অরিজিৎ পাঠকের মুক্তগদ্য



শহরের অ্যালবামে থাকা গল্পগুলো

আমার চেনা শহরের অ্যালবামে বেশ কিছু গল্প লুকিয়ে আছে...। ঢেউয়ের মত ভেঙে যাওয়া আমার গল্পগুলো লুকিয়ে আছে আমার সাদা কালো অ্যালবাম জুড়ে আঁকা অকপট শহরের জেগে থাকা ছবির সাথে ।‌ যে গল্প জুড়ে কখনো থাকে রোদ্দুরের মত ঝলমলে বৃষ্টি, বৃষ্টির মত পালতোলা আকাশ, আকাশের মত ভেসে বেড়ানো চালচিত্র, আবার কখনো ওই চালচিত্র জুড়ে থাকে আমার ছেলেবেলার পুরোনো বাড়ির ছাদে কালো মেঘের মধ্যে গচ্ছিত রাখা হারিয়ে যাওয়া প্রেমপত্রের প্রতিটা অক্ষর–আমার গল্পের প্রতিটি চরিত্রের আদলে তৈরী। সকাল বিকেল এক ঘটনাবহুল অভ্যেস হয়ে তারা আমাকে জাগিয়ে রাখে আমার অজানা গল্পের আনকোরা প্লটের মতন

আমার গল্পটার সবটা লেখা এখন শেষ হয়নি। ধোঁয়া ওঠা শহরের ওই অ্যালবামটার মধ্যে আমার যে ভাঙাচোরা বাড়ির ছবি তোলা আছে, যেখানে প্রতিটি ইঁটের গায়ে সযত্নে লিখে রাখা আমার ফেলে আসা জীবনের শয়ে শয়ে অজানা অধ্যায়গুলো...শৈশবের অপ্রকাশিত স্মৃতি কিম্বা প্রথম চুম্বনের ঝাঁঝালো গন্ধের মত হয়ে – সেই তালাবন্ধ বাড়িটাকে পেছনে ফেলে অ্যালবামের গল্পগুলোর হাত ধরে আমাকে প্রতি মুহূর্তে এগিয়ে যেতে হয় আমার এই ছোট্ট শহরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আরেকটা শহরসীমায়। এগিয়ে যেতে হয় কোনো মাটির রাস্তা, অলিগলি কিম্বা পিচ বাঁধানো রাজপথ ধরে ।

শহরের ওই অ্যালবামটার দিকে তাকালেই আমি দেখতে পাই, রাত বাড়তেই ভাঙ্গা বাড়িটায় সবাই এসে জড়ো হচ্ছে। রাংতায় মুড়ে ফেলা হচ্ছে আমার জরাজীর্ণ ছেড়ে আসা বাড়ি। দেওয়ালে রঙের প্রলেপ পরছে, পাতা হচ্ছে লাল রঙের গালচে। নববধূর মত সেজে উঠছে আমার খসে পড়া জীর্ণ পলেস্তারার বৃদ্ধ বাড়িটা। তারপর হঠাৎ ক্ল্যাপস্টিক হাতে এসে দাঁড়ায় আরো কিছু লোক – সেই ক্ল্যাপস্টিকের শব্দ আর লাইট সাউন্ড ক্যামেরা অ্যাকশন– চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠছে আমার ভাঙাচোরা বাড়ির ভেতর মহলখানা ।

এদিকটায়  কিছুটা ভোর হয়ে এলে, আমার নিস্পৃহ হয়ে আসা শহরের অ্যালবাম টাকে জড়িয়ে ধরে‌ ওই কোলাহল থেকে তখন আমি পালাতে থাকি। প্রথমে কিছুটা দৌড়ই, তারপর আস্তে আস্তে হাঁটি। হাঁটতে থাকি আমার চেনা শহরটার প্রতিটা এলাকা পাড়া মহল্লা ধরে । একটা চার মাথার মোড় থেকে অন্য দিগন্তের দিকে । বড় রাস্তার থেকে ডান কিম্বা বা দিকে বেঁকে গিয়ে কোনো চায়ের দোকানে বসে চা খাই, এটাসেটা কথা বলি,  তারপর আবার নির্জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আমার অ্যালবামের গল্পের সাজানো প্লট ধরে এক পা..দুই পা করে হাজার মাইল হেঁটে যাই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। আর যেতে যেতে  বুঝতে পারি কিভাবে দিন বাড়লেই রাস্তার ধারে যুগপৎ বদলে যায় পুরোনো গল্পের সাজানো দৃশ্যপট আর সমস্ত চরিত্ররা.. প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্ত জুড়ে। রুপোলি পর্দায় ফুটে ওঠা নতুন কোনো গল্পের হাত ধরে আরেকবার ক্ল্যাপস্টিকের শব্দ হয়, তারপর – লাইট সাউন্ড ক্যামেরা আর অ্যাকশন চিৎকারে এক এক করে সামনে আসতে থাকে জুড়ে দেওয়া সাদাকালো ছবির রঙীন দৃশ্যগুলো। নতুন কোনো নায়ক নায়িকা আসে, বৃষ্টিতে গান গায়, ভালোবাসে চুমু খায়, খালি পায়ে ছোটাছুটি করে, আর আমার চোখের সামনে আমার এত দিনের পরিচিত শহরের সাদা কালো অ্যালবামটা ও , জানি না কেনো একটু একটু করে রঙীন হয়ে ওঠে – আমার সমস্ত আপত্তি কে উপেক্ষা করে , সবকটা ছবিই রঙীন হয়ে ওঠে –ভীষণ..ভীষণ রঙীন...

...হয়ত অনেকটা ওই রঙীন সিনেমাটার মতই ।।

গদ্যকার অরিজিৎ পাঠক























0 Comments