ডাকবাক্স ও চিঠিদের কথা
আগেকার দিনে চিঠির জন্য ছিল কত অপেক্ষা। স্কুল হস্টেলে থাকার সময় বোনের চিঠি বা মায়ের কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা চিঠির অপেক্ষায় কত থেকেছি, কত না দিন গুনেছি! একটু বড় হয়ে কলেজ হস্টেলে থাকার সময় প্রেমিকার একটা চিঠির জন্য কতই না হা-পিত্যেশ ছিল! আজ আর চিঠি আসে না। কেউ চিঠি লেখে না। ভাঙাচোরা সাইকেলের ঘন্টা বাজিয়ে আসে না আর সেই ডাক-পিয়ন। রাস্তার পাশে, বড় গাছের ডালে কিংবা দেওয়ালের গায়ে ধুলি-ধূসরিত রঙচটা বিবর্ণ ডাক-বাক্সগুলো ঝুলে রয়েছে চরম উদাসীনতায়, অবহেলায়, বড় অবজ্ঞায়!
চিঠির মাধ্যমে মনের কথা জানানোর চল চলে আসছে বহুদিন ধরেই। কিন্তু, আজ টুয়েন্টি টুয়েন্টি (২০২০) তে দাঁড়িয়ে কেমন আছে আমাদের চিঠিপত্রে -রা? প্রেম তো চিরকালীন। কিন্তু কথা হল, মনের গোপনে সেই রঙিন স্বপ্ন এঁকে প্রেমপত্র কি লেখা হয় আজও, এখনও? আসুন, কী করছে দেখি আজকের দিনের নতুন প্রজন্ম?
টেবিলের ওপরে গাদাগুচ্ছের কাগজপত্র ছড়ানো ছেটানো। দেখি, তারই মধ্যে মুখ গুঁজে কি যেন একমনে লিখে চলেছে সোমলতা। আসলে, আজকে রাজেশ এর জন্মদিন। তাই নিজের হাতে প্রেমিক কে একটা প্রেমপত্র লিখে "সারপ্রাইজ বার্থ ডে উইশ" করতে চায় সে। কিন্তু কিছুতেই মনোমত হচ্ছে না লেখাগুলো। একটু লিখেই মুড়েচুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আবার লিখছে, নাঃ হচ্ছে না। দ্বিতীয়টারও একই অবস্থা, সোজা টেবিলের তলায়। তারপরের চিঠিটা দু'এক লাইন লেখার পরেই মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ধ্যাৎতেরি বলে উঠে পড়ল। বিছানায় রাখা মোবাইল ফোন টা তুলে নিয়ে ঝটপট একটা এস এম এস টাইপ করে লিখে ফেলল, "হ্যাপি বার্থ ডে রাজু, মাই ডিয়ার। লাভ ইউ সো মাচ। বিকেল ৫-টায় সাউথ সিটি মল"। ব্যাস্, এক মিনিটেই খেল খতম্।
আসলে, জেনারেশন ওয়াই এভাবেই চিঠি লিখে প্রেম নিবেদনে স্বচ্ছন্দ।
আশুতোষ কলেজের ছাত্র সোমেন বলে, "এ যুগে ওই সব সেকেলে প্রেমপত্রটত্র লেখা পোষায় না, বড়ই অচল। যেখানে একটা এস এম এস -এ কাজ হয়ে যায়, সেখানে অতশত ঝঞ্ঝাটে কেন যাওয়া বাপু? যাই বলুন, ওসব এখন অবসোলিট। হাতের মুঠোয় যখন ফোন রয়েছে তখন চিঠির কী প্রয়োজন! আর কোনও সময় ফোন না করে একটা মেইল করে দেওয়া যায়, বুঝলেন মশাই?"
হ্যাঁ, বুঝলাম! সত্যিই তো, গতিময় যুগে এখন সময় ছুটছে.. । মানুষের হাতে এত সময় কই, হাতের কাছে কাগজ কলম জোগাড় করে গুছিয়ে প্রেমপত্র লেখার? আর বলি, কেনই বা লিখবে? যখন একজন আর একজনের কাছে, বা, বলা যায় প্রেমিক প্রেমিকার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে মুহূর্তে।
তবে, সত্যি সত্যিই কি চরম অভিমান নিয়ে প্রেমপত্র জায়গা করে নিয়েছে গল্প-উপন্যাস কিংবা ইতিহাসের পাতায়?
আমার এক বান্ধবী অলকানন্দা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। ওর গলায় ভিন্ন সুর। ও বলে, "কে বলল ওইসব প্রেমপত্রের কোন গুরুত্ব নেই? ক্লাস নাইন -এ পড়ার সময় আমার প্রথম বয়ফ্রেন্ড। কোচিং ক্লাসের নোটের ভেতর দিয়ে আমাদের কত প্রেমপত্র হাতবদল হয়েছে তার ইয়ত্যা নেই। বলেই হো হো করে হেসে উঠল। আরও বলল, সেই বয়ফ্রেন্ড ভাগ্যের পরিহাসে আমার জীবনে আসেনি ঠিকই, কিন্তু চিঠিগুলো রয়ে গেছে আজও আমার কাছে।" কেন? প্রশ্ন করাতে ও বলল, "কতকিছু লিখতাম তখন! আজ, এতখানি বদলে গেছি, ভাবলে অবাক লাগে! চিঠিতো স্মৃতি ধরে রাখবার অন্যতম উপায়।"
তবে, চিঠি কি বর্তমানে ছোটবেলার এইসব খুচরো প্রেমে আটকে গিয়েছে? হাতে অন্যকিছু কাজ না থাকলে, শুধুই টাইম পাস এর মাধ্যম, আর, শুধুই স্মৃতিমেদুরতার বিলাসযাপন?
প্রেসিডেন্সির প্রিয়াঙ্কার মত কিন্তু আলাদা। ও বলে, "আসলে দেখুন, মনের কথা সবসময় কিন্তু মুখে প্রকাশ করা যায় না, সেক্ষেত্রে মনের গভীরের কথাটা লিখে প্রকাশ করা অনেক বেশি সহজ। তবে, কাগজ-কলমেই যে লিখতে হবে তার কোন মানে নেই।" ও আরও বলে, "জানেন, আমি বিয়ের প্রোপোজাল পেয়েছিলাম ই-মেইলে। তখনকার প্রেমিক, আজ আমার বর্তমান স্বামী অরিন্দম। সেই মেইল টা কিন্তু আজও আমি সযত্নে সেভ করে রেখেছি আমার অমূল্য সম্পদের মত।"
সত্যিই তাই, সময়ের তালে তালে বিবর্তন আসে। এ তো অমোঘ সত্য। আর, সেই সত্যের ওপর ভিত্তি করে চিঠিপত্রেরও বিবর্তন ঘটেছে। কাগজের জায়গা দখল করে নিয়েছে এখনকার ই-মেইল বা চ্যাট। ক্ষতি কী? প্রেম রয়েছে প্রেমের জায়গায়, আর, পত্র তার রূপরঙ বদল করে নিয়েছে খানিকটা।
এবারে আরও একটু পিছিয়ে যাই। চিঠির অন্য আর এক রূপ খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই, যে সময়ে পয়লা বৈশাখ বা বিজয়া জানাতে ব্যবহার করা হত কাগজ-কলম। তখন মানুষের কাছে প্রেম নিবেদনের অন্যতম উপায় ছিল সাদা কাগজে কালো অক্ষরে লেখা মনের কথা।
চলুন, দেখে নেওয়া যাক, কেমন ছিল সেই সব সময়?
রেলের কর্মী মধবয়সী শুভঙ্কর বাবু বললেন, "টানা তিন বছর চুটিয়ে প্রেম করেছিলাম স্ত্রীর সঙ্গে। মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যেতাম মনের গভীরে! উঃ! সেসব দিনের কথা বলে বোঝানো যাবে না!" ভদ্রলোক আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। বলে চলেন, "আসলে, তখন দু'জনের দেখা সাক্ষাত হওয়া তো অত সহজ ছিল না এখনকার মত। যাতায়াতের রাস্তায় কিংবা কলেজের বাইরে দেখা হত এক ঝলক। তারপর, কেউ আবার দেখে ফেলল কিনা? আসলে, তখনকার দিনে অভিভাবকদের নানারকমের সব কড়া বিধিনিষেধ ছিল, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এখানে সেখানে যখন তখন যাওয়া যাবে না, এই সমস্ত ব্যাপার স্যাপার, বুঝলেন কিনা? তাই, আমাদের বাকি কাজটা করে দিত আমাদের পরম বন্ধু 'চিঠি'। এখনও দু'জনের কাছে গচ্ছিত আছে আমাদের গাদা গাদা সব প্রেমপত্র। এখনও দু'জনে বসে বসে পড়ি, আমাদের উদ্ভ্রান্ত আবেগী মনের লেখা সেইসব চিঠিপত্র। আর মনে মনে ভাবি, জীবনের কতগুলো বছর কিভাবে পেরিয়ে এলাম!"
প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই টালিগঞ্জ এর স্বামী হারানো কমলা দেবীর কাছে, তাঁর স্বামীর লেখা চিঠিপত্রগুলো এখনও তাঁর এই নিঃসঙ্গ জীবনে সময় কাটানোর এক অন্যতম উপায়। চাকরি সূত্রে স্বামী বাইরে থাকতেন, তাই চিঠি লেখালেখি হত বিস্তর। কমলা দেবীর কথায়," ঠিক প্রেমপত্র হয়তো নয়, একেবারেই সাংসারিক সব কথাবার্তা। কিন্তু, আজ ওর অবর্তমানে ওর লেখা চিঠিগুলো পড়লে মনে হয়, ও যেন আমার পাশে বসে আমার সাথে কথা বলছে! ওর উপস্থিতি আমি ভীষণভাবে টের পাই। এই চিঠিগুলো আমার জীবনে বেঁচে থাকার অফুরন্ত রসদ, যেন এক সঞ্জীবনী সুধা!"
কী নস্টালজিক! সত্যিই, কী অসাধারণ ভাবনা! তাই না?
'নীরা'র স্রষ্টা কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের, তাঁর স্ত্রী স্বাতী দেবীকে লেখা চিঠিগুলো কবি সুনীল -এর বাইরে বেরিয়ে এসে এক স্বামী কিংবা পিতা কে খুঁজে পাওয়া যায়। সেইসব চিঠিপত্রগুলো তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির মত আর এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে থেকে গেছে।
বর্তমান প্রজন্ম তবে কি হারাচ্ছে কিছু? একটুকরো কাগজ যেভাবে স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, তা কি সম্ভব ওই নিত্যনতুন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে?
সায়ন্তন আর শ্রেয়া চুটিয়ে চারবছর প্রেম করার পর সদ্য বিয়ে করেছে। শ্রেয়া জানাল, "সায়ন্তনের কিছু প্রেমপত্র আছে আমার কাছে। চিঠির মজা হল এই যে এগুলো ওর নিজের হাতে লেখা। এর ফিলিংস বা অনুভূতিটাই আলাদা। যেন, সেদিনের সেই কৈশোর বা সদ্য যৌবনের গন্ধ লেগে আছে ওর এই চিঠিগুলোতে! মুশকিল হল, মেইল বা এস এম এস -এ এই জিনিসটা একেবারেই থাকে না।"
অর্থাৎ, ই-মেইল, স্কাইপ বা চ্যাটের এই প্রবল চাপেও কিন্তু চিঠিপত্র হারিয়ে যায়নি পুরোপুরি। খানিকটা নিষ্প্রভ হলেও তার অস্তিত্ব কিছুটা হলেও টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। এটুকু জেনে ভীষণ ভাল লাগল।
আসুন না, এ বছর সামনের "ভ্যালেন্টাইন'স ডে" তে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এর সম্মানে কিংবা তার পরেই বাঙালির নিজস্ব প্রেমের উৎসব "সরস্বতী পুজো" তে মা সরস্বতীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে লিখেই ফেলুন না, দু'চার কলম প্রেমের চিঠি, হৃদয়ের কোনও একান্ত গভীর গোপন কথায় নিজের মনের মানুষটি কে। কেই বা বলতে পারে, সেই প্রেমের চিঠিটাই হয়তো আপনাদের প্রেমের চিরন্তন স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে আজীবন..।
এভাবেই বেঁচে থাকুক মানুষের আবেগ-অনুভূতি, নস্টালজিয়া, বেঁচে থাকুক প্রেম-ভালবাসা, বেঁচে থাকুক চিঠি, বেঁচে থাকুক প্রেমপত্র,..না হয় কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত বা বিবর্তিত রূপেই!
একলা চিঠি,
তোমায় আজও খুঁজি..
ভালোবাসার চিঠি, হোক না হিজিবিজি
সেই রঙিন স্বপ্ন নিয়ে আবার দেখা হবে---
ফাগুনের আগুন মেখে কোনও বসন্ত উৎসবে!
কবি দীপক বেরা
রবীন্দ্র আবাসন, হরিদেবপুর, কলকাতা




0 Comments