নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী'র মুক্তগদ্য



ফেলে আসা সময়

মাঝে মাঝেই ভাবি যাব। হাতের কাজটা সামলে একটু হালকা হলেই ছুটে যাব আমার গ্রামে। তারপর চুপচাপ আমাদের ঘাটের পুকুরটার বাঁধানো শানের উপর বসে থাকব। পা ছুঁয়ে থাকবে জল। রাত হলে মা ডাকবে,

''বাবু খেতে আয়! হিম পড়ছে, ঠাণ্ডা লাগবে!''

আমি চোখ তুলে দেখব আকাশ। মাথার উপর মুঠো মুঠো তারার আলপনা। প্রতিবার তাকালেই বিস্ময় জাগে। মায়ের ডাকে সাড়া নেব না। মা ডাকলে খুব শান্তি পাই। কতদিন মায়ের গলা শুনি না। আমাকে বাবু বলে কেউ ডাকে না এখন।

দেখতে দেখতে বয়স বেড়ে গেল অনেক। মনে হয়, এই তো সেদিনও কত সংগ্রাম করে ট্রেনে ঝুলে ঝুলে কলেজে যেতাম। রোগা লিকলিকে চেহারা। গাল বসা। এখন চেহারা ভারীর দিকে। চোখে চশমা। ট্রেনে প্রায় চাপতেই হয় না। ঝুলে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। এখন আমার দুটো গাড়ি। ছোটো গাড়িটা আমার মেয়েকে নিয়ে কোচিং ছোটে। বড়ো গাড়িটা নিয়ে আমি বেরোই। এশা'র মার্কেটিং কিংবা কোথাও যাবার থাকলে ও-ও নেয়। মায়ের ডাক হারিয়ে গেছে জীবন থেকে চিরতরে। গ্রামের সেই স্নিগ্ধ রূপও আর নেই। চারদিকে পাকা বাড়ি। সন্ধ্যে হলেই উন্মত্ত সিরিয়ালের শব্দ ভেসে আসে টিভি থেকে। সব বাগানগুলো প্লট করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যে গ্রাম আমার প্রথম প্রেম! আমার নস্টালজিয়া তার সঙ্গে এখন দেখাই হয় না। তবু খুঁজি। একা হলেই তারা ভরা আকাশ খুঁজি। সেখানে যুগ যুগ ধরে আমার জন্য চেয়ে জেগে আছে কালপুরুষ।

মনে পড়ে আমার কাল প্রতি মুহূর্তে শেষ হয়ে আসছে। প্রতিটা শ্বাস নিলে মনে হয়, আর কত বাকি আছে শ্বাসের কোটা? কোটা শেষ হলে যেতে হবে সবাইকে। পুরনো বদলে যাবে, নতুন আসবে। নতুনও একদিন পুরনো হবে। কাল থেমে থাকবে না। একা হলেই এক অনন্ত মৃত্যু চেতনা জাগে। কী এক মন খারাপ! বেশি কথা ভালো লাগে না। আমি অসুখি নই,জীবনে বরং বলা যায় সফল। তবু এক কীট সর্বক্ষণ ধ্বনি তোলে বুকের ভেতর। সে জেগে থাকে,জাগিয়ে রাখে! 

  গল্পকার নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী
                  মধ্যমগ্রাম, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ















0 Comments