চয়ন কুমার রায়ের ছোটগল্প

 


পোস্টকার্ড 

পোষ্টকার্ডটাতে আর একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে নেয় বিনয়। বাবার চিঠিটা পাবার পর থেকে বড়ো উন্মনা। অবিলম্বে কিছু টাকা পাঠাবার কথা লিখেছেন। খুব জরুরী প্রয়োজন ছাড়া উনি কখনো টাকা চেয়ে চিঠি লেখেন না।

বিনয় একটা স্পঞ্জ -আয়রণ কারখানায় কাজ করতো। শ্রমিক -মালিক বিরোধের কারনে দু'মাস হল কোম্পানি কারখানায় লক্আউট ঘোষণা করেছে। ওরা কোন অন্যায় দাবি করেনি। তবু একটা কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সব দায় বর্তায় শ্রমিকদের ঘাড়ে। এই দুঃসংবাদটা ইচ্ছে করেই বাবাকে জানায়নি বিনয়। শুনলে অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন। 

অন্তত দু'শো টাকা এখন‌ই দরকার।কাজ হারিয়ে কয়েকটা টিউশন,আর রাত্তির বেলা কয়েকটা দোকানের হিসেবের খাতা সেরে যে কটা টাকা পায় বাবাকে পাঠানোর পর অবশিষ্ট অর্থে নিজের খরচের ঠিকমতো সংকুলান হয় না।মাসের শেষে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার পাওয়ার আশা কম। তন্দ্রার কথা মনে হল। ও এখন একটা স্কুলের টিচার। হাতে সবসময় নগদ দু'-পাঁচশ টাকা থাকে। ওর কাছ থেকে আগেই কিছু টাকা ধার নিয়েছে, এখনো শোধ করতে পারেনি। তাই নতুন করে ধার চাইতে লজ্জা পাচ্ছে। তন্দ্রা অবশ্য টাকার প্রসঙ্গে কখনো কোন কথা বলেনি। 

পোস্টকার্ডে বাবাকে একটা চিঠি লিখে রেখেছে। মানি-অর্ডার ফর্মটাও ফিল্আপ করা আছে। টাকাটা পেলেই পোস্ট করে দেবে ।

বিনয়ের মেসবাড়ি থেকে তন্দ্রার বাড়ি দশ মিনিটের হাঁটাপথ। সপ্তাহে অন্তত দু'দিন সাক্ষাত হয়, তবুও সুদৃশ্য লেটার প্যাডে নিদেন পক্ষে দুটো চিঠি লিখবেই। সুন্দর সুন্দর লেটার প্যাডগুলো কোথায় পাওয়া যায় কে জানে! তন্দ্রার হস্তাক্ষর আর শব্দশৈলীর মাধুর্যে বিনয় অভিভূত! ওর মতো অমন সুন্দর করে কথা সাজিয়ে চিঠি লিখতে  পারে না। চিঠিও তো সাহিত্যের‌ই অঙ্গ। না ,বিনয় কিছুতেই টাকা ধার চেয়ে তন্দ্রার সঙ্গে সম্পর্কটা তেতো করতে পারবে না। 

হঠাৎ করেই গৌরাঙ্গবাবুর কথা মনে পড়ল। চাঁদনি-চকে ওনার কাপড়ের দোকান। বিক্রিবাটা তেমন কিছু একটা হয় বলে মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে দোকানটা ওনার অফিস। আসল ব্যবসা হলো চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া। একটা আশার আলো দেখতে পেল বিনয়। চিঠি আর মানি -অর্ডার ফর্মটা সাইডব্যাগে নিয়ে গৌরাঙ্গবাবুর দোকানের উদ্দেশে ঝটপট সাইকেল নিয়ে র‌‌ওনা হলো। কাপড় চকের গলির মুখে হঠাৎ করেই মাথাটা ঘুরে গেল। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখল সে হাসপাতালে একটা বেডে শুয়ে আছে। ওর সামনে বসে আছে তন্দ্রা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'আমি এখানে কেন তন্দ্রা? '

'তুমি কাপড় চকের সামনে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলে। ভাগ্যিস আমি বাজারে গেসলাম,নাহলে যে কি বিপত্তি ঘটত..! শরীরে বল বলে তো কিচ্ছুটি নেই!নাহ্, তোমার মতো ক্যাবলাকান্ত কাপুরুষকে আর একা ছেড়ে রাখা যাবে না। যা ব্যবস্থা করার আমাকেই করতে হবে। 

বিনয় তার বাবাকে লেখা চিঠি আর মানি-অর্ডার ফর্মটা কোথাও খুঁজে পেল না। ক'দিন পরেই বাবার পাঠানো পোস্টকার্ডে একটা চিঠি পেল। তিনি লিখেছেন..... 


           শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায়। 

             ১২আষাঢ়, ১৩৯৭সাল

পরম কল্যানীয় স্নেহের বিনু, 

                                        আশা করি করুণাময় ঈশ্বরের কৃপায় সবিশেষ কুশলে আছ। আমি ও তোমার মা একপ্রকার ভাল আছি। তবে উনি বাতের বেদনায় মাঝে মাঝে শয্যাশায়ী হ‌ইয়া পড়েন। যাহা হ‌উক আমাদের জন্য অকারণ দুশ্চিন্তা করিও না। তোমার পত্র ও মানি -অর্ডার যোগে প্রেরিত দুইশত টাকা যথাসময়েই পাইয়াছি। টাকা পাইয়া যারপরনাই আহ্লাদিত হ‌ইয়াছি। আমাদের পরিচারিকার স্বামীর চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থের বিশেষ প্রয়োজন ছিল... 

এই পর্যন্ত পড়েই বিনয় চিঠিটা পকেটে রেখে দিল। 'তাহলে তন্দ্রাই চিঠিটা পোস্ট করেছে আর টাকাটাও পাঠিয়ে দিয়েছে! '

বিনয় তার বাবার মানবিক আচরণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তাই তাঁকে বহুদিন আগেই দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু আজ তন্দ্রার এই গভীর মমত্বের জন্য তার প্রতি বিনয়ের শ্রদ্ধা বহুগুন বেড়ে গেল।

       সাহিত্যিক চয়ন কুমার রায় 

টিকরহাট, পূর্ব বর্ধমান 




     







0 Comments