
আমার প্রিয় শিক্ষিকা: তন্দ্রা
দিদিমণি
শিয়ালদা স্টেশন (দক্ষিণ) থেকে বেরিয়ে
নীলরতন হাসপাতালের উল্টোদিকের
রাস্তাতে "House of Time" বলে একটা ঘড়ির দোকান আছে,ওখানে আমার নাম বললেই লোকে দেখিয়ে দেবে।এসো, আমাদের বাড়ি, কেমন?" বলেছিলেনআমার প্রিয় অঙ্কের দিদিমণি, তন্দ্রা
দিদিমণি।যাঁকে ভালোবেসেই আমার অঙ্ককে
ভালোবাসা।
নীলরতন হাসপাতালের উল্টোদিকের
রাস্তাতে "House of Time" বলে একটা ঘড়ির দোকান আছে,ওখানে আমার নাম বললেই লোকে দেখিয়ে দেবে।এসো, আমাদের বাড়ি, কেমন?" বলেছিলেনআমার প্রিয় অঙ্কের দিদিমণি, তন্দ্রা
দিদিমণি।যাঁকে ভালোবেসেই আমার অঙ্ককে
ভালোবাসা।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার হরিনাভি সুভাষিণী বালিকা শিক্ষালয়। ক্লাস সেভেন।শুনলাম বেশ কয়েকজন নতুন দিদিমণি আসছেন যাঁরা উঁচু ক্লাসে বিজ্ঞান আর অঙ্ক পড়াবেন।এলেন তাঁরা। সেই প্রথম তন্দ্রাদিকে দেখি।অঙ্কের দিদিমণি, তার ওপর আবার নাইন আর টেনে পড়াবেন শুধু, ভয় আর সমীহের দৃষ্টিতেই তাকানো শুধু।
দু'বছর অপেক্ষা করতে হলো দিদিমণির
ক্লাস পাবার জন্যে। উঠলাম ক্লাস নাইনে।পরিচয় হলো শিক্ষিকার আর ছাত্রীর।সপ্তাহে ছ'দিন সাধারণ মাধ্যমিকের অঙ্ক আর চারদিন অতিরিক্ত গণিত।অতিরিক্ত গণিতের ক্লাসে গোনাগুন্তি
পাঁচটি স্টুডেন্ট।সেই ক্লাসটিতেই ঘনিষ্ঠতা আর আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠলো যেন।
ক্লাস পাবার জন্যে। উঠলাম ক্লাস নাইনে।পরিচয় হলো শিক্ষিকার আর ছাত্রীর।সপ্তাহে ছ'দিন সাধারণ মাধ্যমিকের অঙ্ক আর চারদিন অতিরিক্ত গণিত।অতিরিক্ত গণিতের ক্লাসে গোনাগুন্তি
পাঁচটি স্টুডেন্ট।সেই ক্লাসটিতেই ঘনিষ্ঠতা আর আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠলো যেন।
জ্যামিতি ক্লাসের কথা খুব মনে পড়ে, নীরস উপপাদ্য শেখার ক্লাস।কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমতী শিক্ষিকা এমন ফন্দি এঁটেছেন যে প্রতিটি ছাত্রী মনোযোগী।প্রতি ক্লাসে ঘোষণা করেন, "আমি পড়ানো আর বোঝানো শেষ করার পর যে যে আমাকে বোঝাতে পারবে
উপপাদ্যটা,হাত তুলবে ।"
উপপাদ্যটা,হাত তুলবে ।"
একের পর হাত ওঠে কেউ ভালো করে পারে, কেউ পারে না।যারা পারে না , তাদের আবার একটু বুঝিয়েদেবার পালা।কিন্তু মন দিয়ে শোনে সব্বাই।শেখেও বেশ।জটিল জ্যামিতির ক্লাস হয়ে ওঠে আদরের।
মনোযোগ আদায় করে নেওয়ার এই কৌশল নিজেও যখন অঙ্কের দিদিমণি হয়েছি প্রয়োগ করেছি দেশে এমনকি এখন বিদেশেও।চমৎকার ফল দেয়, ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ ভরা মুখ আমাকে প্রতি ক্লাসে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার কৈশোরে।
আর একটা গুণ ছিল তন্দ্রা দিদিমণির।অপূর্ব সুন্দর নাচতে পারতেন।ক্লাস নাইনেই তখন।স্কুলের ত্রিবার্ষিক পুরস্কার বিতরণী উৎসব।"ঋতুরঙ্গ" হবে। সে যুগটা ছিল রেডিওর যুগ।বাড়িতে তখন ক্যাসেট প্লেয়ারও ছিল না।
তিনটি রবীন্দ্রসংগীত সেই প্রথম দিদিমণির দৌলতেই শুনি সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে ।
"এস শ্যামল সুন্দর", "এবার অবগুন্ঠন খোলো" আর "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে"!
"এস শ্যামল সুন্দর", "এবার অবগুন্ঠন খোলো" আর "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে"!
নিজে নাচের "ন"ও বুঝি না,কিন্তু সেই
অপূর্ব কোরিওগ্রাফিগুলি আজও মনে বসে আছে।
এখনও যেন শুনতে পাই দিদিমনি গুনছেন, "এক দুই, তিন, চার...আমি ষোলো গুনলে তোমরা একটা সার্কেল ঘুরে নাচ শুরু করবে! গানের মেয়েরা রেডি হবে তার মধ্যে!"
অপূর্ব কোরিওগ্রাফিগুলি আজও মনে বসে আছে।
এখনও যেন শুনতে পাই দিদিমনি গুনছেন, "এক দুই, তিন, চার...আমি ষোলো গুনলে তোমরা একটা সার্কেল ঘুরে নাচ শুরু করবে! গানের মেয়েরা রেডি হবে তার মধ্যে!"
শাসনে সোহাগে ভরা মধুর দিনগুলো! একদিনের কথা খুব মনে পড়ে।সব ছাত্রীরা বাড়ির কাজ ঠিকঠাক জমা দিচ্ছিলো না কিছুদিন ধরে।দিদিমনি রাশ টানলেন। কড়া হলেন।সবাইকে হোম ওয়ার্ক জমা দিতেই হবে, নয়তো একহাতে কান ধরে দাঁড়িয়ে ক্লাসে অঙ্ক করতে হবে।
আমি আগের দিন রাতেই সব অঙ্ক করে
রেখেছি। আগের খাতাটা ফুরিয়ে গেছিল।নতুন খাতায় সুন্দর করে মলাট দিয়ে তাতেইকরেছি বাড়ির কাজ।
টিফিনের পরের পিরিয়ডে অঙ্ক ছিল
সেদিন।দুটো ঘন্টা পড়তো টিফিনের পরে, একটা ওয়ার্নিং আর একটা ক্লাস শুরু হবার।ওয়ার্নিং বেল পড়ার পর ক্লাস মনিট্রেস বাড়ির কাজের খাতা তুলতে শুরু করলো।ব্যাগ থেকে খাতা বের করতে গিয়ে দেখি, ওমা! ব্যাগে ভরেছি পুরোনো খাতাটা !নতুন খাতা বোধহয় টেবিলেই পড়ে আছে।
রেখেছি। আগের খাতাটা ফুরিয়ে গেছিল।নতুন খাতায় সুন্দর করে মলাট দিয়ে তাতেইকরেছি বাড়ির কাজ।
টিফিনের পরের পিরিয়ডে অঙ্ক ছিল
সেদিন।দুটো ঘন্টা পড়তো টিফিনের পরে, একটা ওয়ার্নিং আর একটা ক্লাস শুরু হবার।ওয়ার্নিং বেল পড়ার পর ক্লাস মনিট্রেস বাড়ির কাজের খাতা তুলতে শুরু করলো।ব্যাগ থেকে খাতা বের করতে গিয়ে দেখি, ওমা! ব্যাগে ভরেছি পুরোনো খাতাটা !নতুন খাতা বোধহয় টেবিলেই পড়ে আছে।
হাত পা ঠান্ডা! শাস্তির ভয়ে নয়, ভীষণ মন খারাপ! ক্লাসের দরজার বাইরে গিয়ে
দাঁড়ালাম।দিদিমণি ক্লাসে ঢুকতেই বললাম সত্যিটা, আমার চরম ভুলের কীর্তি।ভীষণ ভালোবাসতেন তন্দ্রাদি,মনে একটা আলাদা জায়গায় আছে আমার জন্যে, বুঝতাম সেটা।তবুও আমি বলামাত্রই ভীষণ গম্ভীর হয়ে
বললেন, "ভুল যখন করেছ, শাস্তি পেতেই হবে।''
দাঁড়ালাম।দিদিমণি ক্লাসে ঢুকতেই বললাম সত্যিটা, আমার চরম ভুলের কীর্তি।ভীষণ ভালোবাসতেন তন্দ্রাদি,মনে একটা আলাদা জায়গায় আছে আমার জন্যে, বুঝতাম সেটা।তবুও আমি বলামাত্রই ভীষণ গম্ভীর হয়ে
বললেন, "ভুল যখন করেছ, শাস্তি পেতেই হবে।''
মাথা পেতে নিলাম শাস্তি।চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে আর অঙ্ক করছি।ছুটির পর গেট দিয়ে বেরিয়ে দেখি উনি
দাঁড়িয়ে। ডাকলেন কাছে। বললেন, "জানতাম তুমি সত্যি বলছো,শাস্তি দিতে মনচায় নি, কিন্তু শিখতে হবে তো জীবনে দায়িত্বশীল হতে, তোমার তো উচিত ছিল আরএকবার ব্যাগ চেক করা তাই না?"
দাঁড়িয়ে। ডাকলেন কাছে। বললেন, "জানতাম তুমি সত্যি বলছো,শাস্তি দিতে মনচায় নি, কিন্তু শিখতে হবে তো জীবনে দায়িত্বশীল হতে, তোমার তো উচিত ছিল আরএকবার ব্যাগ চেক করা তাই না?"
মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।অভ্যাসটা বসে গেলো ভেতরে সারাজীবনেরমত।দু'বার দেখে,মিলিয়ে নেওয়ার অভ্যাস।
নাইন আর টেন, দুটো বছর অঙ্কের দিদিমণিকে ভালোবাসা আর সঙ্গে সঙ্গে অঙ্ককে।আজ যে অঙ্ক আমার ভালোবাসা আর
পেশা সে তো দিদিমণিরই দান।
আমরা মাধ্যমিক দেবার বছর দু'য়েক পরে তন্দ্রাদি ওনার বাড়ির কাছের কোন একটা স্কুলে কাজ নিয়ে চলে যান।গেছিলাম দেখা করতে।মন খারাপ,চোখ ছলছল।
নাইন আর টেন, দুটো বছর অঙ্কের দিদিমণিকে ভালোবাসা আর সঙ্গে সঙ্গে অঙ্ককে।আজ যে অঙ্ক আমার ভালোবাসা আর
পেশা সে তো দিদিমণিরই দান।
আমরা মাধ্যমিক দেবার বছর দু'য়েক পরে তন্দ্রাদি ওনার বাড়ির কাছের কোন একটা স্কুলে কাজ নিয়ে চলে যান।গেছিলাম দেখা করতে।মন খারাপ,চোখ ছলছল।
আরো বছর দু'য়েক পর জানলাম দিদিমণি আবার স্কুলে আসছেন কিছু সময়ের জন্যে, ১১-১২ ক্লাসের ছাত্রীদের সাহায্য করতে।তখন পারমানেন্ট অঙ্কের টিচার আসেননি তাই।
গেলাম দেখা করতে। কলেজের ছাত্রী।পড়ছি আবার সেই অঙ্ক-ই।স্কুলের সেই কিশোরীকে আবার নতুনভাবে দেখে আদর আর স্নেহের বন্যা।
সেই শেষ দেখি ওনাকে।এর কিছুদিন পরই হঠাৎ জানতে পারি, দুরারোগ্য কর্কট রোগ ছিনিয়ে নিয়েছে সেই অফুরন্ত জীবনীশক্তিকে।বিশ্বাস করতে মন চায় নি, কিন্তু মেনে নিতে হয়,সয়ে নিতে হয়।
সেই শেষ দেখি ওনাকে।এর কিছুদিন পরই হঠাৎ জানতে পারি, দুরারোগ্য কর্কট রোগ ছিনিয়ে নিয়েছে সেই অফুরন্ত জীবনীশক্তিকে।বিশ্বাস করতে মন চায় নি, কিন্তু মেনে নিতে হয়,সয়ে নিতে হয়।
দিন কেটে গেছে এরপর।কলেজ, ইউনিভার্সাটির গন্ডি শেষ করে আমিও হয়েছি স্কুলের অঙ্কের দিদিমণি।
বি-এড ক্লাস শুরু করেছি। ডেপুটেশনে।মানে চাকরিকালীন সময়ে ছুটি নিয়ে পড়াশোনা।
বি-এড ক্লাস শুরু করেছি। ডেপুটেশনে।মানে চাকরিকালীন সময়ে ছুটি নিয়ে পড়াশোনা।
কলেজটা ওয়েলিংটনে।শিয়ালদা দক্ষিণ স্টেশনে নেমে হেঁটে যাওয়াযায়।একটা গলিতে ঢুকতেই নজরে পড়লো সাইনবোর্ড ," House of Time". বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো।এই সেই দোকান। সময় চলে গেছে।আসা হয় নি তো সেই বাড়িতে, যেখানে আসার নিমন্ত্রণ করেছিলেন একজন অনেক অনেক দিন আগেএকটা বিরাট শূন্যতা ছেয়ে গেলো মনে!
নেই, নেই, তিনি নেই, কোত্থাও নেই! চোখে
জল এলো, দাঁড়িয়ে পড়লাম একটুক্ষণ।হঠাৎ মনে হল চাঁদের আলোর দেশ থেকে বাতাসে ঢেউয়ের মত ভেসে এলো কার যেনচেনা গন্ধ, কানে এলো মধুর আদরের ডাক । মনে মনে তাঁকে একবার প্রণাম করে কলেজের দিকে হেঁটে চললাম।মনটা ভরে রইলো এক মধুর সুরভীতে।
নেই, নেই, তিনি নেই, কোত্থাও নেই! চোখে
জল এলো, দাঁড়িয়ে পড়লাম একটুক্ষণ।হঠাৎ মনে হল চাঁদের আলোর দেশ থেকে বাতাসে ঢেউয়ের মত ভেসে এলো কার যেনচেনা গন্ধ, কানে এলো মধুর আদরের ডাক । মনে মনে তাঁকে একবার প্রণাম করে কলেজের দিকে হেঁটে চললাম।মনটা ভরে রইলো এক মধুর সুরভীতে।

সাহিত্যিক অদিতি ঘোষদস্তিদার
১৮৯ জনসন রোড, নিউ জার্সি, আমেরিকা


0 Comments