⎠⎠সমন্বয়ের প্রতীক নজরুল⎠⎠


 🔸প্রবন্ধ:
                           

                            🔺মিঠুন রায়🔹ত্রিপুরা 



🔵বাংলা সাহিত্য জগতে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ধূমকেতুর ন্যায়।কবিতা,গল্প,প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি তিনি একজন সংগীতশিল্পীও বটে।তিনি গোটা আঠারোটি গল্প লিখেছেন  আর উপন্যাস লিখেছেন মাত্র তিনটি।তাঁর কম-বেশী সব সৃষ্টিতেই সমাজ নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যক্ত হয়েছে।তিনি যৌবনের কবি।তাঁর বিদ্রোহ,পৌরুষ,প্রেম প্রভৃতি হৃদয়বৃত্তি এই যৌবন বেগ থেকেই উৎসারিত।তাইতো 'অগ্নবীণা'য় তিনি শুনিয়াছেন--
  "ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?-প্রলয়  নতুন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!
তাই সে এমন কেশে বেশে 
প্রলয় বয়েও আসছে হেসে মধুর হেসে!"
 একসময় স্কুল ছেড়ে নজরুল যোগ দেন সেনাবাহিনীতে।সেনাবাহিনীতে মাত্র দুই বছরে পাঁচটি প্রমোশন পান।কিছুদিন পর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।
'জীবনের মূল্য আয়ূতে নহে,কল্যাণপূত কর্মে- এ চিরন্তণ সত্য প্রতিফলিত হয় বিদ্রোহী কবির জীবনে।একসময় যে বালক অভাবের তাড়নায়  রুটি মাখার কাজে যোগ দিয়েছিলেন,পরবর্তী সময়ে ঐ নজরুল সাহিত্য চর্চায় বিশেষ প্রতিভার ছাপ রেখেছেন।মানস গঠন বিন্যাসে নজরুল দেহবাদী শিল্পী চেতনা আশ্রয়ী।কবিতায় তাঁর দেহ চেতনার প্রমান রেখেছেন ভুুরিভুরি।সামাজিক অত্যাচার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নিজের জীবনে ক্রমঃঅভিজ্ঞতায় হিন্দু -মুসলমান সম্প্রীতির ভিত্তিভূমি তিনি তৈরি করেছেন।এ কারণেই  ধর্মীয়  সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি জীবনের বিরাট সময় ব্যয় করেন।অবশ্য এমর্মে তাকে 'কাফের','পাতিনেড়' এর মতো নানা বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছে।অথচ তিনি সব অংশের মানুষকেই প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন।তাইতো সগর্বে বলতে পেরেছেন--"মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই।
                 নহে কিছু মহীয়ান।"
  রুশ বিপ্লবের প্রভাব তাঁর উপর পড়েছিল।করাচীতে থাকার সময়  ইরাণি কবি ওমর খৈয়ামের জীবন দর্শন তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন।তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু -মুসলমান সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা।তাইতো নিজেই গেয়েছেন --
    "মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু -মুসলমান
      মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তাহার প্রাণ।"
একসময় সাপ্তাহিক 'গণবাণী' পত্রিকায় 'হিন্দু-মুসলমান'শীর্ষক একটি প্রবন্ধ রচনা করেন।হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গোড়ামি আর মুসলমান সম্প্রদায়ের জঙ্গমতা দূর করতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন।সংস্কারমুক্ত ভাবধারায় বিশ্বাসী নজরুল 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ' উৎসবে ভাষণ দান প্রসঙ্গে বলেছেন --"যদি আপনাদের প্রেমের টানে আমাকে আমার একাকীত্বের পরমশূণ্য থেকে অসময়েই নামতে হয় তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন আমি সেই নজরুল।সে নজরুল অনেকদিন আগে মৃত্যুর খিড়কির দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে।সে দিন আমাকে কেবল মুসলমান বলে দেখবেন না।আমি যদি আসি,আসব মিলিত হিন্দু-মুসলমানের সকল জাতির উর্ধে যিনি 'একমেবাদ্বিতীয়ম' তাঁরই দাস হয়ে।"আবার অন্যত্র বলেছেন,-"আমায়  মুসলমান সমাজ কাফের খেতাবের যে শিরোপা দিয়েছে,তা আমি মাথা পেতে গ্রহণ করেছি।এরা কি মনে করেন হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিলেই সে কাফের হয়ে যাবে?তাহলে মুসলমান কবি দিয়ে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি কোনকালেই সম্ভব হবে না ত্রৈগুণ বিবির পুঁথি ছাড়া "।সাংবাদিক হিসাবেও  তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।সান্ধ্য দৈনিক 'নবযুগ'-এর সম্পাদকীয় প্রমাণ করলো যে,নজরুল দাড়ি চাঁছার জন্য তলোয়ার ধরতে যান নি,আর কলম ধরেনি মনোরঞ্জনের জন্য।আবার'ধূমকেতু'তে সেই সময় তিনি লিখলেন-"সর্বপ্রথম ধূমকেতু,ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।স্বরাজ -টরাজ বুঝি না,কেননা ও কথাটার মানে এক-এক মহারথী এক-এক  রকম করে থাকেন,ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব,সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা,শাসনভার-সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে।"
সত্যদ্রষ্টা কবি নজরুল অনেকটা বিদ্রুপের সুরে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন--"ধর্ম জাতির নাম লয়ে এরা বিষাক্ত করে দেশ,
           এরা বিষাক্ত সাপ ইহাদের মেরে কর শেষ।"
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো তিনিও মনে প্রাণে ধর্মান্ধতা এবং  ফ্যাসিবাদকে ঘৃণা করতেন।নানা সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে  উচু-নীচুতার ভেদাভেদের বিরুদ্ধেও তিনি সকলকে জানিয়েছেন-
    "আয় অশুচি,আয়রে শুচি
     এবার মায়ের পূজা হবে।"
আসলে ধর্মে-ধর্মে কোনো বিবাদ নেই।বিবাদ তৈরি করেছে শুধু মানব।তাইতো জাতের নামে বজ্জাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে কবি নজরুল  লিখলেন-- 'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-
জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
ছুলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতে নয়তো মোয়া।'
নজরুলের ভাবনায় হিন্দু -মুসলমান সংস্কৃতির দুই ধারা।তবে কেন একে অন্যের সাথে বিরোধ।এ বিষয়ে কবির আপেক্ষ-"হিন্দুত্ব-মুসলমানত্ব দুই হওয়া যায়,কিন্তু তাদের টিকিত্ব হিন্দুত্ব ও দায়িত্ব অসহ্য,কেননা এই দুটোই মারামারি বাধায়।টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়,ওটা পান্ডিত্য।তেমনি দাড়িত্ব ইসলামত্ব নয়,ওটা মোল্লাত্ব।এই দুই 'ত্ব' মার্কা চুলের গোছা নিয়েই আজ যে চুলোচুলি।আজ যে মারামারি,হিন্দু-মুসলমানের মারামারি নয়।"
নজরুলের চিন্তাধারাকে গবেষক পিটার কাস্টার্স বর্ণনা করেছেন এইভাবে --'I believe that Nazrul's life  work has concrete meaning for suffering humanity today his method aimed at promoting mutual understanding between people of different faiths notably people belong to the two large religious communities of Bengal -Hindus and Muslims?'

 পরিশেষে বলা যায়,আজ গোটা বিশ্বেই সমন্বয়ের বড় অভাব।বিশ্বাসের ঘরে বারবার আঘাত আসছে।সম্প্রদায়গত বিরোধ বাড়ছে।এ বিভীষিকাময় অবস্হা থেকে পরিত্রাণে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।তাঁর চিন্তা চেতনা নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।মৌলবাদ আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এই মূহুর্তে -'ধরো সবাকার হাত'।সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমেই আসুরিক শক্তির বিনাশ সম্ভব।এক্ষেত্রে প্রয়োজন মানবতার।নজরুর তার গানে বার বার মানবতার কথা বলেছেন।সংকটময় পরিস্হিতিতে একজন কবি হিসেবে নজরুলকে না দেখে মতাদর্শ হিসেবে তাকে গ্রহণ করা জরুরী।তবেই শত পূষ্পের মতো বিকশিত হবে আমাদের জীবনশৈলী।দূর হবে  সামাজিক বৈষম্য।

0 Comments