস্থা মেনে নিতেন।আজকের দিনে কোন পরিবারে,এ পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব কিনা,আমি সন্দিহান। আসলে বিশ্বাস,ত্যাগ, আর নির্ভরতা এই গুনগুলির বাস্তব উপস্থিতি ছিল বলেই হয়ত বাড়ির প্রত্যেকের চেষ্টায় অবিশ্বাস্য এক শান্তির পরিবেশ রচিত হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই,এরকম এক পরিবেশে বড় হয়েছি বলেই আজও যে কোন পরিবেশের সাথে অভিযোজন করতে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হই না। 

আমরা ছোটরা,পুজোর চারদিনই ঠাকুর দেখতে যেতাম। মা-কাকিমারা ঠাকুর দেখতে যেত,অষ্টমী বা নবমীর মধ্যে যে কোন একদিন,সবাই একসাথে। ওঁদের এই একসাথে ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আমার খুব ভাল লাগত। যাইহোক, তিনদিন খুব আনন্দে কাটাবার পর,দশমী এলেই মনটা বিষাদগ্রস্থ হত । কাল থেকে তো আর  এই পূজামণ্ডপ, এত আলোর রোশনাই,এত আনন্দের বন্যা এসব থাকবে না।এত লোকের সাথে ভাব বিনিময়ের অবাধ সুযোগ তো আর পাব না।দশমীর বিকেলে মা-কাকিমারা সবাই একসাথে পূজামণ্ডপে গিয়ে প্রতিমা বরণ করতেন।ওঁদের এই সকলে একসাথে মিলে যাওয়ার ছবিটা যেন আজও আমার স্মৃতিতে সুস্পষ্ট । পারিবারিক সংহতির এর চেয়ে আর ভাল উদাহরন কি হতে পারে,আমার জানা নেই । এরপর,দশমীর রাতে পূজামণ্ডপে ধুনুচি নৃত্য,তাতে সামিল ক্লাবের সব বয়সের সদস্যরা...সবশেষে বিসর্জনের শোভাযাত্রা। বিষাদের করুন সুরকে আনন্দের মুখোশ পরে ভুলে থাকার কৌশল। বিসর্জনের শেষে ,বাড়ি ফিরে আমরা বাড়ির বড়দের বিজয়ার প্রনাম করতাম। পরদিন আবার প্রতিবেশী পরিবারের বড়দেরও প্রনাম করতে যেতাম।তাঁরাও আমাদের হাতে নারকেলের নাড়ু অথবা সন্দেশ কিছু একটা দিতেন। আমাদেরকে প্লেটে না দিয়ে এই যে হাতে দিতেন,এরজন্য মনের মধ্যে কোন ক্লেশ অনুভব করতাম না,এটাই যেন রীতি ছিল। আজকাল অবশ্য ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের কল্যানে শুভ বিজয়ার হার্দিক ভাব বিনিময় প্রথার বেশ পরিবর্তন ঘটেছে । নতুন পদ্ধতিতে অর্থ ও সময় দুয়েরই সাশ্রয়  কিছু হয়ত ঘটেছে কিন্তু, পুরো বিষয়টাই কেন জানি না কৃত্রিমতার চাদরে ঢেকে গেছে । বিজয়াকে কেন্দ্র করে বছরে একবার অন্তত বাধ্যতামূলক আত্মীয়স্বজনের  বাড়ি যাওয়ার নিয়মটা আজ অবলুপ্তির পথে।সত্যি কথা বলতে কি, এখন আর কেউ বিজয়ার পরে বাস্তব মিষ্টিমুখ করায় না, হাঁড়িভর্তি মিষ্টির ছবি পাঠায়।

সময়ের বিবর্তনে,জীবিকার প্রয়োজনে আমাদের বাড়ির আরও অনেকের মত,আমি এখন অন্যত্র থাকি। বাড়িতেও এখন আর আগের মত অত লোকসমাগম হয় না।কালের নিয়মে এখন বাড়িতেও আর আগের মত অত লোক নেই।সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে,ব্যক্তিগত সুবিধা –অসুবিধাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্গাপূজাতে বাড়িতে সকলের সামিল হওয়াটা এখন আর হয় না।স্মৃতিতে পুরনো সেই দিনগুলির  ছবি ভেসে ওঠে  প্রায়শই...নস্টালজিক হয়ে পড়ি।বসে ভাবি ,বাড়িতে তো তখন কত অভাব ছিল ,কিন্তু শান্তিপ্রাপ্তির সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা এত তীব্র ছিল যে পুজো্র কটা দিন বাড়িতে এত আনন্দঘন শান্তির পরিবেশ রচনায় কোন কিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

যতদিন বেঁচে থাকব,শারদীয়ার সেই দিনগুলির স্মৃতি উজ্জ্বল থাকবে আমার মনের মণিকোঠায়। 

সাহিত্যিক প্রবীর দে
তুলসীবাগান ,বিরাটী, কোলকাতা -৫১





























রূপান্তরের দংশন চিহ্ন

আমি তো কতবার বলেছি
ফুলের মতো সবার সামনে ফুটতে পারি না
নিজেকে নিজের ভেতর ঢেকে রাখি
অপরাধ ঢাকার মতো করে।

কতগুলো দিন মাস লম্বা একটা বছর...
মুঠো ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে বসে আছি

বুঝবে কি করে ? কেবল চাক্ষুস পরিচয় !  

অন্তস্থলে যে গান বেজে ওঠে
গানের গিটার ভেসে যায় সমুদ্রে
তার সুর বুঝতে পারো ? ও কেবল কৃষ্ণসাগর
শুধু কান্না ভরা তরঙ্গ ! তুমি কান্না বোঝ না !
আমাকে কি বুঝবে ?

কাহিনির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে কবিতা
ভেবেছ কোনদিন ?

আমাকে নিয়ে ভাবছ !
আমার প্রেমের মায়া ছেড়ে বেরিয়ে এসো
তবেই হয়তো আমাকে ছুঁতে পারবে।

ছুঁলেই বুঝতে পারবে
আগুনে হাত রেখে আমার যাত্রা শুরু
যেভাবে মানুষ আদিম যুগে শোক কে
পোড়াবার জন্য আগুন জ্বেলেছিল তাদের বুকে।
ঠিক সেভাবে তোমার মধ্যের
কারসাজি,চাতুর্য সব কিছুকে
মনোবেদনার আগুনে পুড়িয়ে দাও
দেখবে তোমার হৃদযন্ত্রটা চিতাগ্নীর মতো দাউ দাউ...

মৃত্যু উপত্যকা জুড়ে কেমন সবুজ চাদর বিছানো
ওইখানে নীল ডুবুরির সন্ধান পাবে
যে তোমাকে ডুব সাঁতার শেখাবে

তবেই তো পাগলামির ভাষা শিখবে

বিচ্ছেদেও প্রেম প্রকাশ হয় তা বুঝব।।
ঋতুগন্ধ ও প্রেমিক বুঝতে পারবে 

পাগলামির দীর্ঘ পথ অতিক্রম কর

তবেই বুঝতে পারবে মহাজাগতিক রশ্মিকে
কিভাবে আগুনে রূপান্তর করা যায়। 

রূপান্তরের দংশন চিহ্ন যেদিন
সারা গায়ে লেপ্টে যাবে,সেদিন বুঝবে।

কবি সুকুমার হালদার
৪/১ যাদবগড়, হালটু, কলকাতা 
























বাণ-মোচন

“তখন পাড়া-গ্রামে একটা রীতির চল ছিল খুব বেশি। যখন কোনো মানুষের কারুর উপর রাগ মেটানোর থাকত, বা প্রতিশোধ নেবার থাকত – তখন সে কোনো এক ওঝা বা গুণীণ-এর সাহায্য নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বাণ মেরে দিত। না, এখানে ‘বাণ’ বলতে ঠিক ‘তীর’ নয়, সেটি হল কোনো অপার্থিব জিনিসের দ্বারা প্রেরিত কোনো অভিশাপ – যেটি উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিসাধন করত। এই গোটা ব্যাপারটা কতটা সত্যি আর কতটা বুজরুকি – তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে এমনই একটা গল্প শুনেছিলাম আমার খুব কাছের একজন মানুষের কাছ থেকে, যে তার নিজের সাথে ঘটা ঘটনাটি আমাকে শুনিয়েছিলেন।” –এতটা বলে বটুকবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।
“আপনি যখন মনেই করেন ওটা বুজরুকি, তাহলে আর আমাদের শোনাচ্ছেন কেন? আপনি যে বলেন - প্রমাণ না পেলে আপনি কিছু বিশ্বাস করেন না?” –জগন্নাথ বলল।
বাকি সকলে ধমকে চুপ করিয়ে দিল জগন্নাথকে।
বটুকবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুরু করলেন-
আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া শিপ্রা পিসি, বাগুইহাটিতে থাকতেন। আমায় খুব স্নেহ করতেন উনি। ছোটোবেলায় প্রতি গরমের ছুটিতে ওনার বাড়িতে গিয়ে থাকতাম, আর উনি প্রতিদিন দুপুরে আমাকে বিভিন্ন রকমের গল্প শোনাতেন। সেই সময়কালেই শুনিয়েছিলেন এই গল্পটা। ওনার নিজের সাথেই ঘটা একটি ঘটনা।
ঘটনাটা ওনার বারো কি তেরো বছর বয়সের। একদিন শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ অনুভব করেন - ওনার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বুকের উপর যেন ভারী কিছু জিনিস চেপে রয়েছে! কখনও শ্বাস নিতে গিয়ে দম আটকে যাচ্ছে, আবার কখনও শ্বাস ফেলতে গিয়ে দম আটকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কিছুক্ষণ বাদে বাদে কেউ তাঁর গলা চেপে ধরছে! তাঁর বড়ই করুণ অবস্থা তখন। এতই কষ্ট পাচ্ছেন যে তা চোখে দেখলে মায়া লাগে, চোখ থেকে জল বেরিয়ে যায়! শিপ্রা পিসির বাবা-মা তাঁকে কাছেই এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না। তিনি হাসপাতালে ভর্তি করতে বললেন। তাও হল। কিন্তু তাতেও অবস্থার খুব একটা উন্নতি হল না। অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে রাখতে হচ্ছিল সারাক্ষণ। এরপর বহু ডাক্তার, কবিরাজ, এমনকি ওঝার কাছে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। দিনে দিনে রোগ বেড়েই যেন চলে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে পড়াশুনা ডকে তুলে দিয়ে শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে পুরো। শিপ্রা পিসি ছাড়া ওনার মা-বাবার দ্বিতীয় কোনো সন্তান নেই। ওনারা পিসিকে ভালও বাসেন প্রচন্ড। চিন্তায় ওনাদেরও যেন ঘুম উড়ে গেছে ওই ক’টা দিনে। পিসিকে নিয়ে কি করবেন, কোথায় যাবেন - তার দিশা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা। এমনই সময় দেবদূতের মত তাঁদের জীবনে আবির্ভাব হল তাঁর। হিমাদ্রী সাধু, ঠিক মহামানবের মত পিসিকে এই বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করতে আবির্ভূত হন।
পিসিদের পাড়াতেই একটা বারোয়ারী কালী মন্দির ছিল। সেখানেই আসতেন হিমাদ্রী সাধু। লোকে বলে তিনি নাকি কোনো জমিদারের বংশধর। অবশ্য তার চালচলন, কথাবার্তায় আভিজাত্যের ছাপও প্রচন্ডভাবে ফুটে উঠত। ছয় ফুটের বেশি উচ্চতা, গৌড় বর্ণ, টিকালো নাক, তেজস্বী স্বর, মাথায় এত্ত বড় জটা, শিষ্যদের দেওয়া দামী মখমলের কাপড়, আর কাঁধে একটি ঝোলা ব্যাগ – এ’সবের সমাহারে তাকে মানাতও দারুণ। আশেপাশের মানুষজন তাঁকে শ্রদ্ধাও করতেন খুব। তবে, জমিদারি ছেড়ে উনি কেন যে তন্ত্রসাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত করলেন তা সকলেরই অজানা। প্রতি অমাবস্যাতে মন্দিরের কালী মা-কে পুজো করতন। পুজোর সময় দামী কাপড় ছেড়ে শুধুমাত্র একটি লাল রঙের কটিবস্ত্র ধারণ করতেন। ছুড়ি দিয়ে হাত কেটে নিজের রক্ত দিয়ে তুষ্ট করতেন তিনি মায়ের চ্যালা-চামুন্ডাদের। যজ্ঞ করতেন, যার শিখা উঠত অনেক উঁচু অবধি। দূর দূর থেকে লোক আসতেন তাঁর পুজো দেখতে। উনি বলতেন সেখানের মা নাকি খুবই জাগ্রত।
পাড়ারই এক ব্যক্তির পরামর্শে শিপ্রা পিসির বাবা-মা পিসির ব্যাপারে কথা বললেন হিমাদ্রী সাধুর সাথে। সব কথা শুনে উনি পিসির সাথে একবার দেখা করতে চাইলেন। দেরী না করে তৎক্ষনাৎ ওনাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পিসির বাবা ওনাকে বলেন – টাকা-পয়সা যতই লাগুক উনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। কথাটা শুনে হাসেন হিমাদ্রী সাধু, বলেন, “টাকা-পয়সা দিয়ে কারুর প্রাণ কেনা যায় না রে... তবে, ওকে দেখে আমি জানলাম - ওর মধ্যে কিছু বিশেষ সুপ্ত গুণ রয়েছে, যেগুলো পর্বরতীকালে প্রকাশ পাবে। তাছাড়া তোদের মেয়ের মনের জোড় খুব বেশি, অন্য কোনো মেয়ে হলে এতদিনে মরেই যেত।”
শিপ্রা পিসিকে সাহায্য করতে রাজি হলেন হিমাদ্রী সাধু। ঠিক হল – আগামী অমাবস্যায় মন্দিরে কালী পুজ়ো সেরে তিনি আসবেন তাদের বাড়িতে। অনেক কঠিন কাজ করতে হবে। সারারাত ধরে চলবে কর্মসূচী। পিসির বাবাকে কিছু জিনিস আনিয়ে রাখতে বলে তিনি বেড়িয়ে যান বাড়ি থেকে।
যথারীতি অমাবস্যার রাত উপস্থিত হয়। মন্দিরের পুজো শেষ করে সোজা শিপ্রা পিসিদের বাড়িতে যান হিমাদ্রী সাধু। সমস্ত সরঞ্জাম নির্দেশ মত আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা ছিল। সিঁদুর, লেবু, খোসা ছাড়ানো নারকেল, প্রদীপ ইত্যাদি। হিমাদ্রী সাধু এসেই ফাঁকা ঘরের মধ্যে সিঁদুর দিয়ে একটা বড় ত্রিভূজ এঁকে ফেলেন, আর তার ভিতরে কোনো এক অজানা ভাষায় সিঁদুর দিয়েই কিছু লেখা লেখেন। তারপর ত্রিভূজের তিনটে কোণে তিনটে লেবু ও রক্তজবা ফুল রেখে দেন, এবং ভিতর দিক করে তিনটে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন। তারপর পিঠের ঝোলা ব্যাগটা আস্তে আস্তে নামিয়ে ভিতর থেকে বের করেন তিনটে ছোটো ছোটো ঘট জাতীয় মাটির পাত্র, যার মুখগুলো ছিল লাল কাপড়ে মোড়া। সেগুলিকে তিনি ত্রিভূজের মাঝখানে রাখেন এবং তিনটে খোসা ছাড়ানো নারকেল চাপিয়ে দেন সে’গুলির কাপড় জড়ানো মুখের উপর। এরপর শিপ্রা পিসিকে নিয়ে আসতে বলেন পাশের ঘর থেকে। পিসি আসলে তাঁকে বসানো হয় ত্রিভূজের ভিতর, হিমাদ্রী সাধুর বামদিকে।
হিমাদ্রী সাধু পিসিকে বলেন, “কিছুক্ষণ পর তুই আর আমি ছাড়া এই জায়গায় আরেকজন আসবে। তুই তাকে একদম ভয় পাস না যেন। তোর কোনো ক্ষতি করবে না সে। সে আমার মেয়ের মত। তুই চোখ বন্ধ করে রাখবি, আর সে যা জিজ্ঞেস করবে তুই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে উত্তর দিবি শুধুমাত্র। আর একদমই এই ত্রিভূজ ছেড়ে বাইরে পালিয়ে যাবি না। ঠিক আছে মা?”
“হুম্‌, ঠিক আছে।” –এটুকু বলতেই যেন খুব বেগ পেতে হল পিসির।
“তোরা বাইরে চলে যা। আর দরজাটাকে বাইরে থেকে টেনে দিয়ে যাবি। আমি যতক্ষণ না বলব এদিকে আসিস না যেন।” –শিপ্রা পিসির বাবা-মা কে বলেন হিমাদ্রী সাধু।
“মা রত্না, বেড়িয়ে আয় মা। দেখ... এই ছোট্ট মা-টার কি কষ্ট! তোর কাছে সাহায্য চাইছে মা রে। তুই আসবি না? রত্না মা আমার...” –একটা মাটির পাত্র থেকে নারকেলটা নামিয়ে রেখে, তার মুখের লাল কাপড় সরাতে সরাতে বলে চললেন হিমাদ্রী সাধু।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অপার্থিব গর্জনের মাধ্যমে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল শিপ্রা পিসির। ঘরে আলোর পরিমাণ এতই বেড়ে গেছে যে বন্ধ চোখেও যেন চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম!
“হু-উ-ম্‌-ম্‌!” –আবার সেই অপার্থিব গর্জন, সাথে কিছুটা গোঙানির আওয়াজ।
পিসি ঠক্‌-ঠক্‌ করে কেঁপেই চলেছেন ক্রমাগত। শীতের রাত্রেও ঘাম দেখা দিয়েছে তাঁর শরীরে।
“তোর নাম শিপ্রা?” –সেই বীভৎস গলায় নিজের নাম শুনে পিসির তো অবস্থা যেন আত্মারাম খাঁচাছাড়া।
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে পিসি উত্তর দিলেন, “হুম্‌।”
“আভারাণী-কে চিনিস?”
“না।”
“প্রীতিকণা-কে?”
“হ্যাঁ। আমার সাথে পড়ে।”
কথা শেষ করার সাথে সাথেই শুরু হয় বিকট চীৎকার।
“শান্ত হ মা রত্না... শান্ত হ... বাচ্চা মেয়ে...” –হিমাদ্রী সাধু যেন কাকুতির সুরে বলে ওঠেন। “শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ –তে উত্তর দে শিপ্রা মা, আর কিছু নয়।” –তিনি পিসিকে কিছুটা শাসনের সুরে বলেন।
এতকিছুর মধ্যে হঠাৎই শিপ্রা পিসির মাথায় চলে আসে – আভারাণী তো তার সাহপাঠী প্রীতিকণার মায়ের নাম!
সাথে সাথেই পিসি অনুভব করেন তার কানের পাশ থেকে যেন একটা গরম হাওয়া ‘হুশ’ করে বেড়িয়ে গেল। সাথে সাথে পিছনের দরজাটাও যেন নিজে নিজেই সশব্দে খুলে গেল।
হিমাদ্রী সাধু চীৎকার করে শিপ্রা পিসির বাবা-মাকে ডাক দিলেন। ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটে বাজে। পিসির বাবা-মা আসতেই উনি বলেন, “আমার কাজ এখানে শেষ। এ’বার আমায় বেরোতে হবে।”
পিসির বাবা-মা বাধা দিয়ে বলেন, “এত রাত হল, আপনি কোথায় যাবেন? আজ রাতটা আমাদের বাড়িতেই থেকে যান।”
“না না, এখানে থাকলে আমার চলবে না। চিন্তা করিস না, আমি আজ তোদের পাড়াতেই ওই পুকুর ধারটায় রাত কাটাব।” –হিমাদ্রী সাধু বলেন। “শিপ্রা মা, আজ রাত টা কোনো রকমে একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দে। কাল সকালে উঠে দেখবি তুই পুরো ঠিক হয়ে গেছিস। আমি সকালে আসব তোদের বাড়িতে।” –পিসির দিকে ঘুরে তিনি বলেন।
পরের দিন সকালে, সত্যি সত্যিই পিসির সমস্ত কষ্ট যেন সম্পূর্ণরুপে উবে গেছে। অক্সিজেন সিলিন্ডারের আর কোনো প্রয়োজন নেই। খোলা হাওয়ায় তিনি স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারছেন। যেন কোনো ম্যাজিক হয়ে গেছে, অথবা কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন এই ক’টা দিন!
“তোর মেয়ে প্রতি ক্লাসে প্রথম হয়। আর ওর বন্ধু প্রীতিকণা কোনোবছরই সেই জায়গাটা পায় না। তাই ঈর্ষা তৈরী হয়েছিল তার মনে। তার মা আভারানী ওই পাড়ার রমেশ ওঝার সাহায্য নিয়ে বাণ মেরেছিল তোর মেয়েকে। যাতে আর সে পড়াশুনা না করতে পারে। আমার রত্না মা গিয়ে রমেশ ওঝাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে না – সে আর এই জন্মে কোনো মানুষের ক্ষতি করার চিন্তা মাথাতেও আনবে না।” –হিমাদ্রী সাধু বললেন শিপ্রা পিসির বাবা-মা কে।
এরপর থেকে সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকে। হিমাদ্রী সাধু মাঝে-মধ্যেই আসতেন শিপ্রা পিসির বাড়িতে, সকলের খোঁজ-খবর নিতে।
এতটা বলে চুপ করলেন বটুকবাবু।
“ব্যাস... শেষ?” –জগন্নাথ প্রশ্ন করল।
“পিসি বলতেন – তার বহু বছর পর এক রাতে স্বপ্নে একজন অচেনা মহিলাকে দেখেছিলেন। সেই মহিলা পিসির নাম ধরে ডেকে বলেছিলেন, ‘কেমন আছিস শিপ্রা? আমায় চিনতে পারছিস? আমি রত্না। আমার মুক্তি হয়ে গেছে আজ, আমি চললাম। ভালো থাকিস।’ পিসি স্বপ্নের মধ্যেই ঘাড় নাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘ভালো আছি।’ মহিলার মুখটা অচেনা হলেও গলার স্বরটা কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছিল পিসির কাছে। তার পরের দিন সকালে তাদের বাড়িতে খবর আসে – গত রাতে হিমাদ্রী সাধু বার্দ্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন।” –বটুকবাবু বললেন।
“আর হিমাদ্রী সাধু যে বলেছিলেন – আপনার পিসির মধ্যে কিছু বিশেষ গুণ আছে, সে’রকম কিছু কি ভবিষ্যতে প্রকাশ পেয়েছিল?” –জগন্নাথ প্রশ্ন করল।
“পরবর্তীকালে উনি প্রায় চারশো বাচ্চা নিয়ে একটা অনাথ আশ্রম চালাতেন। মানবতা ধর্মের গুণ থাকার চেয়ে বড় গুন আর কিসে হতে পারে?” –বটুকবাবু বললেন।

সাহিত্যিক সুমন সেন
১৪৪/এ, সুভাষ নগর, রিষড়া, হুগলি 






















দেবীপক্ষ

ছোট্ট টুসকি'র তর সয় না, ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে বারবার খোলা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবাই আর মামমাম শপিং করতে গেছে কখন, কত কী আনবে তার জন্য, সুন্দর ড্রেস, সফ্ট টয়, কুকিজ, আরও কতকিছু! তার ঠাম্মা আর দাদু আসবে ক'দিন পরেই, সবাই মিলে প্রতিবছর বেড়াতে যায় ওরা। এবছর তো প্যান্ডেমিক, তাই কোথাও যাওয়া হবে না, এই কমপ্লেক্সে'ই যতটা হয়! তবু তো দুর্গাপুজো, কী আনন্দ হয়, ঠাম্মা কতরকম নাড়ু বানায় আর কুচো নিমকি, বেশি করে ময়ান আর কালোজিরে দিয়ে! 

পুজো'র মাসে ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকবে, অরণ্য'র সাথে দেখা হবে না তিয়াসা'র। প্রফেসর সেন কোথাও বিদেশ যাচ্ছেন সেমিনারে, নোটস আনতে যাবার নাম করে বেরোনোও যাবে না, ওই একসাথে কখনো পার্কে'র বেঞ্চ, শপিং মলে'র সামনের স্টল বা বাইকে এক চক্কর এইটুকুই তো মুক্তি'র আকাশ, মন ভালো নেই তার। আত্মীয়স্বজন, দিদি, পিসি, পুঁচকেগুলোতে ঘর ভরা থাকবে, নিজের বেডরুমটাও ছেড়ে দিতে হয় তখন, একটু কথা বলারও কি প্রাইভেসি থাকবে? ওর মোটেও ভালোলাগবেনা, সেজেগুজে বাড়ির লোকের সাথে ঠাকুর দেখতে! 

একটু দম ফেলার ফুরসত নেই তরুণী কোয়েলী'র। অভি'র অফিস নেই তো কি হয়েছে? পিসশ্বশুরেরা এবার আসছেন চন্দননগর থেকে, শাশুড়ি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, 
—বছর বছর, নেচে নেচে, বাপের বাড়ি চলে গেলে তো হবে না, আমার বয়েস হয়েছে, আত্মীয়স্বজনরা আসবে, কে করবে তাদের খাতির-যত্ন? 
অগত্যা... 
মা বলেছিলো,
 —তোর জন্য একটা লালপেড়ে গরদ কিনেছি, অঞ্জলিতে পরিস,বেশ মানাবে তোকে।
 অভি'র কাছে বলতে গেলে পাশ কাটায় সে, 
—মেয়েদের তো এগুলো মেনে নিয়েই বিয়ে থা করতে হয়! না'হলে তোমার কি মনে হয় কোয়েলী, আমি চাকরি-করা মেয়ে পেতাম না?! 
আড়ষ্ট কোয়েলী পাশ ফিরে ঘুমন্ত তিনবছরের শিশুকন্যা'র দিকে যতটাসম্ভব গড়িয়ে যায়। 

—আহা! আঁশে'র ছোঁয়া কাপড়ে ঠাকুরের নাড়ু করবে কি গো বৌমা? বিজয়াদেবী বউ-মেয়েদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এতবছর ধরে চৌধুরীবাড়িতে তিনিই সামলে রেখেছেন সব দিক। লোক-লস্কর, ছেলেপুলে, আত্মীয়স্বজন সবার সুবিধা-অসুবিধা'র দিকে তীব্র দৃষ্টি তার। ঠাকুর-চাকরেরা অবধি তাকে 'মা' ছাড়া কথা বলেনা। সেই এগারো বছর বয়েসে এসেছেন এ বাড়িতে, এখনো।পাকাচুলে সিঁদূর পড়ে, কস্তা-পেড়ে শাড়িতে তাকে দেবী'র মত মনে হয়। ঠাকুরের একশ' আটখানা পদ্ম, নৈবেদ্য, ভোগের জোগাড়-যন্ত, তারপর দেওয়া-থোয়া তো আছেই, সবকিছু সুচারুভাবে হলে তবে শান্তি। এর মধ্যে দিয়ে কবে কখন ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে গেছে তার যৌবনের সোনালি দিনগুলো তা টেরই পাননি, বিসর্জনে'র পর ফাঁকা মন্ডপে যখন প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন, মনে পড়ে তার কর্তামশাই তখনও বাইরে বাইরে, চিরদিন বিজয়াদেবী পুতুল খেলেছেন বুঝি?! ছেলেমেয়ে, সংসার আর বিষয়-আশয় নিয়ে! উনি নিয়মিত বন্ধুবান্ধব, নিজস্ব বৃত্তে মশগুল থেকেছেন,লোকে বলাবলি করে, বাগান-বাড়িতে নাকি রাতে এখনো... 
ছেলেমেয়েরা ফিরে যায় যে যার, পুজো ফুরোলে, আটচালায় কাঠামো'টা আর সে একা পড়ে থাকে এতবড় বাড়িতে! 

সন্ধেবেলা'র মুখে বাড়ি-ফেরত, একঝলক ছাতিমে'র গন্ধ এসে ঝাপটায় নাকে! আহহহহহহহ... বুক ভরে শ্বাস নেয় সাহানা, ছাতিমে'র গন্ধ তার বড় প্রিয়। পুজো এবছর দেরীতে, তাই ফুটতে শুরু করেছে। ছাতিমের গন্ধে'র সাথে মনে পড়ে যায় কত পুরনো শিশিরভেজা গল্প, শিউলীসতেজ দিন, নষ্টালজিয়া'র নাক উঁচু করে, অনির্বাণে'র কথা,হাসি,  স্মৃতি'র এলব্যামে ভেসে ওঠে। একই শহর অথচ যোজন দূরত্ব, ওর ফ্ল্যাটের দিকে তাকাতে এই মধ্যবয়েসে স্পন্ডেলাইটিস হওয়া ঘাড়, ব্যথা করে সাহানা'র, ক্ষয়ে আসা হাওয়াই চটি'র দিকে চোখ নামিয়ে নেয় সে। এমন ছাতিমফোটা দিনেই তো সে প্রথম দেখেছিল অনির্বাণ'কে, একটা নৌ-নীল শার্ট পরে। যাতায়াতের পথে কোনোদিন এক-আধবার চোখেও পড়ে যায়, সে খেয়াল করে না তেমন, নির্ভার দামী জীবনের একটা তীব্র উদাসীনতা আছে, যার জীবন সে বোঝেনা, আশেপাশের মানুষ বেশ অনুভব করে।পুজো এলে সেইসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে,সাহানা ঠিকই দ্যাখে, মধ্যবয়সী পুরুষ, একটু কি রোগা হয়েছে আগের চেয়ে? একমাথা কাঁচাপাকা চুল, চোখদুটো একইরকম উজ্জ্বল আছে এখনো। কষ্ট করে যদি চিনতে হয়, সেই ভয়ে কোনোদিন আর সামনে যাবার ইচ্ছেটা মরে গেছে, তা না হলে বড় জানতে ইচ্ছে করে, অদ্ভুত সুন্দর  সেই সন্ধেবেলাগুলোতে  যখন তারা সারাদিনের অপেক্ষা'র পর একটা অনুজ্জ্বল হলদে আলো'র নিচে দাঁড়াতো, পৃথিবী'র শ্রেষ্ঠ সুখী মানুষ মনে হত তাদের, একথা কি অনির্বাণ ভুলে গেলো? এত তাড়াতাড়ি? পুজোর গন্ধ ছাপিয়ে ছাতিমে'র আঘ্রাণ তীব্র হয়ে ওঠে। 

সে অপেক্ষা করে। সারাবছর বাড়ি'টার সাথে যাপন, ঘর, উঠোন, বাগান। তার নিজের হাতে তৈরী বসতভিটে, উনি চলে যাবার পর ছেলেরা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। জ্ঞাতিগুষ্টি, আত্মীয়স্বজনরা বলেছিল, 
—দু দুখানা ছেলে পেটে ধরেছ গো, দুটিই রত্ন,বুড়ো বয়েসে আর ভিটে আগলে থাকা কেন বাপু? একটু যত্ন-আত্তি পাবে, যাও ছেলেদের কাছে থাকোগে। 
সে পারেনি, এই বাহাত্তর বছর বয়েসেও কিরণমালা'র মন পড়ে থাকে ঠাকুরঘরে, ভেজা বারান্দায়, উঠোনের ঘাসে, বাগানে'র পাতা পড়ায়।ব্রাহ্মণ- বিধবা মানুষ, একাহারী। শরীর ভেঙেছে অনেকদিন, শুধু মনে তীব্র বিশ্বাস বেঁচে আছে, পুজো এলে ছেলেরা ঘরে ফিরবে। প্রায়ান্ধকার রান্নাঘরে ধোঁয়া'র ভেতর, পেতলে'র কড়াইয়ে সিমুই নাড়তে নাড়তে চোখ জলে ভরে যায়, ছোট'টা আজই ফিরে যাবে, নাড়ি টনটন করে ওঠে। ছেলে তার সিমুই খেতে খুব ভালোবাসে।কোলে'র ছেলে তো, আলাদা টান!  ফিগার কনশাস ছেলে আঁতকে ওঠে,
— এ তো দারুণ মিষ্টি, প্রচুর ক্যালোরি!  এক চামচ খেয়ে সরিয়ে দেয়। 
ধুলোভরা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে এক মা, হাজার মায়ের প্রতিভূ হয়ে, ছেলের গাড়ি'র লাল আলো মিলিয়ে গেছে কখন, বাটিভর্তি সিমুইয়ে জল ঢেলে দ্যায় মা। 

মিনু'র মা পাঁঁচবাড়ি গতর খাটায়,মাগনা কেউ কিছু দেয়না আজকের বাজারে, সেই ভোর থেকে রাত অবধি খেটেখুটে তবে দুবেলা ভাতের যোগাড়! ঘরের মানুষ'টা স্টেশন-বাজারে ভ্যান টানে, সন্ধে-ইস্তক নেশা-ভাঙ করে, এতগুলা ছেলেপুলে'র মুখে নুন-ভাত জোটাতে হাড়-হিম হয়ে আসে। বড় মেয়েটা'কে পনেরো পেরোতে না পেরোতে বিয়ে দিয়ে দিলো ওর বাপ-জেঠা'রা। আপত্তি করেছিল মিনু'র মা। 
—ছোটলোকের ঘরে গতর খাটিয়েই খাবে যদি বিয়ে ক্যানে তবে একন? কাঁচা শরীল। 
ওরা কথা শোনেনি। সে মেয়েকে আজ তিনবছর বাপের ঘর পাঠায়নি শ্বশুরবাড়ি'র লোক। মেয়ে আটমাসের পোয়াতি। অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছে মিনু'র মা, এবার টাকাক'টা ওর শাউড়ি'র হাতে গুঁজে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসবে সে। একখানা কাপড়'ও কিনেছে মেয়ের জন্য রেশনের দোকান থেকে। ষষ্ঠী'র সকালে মেয়েকে আনতে গিয়ে দ্যাখে মেয়ে তার স্বামী'র ঘরে নেই। জ্বরজারি হয়েছিলো, ওষুধ ডাক্তার করেনি, ভরা-পেটে পুকুরঘাটে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মেয়ে'র যমে-মানুষে টানাটানি, ফিমেল-ওয়ার্ডে'র আয়া মিনু'র মা'র বাপের বাড়ির দেশের চেনা। সে বললে, 
—ধড়ফড়িয়ে মরা'র আগে পর্যন্ত মেয়েটা মা মা করেছিল গো। 
মিনু'র মা আজকাল ঘাড় গুঁজে খাটে, পুজো-পাব্বনে বাড়ি থেকে বেরোয় না বড় একটা।             
                
এই দেবীপক্ষে অসংখ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানবী'কে তুমি দেবী'তে উত্তীর্ণ কোরো মা, জ্ঞান ভক্তি তো আপেক্ষিক, ওদের তুমি একটা হৃদয় দিও ভালোবাসা'র, একটা কপাট বুক দিও মাথা রেখে কাঁদা'র, দিনে'র শেষে অনুজ্জ্বল আলোতেও  দুটি চোখ দিও জুড়োবার। ওরা, এর বেশি কিছু চায়'না। তুমি'ও তো মেয়ে মা'গো, ঠিক বুঝবে তুমি। 

              গদ্যকার অন্তরা দাঁ                     কাঁটাপুকুর উত্তর, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ


















নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ হোম

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

  • আগস্ট (3)
  • জুলাই (22)
  • জুন (8)
  • নভেম্বর (15)
  • অক্টোবর (5)
  • সেপ্টেম্বর (81)
  • আগস্ট (66)
  • জুলাই (55)
  • জুন (56)
  • মে (57)
  • এপ্রিল (46)
  • মার্চ (15)
  • জানুয়ারি (14)
  • ডিসেম্বর (73)
  • নভেম্বর (103)
  • অক্টোবর (97)
  • সেপ্টেম্বর (101)
  • আগস্ট (120)
  • জুলাই (88)
  • জুন (76)
  • মে (63)
  • এপ্রিল (11)

🔴বিজ্ঞপ্তি:

পাঁচ মাসের বিরতি কাটিয়ে আবার ও ফিরছি আমরা। খুব শীগ্রই আসছে আমাদের প্রত্যাবর্তন সংখ্যা।

অনুসরণ করুণ

এক মাসের সর্বাধিক পঠিত পোস্টগুলি:

  • শান্তনু গুড়িয়ার কবিতা
  • ফেরারি মন ~ অসীম বিশ্বাসের কবিতা
  • তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা
  • গেরস্থালি ~ অনুশ্রী যশের কবিতা
  • শ্রমনিবিড় ~ সুমনা ভট্টাচার্য্য'র কবিতা
  • সৌগত রাণা কবিয়ালের কবিতা
  • উষ্ণতা ~ পিঙ্কি ঘোষের কবিতা
  • প্রচ্ছদ, সূচিপত্র ও সম্পাদকীয়
  • প্রেমাংশু শ্রাবণের কবিতা
  • ফিরে ফিরে আসা ~ অন্তরা দাঁ এর মুক্তগদ্য

বিষয়সমূহ

  • Poetry speaks 2
  • অণু কথারা 21
  • আবার গল্পের দেশে 8
  • উৎসব সংখ্যা ১৪২৭ 90
  • একুশে কবিতা প্রতিযোগিতা ২০২১ 22
  • এবং নিবন্ধ 3
  • কবিতা যাপন 170
  • কবিতার দখিনা দুয়ার 35
  • কিশলয় সংখ্যা ১৪২৭ 67
  • খোলা চিঠিদের ডাকবাক্স 1
  • গল্পের দেশে 17
  • ছড়ার ভুবন 7
  • জমকালো রবিবার ২ 29
  • জমকালো রবিবার সংখ্যা ১ 21
  • জমকালো রবিবার ৩ 49
  • জমকালো রবিবার ৪ 56
  • জমকালো রবিবার ৫ 28
  • জমকালো রবিবার ৬ 38
  • দৈনিক কবিতা যাপন 19
  • দৈনিক গল্পের দেশে 2
  • দৈনিক প্রবন্ধমালা 1
  • ধারাবাহিক উপন্যাস 3
  • ধারাবাহিক স্মৃতি আলেখ্য 2
  • পোয়েট্রি স্পিকস 5
  • প্রতিদিনের সংখ্যা 218
  • প্রত্যাবর্তন সংখ্যা 33
  • প্রবন্ধমালা 8
  • বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যা 10
  • বিশেষ সংখ্যা: আমার প্রিয় শিক্ষক 33
  • বিশেষ সংখ্যা: স্বাধীনতা ও যুবসমাজ 10
  • ভ্রমণ ডায়েরি 1
  • মুক্তগদ্যের কথামালা 5
  • রম্যরচনা 2
  • শীত সংখ্যা ~ ১৪২৭ 60

Advertisement

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

মোট পাঠক সংখ্যা

লেখা পাঠাবার নিয়মাবলী:

১. শুধুমাত্র কবিতা, মুক্তগদ্য অথবা অণুগল্প পাঠাবেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য বিষয়ক লেখা সম্পূর্ণ আমন্ত্রিত। ২. লাইনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ৩. লেখা মেইল বডিতে টাইপ করে পাঠাবেন। ৪. লেখা মৌলিক ও অপ্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো ব্লগ, ওয়েবজিন অথবা প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ৫. মেইলে আপনার লেখাটি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত, কথাটি উল্লেখ করবেন। ৬. লেখার সাথে আবশ্যিক ভাবে এক কপি ছবি ও সংক্ষিপ্ত ঠিকানা পাঠাবেন।  ৭. লেখা নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে কোনো উত্তর না এলে লেখাটি অমনোনীত ধরে নিতে হবে। ৮. আপনার লেখাটি প্রকাশ পেলে তার লিঙ্ক শেয়ার করাটা আপনার আবশ্যিক কর্তব্য। আশাকরি কথাটি আপনারা মেনে চলবেন। আমাদের মেইল- hridspondonmag@gmail.com
blogger-disqus-facebook

শান্তনু শ্রেষ্ঠা, সম্পাদক

আমার ফটো
পূর্ব বর্ধমান, India
আমার সম্পূর্ণ প্রোফাইল দেখুন

সাম্প্রতিক প্রশংসিত লেখা:

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

তোয়াঞ্জলী ॥ সায়নের কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

নিমাই জানার কবিতা

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

পার্থ প্রতিম পালের অণুগল্প

๑ জন্মদিন ๑

๑ জন্মদিন ๑

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

আঁচড় ~ শর্মিষ্ঠা ঘোষের কবিতা

হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন

© হৃদস্পন্দন ম্যাগাজিন। শান্তনু শ্রেষ্ঠা কর্তৃৃক পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত।

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi Templates