
পীযূষকান্তি সরকারের ছোটগল্প
ঝরা পাতার দলে
মিনিট পনেরো আগে শুভ্র এসে জানিয়ে গিয়েছিল “সুকান্তদা আপনার জন্য এক ভদ্রমহিলা গেষ্টরুমে অপেক্ষা করছেন”।কাজের শেষে তখন বেসিনে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সুকান্ত। হাত-মুখ তোয়ালে মুছে ওয়ার্কশপের এ্যপ্রন আর সারাদিন পরে থাকা জামাপ্যাণ্ট নিজের লকারে গুছিয়ে রেখে,বাড়ি থেকে আনা পোশাক পরে প্রস্তুত হল সে। ব্যাগটাকে কাঁধে ঝুলিয়ে দরজার কোণে রাখা লাঠিটা নিয়ে ধীর পায়ে বাইরে এল সুকান্ত।
ফ্যাক্টরির গেট-এর বাইরে অসংখ্য ফুলের গাছ, যার মধ্যে স্বর্ণচাঁপার সুগন্ধে ম—ম করছে চতুর্দিক। সুকান্ত দৃষ্টিহীন কিন্তু বাকি অনুভূতিগুলো খুবই প্রখর আর সেগুলির উপর নির্ভর করেই কাজ চালাতে হয় তাকে। ইস্টার্ন রেল-এর এই ওয়ার্কশপে দৃষ্টিহীনের কোটায় সে চাকরি পেয়েছিল পঁচিশ বছর আগে।চোখে না দেখতে পেলেও এখানকার প্রতিটি গাছপালা তার অতি পরিচিত। এমনকি প্রত্যেকটি কুকুর-বেড়াল তার লাঠির আওয়াজে উৎকর্ণ হয়ে অনায়াস ভঙ্গিতে উঠে গিয়ে ছেড়ে দেয় তার চলার পথ।
দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশেষভাবে বানানো এই লাঠির বৈশিষ্ট্য-ই হল এটিকে বাসে বা ট্রেনে ওঠার সময় ভাঁজ করে ব্যাগে ভরে নেওয়া যায়। লাঠির শেষপ্রান্তে লাগানো নাইলনের তৈরি শক্তপোক্ত ‘টিপ’ টার সাহায্যে সে রাস্তার একপ্রান্ত ধরে চলে। রাস্তায় গর্ত থাকলে অনুভূতির জোরে সাবধান হয়ে যায় সে। বিন্দুমাত্র আলো নেই তার দু’চোখে,তবু স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করে সে। মানুষ যে অভ্যাসের দাস।
লন-এর মাঝবরাবর এসে দাঁড়িয়ে নিল সে চাঁপার সুবাস তারপর ধীর পায়ে ডানদিকে ঘুরল।এই পাশেই গেষ্টরুম। অপেক্ষারতা মহিলার সঙ্গে কথা শেষ করে অন্যান্য দিনের মতো স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরবে। চার-চারটে স্টেশন পার হয়ে সে নামবে পঞ্চম স্টেশনে।প্লাটফর্মে সাধারণতঃ তার নিজের ছেলেই এসে দাঁড়ায়, তার হাত ধরেই মিনিট দশ হেঁটে পৌঁছে যায় তার নিজের বাড়িতে।
বছর দশেক হল সুকান্ত তার নিজের জন্য কিনেছে একটি টকিং মোবাইল। তার অনেক আগেই কিনেছিল টকিং রিষ্ট-ওয়াচ। চোখে না-দেখলেও আন্দাজে বটম পুশ করে সময় যেমন বুঝে নেয়,তেমনই ট্রেনে উঠে ছেলে কিংবা তার মায়ের সেলফোনে মিসড কল দেয়।সময়মতো তারা কেউ না কেউ প্লাটফর্মে চলে আসে। মাধ্যমিক পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে তার ছেলে সৃঞ্জয়। পিওর সায়েন্স নিয়েছে সে। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া চলাকালীন কেমিস্ট্রি-র ল্যাবে ঘটেছিল তার জীবনের চরমতম দুর্ঘটনা। তখন দৃষ্টিহীনদের জন্য কোনো সরকার স্বীকৃত আই টি আই ছিল না, বছর দুয়েক হল চালু হয়েছে কলকাতায়। তাই বার বার সৃঞ্জয়কে সাবধান করে যাতে কেমিস্ট্রি-ল্যাব এ কাজের সময় সদা সতর্ক থাকে সে।
২
সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় সুকান্ত চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছিল তার স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি।
সুকান্ত-র স্ত্রী শ্রীময়ীর দাদা শোভন তার চেয়ে বছর পাঁচেক সিনিয়র,ইস্টার্ন রেলের সিনিয়র অ্যাকাউন্টট্যান্ট ।মূলতঃ শোভনের উদ্যোগেই তাদের বিয়ে,সংসার,নিজস্ব বাড়ি – সবকিছু। রেল কোম্পানির মেন অফিস থেকে জয়েনিং লেটার পাওয়ার পর এই অফিসে এসে প্রথম দেখা হয় শোভনদার সঙ্গে। সেই পরিচয়সূত্র ধরে তাদের বাড়িতে থাকা,বছর তিনেক বাদে তারই বোনকে বিয়ে করে পাকাপাকিভাবে সেই বড়িতেই থাকা,তারও পাঁচবছর বাদে সেই শোভনদার উদ্যোগেই স্টেশনের কাছে জমি কিনে নিজের বাড়ি তৈরি করা – সবকিছুই যেন সেই পরমেশ্বরের ফিরিয়ে দেওয়ার খেলা বলেই মনে হয় তার কাছে। নতুন বাড়িতে নতুন সংসার পেতে বসার পরই শ্রীময়ীর কোলে এসেছিল সৃঞ্জয়।
ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় শ্রীময়ীর বামচোখটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল,ভেলোরে দীর্ঘ পরিচর্যায় বাঁচানো গিয়েছিল তার ডানচোখের আলো। ফর্সা সুন্দর মেয়ের একটি চোখ দৃষ্টিহীন – নানাসূত্রে যোগাযোগ এমনকি সংবাদপত্রের ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপনও কোনো পাত্রের সন্ধান দিতে পারেনি। সুকান্তর শোভনদা তাই তিনবছর তাকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিল। সর্বক্ষণই কালোচশমা পরে থাকত সে। রাত খাবার পর চশমা খুলে শুয়ে পড়ত। শ্রীময়ী একদিন তার চশমাহীন মুখদেখে শিউরে উঠল। নাক আর ভ্রূর চতুর্দিক ঘিরে গভীর ক্ষতচিহ্ন ঘিরে রয়েছে। প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে দাগগুলি অনেকটা মিলিয়ে যাবার পর শ্রীময়ী তাকে জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছিল।
পৃথিবীটা সুকান্তর কাছে অন্ধকারময় তবে শ্রবণ,ঘ্রাণআর স্পর্শেন্দ্রিয়র মাধ্যমে সে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকে অনুভব করে বুঝতে চায়। শ্রীময়ীর একটা চোখ অন্ধকার ভরা কিন্তু অন্য চোখটি আবার আলোর দিশারি। শ্রীময়ীই তার অন্ধকার জগতে রচনা করেছে আলোর সেতু। তাই সৃঞ্জয়ের জন্মের পর সে অর্ধচেতন শ্রীময়ীকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল,”বলো না শ্রীময়ী বলো না আমাদের সন্তানের দু’চোখে আলো আছে তো? সে পৃথিবীটাকে দেখতে পাচ্ছে তো!”
কোনক্রমে তাকে আশ্বস্ত করে শ্রীময়ী বলেছিল, ”তোমার ছেলে রূপবান – সুন্দর দু-দুটি চোখের অধিকারি সে! বড়ো বড়ো চোখ মেলে আমাদের দিকে সে তাকিয়ে দেখছে! যদি তোমায় দেখাতে পারতাম!”
নার্সরা আর কথা বলতে দেয়নি। তার শোভনদা বলেছিল, “সুকান্ত, এবার তো তোমার সবকিছু ফিরে পাওয়ার পালা!” সুকান্ত অনুভব করেছিল তার চোখের সামনে কালোপর্দাটা আছে বটে তবে তার ঠিক পাশেই এক এক করে জ্বলে উঠছিল উজ্জ্বল আলোকের শিখাগুলি”।
ইষ্টার্ন রেলের এই ফ্যক্টরি কাম অফিসের গেষ্টরুমটি বেশ বড়ো,কমপক্ষে একশোজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসতে পারে। গোটা হলঘরে পাঁচখানা সিলিং ফ্যান তো আছেই তার সঙ্গে দরজার দুইপাশে দু’খানি বড়ো স্ট্যান্ডফ্যান ও বাখা আছে। আলো-বাতাস পূর্ণ সেই ঘরের গদি আঁটা চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলেন এক প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা। খোলা দরজার পাল্লা বাঁহাতে ধরে সেইঘরে ঢুকলো সুকান্ত।
৩
সেখানে দাঁড়িয়ে সে বলল,“আমি সুকান্ত, রেলেলর ওয়ার্কশপে ফিটারের কাজ করি। দু’চোখেই দেখতে পাই না। এ-ঘরে আমার জন্য যদি কেউ অপেক্ষা করে থাকেন, সাড়া দেবেন প্লিজ”।ভদ্রমহিলা যেন থর থর করে কেঁপে উঠলেন। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বললেন,“আমি”।কেঁপে যাওয়া কণ্ঠস্বরের মাত্রা বুঝতে সুকান্ত আবার বলে উঠল, “শুধু ‘আমি’ বললে কি করে চিনবো? এতকাল বাদে আমার নিজের বলতে কেউ তো নেই তবে আমার স্ত্রী শ্রীময়ীর কোনো আত্মীয় হলে প্লিজ পরিচয় দিন।পরিস্কার করে বলুন আপনি কে?” প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা এবার বললেন,“আমি সন্দীপ্তা – তোমার বৌদি”।সুকান্তর মনে হল তার সামনেই বুঝিবা বাজ পড়ল। কোনক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে উঠল, “বৌ-দি। সত্যিই বৌদি তো!” ফোঁপানো কান্নার শব্দ এলো প্রথমে তারপর কান্না জড়ানো কণ্ঠে ভেসে এলো শব্দ,“হ্যাঁ,আমি”।
“দাদা. আমার দাদা কোথায়? সে কেন আসে নি” আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে সুকান্ত।এবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন সুকান্তর বৌদি সন্দীপ্তা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,“তাকে কেড়ে নিয়েই তো ভগবান আমায় এমন সাজা দিলেন”।
“ওফ তাহলে দাদা আর এই পৃথিবীতেই নেই!” ডুকরে কেঁদে ওঠে সুকান্ত।
“ব্লাড সুগার ক্রমশঃ বাড়ছিল। মাস দুয়েক আগে করোনারি হার্ট অ্যাটাকে সে চলে গেল। প্রথমবার অ্যাটাক সামলে নিয়ে বলেছিল ‘আমার ভাইকে বড়ো অবহেলায় ফেলে চলে এসেছিলাম,পারলে তার খোঁজ নিও আর আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিও’। তার পরের দিনের ধাক্কাটা আর সামলাতে পারল না।তার চলে যাবার পর থেকেই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছি। আজ এতোদিনে পেলাম”। বলতে বলতে সন্দীপ্তার গলা বুজে এলো।
“সেই যখন এলেই, সব শেষ হয়ে যেতে কেন এলে?” আর্তনাদ বাতাস ভরিয়ে তুললো সুকান্ত।
পঁচ বছরের কঠোর কৃচ্ছসাধনা আর পঁচিশ বছরের চাকুরিজীবনের ওপারে আলোময় রঙিন পৃথিবীতে তার বিচরণশীল জীবন ছিল আঠারো বছরের – সেই দিনগুলো সেই মুহূর্তে যেন ঝলমলিয়ে উঠল তার অন্ধকারময় পৃথিবীতে।
সুকান্ত তখন ক্লাস ফাইভ-এর ছাত্র, তার দাদা সুশান্ত সেই একই স্কুল ‘বাণী মন্দির’ থেকে মাধ্যমিক-এ স্টার পেয়েছিল। সুকান্তর বেশ মনে পড়ে তাদের ক্লাস টিচার নবীন স্যার বলেছিলেন, “এই বছর আমাদের স্কুলে দশ-দশটা স্টার! ভাবা যায়!” তার বাবাও খুব আনন্দ পেয়েছিলেন। সুশান্তর শিক্ষকদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে রীতিমতো ভোজের আয়োজন করেছিলেন।
সুশান্ত যখন হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিল তার ঠিক পরের মাসেই আচমকা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে তাদের বাবা চলে গেলেন। সুশান্ত জয়েণ্ট এন্ট্রান্সে মেডিকেল-এ চান্স পেয়েও ছেড়ে দিয়ে ম্যাথে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করল। ব্যাঙ্ক-রেল-পি এস সি-র সমস্ত পরীক্ষায় নিজকে ডুবিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সাফল্য পেয়েছিল সে । ব্যাঙ্কে চাকরি পেতেই তাদের মা অপেক্ষা না করেই সন্দীপ্তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সুশান্তকে সংসারী করে দিলেন। বিয়ে দিলেন জানুয়ারির শেষে আর সুকান্ত মাধ্যমিক দিল মার্চ মাসে।
৪
সন্দীপ্তা পাস কোর্সে বি.এ. পরীক্ষায় বসল,সুকান্ত পিওর সায়ন্স নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়া শুরু করল। ঠিক সেই সময় তার মায়ের কিডনি বিকল হয়ে গেল। গোটা চারেক ডায়ালেসিসের পর আর টানতে পারলেন না,চিরনিদ্রায় ঢলে পড়লেন তিনি।
মায়ের মৃত্যুর পর দিন কুড়ি দু’ভাই শোকে মুহ্যমান থাকলেও আস্তে আস্তে নিজেদের সামলে নিয়ে কাজে মন দিতেই হল -সুশান্ত কর্মস্থলে,সুকান্ত স্কুলে। মাস দুয়েক পার হতে না হতেই সুকান্ত তার বৌদির মনোভাবের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করল। আগে সন্দীপ্তার কলেজের কোনো বন্ধু-বান্ধবীকে বাড়িতে আসতে দেখে নি সে, তখন সন্ধ্যা হলেই শুরু হল তাদের আসা-যাওয়া, হাসি-মস্করার সঙ্গে চলত চায়ের তুফান। দু-একদিন নয়,রোজই চলত সেই
মেহফিল।সুকান্ত ভাবতেও পারছিল না, তার দাদাই বা কী করে দিনের পর দিন এই শোকের আবহে তা বরদাস্ত করে চলছে।
সেদিন ছিল বুধবার। সুকান্ত স্কুলে গিয়ে শুনল তাদের অঙ্কের অন্যতম শিক্ষক বৈদ্যনাথস্যারের করোনারি থ্রম্বোসিসে মৃত্যু হয়েছে। বলা বারোটা নাগাদ তাঁর মরদেহ স্কুলে আনা হলে ছাত্র-শিক্ষক মিলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর পর অন্যরা শ্মশানে চলে গেলে,ভারাক্রান্ত মনে সুকান্ত বাড়ি ফিরে এল। কলিং বেল বাজাতে গিয়ে দেখল দরজা খোলা,দরজার ভিতরে নতুন একজোড়া স্যাণ্ডেল। ভাবতে লাগলো দাদাই কী ফিরে এলো অসময়ে!
কৌতূহল দেখালে যদি বৌদি রাগ করে, তাই সুকান্ত নিজের ঘরে ঢুকে কেমিস্ট্রির বই খুলে মনে মনে পড়তে শুরু করল। পাশের ঘর থেকে ভেসে এল পুরুষ কণ্ঠের বিশেষ উক্তি –“এ্যই সন্দীপ্তা,এত্তো সুন্দরী তুমি, বিবাহবার্ষিকী তো কবেই পার হয়ে গেছে! সুশান্তটা কী করলো বলো তো!” সন্দীপ্তার কণ্ঠে মাদকতা,“ সে আবার কী করবে জুবিন!”
উৎকর্ণ হয়ে উঠল সুকান্ত – কে এই জুবিন!
উত্তর ভেসে এলো জুবিনের কণ্ঠে “এমন সতেজ গাছে ফলই ধরাতে পারল না উজবুকটা! আমি চেষ্টাকরে দেখবো নাকি সন্দীপ্তা!” সন্দীপ্তা উত্তর না দেওয়ায় সম্ভবতঃ প্রশ্রয় মনে করে জুবিন এবার বলে উঠল, “আরে কদর যে বুঝলো না তার চেয়ে কদর যে বোঝে তাকে দেওয়াই তো ভালো নাকি!”
এবার সন্দীপ্তার ভীত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “এ্যাই জুবিন বাড়াবাড়ি করবে না একদম! ডোণ্ট ক্রস ইয়োর লিমিট!”
সুকান্ত আর স্থির থাকতে না পেরে সজোরে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল তার দাদা-বৌদির ঘরের দরজা। সুকান্তকে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুবিনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো “এইরে! ‘কাবাব মে হাড্ডি’!” বলেই সে দৌড়ে চলে গেল সদর দরজার দিকে। সন্দীপ্তা বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলে উঠেছিল,“খবরদার। তোমার দাদা যদি এর বিন্দু-বিসর্গও জানতে পারে তাহলে ওই জুবিনের হাতেই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করে ছাড়বো!”
রাতে মায়ের ওপর অভিমান হল খুব। মনেমনে বলতে লাগল “কেন আমায় এমন অসহায় করে দিয়ে চলে গেলে,কেন?” নিদ্রাহীনভাবেই কেটেছিল সেই রাত।
৫
পরদিন কেমিস্ট্রির ল্যাবে ছিল পর -পর তিনটে প্র্যাকটিকাল ক্লাস। টেষ্ট টিউবে ফেরাস সালফেটের জলীয় দ্রবণে নাইট্রিক অ্যাসিড মিশিয়ে স্ট্যাণ্ডে রেখে,একটা বীকারে গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে রেখেছিল। আর একটি বীকার পরিস্রুত জল রেখে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়িয়েছে,কোথা থেকে একটা বিশ্রি পোকা এসে তার ডান চোখে ঢুকে গেল। যণ্ত্রণায় কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ‘গেলাম রে’ বলেই বীকারের জল ভেবে নিজের দুচোখে ঢেলে দিল। ভুল কর সালফিউরিক অ্যাসিডের বীকারটাই তুলে নিয়েছিল সে ফলে অচিরেই যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল সে।
সেই জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে, দু-চোখে তখন চাপবাঁধা অন্ধকার।অনুভবে বুঝল সারা চোখমুখ তার ব্যাণ্ডেজে ঢাকা। কেমিস্ট্রির অধীরস্যার বললেন “একী করলে সুকান্ত!আমরা তো হেল্প করতেই ছুটে আসছিলাম,কেন এভাবে না দেখে অ্যাসিডের বীকারটা তুলে নিলে! কেন? ক্যানো?”
সপ্তাহ দুয়েক কাটার পর সুকান্ত নার্সকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল তার স্কুলের বন্ধুরা কিংবা শিক্ষকদের কেউ প্রায় দিনই তার খোঁজ-খবর নিতে এলেও তার দাদা প্রথমদিকে মাত্র একদিনই এসেছিল। এইভাবেই মাস দুয়েক কাটার পর হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দিল। ডাক্তার জানিয়ে দিলেন তার দৃষ্টিশক্তি আর কোনোদিনই ফিরবে না,খুঁজে নিতে হবে বিকল্প কোনো পথ।বন্ধুর হাত ধরে বাড়ি ফিরে যা শুনল তা যেন বিনামেঘে বজ্রপাত, বাড়িওয়ালা প্রমোদকাকু জানালেন তার দাদা-বৌদি মাসখানেক আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়িভাড়া মিটিয়ে দিয়ে চলে গেছে। তাঁর দু-হাত জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে সুকান্ত বলেছিল,“আমায় ওই বাসস্ট্যাণ্ডে নিয়ে গিয়ে একটু বসিয়ে দিন কাকু,বাকি জীবনটাতো আমাকে ভিক্ষা করেই কাটাতে হবে!” প্রমোদকাকু বলেছিলেন,“তোর দাদার সঙ্গে আমায় এক করে ফেলিস না।“
কথা রেখেছিলেন তিনি।স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ঝরা পাতর দলে’, তাঁদের অফিসে রোজ নিজে পৌঁছে দিতেনবার বিকালে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেন। খাওয়া-থাকার ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি এক-দু মাস নয় টানাবছর চারেক। উচ্চ মাধ্যমিক দিল রাইটার নিয়ে। তারপর ফিটিং শপে ট্রেনিং নিয়ে শেষমেশ পেল ইষ্টার্ন রেলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধির কোটায় এই চাকরি।
একের পর এক ছবিগুলো ভেসে উঠতেই দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো সুকান্তর অজান্তেই। সে বলে ফেলল,“তুমি আমার কাছে কেন এসেছো,এবার বলো?”
“আমাদের কোনো সন্তান হয় নি,সেও আমারই দোষে। তোমার দাদাকেও হারিয়ে আজ আমি সর্বসান্ত। তোমার স্ত্রী আছে, ছেলে আছে শুনেছি বাড়িও করছো…”। বৌদির কথার মাঝে সুকান্ত বলে ওঠে, “কিন্তু তুমি কি বলতে চাইছো,বলে ফেলো”।
“আমায় …মানে আমায় একটু আশ্রয় দেবে..” কোনোক্রমে বলে ওঠে সন্দীপ্তা।
‘হায় ভগবান’ বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে সুকান্ত। তাকে তার এই বৌদি কতই না যন্ত্রণা দিয়েছে, অসময়ে ফেলে পালিয়েছে তাকে ;আজ সেই বৌদিই কিনা তার কাছে এসেছে আশ্রয়ের আশায়!
৬
মুহূর্তের মধ্যে নিজের মনে রাশ টেনে ধরে সুকান্ত, সংযত করে নিজেকে। এখন একাকীত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার সেই বৌদি যাকে সে আপন দিদির মতোই ভালোবেসেছিল,কী করে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে! সে যে আজ অন্ধকারের মাঝে আলো খুঁজে পেয়েছে সেতো প্রমোদকাকু আর ‘ঝরা পাতার দল’–এর সৌজন্যে।
নিজের মনকে শক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সুকান্ত। ডানহাতে লাঠি ধরে বামহাতটা বাড়িয়ে দিল তার বৌদি সন্দীপ্তার উদ্দেশে তারপর বলে উঠল,“আমার দুচোখে বিন্দুমাত্র আলো নেই,অন্ধকারই আমার বন্ধু কিন্তু তাই বলে তোমায় একাকীত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারব না বৌদি! এসো শক্ত করে ধরো আমার হাত !চলো সব অন্ধকার সরিয়ে আমরা আলোর পথে এগিয়ে যাই”।



0 Comments